[0:00]ইফতার কখন? সন্ধ্যায় না রাতে? সিয়াম বা রোজা কতক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ করতে হবে? সূর্যাস্ত পর্যন্ত? নাকি রাত পর্যন্ত? অর্থাৎ ইফতারের সময় কখন থেকে শুরু হয়? সন্ধ্যায় নাকি রাত শুরু হলে? রাত কখন থেকে শুরু হয়? রাত কখন শেষ হয়? রাত কাকে বলে? রোজা কি ভাঙতে হয় নাকি রোজা পূর্ণ করতে হয়? আল্লাহ কি রোজা ভাঙতে বলেছেন নাকি রোজা পূর্ণ করতে বলেছেন? এ বিষয়গুলো সম্পর্কে আল কুরআন কি বলে? যুগ যুগ ধরে মানুষ সন্ধ্যার সময় বা সূর্য ডোবার সাথে সাথে ইফতার করে বা রোজা ভাঙ্গে। কিন্তু বর্তমান সময় সন্ধ্যায় ইফতার করা বা রোজা ভাঙ্গা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া তথা ইন্টারনেট ও ফেসবুকসহ নানান মানুষের মুখে নানান রকম কথা শোনা যায়। অধিকাংশ মানুষের ধারণা যে, সূর্যাস্তের সাথে সাথে রাত শুরু হয়ে যায়। কেউ কেউ বলে যে, সূর্যাস্তের ১০/১৫ মিনিট পরে রাত শুরু হয়ে যায়। তাই সূর্যাস্তের ১০/১৫ মিনিট পরেই ইফতার করা যাবে। অধিকাংশ মানুষ বলে যে, সূর্যাস্তের সাথে সাথে রোজা ভাঙতে হবে। কেউ কেউ বলে যে, রোজা পূর্ণ করার জন্য সূর্যাস্তের পর ১ ঘন্টা ১২ মিনিট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কেউ কেউ বলে যে, সূর্যাস্তের পর ১ ঘন্টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কেউ বলে সূর্যাস্তের সাথে সাথে তাড়াতাড়ি ইফতার করতে হবে। আবার কেউ কেউ বলে যে, সূর্যাস্তের পর রাত না হওয়া পর্যন্ত রোজা পূর্ণ করতে হবে ইত্যাদি। এত মতভেদের মধ্যে আমাদের প্রশ্ন জাগে যে, তাহলে এতদিন আমরা কি ভুল করে আসছি? তাই উপরোক্ত বিষয় সম্পর্কে আল কুরআন কি বলে তা জানার প্রয়োজন রয়েছে, সমাধান পাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে, ও গবেষণা করারও প্রয়োজন রয়েছে। উক্ত বিষয়টি বোঝার জন্য আমরা আল কুরআনের অনেকগুলো অনুবাদ যদি পড়ি। ১১৪ টি সূরা বা ত্রিশ পারা কুরআনের মধ্যে মাত্র একটি আয়াতেই আল্লাহ সিয়াম পূর্ণ করার কথা বলেছেন, কিন্তু ইফতার করার কথা বলেননি।
[2:31]সিয়াম পূর্ণ করার প্রসঙ্গে সেই আয়াতের অংশবিশেষ যথা কুলু আশ রাবু হাত্তা ইয়াতা বাইয়ানা লাকুমুল খইতুল আব ইয়াদু মিনাল খইতিল আসওয়া দি মিনাল ফাজরি, সুম্মা আতিমুহু হিয়ামা ইলাল লাইলি। অর্থ:- পাহাড় করো যতক্ষণ না রাতের কালো রেখা থেকে ভোরের শুভ রেখা স্পষ্টভাবে দেখা যায়। অতঃপর সিয়াম পূর্ণ করো নিশাগম পর্যন্ত/ রাতের আগম পর্যন্ত/ রাত পর্যন্ত/ রাত না হওয়া পর্যন্ত। এই যে বলা হলো নিশাগম পর্যন্ত অর্থাৎ রাতের আগমন পর্যন্ত। নিশি বা নিশা অর্থ রাত। সিয়াম পূর্ণ করার ব্যাপারে আল্লাহ আল কুরআনে আতিমু আল সিয়ামা ইলা আল লাইল শব্দগুলো উল্লেখ করেছেন। আতিমু অর্থ পূর্ণ করো। আল সিয়ামা অর্থ নির্দিষ্ট সিয়াম বা রোজা। ইলা অর্থ পর্যন্ত। আল লাইল অর্থ নির্দিষ্ট রাত। তাহলে পুরো অনুবাদ হবে সিয়াম পূর্ণ করো রাত পর্যন্ত, অর্থাৎ রাতের আগমন পর্যন্ত। আলিফ এবং লাম দ্বারা অর্থাৎ আল শব্দ দ্বারা সিয়াম এবং রাতকে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। ঠিক ইংরেজি গ্রামারে যেমন দি আর্টিকেলটা নির্দিষ্ট করা হয় যেমন সান, দি সান, দি মুন, দি কুরআন, দি কাউ।
[4:25]এইভাবে আরবিতে আল শব্দটা দ্বারা কোন জিনিসকে নির্দিষ্ট করা হয়। তো এই সূরা বাকারার ১৮৭ নাম্বার আয়াতে মহান আল্লাহ সরাসরি আতিমু শব্দ দ্বারা রোজা পূর্ণ করতে বলেছেন, রোজা ভাঙতে বলেননি। তারপর ইলা আল লাইল = ইলাল লাইল বাক্য দ্বারা রাত পর্যন্ত বা রাতের আগমন পর্যন্ত বলেছেন। উক্ত আয়াতের ইলাল লাইল বাক্যের ভিত্তিতে সিয়াম বা রোজা পূর্ণ করতে হবে রাত না হওয়া পর্যন্ত। উক্ত কথাগুলো আমার কথা নয়। উক্ত কথাগুলো সরাসরি আল্লাহ নিজেই আল কুরআনে বলে দিয়েছেন এবং আল কুরআনের প্রতিটি অনুবাদেও রাত শব্দ লেখা আছে। আল্লাহ সরাসরি লাইল তথা রাতের কথা বলেছেন। তাহলে এখন জানার বিষয় হবে রাত কাকে বলে, রাত কখন থেকে শুরু হয় এবং রাত কখন শেষ হয়? আল্লাহর কথা অনুযায়ী আল কুরআন থেকে এ তিনটি বিষয় বুঝতে পারলে আমরা এর একটি সমাধান পাবো ইনশা-আল্লাহ। আমরা জানি যে, সাধারণত চারটি দিক রয়েছে যথা পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণ। এখানেও শেষ নয়, এই চারটি দিকের চারটি কর্নারে আরও চারটি দিক রয়েছে, যথা ঈশান, বায়ু, অগ্নি, নৈরুত। এখানেও শেষ নয়, আরও দুটি দিক রয়েছে যথা ঊর্ধ্ব অধঃ। এই মোট দশটি দিক। তদ্রূপ রাত ও দিনই শেষ নয়। রাত এবং দিনের মধ্যবর্তী স্থানে আলো-আঁধারের সংমিশ্রণে আরও দুটি সময় রয়েছে যথা (১) ফজর (২) শাফাক। অর্থাৎ ভোর বা প্রভাত এবং অন্তরাগ বা সন্ধ্যা। ফজরের আজান থেকেই রাত শেষ হয়ে যায় এবং সেই সময় তারকাগুলোও অস্তমিত হয়।
[6:18]ফজরের আজান থেকে রাত শেষ হয়ে সূর্যোদয়ের আগ পর্যন্ত আলো-আঁধারের সংমিশ্রণের সময়কে বলা হয় ফজর/ ভোর/ প্রভাত/ সুবহে (সাদেক) (হিন্দি তে সুবাহও বলা হয়)। তদ্রূপ সূর্যাস্ত থেকে পুরোপুরি অন্ধকার না হওয়া পর্যন্ত আলো-আঁধারের সংমিশ্রণের সময়কে বলা হয় গোধূলি/ সন্ধ্যা/ অন্তরাগ/ শাফাক। (বিজ্ঞানের ভাষায় এ দুটি সময়কে বলা হয় “twilight” (টুইলাইট)।)
[7:00]বিজ্ঞানীদের মতে এ দুটি সময়ের পরিমাণ ৭২ মিনিট। তবে কারও মতে এ সময়ের পরিমাণ ৩০/৪০ মিনিট, কারও মতে ১ ঘন্টা ১৫ মিনিট এবং কারও মতে ১ ঘন্টা ৩০ মিনিট ইত্যাদি। এ বিষয়গুলো নিয়ে মানুষের মধ্যে ব্যাপক ভাবে চিন্তা-ভাবনা বা আলোচনা না থাকার কারণেই একাধিক মত পাওয়া যায়। তবে সঠিকভাবে গবেষণা করলে এ দুটি সময়ের সঠিক পরিমাণ বলা যাবে। বুঝে না আসলেও বা মেনে নিতে না পারলেও এ দুটি সময় দিনেরই অংশ। কারণ, আল কুরআনে অন্ধকারকে রাত বলা হয়েছে। (প্রশ্নবিদ্ধ দলিল দ্বারা আরবী সাল বা হিজরী সাল গণনায় সূর্যাস্ত থেকেই রাত শুরু হয়ে তার পরের দিনের দিন শুরু হয় বলে ধরা হয়।)
[8:17]তাই অধিকাংশ মানুষ ধরে নেয় যে, সূর্যাস্তের সাথে সাথে দিন শেষ হয়ে রাত শুরু হয়ে যায়, যার কারণে মানুষ সূর্য ডোবার সাথে সাথেই রোজা ভাঙতে শুরু করে। রাহুলের মৃত্যুর ২২০ বছর পর রাশিয়া থেকে যে বুখারী আবিষ্কার হয়েছে তাতেও লেখা হয়েছে যে সূর্য অস্তমিত হওয়ার সাথে সাথে রোজা ভাঙতে হবে তবে আল কুরআন তা বলে না। কিন্তু এ সময় সূর্য অদৃশ্য হলেও এ সময় দিনের আলো পরিষ্কারভাবে দেখা যাওয়ার কারণে এ সময় থেকে রাত শুরু হয় না।
[9:03]আল কুরআনের গবেষণায় দেখা যায় যে, যতক্ষণ আলো থাকবে ততক্ষণ দিন থাকবে, কারণ দিন হলো দেখার জন্য। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মানুষের ধরে নেওয়া, মানুষের বলে দেওয়া বা মানুষের ওই চিন্তা-ভাবনা কতটুকু সঠিক? আসলেই কি সূর্যাস্ত থেকে রাত শুরু হয়? নাকি শাফাক বা সন্ধ্যার পরে রাত শুরু হয়? সূর্য অস্তমিত হওয়ার পরের সময়কে কি বলা হয়? রাত না সন্ধ্যা? আল্লাহ আল কুরআনে অসংখ্য আয়াতে সন্ধ্যা বর্ণনা দিলেও কেন ইফতার প্রসঙ্গে সন্ধ্যা না বলে কেন রাত বললেন? তাহলে এখন জানার বিষয় হলো রাত কখন থেকে শুরু হয়? যিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন, সৃষ্টি করেছেন আসমান-জমিন, চন্দ্র-সূর্য, এবং সৃষ্টি করেছেন দিন ও রাত, তিনিই কেবল তাঁর নাযিলকৃত বিধান আল কুরআনে বলে দিবেন যে, কখন থেকে রাত শুরু হয় এবং কখন থেকে দিন শুরু হয়।
[10:11]আল্লাহ আল কুরআনে ফজর, সুবহে (সাদেক), অন্তরাগ, শাফাক, সকাল-সন্ধ্যা, রাত-দিন ও দশ দিকের ও বর্ণনা দিয়েছেন। আমরা মানুষের কথায় কান না দিয়ে আল কুরআন থেকে জেনে নেবো যে, কখন থেকে রাত শুরু হয়।
[10:33]রাত ও সুবাহঃ আল্লাহ বলেন শপথ রাতের যখন তার অবসান হয়। শপথ সুবহের (প্রভাতের) যখন তা আলোকিত হয়। সূরা মুদ্দাসসির। আয়াত ৩৩-৩৪।
[13:03]আল্লাহর কথায় এটা প্রমাণ হলো যে, রাতের পরে সুবহা বা প্রভাত হয়। লক্ষ্য করুন! আল্লাহ রাতের পরে দিনের কথা বলেননি। আল্লাহ বলেছেন রাতের পরে সুবহা বা প্রভাত।
[13:16]পুনরায় লক্ষ্য করুন! আল্লাহ রাতের পরে দিনের কথা বলেননি। আল্লাহ কথা অনুযায়ী আমরা দুটি সময় পেলাম যথা রাত ও প্রভাত। ঠিক তদ্রূপ সন্ধ্যা তার পর রাত।
[25:50]আসল বিষয় হলো ভিন্ন, আর তা হলো সূর্য অস্তমিত হওয়ার পরও কিছুক্ষণ দিন থাকে তাই সকলে দিনের কিনারায় নামাজ পড়েন। ঠিক তেমনই সকলে দিনের প্রথম কিনারায় ফজরের নামাজ পড়েন। তাহলে ফজর, ভোর ও প্রভাত যেমন দিনের অংশ তেমনি সন্ধ্যা এবং প্রভাত এ দুটি সময়ও দিনের অংশ। কারণ, এ দুটি সময় পরিষ্কার দেখা যায়। সূর্য ওঠার ২০/২৫/৩০ মিনিট আগের অবস্থা লক্ষ্য করলেই দেখা যায় যে, সুবহে সাদেক থেকেই দিনের আলো শুরু হয়ে যায়, কিন্তু তখনো সূর্য ওঠে না। দিন শুরু হয় ফজরের আজান থেকেই অর্থাৎ ফজরের আজানের আগ পর্যন্ত তারকা থাকে তাই তা রাত। তদ্রূপ, সন্ধ্যার পরে আকাশে বহু সংখ্যক তারকা দেখা দিলেই রাত শুরু হয়। যতক্ষণ আলো থাকবে ততক্ষণ দিন থাকবে, যখন পুরোপুরি আলো চলে যাবে ঠিক তখন থেকেই রাত শুরু হবে।
[26:54]সূর্য না ওঠা সত্ত্বেও যেমন দিন শুরু হয় তদ্রূপ সূর্য অস্ত যাওয়ার পরেও কিছুক্ষণ আলো থাকে বিধায় তা দিনেরই অংশ। অর্থাৎ ভোরে বা প্রভাতে সূর্য না ওঠা সত্ত্বেও যেমন দিনের প্রথম ভাগ শুরু হয় ঠিক তেমনই সূর্য না থাকা সত্ত্বেও সন্ধ্যার সময় দিনের শেষ ভাগ থেকে যায়। যদি ভোর বা প্রভাতকে রাত বলা না হয় তাহলে শাফাক, অন্তরাগ বা সন্ধ্যাকেও রাত বলা যাবে না, তাই নয় কি? রাতে বিশ্রাম, দিন আলোকনয়। সূরা ইউনুস ৬৭।
[27:40]তিনি তোমাদের জন্য রাত বানিয়েছেন যেন তোমরা তাতে শান্তি লাভ করতে পারো, আর দিন সৃষ্টি করেছেন (সবকিছু) দেখার জন্য। (সূরা ইউনুসু আয়াত ৬৭।
[34:00]এ আয়াতেও আল্লাহ সূর্যের কথা বলেননি। বলেছেন রাত নিষ্প্রভ অর্থাৎ রাতে আলো থাকে না তাই রাত নিষ্প্রভ। কাজেই সূর্য ডোবার সাথে সাথে দিনের আলো নিষ্প্রভ হয় না।
[49:09]উক্ত আয়াতেও আল্লাহ সূর্যের কথা বলেননি। বলেছেন রাত নিষ্প্রভ অর্থাৎ রাতে আলো থাকে না তাই রাত নিষ্প্রভ। কাজেই সূর্য ডোবার সাথে সাথে দিনের আলো নিষ্প্রভ হয় না। উক্ত আয়াত এবং সূরা শামসের ৪ নং আয়াত প্রায় একই রকম। এ দুটি আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, “তিনি দিনকে রাত্রি দ্বারা আবৃত করেন”। এখানেও সূর্যের কথা বলা হয়নি। আসলে যারা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে তাদেরকে কুরআন থেকে দলিল-প্রমাণ দেখানো সত্ত্বেও তারা বলতে থাকে যে, বিচার মানি কিন্তু তালগাছটা আমার। যারা আল্লাহর প্রতি এ রূপ মিথ্যা আরোপ করে তাদের জন্য জ্বলন্ত প্রমাণ সূরা জুমারের ৫ নাম্বার আয়াত।



