[0:09]Sunday suspense শুধুমাত্র রেডিও মির্চি 98.3 এফএম ইট'স হট।
[0:21]বাংলা সাহিত্যের রোমাঞ্চকর কিছু গল্প দিয়ে সাজানো আমাদের এই বিশেষ নিবেদন সান্ডে সাসপেন্স। সরল ও অনাবিল হাসির গল্প লেখক প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায় জন্মেছিলেন 1873 সালে বর্ধমানের ধাত্রী গ্রামে। পেশায় ব্যারিস্টার প্রভাত কুমার প্রথম জীবনে কবিতা লিখতেন। পরে রবীন্দ্রনাথের উপদেশে গদ্য রচনায় হাত দেন। তিনি রাধামনি দেবী ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন। প্রায় 15 টি উপন্যাস এবং 100 র বেশি ছোট গল্প লিখেছেন। তার লেখা উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো অভিশাপ, গল্পবিথি, সতীর পতি, রমা সুন্দরী ইত্যাদি। তার মৃত্যু হয় 1932 সালে। সান্ডে সাসপেন্সে আজ প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায় লেখা একটি ভৌতিক কাহিনী। গল্পটি আমরা নিয়েছি মিত্র ও ঘোষ থেকে প্রকাশিত 100 বছরের সেরা ভৌতিক এই বইটি থেকে। বইটি সম্পাদনা করেছেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ও বারীদ বরণ ঘোষ। প্রধান চরিত্রে উপেন্দ্রনাথ ঘোষ, রমা প্রসন্ন মজুমদার, উপেন্দ্রনাথের মা, দিনু, রাশবিহারী বাবু, গাড়োয়ান এবং ভূত। গল্প পাঠে ও বিভিন্ন চরিত্রে দীপ। গল্পের সূত্রধার মীর। শুরু হচ্ছে একটি ভৌতিক কাহিনী।
[2:00]আমার নাম শ্রী উপেন্দ্রনাথ ঘোষ। নিবাস বীরভূম জেলার টগরা নামক গ্রামে। 1872 খ্রিস্টাব্দে আমি বিয়ে পাস করে চাকরির সন্ধানে প্রবৃত হই। কয়েক মাস ধরে বহু জায়গায় বহু আবেদন করলাম। কিন্তু কোন ফল পেলাম না। অবশেষে শিউড়ি জেলা স্কুলের দ্বিতীয় শিক্ষকের পদ শূন্য হয়েছে সংবাদ পেয়ে নিজেই সেখানে গিয়ে বহু লোকের খোশামোদ করে চাকরিটি জোগাড় করলাম। আমার মাইনে হলো মাসিক 50 টাকা। আমাদের গ্রাম থেকে শিউড়ি 12 ক্রোশ দূরে। বরাবর একটা কাঁচা রাস্তা আছে। আমি গ্রামে ফিরে গিয়ে নিজের জিনিসপত্র নিয়ে এসে দুদিন পরে নতুন কাজে লেগে পড়লাম। যেমন অল্প মাইনে তেমনই একটা ছোটখাটো সস্তা বাড়ি খুঁজতে লাগলাম। কিন্তু পেলাম না। রাতের শোয়া আর খাওয়া-দাওয়াটা হেডমাস্টার মশাইর বাড়িতেই করি। দিনের বেলা স্কুলে কাজ করি এবং অবসর সময়ে বাড়ি খুঁজে বেড়াই। অবশেষে শহরের প্রান্তে একটি বড় খালি পাকা বাড়ি সন্ধান পেলাম। বাড়িটি বহু কাল খালি পড়ে আছে। বাড়িটি জায়গায় জায়গায় ভাঙা। মাত্র কয়েকটি এমন ঘর রয়েছে যেখানে বসবাস করা যায়। মাসিক পাঁচ সিক্তি মাত্র ভাড়া দিলেই বাড়িটি পাওয়া যায়। কিন্তু গুজব এই যে বাড়িটিতে ভূত আছে। তখন আমি সদ্য কলেজের ছোকরা, ইয়াং বেঙ্গল। ভূতের ভয়ে যদি পিছু হটি তবে আমার বিদ্যা মর্যাদা একেবারে ধুলিসাত হয়ে যায়। সুতরাং বাড়ি নেব বলেই স্থির করলাম। কিন্তু অত দূরে একলা থাকা নিরাপদ নয়। চোর ডাকাতের ভয় তো আছেই। তাই একজন সঙ্গীর খোঁজ করতে লাগলাম। একজন জুটেও গেলেন। তিনি আমাদেরই স্কুলের চতুর্থ শিক্ষক, নাম রাসবিহারী মুখোপাধ্যায়। যদিও উনি বিয়ে পাস করেননি, তাও কলেজে পড়েছেন এবং নিজেকে ইয়াং বেঙ্গল শ্রেণীভুক্তই মনে করেন। তার আগের বাড়িতে কিছু অসুবিধা হচ্ছিল। তাই তিনি আমার সঙ্গে এই বাসায় থাকতে রাজি হয়ে গেলেন। একজন রান্নার লোক স্থির করা গেল। কিন্তু তারা রাত্রিবেলা সে বাড়িতে থাকতে রাজি হলো না। বলল কাজকর্ম সেরে আমাদের খাওয়া-দাওয়া হয়ে গেলে রাত্রি নটার মধ্যেই যে যার নিজের বাড়িতে ফিরে যাবে। কি করি? তাই মেনে নিতে হলো। পরবর্তী রবিবার সকালে জিনিসপত্র নিয়ে সেই বাড়িতে গিয়ে হাজির হলাম। বাড়িটি খুব পুরনো। চারিদিকের প্রাচিল জায়গায় জায়গায় ভাঙা। গোরুমোষ আটকানোর জন্য বাঁশের বেড়া বাঁধা আছে। বাড়িটির চারদিকে বাগান। অনেকগুলো নারকোল, আম, কাঁঠাল, জাম প্রবৃত্তি ফলের গাছ আছে। বাড়িটি দোতলা। নিচের তলার সামনের দিকটা বেশ বড় এবং দুখানি ঘর আছে। শুধু সেই ঘর দুটি আমরা দখল করলাম। কারণ আমাদের প্রয়োজন অল্প। বাড়ির পেছনে একটা পুকুর। তার জল পানযোগ্য নয়, স্নানযোগ্যও নয়। তবে বাসন মাজা প্রভৃতি বাড়ির কাজে তা লাগানো যেতে পারে। বাড়ির অল্প দূরে একটা খুব সুন্দর দীঘি ছিল। আমরা সেখানে গিয়েই চান করতাম এবং রান্না খাওয়ার জন্য সেই জল আনাতাম। একটি ঘর খাওয়া-দাওয়া করবার জন্য ঠিক করা হলো। অন্যটিতে দুটি চৌকি পেতে আমরা দুজনে সুতাম। সমস্ত রাত ঘরে প্রদীপ জ্বালা থাকত। এইভাবে কিছুদিন যায়। ইতিমধ্যে দশেরা দুদিন ছুটি হলো। সেই সঙ্গে একটা রবিবারও পাওয়া গেল। আমি বাড়ি গেলাম। বাড়িতে দুদিন মাত্র থেকে তৃতীয় দিন পায়ে হেঁটে শিউড়ির জন্য বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের গ্রামের এক ক্রোশ পরে হাতছালা বলে একটি গ্রাম আছে। আগে এখানে স্থানীয় জমিদারের অনেকগুলো হাতি বাঁধা থাকত। হাতিশালা থেকেই হাতছালা নামটি উৎপন্ন হয়েছে। সেই গ্রামের প্রান্তে রাস্তার ধারে একটি মন্দির আছে। সেই মন্দিরে রমা প্রসন্ন মজুমদার নামক এক ব্রাহ্মণ সর্বদা বাস করেন এবং জপ-তপ নিয়ে থাকেন। তিনি একজন সিদ্ধ পুরুষ বলে বিখ্যাত। আশপাশের চারিদিকের গ্রামের লোকেরা তাকে যথেষ্ট শ্রদ্ধা ভক্তি করে। সেখান দিয়ে যেতে যেতে দেখলাম মজুমদার মশাই খরং পায়ে দিয়ে মন্দিরের বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন। দেখে রাস্তা থেকে নেমে গিয়ে আমি তাকে প্রণাম করলাম। আশীর্বাদ করে তিনি আমায় বললেন, ভালো থাকো, ভালো থাকো। কোথায় যাচ্ছ বাবা? আমি উত্তরে বললাম, শিউড়ি স্কুলে আমার মাস্টারি চাকরি হয়েছে। দশেরার ছুটিতে বাড়ি এসেছিলাম। কাল স্কুল খুলবে, তাই ফিরে যাচ্ছি। মজুমদার মশাই একটু চিন্তা করে বললেন, বাবা, আজ কি তোমার না গেলেই নয়? আজ বাড়ি ফিরে যাও। কাল যেও। আমি বললাম, কাল স্কুল খুলবে। আমার তো নতুন চাকরি। কামাই হওয়াটা খুবই খারাপ কথা। সুতরাং আমাকে ওরকম আদেশ করবেন না। মজুমদার মশাই বললেন, তুমি কোথায় বাসা নিয়েছো? শহরের দক্ষিণ দিকে একটা পুরনো খালি বাড়ি ছিল। সেইটা ভাড়া নিয়ে আমি আর আমার স্কুলের আরেকজন মাস্টার রাসবিহারী মুখোপাধ্যায় একসঙ্গেই থাকছি। বলে মজুমদার মশাইকে প্রণাম করে আমি পথ চলতে লাগলাম।
[8:41]বেলা আন্দাজ দুটোর সময় শিউড়ি পৌঁছলাম। স্নানাহার সারতে পাঁচটা বেজে গেল। খাওয়া সেরে বারান্দায় বসে তামাক খাচ্ছি এমন সময় দেখি আমাদেরই গ্রামের একজন চাষী বিরাট লম্বা লাঠি ঘাড়ে করে এসে উপস্থিত হয়েছে। তাকে দেখে অবাক হয়ে আমি জিজ্ঞেস করলাম, কিরে তুই হঠাৎ কোত্থেকে এলি? সে বলল, আগে মা ঠাকুরানি চিঠি দিয়েছেন এবং এই কবজটি আপনার হাতে পরবার জন্য পাঠিয়ে দিয়েছেন। চিঠি পড়ে দেখলাম তাতে মাথা ঠাকুরানী লিখেছেন, তুমি বাড়ি হইতে যাত্রা করিবার পর রমা প্রসন্ন মজুমদার মহাশয় আসিয়া ছিলেন এবং একটি কবজ দিয়া বলিলেন, না তোমার ছেলে আজ প্রাতে শিউড়ি রওনা হয়েছে। পথে তাহার সঙ্গে দেখা হলো। তাহার জন্য আমি এই রাম কবজটি আনিয়েছি। তুমি যেমন করিয়া পারো আজই এই কবজটি তোমার ছেলেকে পাঠাইয়া দাও এবং বিশেষ করিয়া লেখো যেন আজই সেই কবজটি ধারণ করে। আর লিখিয়া দাও যদি কোনরকম ভয় পায় তবে যেন তারক ব্রহ্ম নাম জপ করে। এই কবজের গুণে এবং নামের বলে সে সকল বিপদ হইতে মুক্ত হইবে। সুতরাং আমি দিনুকে দিয়া এই চিঠি ও কবজ পাঠাইলাম। পাওয়া মাত্র রাম নাম স্মরণ করিয়া তুমি কবজটি ভক্তিপূর্বক তোমার ডান হস্তে ধারণ করিবে। যেন কোনমতে কথার কোন অন্যথা না হয়। ইহা তোমার মাতৃ আজ্ঞা জানিবে। চিঠি ও কবজ নিয়ে আমি দিনুকে বললাম, তুই আজ এখানেই থাকবি তো? তোর খাবার জোগাড় করি? সে বলল, আগে না। মা ঠাকুরানি কিন্তু জোর দিয়ে বলে দিয়েছেন তুই নিজে দাঁড়িয়ে থেকে কবজটা পরিয়ে দিবি এবং আজ রাত্রেই এসে আমায় খবর দিবি যে আমার ছেলে কবজ পড়েছে। সুতরাং তাকে থাকবার জন্য আর অনুরোধ করলাম না। তার হাতে দুআনা পয়সা দিয়ে বললাম, এ নে বাজার থেকে কিছু মুড়িমুরকি কিনে পথে যেতে যেতে খাবি, কেমন? তার সামনে কবজটা আমি হাতে ধারণ করলাম। সে আমায় প্রণাম করে বিদায় নিল। সেদিন রাত্রে খাওয়া-দাওয়ার পর যথাসময় দুজনে শুয়ে পড়লাম। দুজনেরই চৌকির মাথার দিকে দুটো বড় বড় জানলা খোলা ছিল। আকাশে মেঘ। মাঝে মাঝে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। আবার মাঝে মাঝে প্রবল হাওয়া এসে মেঘকে উড়িয়ে দিচ্ছে আর একাদশী চাঁদ দেখা যাচ্ছে। আমরা দুজনে কিছুক্ষণ গল্পগুজব করে নিস্তব্ধ হলাম। পথশ্রমে ক্লান্ত ছিলাম। তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লাম। অনেক রাত্রে হঠাৎ ঘুম ভেঙে দেখি বাতাসে প্রদীপটা নিভে গেছে। ক্ষীণ মেঘের মধ্যে দিয়ে জোছনা জানলা দিয়ে ঘরে ঢুকে উল্টো দিকের দেয়ালের একটা অংশ আলোকিত করেছে। ঘুম জড়ানো চোখ অল্প খুলে দেখলাম যেন একটা কঙ্কালসার বৃদ্ধ আমার খাটের ওপর হাঁটু গেড়ে থাবা পেতে বসে আছে এবং একদৃষ্টে আমার প্রতি চেয়ে রয়েছে। তার মুখখানা যেন বহুদিন রোগে শীর্ণ। গালের চামড়া ঝুলে পড়েছে। দন্তহীন মাড়ির উপর তার ঠোঁট দুটো চুপসে বসে গেছে। মাথায় সাদা ছোট চুলগুলো যেন দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার চোখ দুটো থেকে যেন ক্রোধ, ঘৃণা ও বিদ্রূপের জ্বালা বেরিয়ে আসছে। দেখে আমি আপাদ মস্তক শিউড়ে উঠলাম। ভয়ে চোখ বন্ধ করলাম। কিন্তু সে অবস্থায় বেশিক্ষণ থাকতে পারলাম না। আবার চোখ খুললাম। আবার দেখলাম সেই বিভৎস মূর্তি ঠিক সেই অবস্থায় বসে আছে। আবার চোখ বন্ধ করলাম। তখন হঠাৎ মায়ের চিঠিটার কথা মনে পড়ে গেল। মনে মনে বললাম, আমার ভয় কি? আমার হাতে রক্ষা কবজ রয়েছে এবং মৃদুসুরে তারক ব্রহ্ম নাম জপ করতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পরে আবার যখন চোখ খুললাম তখন সে মূর্তি আর নেই। সাহস পেয়ে উঠে বসলাম এবং ঘুম জড়ানো গলায় আমার বন্ধুকে ডাকতে লাগলাম। রাশবিহারী উঠে বললেন, কী মশাই? আমি তখন প্রদীপ জেলে সমস্ত ঘটনা তাকে খুলে বললাম। তিনি অত্যন্ত ভয় পেলেন। সমস্ত রাত আমরা গল্প করেই কাটিয়ে দিলাম। পরেরদিন সকালে সে বাড়ি ত্যাগ করে আমরা অন্যত্র আশ্রয় গ্রহণ করলাম। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে 10:00 টার সময় স্কুলে গেলাম। টিফিনের সময় ডাকওয়ালা পিয়ন একখানি চিঠি দিল। দেখলাম সেটি রমা প্রসন্ন মজুমদার লিখেছেন। চিঠির তারিখ ও ছাপ গতকালের। চিঠিটিতে লেখা আছে শ্রী শ্রী দূর্গাশরণম পরম শুভাশিষাদা সঁতুল বিশেষং বাবা জীবন। গতকালও তোমার সহিত সাক্ষাৎ হওয়ার পর আমি তোমার বাড়িতে গিয়াছিলাম এবং তোমার মাথা ঠাকুরানীকে তোমার নিমিত্ত একটি রাম কবজ দিয়ে আসিয়াছি। তাহাকে অনুরোধ করিয়াছিলাম যে অদ্যই তিনি সেটি যে কোন উপায়ে যেন তোমাকে পাঠাইয়া দেন যাহাতে অদ্যই নিশাগমের পূর্বে কবজটি তুমি ধারণ করিতে পারো। বোধহয় অদ্য রাত্রে তুমি কোনরূপ ভয় পাইবে কিন্তু সে রাম কবজটির গুণে তোমার কোন বিপদ হইবে না। কবজটি তুমি নিয়ত ধারণ করিয়া থাকিবে এবং আর যদি কখনো ভয়ের কারণ ঘটে তবে তারক ব্রহ্মের নাম জপ করিবে। সর্বদা শুদাচারে থাকিবে অত্র কুশল মা ভবানী তোমার মঙ্গল করুন ইতি নিয়ত আশীর্বাদুক শ্রী রমা প্রসন্ন দেব শর্মা।
[14:43]চিঠিটা পড়ে আমার বিস্ময়ের শেষ রইল না। সেটি রাসবিহারী বাবুকে দেখালাম। তিনিও খুব আশ্চর্য হলেন। পূজোর ছুটির সময় বাড়ি গিয়ে প্রথমেই মজুমদার মশাইকে প্রণাম করতে গেলাম। যে বিপদ থেকে তিনি আমাকে উদ্ধার করেছেন তার জন্য অনেক কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আমি জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা আমি যে সেই রাত্রে ভয় পাবো একথা আপনি কি করে জানতে পেরেছিলেন? একটু মৃদু হেসে মজুমদার মশাই বললেন, তুমি যখন সেদিন এসে আমাকে প্রণাম করলে তখনই আমি দেখলাম একটি প্রেতাত্মা তোমার পেছন পেছন ঘুরছে। কোন কারণে সে তোমার উপর ভয়ানক খেপে গেছে এবং তোমার প্রাণহানি করবার জন্যই সে তোমার সঙ্গ নিয়েছে। কেবল উপযুক্ত সময় পায়নি বলেই সে পর্যন্ত কৃতকার্য হতে সে পারেনি। তুমি চলে গেলে আমি গণনা করে দেখলাম যে সেই রাতেই ক্ষণ উপস্থিত হবে। তাই তাড়াতাড়ি একটি রামকবচ লিখে তোমার মাথা ঠাকুরানিকে দিয়ে এলাম। যাই হোক, কবজটা তুমি কখনো পরিত্যাগ করো না। আমি বললাম, মজুমদার মশাই আমার সঙ্গে যে লোকটা ঘরে শুয়ে ছিল তিনি কোন রকম ভয় পেলেন না কেন? আমরা দুজনেই একই সঙ্গে একই বাড়িতে ছিলাম। তবে আমার ওপরেই ভূতের এত আক্রোশ কেন? মজুমদার মশাই জিজ্ঞেস করলেন, সে লোকটির নাম কি? তার নাম রাসবিহারী মুখোপাধ্যায়। তিনি ব্রাহ্মণ। এই কারণেই ভূত তার কোন অনিষ্ট করতে পারেনি। তুমি কায়স্থ। তোমার প্রাণহানি করা তার পক্ষে সহজ হতো। এই কথা শুনে কিছুক্ষণ আমি নীরবে চিন্তা করলাম। তারপর বললাম, সে ভূত কি এখনো আমার অনিষ্ট করার চেষ্টা করছে? করছে। আর একবার সে তোমায় দেখা দেবে। কিন্তু সে ক্ষণ কতদিনে উপস্থিত হবে তা আমি এখন বলতে পারবো না। কিন্তু ওই রামকবজের বলে তোমার কোন বিপদ হবে না।
[17:05]তারপর আরো 7 বছর কেটে গেছে। কিন্তু আর কখনো এরম কোন ভয়ের কারণ ঘটেনি। শ্রী রামকবজটি এখনো ধারণ করেই আছি এবং যতদিন বেঁচে থাকবো ধারণ করেই থাকবো। আমি ক্রমে দ্বিতীয় শিক্ষক থেকে প্রধান শিক্ষক হলাম। তার পরেও আরো কয়েক বছর সুখ খ্যাতির সঙ্গে কাজ করে প্রেসিডেন্সি বিভাগের ডেপুটি ইন্সপেক্টর পদে যোগ দিলাম। আমার বেতন 150 টাকা হলো। মফঃস্বলের নানা স্থানে ঘুরে আমাকে বিদ্যালয় পরিদর্শন করতে হতো। একদিন মেদিনীপুর জেলার একটি গ্রামের স্কুল পরিদর্শন করতে গিয়েছি। সন্ধ্যের পর খাওয়া-দাওয়া করে একটি গরুর গাড়ি ভাড়া করে সেই গ্রামের দিকেই রওনা দিলাম। শরৎকালের পরিষ্কার রাত্রি আকাশে চাঁদ উঠেছিল। ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের পাকা রাস্তা দিয়ে গাড়ি মন্থর গতিতে চলছিল। আমি প্রথমে শুয়ে একটু ঘুমোবার চেষ্টা করলাম। ঘণ্টা দুই এপাশ ওপাশ করে যখন কিছুতেই ঘুম হলো না তখন চোখ খুলে উঠে বসলাম। দেখলাম গাড়োয়ান তার বসবার সেই ছোট্ট জায়গাটুকুতে কোন রকমের শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। জোছনা রাত পরিষ্কার পথ গেছে। গরু দুটি অবাদে আপন মনে চলছে। রাস্তার দু ধারে গাছের সারি। কোথাও দূরে দূরে কোথাও বা কাছাকাছি। ঝুরঝুর করে বাতাস বইছে। গাড়োয়ান আরাম এ ঘুমিয়ে যাচ্ছে দেখে গরিবকে জাগাতে আমার আর ইচ্ছে করল না। অথচ গরু দুটি অরক্ষিত অবস্থায় পথ চলে তাও নিরাপদ নয়। এই ভেবে আমি আর শুলাম না। বসেই রইলাম। এই অবস্থায় প্রায় ঘণ্টাখানেক কাটল। আমার একটু তন্দ্রা আসতে লাগল। আমি বসে বসে ঢুলতে লাগলাম। হঠাৎ গরু দুটি থেমে গেল। একটা ঝাঁকুনি দিয়ে গাড়িটি দাঁড়িয়ে পড়ল আর আমার ঘুম ছুটে গেল। চোখ খুলে দেখি সেই বিভৎস মূর্তি গরু দুটির সামনে পথ আটকে গাড়ির জোয়ালের উপর দুটো জীর্ণ হাত রেখে সেই কঙ্কালসার চেহারা দাঁড়িয়ে আছে এবং তার জ্বলন্ত দুটি চোখ থেকে যেন আগুন ঠিকরে বেরোচ্ছে। দেখে আমার শরীরের রক্ত হিম হয়ে গেল। আমি কাঁপতে লাগলাম। বুকের কাছে হাত রেখে তারক ব্রহ্ম নাম জপ করতে লাগলাম। কিছুক্ষণ জপ করতে করতে দেখলাম সে মূর্তি ছায়ার মতই মিলিয়ে যাচ্ছে। যখন সে একেবারে অদৃশ্য হয়ে গেল গরু দুটি তখন গাড়ির পেছন দিকে ঘুরে প্রাণপণে ছুটতে লাগল।
[20:16]ঝাঁকুনিতে গাড়োয়ানের ঘুম ভেঙে গেল। সে থরথর করে উঠে বসে বলল, বাবু বাবু এ কি গরু এমন ছুটছে কেন? আমি আসল কথাটাকে না বলে কেবলমাত্র বললাম, হয়তো পথে কোন কারণে ভয় পেয়েছেন। তাই ছুটে বাড়ি যাচ্ছেন। গাড়ি থামাবার এবং অনুঘোরাবার অনেক চেষ্টা করল। গরু দুটি নাঙ্গল টেনে ছিড়ে ফেলবার উপক্রম করল কিন্তু কিছুতেই তারা দাঁড়ালো না। দৌড়াতে দৌড়াতে অবশেষে যখন একটি গ্রামের বাজার উপস্থিত হলো এবং সেখানে অনেক লোকজন ও অন্যান্য গরুর গাড়ি দেখা গেল তখন গরু দুটি দাঁড়ালো। গরু দুটি ভয়ানক ক্লান্ত হয়ে পড়েছে দেখে আমি গাড়োয়ানকে বললাম, থাক আজ আর কাজ নেই। গরু দুটোকে খুলে দাও ওদের ঘাস আর জল দাও। কাল সকালে রওনা হওয়া যাবে। আজ রাত্রে এখানেই বিশ্রাম করি।
[21:22]তারপর আরো সাত বছর কেটে গেছে। কিন্তু আর কখনো এরম কোন ভয়ের কারণ ঘটেনি। শ্রী রামকবজটি এখনো ধারণ করেই আছি এবং যতদিন বেঁচে থাকবো ধারণ করেই থাকবো। আমার মায়ের এবং মজুমদার মশাইর লেখা সেই চিঠি দুটি আজও আমার কাছে আছে। যদি কেউ দেখতে চান আমি দেখাতে পারি।
[22:00]শুনছিলেন একটি ভৌতিক কাহিনী। রচনা প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়। গল্প পাঠে ও বিভিন্ন চরিত্রে দীপ। মায়ের ভূমিকায় ইন্দ্রানী। গল্পের সূত্রধার মীর। শব্দ গ্রহণ আবহ সংগীত এবং স্পেশাল এফেক্টসে রিচার্ড। পরিকল্পনা ও পরিচালনায় ইন্দ্রানী। আগামী সপ্তাহে ঠিক এই সময় আরো একটি রোমাঞ্চকর গল্প নিয়ে হাজির হবে সান্ডে সাসপেন্স।



