[0:00]হ্যালো বন্ধুরা, কেমন আছো সবাই? আজ আমরা দেখব পৃথিবীর অন্যতম সর্বকালের মহান ফুটবলার পেলের জীবন কাহিনি। ব্রাজিলের রাস্তার একজন সামান্য মুচি থেকে যে হয়ে উঠেছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা ফুটবলার। সম্পূর্ণ সত্যি কাহিনি থেকে তৈরি আমাদের আজকের এই সিনেমার নাম পেলে: বার্থ অফ এ লেজেন্ড। ২০১৬ সালে মুক্তি পাওয়া এই সিনেমার আইএমডিবি রেটিং ৭.১। তো আমাদের আজকের গল্পটা শুরু হয় ১৯৫০ সালে ব্রাজিলের বাউরু নামের একটা ছোট্ট গ্রাম থেকে। সেখানেই আমরা ডিকো নামের আট বছর বয়সী এই বাচ্চা ছেলেটাকে দেখতে পাই। ডিকোর পরিবার খুবই গরিব ছিল। তাই নিজের খরচ চালানোর জন্য ও প্রতিদিন স্কুল শেষ হওয়ার পর রাস্তার ধারে জুতো পালিশ করার কাজ করত। আর এই জুতো পালিশের মাঝে ও সময় পেলেই নিজের বন্ধুদের সাথে ফুটবল খেলতো। কিন্তু যেহেতু এরা প্রত্যেকেই খুবই গরিব বস্তিতে থাকতো, তাই এদের কাছে ফুটবল কেনার মতন কোন টাকা পয়সা ছিল না। সেজন্য ওরা বেশ কিছু পুরানো জামাকাপড়ের জটলা পাকিয়ে সেগুলোর সাহায্যে নিজেদের বল তৈরি করে নিত। আর আমরা যেরকম ভাবে গলি ক্রিকেট খেলি, এরা সেরকম ভাবেই গলি ফুটবল খেলতো। তবে এদের ফুটবল খেলার স্টাইলটা একদমই আলাদা ছিল। এরা আসলে জিঙ্গা স্টাইলে ফুটবল খেলতো। জিঙ্গা হলো ব্রাজিলের নিজস্ব ফুটবল খেলার স্টাইল। ট্র্যাডিশনাল ফুটবলে যেমন প্লেয়াররা সবসময় একে অপরকে পাস দেয়, কিন্তু এই জিঙ্গা স্টাইল একদমই তার উল্টো ছিল। এই স্টাইলে প্লেয়াররা সাধারণত নিজের একার কাছেই বল রেখে দেয়। আর নিজের বাকি টিমমেটদেরকে বল পাস না করে একা একাই নিজের পুরো অপনেন্টদেরকে ট্যাকেল করে গোল করা হয়। আর এই স্টাইলের খেলাগুলো দেখতে খুবই ভালো লাগতো। এখন ডিকো আর তার বন্ধুরাও এই জিঙ্গা স্টাইলে ফুটবল খেলে মাটিতে বল না ফেলে নিজেদের বস্তির এক গলি থেকে অন্য গুলিতে খেলা করে বেড়াতো। আসলে এই সময় থেকেই ব্রাজিলের মানুষ ফুটবল খেলাকে খুবই পছন্দ করত। এটাই যেন ছিল তাদের ইমোশন, তাদের আসল পরিচয়। ব্রাজিলের মানুষ ফুটবল খেলাকে নিজেদের জীবনের থেকেও বেশি ভালোবাসতো। কিন্তু ডিকোর মা এই ফুটবল খেলা একদমই পছন্দ করতেন না। উনি চাইতেন ডিকো যেন ফুটবল খেলা বন্ধ করে দিয়ে ভালো করে পড়াশোনা করে একটা বড় চাকরি করে। আসলে ডিকোর বাবাও একটা সময় খুবই ভালো ফুটবলার ছিলেন। উনি ব্রাজিলের ন্যাশনাল টিমের হয়ে খেলতেন। কিন্তু একদিন খেলা চলাকালীন ওনার পায়ে প্রচন্ড জোরে চোট লেগে উনি সারাজীবনের মতন খোঁড়া হয়ে যান। আর তারপর থেকেই ওনার ফুটবল ক্যারিয়ার পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু এই ঘটনার পর সরকার থেকে বা ব্রাজিলের ন্যাশনাল ফুটবল টিম থেকে ডিকোর বাবাকে কোন রকম সাহায্য করা হয়নি। যে কারণে এখন নিজের সংসার খরচ চালানোর জন্য উনি একটা হসপিটালে ক্লিনার বা সাফাইকর্মী হিসেবে কাজ করেন। এমনকি ডিকোর মাকেও লোকের বাড়িতে কাজ করতে যেতে হত। আর ডিকোকে স্কুল ছুটির পরে জুতো পালিশ করতে হতো। সেজন্যই এখন ডিকোর মা চাইছিলো ডিকো যেন ওর বাবার মতন ফুটবল না খেলে নিজে ভালো করে পড়াশোনা করে একটা ভালো চাকরি করে। যদিও ডিকো সুযোগ পেলেই নিজের মায়ের থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে ফুটবল খেলে বেড়াতো। এইভাবে আস্তে আস্তে বেশ কিছুদিন পর চলে আসে ১৯৫০ সালের ওয়ার্ল্ড কাপ ফাইনাল। এই দিন ব্রাজিল আর উরুগুয়ের মধ্যে ওয়ার্ল্ড কাপের ফাইনাল ম্যাচ চলছিল। আর ব্রাজিলের সমস্ত লোকজন রেডিওর সামনে বসে এই খেলার লাইভ কমেন্ট্রি শুনছিল। ব্রাজিলের সমস্ত মানুষ চাইছিল এই বছরের ওয়ার্ল্ড কাপ যেন ব্রাজিল জেতে। কারণ এখনও অব্দি ব্রাজিল কোন ওয়ার্ল্ড কাপই জিততে পারেনি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত দুই এক গোলে ব্রাজিল সেই দিনের ম্যাচটা উরুগুয়ের কাছে হেরে যায়। যে ঘটনায় পুরো দেশে একটা শোকের ছায়া নেমে এসেছিল। সমস্ত মানুষ খুবই হতাশ হয়ে গেছিল। ব্রাজিল এই ম্যাচটা হেরে যাওয়ার পর ডিকোর বাবা প্রচন্ড কষ্টে কেঁদে ফেলেছিলেন। যেটা দেখে ছোট্ট ডিকো ওর বাবাকে বলে, তুমি একদমই মন খারাপ করো না বাবা। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি। একদিন আমিই আমাদের দেশের হয়ে ওয়ার্ল্ড কাপ জিতে আনব। যেটা শুনে ওর বাবা বলে, তুমি নিজের মায়ের কথাটা মেনে চলো। আর ফুটবল খেলা বন্ধ করে দিয়ে একটু ভালো করে পড়াশোনা করো। এই ঘটনার কিছুদিন পর একদিন ডিকোর মা ওকে নিজের সাথে করে নিজের কাজের জায়গায় নিয়ে যায়। ডিকোর মা লোকের বাড়িতে ঘর মোছা, বাসন মাজার কাজ করত। এখন ডিকোর মা ডিকোকে ঘরের মেঝে পরিষ্কার করতে বলে নিজে অন্য একটা কাজ করার জন্য পাশের ঘরে চলে যায়। আর সেই সময় ডিকোর ওই ঘরে ওই বাড়ির মালিকের ছেলে আর তার বেশ কিছু বন্ধুরা চলে আসে। এই ছেলেগুলো ডিকোর থেকে বয়সে সামান্য একটু বড় ছিল। এরা প্রত্যেকেই বড়লোক ঘরের সন্তান ছিল। আর এখন এরা সবাই ফুটবল প্র্যাকটিস করে এখানে এসেছিল। এখন এরা সবাই নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছিল যে আগামী কিছুদিন পরেই নাকি এদের গ্রামে একটা ফুটবল টুর্নামেন্ট হবে। আর যে টিম ওই টুর্নামেন্টে জিতবে তাদের মধ্য থেকে যেকোনো একজন প্লেয়ারকে স্যান্টোস নামের খুবই বড় একটা ফুটবল ক্লাবে খেলার সুযোগ দেওয়া হবে। যে কারণে এরা প্রত্যেকেই ওই টুর্নামেন্ট নিয়ে খুবই এক্সাইটেড ছিল। এখন এরা সবাই নিজেদের পছন্দের ফুটবলারের নাম নিয়ে বলে, ওই টুর্নামেন্টে আমি তো এর মতন ফুটবল খেলব, আমি তো ওর মতন ফুটবল খেলব। পাশের থেকে এই সমস্ত কথা শুনে ছোট্ট ডিকো প্রচন্ড আনন্দের সঙ্গে বলে ওঠে, আর আমি তো পেলের মতন ফুটবল খেলব। যেটা শুনে বাকি বাচ্চারা হাসতে হাসতে বলে, এই পেলে আবার কি? এ কোন দলের হয়ে খেলে? ডিকো বলে, উনি হলেন ভস্কো ক্লাবের গোলকিপার। যেটা শুনে ওই বাচ্চাগুলো হাসতে হাসতে বলে, ওনার নাম তো বিলে। তুমি বিলেকে পেলে বলছো? ঠিক আছে, আজকের পর থেকে আমরা তোমাকেই পেলে বলে ডাকব। এই কথা বলেই ওরা সবাই ডিকোকে নিয়ে হাসাহাসি করতে শুরু করে। এরপর ওদের মধ্যে থেকে একটা বাচ্চা ফুটবলে লাথি মেরে সেটা ডিকোকে পাস করে। কিন্তু ভুল করে সেই বলটা ঘর মোছার বালতিতে লেগে সমস্ত নোংরা জল ঘরের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এখন এই আওয়াজ শুনে ডিকোর মা তাড়াতাড়ি করে ছুটে এসে ওই বাড়ির মালিকের ছেলে আর তার বন্ধুদের কাছে ক্ষমা চায়। যদিও ডিকো বলার চেষ্টা করে এখানে ও কোন ভুল করেনি। সমস্ত ভুল ওই বাচ্চাদের। কিন্তু ডিকোর মা এখন ওকে কোনো কিছুই বলতে দেয় না। কারণ উনি কোনোভাবেই এখান থেকে নিজের এই চাকরিটা হারাতে চাইছিলেন না। এই ঘটনা কিছুদিন পর ডিকো নিজের বন্ধুদেরকে নিয়ে একটা টিম তৈরি করে সেই ফুটবল টুর্নামেন্টে জয়েন করে। আর এখানে মাজলো নামের সেই ছেলেটা আর তার বন্ধুরা এসেছিল, যাদের বাড়িতে ডিকোর মা কাজ করে। আর যারা ডিকোকে পেলে বলে খেপিয়েছিল। এই টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার প্রথম থেকেই ডিকো আর তার বন্ধুরা খুবই ভালো খেলছিল। ওরা খুব সহজেই বাকি সমস্ত টিমকে হারিয়ে দিচ্ছিল। এইভাবে দুদিন ধরে টুর্নামেন্ট চলার পর ডিকোর টিম আর মাজলোর টিম ফাইনালের জন্য পৌঁছে যায়। পরের দিন এদের দুজনের মধ্যে ফাইনাল ম্যাচ হবে। তবে আজকের ম্যাচ শেষ হওয়ার পর মাজলো আর তার বন্ধুরা ডিকো আর তার বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে হাসাহাসি করতে শুরু করে। মাজলো আর তার বন্ধুরা হাসতে হাসতে বলে, দেখো এরা কত গরিব। এদের কাছে তো ফুটবল খেলার জন্য কোন জুতোও নেই। এরা তো খালি পায়ে খেলা করে। কালকের ম্যাচে তো আমরা খুব সহজেই এদেরকে হারিয়ে দেব। এই কথা শুনে ডিকোর খুবই খারাপ লাগে। সেজন্য এখন ও নিজের বন্ধুদেরকে বলে, আমাদেরকে যেভাবেই হোক কালকের ম্যাচ শুরু হওয়ার আগে বেশ কিছু ফুটবল বুট জোগাড় করতে হবে। কিন্তু যেহেতু এদের কাছে কোন রকম টাকা পয়সা ছিল না, তাই এরা পাশের একটা গোডাউন থেকে বেশ কয়েক বস্তা বাদাম চুরি করে। আর তারপর সেই বাদামগুলো বিক্রি করে ওরা নিজেদের জন্য বেশ কিছু পুরানো জুতো কিনে আনে। কিন্তু সমস্যা হল এই জুতো গুলো ওদের পায়ের সাইজের থেকে অনেক বড় ছিল। এখন ওরা বাধ্য হয়ে এই বড় জুতো পরেই পরের দিনের টুর্নামেন্টের ফাইনাল ম্যাচটা শুরু করে দেয়। কিন্তু সমস্যা হল যেহেতু এতদিন ধরে এরা সবাই খালি পায়ে ফুটবল খেলত, তাই এখন হঠাৎ করে এই বড় সাইজের জুতো পরে খেলতে এদের খুবই অসুবিধা হচ্ছিল। সেজন্য প্রথমের দিকে ডিকো আর তার বন্ধুরা একদমই ভালোভাবে খেলতে পারছিল না। আর সেই সুযোগেই মাজলো আর তার টিম পরপর ছ'টা গোল করে দেয়। সবাই মনে করেছিল ডিকো আর তার টিম হয়তো আজকের এই ম্যাচে খুবই বাজেভাবে হেরে যাবে। কিন্তু তখনই দর্শকদের মধ্যে ডিকো নিজের বাবাকে দেখতে পায়। যেটা দেখে ও নিজের জুতো খুলে খালি পায়ে খেলতে শুরু করে। আর এখন ও খুব ভালোভাবে জিঙ্গা স্টাইলে ফুটবল খেলে ওই বলটাকে জাগেল করে পুরো টিমের সাথে একাই লড়াই করে গোল করে দেয়। এখানে ডিকোর এত সুন্দর খেলা দেখে ওখানে থাকা সমস্ত দর্শক প্রচন্ড মুগ্ধ হয়ে গেছিল। এখন ডিকোর দেখাদেখি ওর টিমের বাকি সঙ্গীরাও নিজেদের জুতো খুলে খালি পায়ে খেলতে শুরু করে দেয়। আর এইভাবে এখন এরা খুবই সহজেই অল্প সময়ের মধ্যে এক এক করে পরপর পাঁচটা গোল করে দেয়। কিন্তু ছ'নম্বর গোলটা করার আগেই এই খেলার টাইম আউট হয়ে যায়। যার ফলে আজকের ম্যাচে ডিকো আর তার টিম ছয় পাঁচ গোলে হেরে যায়। কিন্তু হেরে যাওয়ার পরেও ওই মাঠে থাকা সমস্ত দর্শক ডিকোকে পেলে পেলে বলে সম্বর্ধনা জানাতে শুরু করে। আসলে ম্যাচ শুরু হওয়ার আগে মাজলো ডিকোর নামটা পেলে হিসেবে রেজিস্টার করিয়ে ওকে নিয়ে মজা করতে চেয়েছিল। আর সেজন্যই এখন সমস্ত দর্শকরা ডিকোকে পেলে পেলে বলে সম্বর্ধনা জানাচ্ছিল। এখানে নিজের এই পেলে ডাকটা শুনে প্রথমবারের জন্য ডিকোর সেটা খুবই ভালো লাগে। আর আজ প্রথমবারের জন্য ও নিজের এই পেলে নামটাকে মেনে নেয়। এখানে সমস্ত দর্শকদের মধ্যে মিস্টার ওয়ালমার ডিব্রিটো নামের খুবই ফেমাস একজন প্রাক্তন ফুটবলার ছিলেন। যিনি স্যান্টোস ফুটবল ক্লাবের একজন সিলেক্টর ছিলেন। এখানে ডিকোর খেলা দেখে ওনার এতটাই ভালো লেগে যায় যে উনি ডিকোর বাবাকে নিজের পার্সোনাল ফোন নাম্বার আর কার্ড দিয়ে ডিকোকে নিজের ক্লাবের হয়ে ফুটবল খেলার জন্য জয়েন করতে বলেন। এমনকি এখন শহরের সমস্ত বড় বড় নিউজপেপার থেকেও ডিকো আর তার বন্ধুদের ছবি তোলা হয়। এখন চারিদিকে এই সমস্ত ভালো ঘটনার মধ্যে এখানে সেই লোকগুলো চলে আসে, আগের দিন যাদের গোডাউন থেকে ডিকো আর তার বন্ধুরা কয়েক বস্তা বাদাম চুরি করেছিল। এখন সেই লোকগুলো এদেরকে ধরার চেষ্টা করে। যেটা দেখে ডিকো আর তার বন্ধুরা তাড়াতাড়ি করে ওখান থেকে পালাতে শুরু করে। আর তখনই ওখানে বিশাল জোরে বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়। এখন এরা ছুটতে ছুটতে পাশেই একটা নদীর ধারে থাকা জঙ্গলের মধ্যে লুকিয়ে পড়ে। এখন ডিকোর বাকি বন্ধুরা ওই জঙ্গলের অনেকটা ভিতরে ঢুকে গেছিল। কিন্তু এখন ডিকো আর ওর বন্ধু ডিয়াগো ওই নদীর পাশে একটা বিশাল বড় গাছের নিচে থাকা গর্তের ভিতরে ঢুকে লুকিয়ে পড়ে। কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ ওই গর্তের মধ্যে লুকিয়ে থাকার পর, অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে ওই গর্তের ওপরে বেশ অনেকটা কাঁদা মাটি ধসে পড়তে শুরু করে। যেটা দেখে ডিকো কোন রকমে ওই গর্ত থেকে বাইরে বেরিয়ে আসলেও ওর বন্ধু ডিয়াগো আর কোনোভাবেই বাইরে বের হতে পারে না। এখন ডিকো জোরে জোরে চিৎকার করে সাহায্য চেয়ে ওর বন্ধুকে বাঁচানোর চেষ্টা করে। যেটা শুনে ওই গোডাউনের লোকগুলো তাড়াতাড়ি করে ওখানে এসে মাটি খুঁড়ে ডিয়াগোকে বাইরে বের করে আনে। কিন্তু দেখা যায় ততক্ষণে ডিয়াগো দম বন্ধ হয়ে মারা গেছিল। এই ঘটনার পর থেকে ডিকো মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। ওর মনে হয়েছিল ডিয়াগোর মৃত্যুর জন্য হয়তো ও নিজেই দায়ী। ওর মনে হচ্ছিল আগের দিন যদি ও জুতো কেনার জন্য বায়না না করত তাহলে ওদেরকে আর বাদাম চুরি করতে হত না। আর তখন এই লোকগুলো ওদেরকে আর তাড়া করত না। আর ডিয়াগো এখন বেঁচে থাকত। এসব কিছু ভেবেই ডিকো নিজেকে প্রচন্ড দোষী মানতে শুরু করে দেয়। আর এখন ও নিজের মাকে জড়িয়ে ধরে প্রচন্ড কান্নায় ভেঙে পড়ে। যদিও ডিকোর মা ওকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করে, যে এই ঘটনায় ওর কোন দোষ নেই। কিন্তু এই ঘটনায় ডিকো মানসিকভাবে এতটাই ভেঙে পড়েছিল যে ও ফুটবল খেলা পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। এখন থেকে ডিকো সবসময়ের জন্য খুবই মন খারাপ করে হতাশ হয়ে থাকত। ওকে এই অবস্থায় দেখে প্রতিদিন ওর স্কুল শেষ হওয়ার পর ওর বাবা ওকে নিজের সাথে করে নিজের কাজের জায়গায় নিয়ে যেতেন। আর সেখানে উনি সবসময় ডিকোর সাথে গল্প করে কথা বলে ওর মন ভালো করার চেষ্টা করতেন। আসলে ডিকোর বাবা চাইছিল ডিকো যেন আবার আগের মতন ফুটবল খেলতে শুরু করে। কারণ আগের দিনের ওই টুর্নামেন্টেই উনি দেখেছিলেন ডিকো খুবই ভালোভাবে ফুটবল খেলতে পারে। সেজন্য এখন ডিকোর বাবা ডিকোকে একটা আম বাগানে নিয়ে গিয়ে বলেন, আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন আমি গাছে থাকা কাঁচা পাকা আমের সাহায্যে ফুটবল খেলার প্র্যাকটিস করতাম। আমি শক্ত কাঁচা আমগুলোকে জোরে শট মারতাম। আর পেকে যাওয়া নরম আম দিয়ে জাগলিং আর ব্যালেন্সিং প্র্যাকটিস করতাম। এই কথা বলেই উনি ডিকোর সামনে একটা পাকা আম নিয়ে খেলা করতে শুরু করেন। যদিও প্রথম প্রথম ডিকো এই বিষয়গুলোয় খুব একটা গুরুত্ব দিত না। ও সবসময়ের জন্যই খুবই মন খারাপ করে হতাশ হয়ে বসে থাকত। এমনকি এখন ও নিজের বাকি বন্ধুদের সাথে মেশা তাদের সাথে খেলা করাও পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু ডিকোর বাবা কোনভাবেই হার মানতে চাইছিলেন না। উনি প্রতিদিন নতুন নতুন ভাবে ডিকোকে ফুটবল খেলার জন্য উৎসাহ দেওয়ার চেষ্টা করতেন। আর এইভাবে বেশ কিছুদিন যাওয়ার পর অবশেষে একদিন ডিকো নিজের বাবার সাথে আম নিয়ে খেলা করতে শুরু করে দেয়। এরপর থেকে প্রতিদিন সুযোগ পেলেই ডিকো আর ওর বাবা কাঁচা পাকা আম নিয়ে জিঙ্গা স্টাইলে ফুটবল খেলার প্র্যাকটিস করত। আর আগামী বেশ কিছু বছর ধরে ডিকো এভাবে নিজের বাবার সাথেই প্র্যাকটিস করতে থাকে। আর যেহেতু ডিকোর বাবা একসময়ের খুবই মহান ফুটবলার ছিল, তাই ডিকো ওর বাবার কাছ থেকে অনেক কিছু শিখতে পারে। এইভাবে বেশ কিছু বছর কেটে গিয়ে এখন ডিকোর ১৫ বছর বয়স হয়ে গেছিল। একদিন ডিকোর মা লক্ষ্য করে ডিকো যখন নিজের বাবার সাথে ফুটবল খেলার প্র্যাকটিস করে সেই সময়টাই ও খুবই হাসিখুশি আর ভালো মনে থাকে। যেটা দেখে ওর মা বুঝতে পারে ডিকো ফুটবল খেলতে খুবই ভালোবাসে। সেজন্য একদিন ওর মা ওয়ালমার ডিব্রিটো নামের সেই লোকটার সঙ্গে যোগাযোগ করে, যিনি স্যান্টোস ফুটবল ক্লাবের সিলেক্টর ছিলেন। আর যিনি আজ থেকে বেশ কিছু বছর আগে একটা টুর্নামেন্টের ডিকোর খেলা দেখে ওকে নিজেদের ক্লাবে নিতে চেয়েছিল। এখন ডিকোর মা কল করার পর উনি সরাসরি এদের বাড়িতে এসে ডিকোকে নিজেদের ক্লাবের হয়ে খেলার প্রস্তাব দেন। এই কথা শুনে ডিকো খুবই খুশি হয়ে সাথে সাথেই ওনার এই প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান। এখন অবশেষে ডিকো একটা বড় প্রফেশনাল টিমের হয়ে খেলার সুযোগ পেয়েছিল। এখন থেকে ডিকোকে নিজের বাড়ি ছেড়ে সেই ফুটবল ক্লাবে গিয়ে থাকতে হবে। আর সেখানে বাকি সমস্ত প্লেয়ারদের সাথে খেলা প্র্যাকটিস করতে হবে। কিন্তু ডিকো ওই ক্লাবে যাওয়ার পরেই একটা বড় সমস্যা দেখা দেয়। এই ক্লাবের কোচ সমস্ত নতুন প্লেয়ারদেরকে বলেন, এতদিন ধরে তোমরা যা কিছু শিখেছ সে সবকিছুই ভুলে যাও। এখন থেকে আমি তোমাদের সবাইকে নতুন ইউরোপিয়ান স্টাইলে ফুটবল খেলা শেখাব। আমার টিমে কোন প্লেয়ারই ব্রাজিলিয়ান জিঙ্গা স্টাইলে ফুটবল খেলবে না। তোমাদের প্রত্যেককেই মাটিতে ফুটবল রেখে একে অপরকে পাস করতে হবে। এই কথা শুনে ডিকো খুবই চিন্তায় পড়ে যায়। কারণ এত বছর ধরে ও তো খালি জিঙ্গা স্টাইলেই ফুটবল খেলে এসেছিল। আর এই জিঙ্গা স্টাইলেই ও সবচেয়ে ভালো খেলতে পারে। কিন্তু এখন কোচের কথা মতন ওকে নতুন ইউরোপিয়ান স্টাইলে খেলার প্র্যাকটিস করতে হচ্ছিল। আর এইভাবে খেলতে ওর খুবই অসুবিধা হচ্ছিল। ও সারাদিন রাত ধরে এই নতুন ইউরোপিয়ান স্টাইলটা শেখার চেষ্টা করছিল। কিন্তু অনেক চেষ্টা করার পরেও ও কোনভাবেই ইউরোপিয়ান স্টাইলে খেলতে পারছিল না। এমনকি এইভাবে ও ফাঁকা মাঠে সামান্য একটা গোলও করতে পারছিল না। যে কারণে বেশ কিছুদিন পর ও নিজের সমস্ত জামাকাপড় গুছিয়ে ওই ক্লাব ছেড়ে নিজের বাড়ি ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। ও যখন বাড়ি ফেরার জন্য স্টেশনে বসেছিল, তখন ওই ক্লাবের সিলেক্টর মিস্টার ওয়ালমার ডিব্রিটোও ওখানে চলে আসেন। আসলে ডিকো যখন ওই ক্লাব থেকে বাইরে বেরোচ্ছিলো, তখনই মিস্টার ডিব্রিটো ওকে দেখতে পেয়েছিল। এখন মিস্টার ডিব্রিটো ওকে প্রশ্ন করে, তুমি এই ক্লাব ছেড়ে চলে যাচ্ছ কেন? ডিকো বলে, আমি তো সারাজীবন ধরে জিঙ্গা স্টাইলেই ফুটবল খেলার প্র্যাকটিস করেছি। কিন্তু এখন আমার কোচ বলছেন আমাকে নতুন ইউরোপিয়ান স্টাইলে খেলা শিখতে হবে। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও আমি কোনভাবেই ইউরোপিয়ান স্টাইলে খেলতে পারছি না। তাই আমি ঠিক করেছি এখন আমি বাড়ি ফিরে গিয়ে আবার স্কুলে ভর্তি হব। যাতে আমি একটা ভালো চাকরি করতে পারি। মিস্টার ডিব্রিটো বলেন, তাহলে তুমি নিজের মতন করে জিঙ্গা স্টাইলেই ফুটবল খেলো। তখন ডিকো বলে, কিন্তু কোচ আমার এই স্টাইলটা একদমই পছন্দ করেন না। উনি বলেন এটা নাকি অনেক পুরানো স্টাইল। যেটা শুনে মিস্টার ডিব্রিটো বলেন, হ্যাঁ এটা সত্যি যে জিঙ্গা হলো ফুটবল খেলার খুবই পুরানো স্টাইল। আর তোমার কোচের এই স্টাইলটাকে অপছন্দ করার পিছনেও একটা বড় কারণ আছে। মিস্টার ডিব্রিটো বলেন, এই জিঙ্গা স্টাইল তৈরি হয়েছিল আজ থেকে ৪০০ বছর আগে ১৬০০ শতকে। সেই সময় পর্তুগীজরা বেশ অনেক আফ্রিকান গোলামদেরকে নিয়ে ব্রাজিলের রাজত্ব করার জন্য এসেছিল। কিন্তু এই আফ্রিকানরা খুবই শক্তিশালী ছিল। অনেক আফ্রিকান গোলাম ওই পর্তুগীজদের থেকে পালিয়ে জঙ্গলের মধ্যে এসে থাকতে শুরু করে। এখন জঙ্গলের মধ্যে এই সমস্ত গোলামরা পর্তুগীজদের সাথে লড়াই করে নিজেদেরকে বাঁচানোর জন্য একটা বিশেষ ধরনের মার্শাল আর্ট বা ফাইটিং টেকনিক প্র্যাকটিস করতে শুরু করে। আর সেই ফাইটিং স্টাইলটাকেই জিঙ্গা বলা হত। জঙ্গলের মধ্যে সমস্ত আফ্রিকান গোলামরা এই জিঙ্গা স্টাইলেই পর্তুগীজদের সাথে লড়াই করে নিজেদের আত্মরক্ষা করত। পরবর্তীকালে অনেক বছর পর গোলামী থেকে মুক্তি পেয়ে এই সমস্ত আফ্রিকান গোলামরা জঙ্গল থেকে বেরিয়ে শহরে এসে থাকতে শুরু করে। কিন্তু এখন সরকার জিঙ্গা স্টাইলে এই মারামারি প্র্যাকটিস করাটাকে পুরোপুরি বেআইনি ঘোষণা করে দিয়েছিল। কিন্তু এই সমস্ত আফ্রিকান গোলামরা যেভাবেই হোক এই জিঙ্গাটাকে বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছিল। একটু ভাবনা চিন্তা করার পর ওদের মনে হয় এখন থেকে জিঙ্গাকে বাঁচিয়ে রাখতে গেলে ওদেরকে জিঙ্গা স্টাইলে মারামারি না করে জিঙ্গা স্টাইলে ফুটবল খেলতে হবে। আর এইভাবে জিঙ্গা স্টাইলে ফুটবল প্র্যাকটিস করলে পুলিশও আর ওদেরকে গ্রেফতার করতে পারবে না। পরবর্তীকালে এই জিঙ্গা স্টাইলে ফুটবল খেলা সমস্ত মানুষদের এতটাই পছন্দ হয়ে যায় যে এটা আফ্রিকান গোলামদের থেকে এখন পুরো ব্রাজিল দেশের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে। এরপর থেকে ব্রাজিলের সমস্ত মানুষ এই জিঙ্গা স্টাইলেই ফুটবল খেলত। আস্তে আস্তে এটাই ব্রাজিলের ঐতিহ্য হয়ে ওঠে। কিন্তু ১৯৫০ সালে এই জিঙ্গা স্টাইলে ফুটবল খেলতে গিয়েই ব্রাজিলিয়ান টিম ওয়ার্ল্ড কাপ ফাইনালে হেরে গেছিল। আর এরপর থেকে বেশিরভাগ মানুষই মনে করছিল এই জিঙ্গা স্টাইলে খেলার জন্যই হয়তো ব্রাজিল ওই ওয়ার্ল্ড কাপে হেরে গেছিল। আর সেজন্যই এখন তোমার কোচ চাইছে সমস্ত ব্রাজিলিয়ান প্লেয়াররা যেন নতুন ইউরোপিয়ান স্টাইলে খেলা প্র্যাকটিস করে। কিন্তু আমরা যারা আফ্রিকান যাদের পূর্বপুরুষরাই জিঙ্গা স্টাইলটা তৈরি করেছিল আমরা হয়তো কোনদিনও এটা থেকে আলাদা হতে পারব না। জিঙ্গা স্টাইলটা সমস্ত আফ্রিকান ব্রাজিলিয়ানদের রক্তের মধ্যে রয়েছে। আর আমি তোমার খেলা দেখেছি। তোমার ভিতরে থাকা জিঙ্গা খুবই স্ট্রং। এখন তুমি যদি নিজের আসল সত্যিটা মেনে নাও আর সবার সামনে নির্ভয়ে এই জিঙ্গা স্টাইলেই খেলতে পারো তাহলে একদিন তুমি অনেক বড় প্লেয়ার হয়ে উঠতে পারবে। এই সমস্ত কথা শুনে এখন ডিকো ঠিক করে নেয় ও আর বাড়ি ফিরে যাবে না। এখন ও ক্লাবে গিয়ে নিজের মতন করে ফুটবল খেলার প্র্যাকটিস করবে। এরপর থেকে ডিকো সমস্ত ম্যাচেই এই জিঙ্গা স্টাইলে খেলতে শুরু করে। আর এইভাবে ও খুব সহজে একা একাই প্রতিটা ম্যাচে তিন চারটে করে গোল করে দিত। যেটা দেখে এখন ওর কোচও ওকে আর এইভাবে খেলতে বারণ করত না। এইভাবে খেলতে খেলতে ডিকো এখন ওর ক্লাবের প্রো টিমে সিলেক্ট হয়ে গেছিল। প্রো টিমে ওই ক্লাবের সবচেয়ে ভালো ভালো আর অভিজ্ঞ প্লেয়াররা খেলত। এখন ১৫ বছরের বাচ্চা ডিকোকেও সেই প্রো টিমে খেলার সুযোগ দেওয়া হয়। আর ডিকো এখানেও এত ভালো খেলছিল যে ওর কারণে ওর ক্লাব পরপর অনেকগুলো ম্যাচ আর টুর্নামেন্ট জিতে গেছিল। আস্তে আস্তে ওর এই ভালো খেলার জন্য দেশের সমস্ত বড় বড় খবরের কাগজেই ওর ব্যাপারে লেখালিখি শুরু হয়ে যায়। এখন পুরো দেশের মধ্যেই ডিকোর নাম ছড়িয়ে পড়েছিল। এইভাবে কিছু মাস পরেই চলে আসে ১৯৫৮ সাল। এই বছর ওয়ার্ল্ড কাপ ছিল। আর ওয়ার্ল্ড কাপের জন্য ব্রাজিলের সমস্ত ভালো ভালো প্লেয়ারদেরকে বেছে নেওয়া হচ্ছিল। যদিও ডিকো খুবই ভালো খেলত। কিন্তু যেহেতু ওর বয়স ১৭ বছর ছিল তাই ডিকো আর ওর বাবা মা মনে করেছিল এই বছরের ওয়ার্ল্ড কাপে হয়তো ডিকোকে সিলেক্ট করা হবে না। কিন্তু খুবই আশ্চর্যজনকভাবে মাত্র ১৭ বছরের বাচ্চার ডিকোকেই ব্রাজিলের হয়ে ওয়ার্ল্ড কাপ খেলার জন্য সিলেক্ট করে নেওয়া হয়। এই ঘটনায় ডিকো ওর বাবা, মা, ভাই প্রত্যেকেই খুবই অবাক হয়ে গেছিল। কেউই যেন এটাকে কোনভাবেই বিশ্বাস করতে পারছিল না। এখন ওয়ার্ল্ড কাপ খেলতে যাওয়ার আগে ডিকোর বাবা ডিকোকে বলে, তোমার ওপরে কিন্তু অনেক বড় একটা দায়িত্ব রয়েছে। কারণ আগের সমস্ত ওয়ার্ল্ড কাপে হেরে যাওয়ার পর এখন সমস্ত ব্রাজিলিয়ানদেরই ফুটবলের ওপর থেকে ভরসা উঠে গেছে। তাই তোমাকে এইবারের ওয়ার্ল্ড কাপটা জিতে সমস্ত ব্রাজিলিয়ানদের ভরসা আবার ফিরিয়ে আনতে হবে। আর আমি জানি তুমি এই কাজটা খুব ভালোভাবে করতে পারবে। কারণ তোমার মধ্যে একটা বিশেষ ক্ষমতা আছে। তুমি খুবই ভালোভাবে জিঙ্গা খেলতে পারো। আজ অব্দি আমি তোমার মতন এত ভালোভাবে কাউকেই জিঙ্গা খেলতে দেখিনি। আর ওয়ার্ল্ড কাপে এইভাবে খেললে তুমি অনেক ভালো কিছু করতে পারবে। তবে তুমি যেন কোনদিনই নিজের ওপর থেকে আত্মবিশ্বাস হারাবে না। আজ থেকে বহু বছর আগে আমি যখন ব্রাজিলের ন্যাশনাল টিমের হয়ে ফুটবল খেলতাম তখন তোমার মতন আমিও জিঙ্গা স্টাইলে খেলতাম। কিন্তু একদিন খেলা চলাকালীন একটা শট নেওয়ার সময় আমি একটু কনফিউজড হয়ে যাই। তখন আমার মনে হয় জিঙ্গা স্টাইলে না খেলে অন্যভাবে খেললে হয়তো একটু বেশি ভালো হবে। আর এইভাবে অতিরিক্ত চিন্তা করতে করতে আত্মবিশ্বাসের অভাবে আমি একটা ভুল শট নিয়ে ফেলি। যার ফলে আমার পায়ে বিশাল জোরে একটা চোট লাগে। আর তারপর থেকেই আমি সারাজীবনের মতন খোঁড়া হয়ে যাই। আর আমার ফুটবল ক্যারিয়ারও পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। তাই আমি চাই তুমি যেন কোনদিনই আমার মতন এই ভুলটা করো না। তোমাকে যে যাই বলুক না কেন তুমি সবসময় নিজের ওপরে আত্মবিশ্বাস রাখবে। এই কথাটা বলার পরেই ওর বাবা ওকে ওর ছোটবেলার একটা জার্সি দেয়। যে জার্সির পিছনে পেলে লেখা ছিল। আর এই জার্সিটা পরে ডিকো আর তার বন্ধুরা সেই টুর্নামেন্টটা জিতেছিল। এখন ডিকোর বাবা বলে, সেই দিন টুর্নামেন্টে সবাই যখন তোমাকে জিঙ্গা খেলতে দেখেছিল তারপর থেকেই সবাই তোমাকে পেলে বলে ডাকতে শুরু করেছিল। আমি চাই এবারের ওয়ার্ল্ড কাপেও তুমি সেই একই রকম ভাবে জিঙ্গা স্টাইলে ফুটবল খেলো। যাতে সেখানেও সবাই তোমার খেলা দেখে তোমাকে পেলে বলে ডাকতে শুরু করে। এরপর ডিকো সরাসরি সেই জায়গায় পৌঁছে যায় যেখানে ব্রাজিলের ন্যাশনাল টিমের সমস্ত ফুটবলারদেরকে রাখা হয়েছিল। এখানেই ডিকোর সাথে ব্রাজিলের সমস্ত বড় বড় ফুটবল প্লেয়ারের পরিচয় হয়। আর এই সমস্ত প্লেয়ারের মধ্যে ডিকো মাজলো নামের সেই ছেলেটাকে দেখতে পায় যে আর তার বন্ধুরা ছোটবেলায় ডিকোকে পেলে বলে খেপাবে। এখন ডিকোকে ব্রাজিল টিমের জন্য সিলেক্ট করা হয়েছিল ঠিকই কিন্তু এখনও ও মেইন ইলেভেনে খেলার সুযোগ পাবে কিনা তার কোন ঠিক নেই। ডিকোর মনে হয়েছিল হয়তো ওকে এক্সট্রা সাবস্টিটিউট প্লেয়ার হিসেবে রিজার্ভ বেঞ্চে বসিয়ে রাখা হবে। এরপর সমস্ত ব্রাজিল টিমের প্লেয়ারদেরকে নিয়ে সেইদিন একটা প্রেস কনফারেন্স করা হয়। সেখানে সমস্ত সাংবাদিকদের সামনে ব্রাজিল টিমের ন্যাশনাল কোচ সরাসরি বলে দেন, আপনারা একদমই চিন্তা করবেন না। এইবারের ওয়ার্ল্ড কাপটা আমরাই জিতব। কারণ এই বছর আমার টিমে কেউ জিঙ্গা স্টাইলে খেলবে না। আমরা প্রত্যেক প্লেয়ারকে ইউরোপিয়ান স্টাইলে খেলার জন্য নতুনভাবে ট্রেনিং দিয়েছি। আর অতীতে আমরা যে ভুলটা করেছি সেটা আর কোনদিনও রিপিট করব না। পাশের থেকে এই সমস্ত কথা শুনে ডিকো খুবই চিন্তায় পড়ে যায়। কারণ ও শুধুমাত্র জিঙ্গা স্টাইলে ফুটবল খেলতে পারত। ইউরোপিয়ান স্টাইল ওর একদমই পছন্দ ছিল না। এমনকি সেইদিনের প্রেস কনফারেন্সের পরেও ওই কোচ সরাসরি ডিকোকে নিজের অফিসে ডেকে বলেন, আজকের থেকে তুমি আর জিঙ্গা স্টাইলে খেলবে না। এত বছর ধরে তুমি স্যান্টোস ক্লাবে আর বাকি সমস্ত জায়গায় যেভাবে খেলা করেছ সেটা পুরোপুরি ভুলে যাও। ইন্টারন্যাশনাল লেভেলে তোমার ওই স্টাইলের খেলা কোনভাবেই চলবে না। এখানে কোচ ওকে অনেকবার বারণ করলেও ডিকো কোনভাবেই ওনার কথা শুনতে চাইছিল না। এর পরের দিন প্র্যাকটিস ম্যাচ চলাকালীন ডিকো কোচের সামনেই জিঙ্গা স্টাইলে খেলতে শুরু করে। কিন্তু এই প্র্যাকটিস চলাকালীন একটা সময় ওর হাঁটুতে বিশাল জোরে চোট লাগে। পরবর্তীকালে ডাক্তার জানায়, ডিকোর হাঁটুতে অনেক মারাত্মক চোট লেগেছে। ওর পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে অনেক মাস সময় লেগে যাবে। আর সেজন্য ও এই বছরের ওয়ার্ল্ড কাপটা খেলতে পারবে না। ওকে এখন পুরোপুরিভাবেই বেড রেস্টে থাকতে হবে। পাশের থেকে এসব কিছু শুনে ব্রাজিল টিমের কোচ বলেন, ডিকো খেলতে পারুক আর না পারুক, এই ওয়ার্ল্ড কাপ চলাকালীন ওকে ব্রাজিল টিমের সাথেই থাকতে হবে। কারণ এখন ওয়ার্ল্ড কাপের আর বেশি দিন বাকি নেই। এই অল্প সময়ের মধ্যে ডিকোকে রিপ্লেস করে ওর জায়গায় নতুন কোন প্লেয়ার নেওয়া কোনভাবেই সম্ভব না। এসব কিছুর মধ্যেই পাশে থাকা একটা রেডিওতে নিউজ চলছিল। যে নিউজে বলা হচ্ছিল এই বছরের ওয়ার্ল্ড কাপেও হয়তো ব্রাজিলিয়ানরা হেরে যাবে। কারণ এখনও অব্দি ব্রাজিলিয়ান প্লেয়াররা পুরানো জিঙ্গা স্টাইলে খেলতে গিয়ে নিজেদেরকে চোট লাগিয়ে আহত হয়ে যাচ্ছে। আসলে নিউজে এখানে ইনডাইরেক্টলি ডিকোর কথা বলা হচ্ছিল। এই কথা শুনে কোচ আর বাকি সমস্ত প্লেয়াররা প্রত্যেকেই খুবই হতাশ হয়ে যায়। এই ঘটনার কিছুদিন পরেই ১৯৫৮ সালের ফুটবল ওয়ার্ল্ড কাপ শুরু হয়ে যায়। যেটা সুইডেনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এখন সমস্ত ব্রাজিলিয়ান টিমের সঙ্গে আহত ডিকোকেও সুইডেনে নিয়ে যাওয়া হয়। সুইডেনে আসার পর ব্রাজিল টিমে একজন নতুন ফিজিওথেরাপিস্ট আসেন। যিনি অনেক পুরানো আয়ুর্বেদিক পদ্ধতিতে ডিকোর চিকিৎসা করছিলেন। যার ফলে ডিকো খুবই অল্প সময়ের মধ্যে অনেক সুস্থ হয়ে উঠতে শুরু করে। যেটা দেখে সেই ডাক্তার খুবই অবাক হয়ে গিয়ে বলেন, এইরকম ভাবে চলতে থাকলে তুমি হয়তো ওয়ার্ল্ড কাপের আগেই সুস্থ হয়ে উঠবে। আর হয়তো তুমি এই ওয়ার্ল্ড কাপে খেলতেও পারবে। তবে এর মধ্যে যদি তোমার হাঁটুতে আর কোন চোট লাগে তাহলে তুমি কিন্তু অনেক বড় বিপদে পড়ে যাবে। এদিকে ব্রাজিলিয়ান টিম বাকি সমস্ত টিমকে হারাতে হারাতে ওয়ার্ল্ড কাপ ফাইনালের বেশ অনেকটা কাছে পৌঁছে গেছিল। কিন্তু এই সমস্ত ম্যাচ চলাকালীন ব্রাজিলিয়ান টিমের বেশিরভাগ প্লেয়াররাই অতিরিক্ত চোট লাগার কারণে আহত হয়ে গেছিল। অতিরিক্ত চোট লাগার কারণে এখন বেশিরভাগ প্লেয়ারদেরই খেলার ক্ষমতা ছিল না। এদিকে এতদিনেন মধ্যে ডিকো বেশ অনেকটাই সুস্থ হয়ে উঠেছিল। যে কারণে এখন বাধ্য হয়ে ডিকোকে মেইন ইলেভেনে খেলার সুযোগ দেওয়া হয়। ১৯৫৮ সালের ওয়ার্ল্ড কাপে ডিকোর প্রথম ম্যাচ ছিল ইউএসএসআর বা সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে। জীবনের প্রথমবারের জন্য এত বড় একটা ম্যাচে অংশগ্রহণ করে ডিকো খুবই ঘাবড়ে গেছিল। আর তাছাড়া এখানে ও সমস্ত প্লেয়ারদের মধ্যে বয়সের সবচেয়ে ছোট ছিল। সেই সময় ডিকোর বয়স ছিল মাত্র ১৭ বছর। আর সেই সময় ব্রাজিলের বিরুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের যে সমস্ত প্লেয়ার ছিল তারা প্রত্যেকেই অনেক শক্তিশালী আর লম্বা চওড়া ছিল। যাদের সামনে ডিকোকে একদমই বাচ্চা মনে হচ্ছিল। এটা দেখে স্টেডিয়ামে থাকা সমস্ত লোকজন ডিকো আর ব্রাজিলিয়ান টিমের ওপরে হাসাহাসি করতে শুরু করে। এই সমস্ত ঘটনায় ডিকো এতটাই ঘাবড়ে গেছিল যে প্রথম দিনের ম্যাচে ও একদমই ভালো করে খেলতে পারে না। এদিকে টিভিতে ডিকোকে এইভাবে ঘাবড়ে যেতে দেখে ডিকোর বাবাও খুবই চিন্তায় পড়ে যায়। যদিও সৌভাগ্যবশত সেই দিনের ম্যাচটা ব্রাজিল এক শূন্য গোলে জিতে যায়। যার ফলে ব্রাজিলিয়ান টিম সরাসরি সেমিফাইনালে পৌঁছে গেছিল। যেখানে ওদেরকে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে খেলতে হবে। কিন্তু এই সেমিফাইনালের ম্যাচেও ডিকো খুবই ভয়ের মধ্যে ছিল। যে কারণে ও ঠিকভাবে খেলতে পারছিল না। ওকে এই অবস্থায় দেখে আজও মাঠে থাকা সমস্ত দর্শকরা ওকে নিয়ে হাসাহাসি আর ওকে গালাগালি করতে শুরু করে। যেটা দেখে ও যেন আরো বেশি ঘাবড়ে গেছিল। এইভাবে হাফ টাইমের আগে অবধিও ফ্রান্স আর ব্রাজিল দুটো টিমই এক এক গোলে সমানভাবে চলছিল। হাফ টাইমে যখন পুরো ব্রাজিলিয়ান টিম ড্রেসিং রুমের মধ্যে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিল তখনও অব্দি ডিকো প্রচন্ড ভয়ের মধ্যে ছিল। ওর মনে হচ্ছিল ওর জায়গায় অন্য কোন প্লেয়ারকেই এই ম্যাচটা খেলা উচিত। সেজন্য ও মাজলো নামের সেই ছেলেটাকে বলে, আমি একদমই খেলতে পারছি না। আমার খুবই ভয় লাগছে। এখন যদি তোমার পায়ের চোট ঠিক হয়ে থাকে তাহলে আমার জায়গায় তুমি এই বাকি ম্যাচটা খেলো। যেটা শুনে মাজলো বলে, আমি এই ম্যাচটা খেলতে পারব না। কারণ এখন আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। আমি সারাজীবন ধরে ইউরোপিয়ানদের মতন হতে চেয়েছিলাম। আর সেজন্যই ছোটবেলা থেকে আমি ইউরোপিয়ান স্টাইলে ফুটবল খেলতাম। কিন্তু এখানে আসার পর আমি দেখলাম কোন ইউরোপিয়ানরাই আমাদেরকে সম্মান করে না। সবাই আমাদেরকে অনেক নিচু চোখে দেখে। আর তখন থেকে আমার মনে হচ্ছে আমি কোনদিনও ইউরোপিয়ান হতে পারব না। কারণ আমি একজন ব্রাজিলিয়ান। আর আমাদেরকে আজকে ম্যাচটা জিততে গেলেও সে জিঙ্গা স্টাইলে খেলতে হবে।
[25:04]আর আমাদের পুরো টিমের মধ্যে একমাত্র তুমিই সবচেয়ে ভালো জিঙ্গা খেলতে পারো। এখন তুমি সবাইকে দেখিয়ে দাও তুমি আসলে কি করতে পারো। এই কথা শুনে ডিকো মনে মনে অনেকটা আত্মবিশ্বাস ফিরে পায়। এর কিছুক্ষণ পর হাফ টাইম শেষে যখন আবার নতুন করে খেলা শুরু হয় তখন ডিকো সমস্ত ভয় কাটিয়ে পুরোপুরি নিজের মতন করেই জিঙ্গা স্টাইলে খেলা শুরু করে দেয়। আর এইভাবে একা একাই ও পুরো ফ্রেঞ্চ টিমের সঙ্গে লড়াই করে খুব সহজেই একটা গোল করে দেয়। এখানে ডিকোর এত সুন্দর খেলা দেখে মাঠে থাকা সমস্ত দর্শক খুবই অবাক হয়ে যায়। এমনকি এখন ফ্রেঞ্চ সাপোর্টাররাও উঠে দাঁড়িয়ে ডিকোর খেলা দেখে হাততালি দিতে শুরু করে। একটু আগে অবধিও যে ছেলেটা ওয়ার্ল্ড কাপের মধ্যে সবচেয়ে বাজে খেলছিল, এখন তার এত সুন্দর খেলা দেখে কেউই যেন সেটাকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। কিন্তু ডিকো এখানেই থেমে থাকে না। এরপর ও আরো দুটো গোল করে। পরবর্তীকালে সেই দিনের ম্যাচটা ব্রাজিল চার এক গোলে জিতে যায়। যে চারটে গোলের মধ্যে থেকে তিনটে গোল ডিকো নিজেই করেছিল। টিভিতে ডিকোর এত সুন্দর খেলা দেখে ওর বাবা আর ওর গ্রামের প্রত্যেকটা মানুষের আনন্দে আর গর্বে প্রচন্ড আনন্দ হয়। কারণ আজ শুধুমাত্র ডিকোর জন্যই ব্রাজিল টিম ফাইনালে পৌঁছাতে পেরেছিল। এই ঘটনার কিছুদিন পরেই ১৯৫৮ সালের ফুটবল ওয়ার্ল্ড কাপের ফাইনাল ম্যাচ শুরু হয়ে যায়। যে ম্যাচটা ব্রাজিল আর সুইডেনের মধ্যে হচ্ছিল। তবে সেই দিনের ম্যাচ শুরু হওয়ার আগে একটা প্রেস কনফারেন্সে সুইডেনের কোচ সমস্ত ব্রাজিলিয়ান প্লেয়ারদেরকে নিয়ে অনেক উল্টোপাল্টা বলতে থাকেন। উনি বলেন এই সমস্ত ব্রাজিলিয়ান প্লেয়াররা তো জংলি। এরা সবাই পুরানো জিঙ্গা স্টাইলে খেলা করে। আর সেজন্যই ১৯৫০ সালের মতন এই বছরও ব্রাজিলিয়ান টিম এই ওয়ার্ল্ড কাপটা জিততে পারবে না। কারণ আমরা খুব সহজেই এদেরকে হারিয়ে দেব। এই কথা শুনে ব্রাজিল টিমের কোচ আর প্লেয়াররা খুবই রেগে যায়। এই ঘটনার পর ব্রাজিল টিমের প্রত্যেকটা প্লেয়ার খুবই মন খারাপ করে হতাশ হয়ে গেছিল। কারণ সুইডেনের টিম সত্যি সত্যি খুবই পাওয়ারফুল ছিল। আর এদের সবার মনে হয়েছিল এইবারের ওয়ার্ল্ড কাপ ফাইনালেও এরা হয়তো সুইডেনকে হারাতে পারবে না। এখন এদের সবার মনোবল বাড়িয়ে সবার আত্মবিশ্বাস ফেরানোর জন্য ডিকো এদের সবার সঙ্গে জিঙ্গা স্টাইলে ফুটবল খেলতে শুরু করে। যদিও প্রথমের দিকে কেউই ডিকোর কথা শুনতে চাইছিল না। তখন ডিকো নিজের টিমের সমস্ত প্লেয়ারদেরকে বলে, আমি তোমাদেরকে চ্যালেঞ্জ করছি। এখন আমরা যে হোটেল রুমের মধ্যে আছি সেখান থেকে ফুটবল খেলতে খেলতে আমরা হোটেলের সামনে থাকা টাওয়ার অবধি যাব। কিন্তু এই পথটা যাওয়ার মধ্যে আমরা একবারের জন্যও ফুটবলটাকে মাটিতে ফেলতে পারব না। আমাদেরকে জিঙ্গা স্টাইলে একে অপরকে পাস করে এই বলটাকে হাওয়ার মধ্যেই রাখতে হবে। এখানে ডিকোর এই চ্যালেঞ্জ শুনে সবাই ওর সাথে খেলার জন্য রাজি হয়ে যায়। এরপর সমস্ত ব্রাজিলিয়ান প্লেয়াররা জিঙ্গা স্টাইলে হোটেলের মধ্যে দিয়েই ফুটবল খেলতে খেলতে সে টাওয়ার অবধি পৌঁছে যায়। এই ঘটনার পর সমস্ত প্লেয়ারদের মধ্যে অনেকটা আত্মবিশ্বাস ফিরে আসে। এর পরের দিন ফাইনাল ম্যাচ শুরু হওয়ার আগে ব্রাজিল টিমের কোচ সমস্ত প্লেয়ারদেরকে বলেন, আগের দিন আমি হোটেলের মধ্যে তোমাদের সবার খেলা দেখেছি। আর সেখান থেকে আমি এটা বুঝতে পেরেছি তোমরা সবাই যদি ইউরোপিয়ান স্টাইলে খেলার চেষ্টা করো তাহলে এই ম্যাচটা তোমরা হেরে যাবে। আমি চাই গতকাল হোটেলের মধ্যে তোমরা যেভাবে খেলেছিলে ফাইনাল ম্যাচেও তোমরা সেভাবে খেলো। আর সবার সামনে ব্রাজিলের আসল ঐতিহ্যটা তুলে ধরো। আর গর্বের সাথে বুক ফুলিয়ে সম্পূর্ণ নিজেদের মতন করে খেলো। তাতে যদি আমরা হেরেও যাই তাতেও আমার কোন দুঃখ নেই। তবে তোমাদের ফাইনাল ম্যাচ দেখার পর সমস্ত দর্শকদের যেন সেই খেলাটা সারাজীবনের জন্য মনে থাকে। এরপর যখন ওয়ার্ল্ড কাপের ফাইনাল ম্যাচ শুরু হয় তখন খেলা শুরুর প্রথম থেকেই সমস্ত সুইডেন প্লেয়াররা ডিকোকে ঘিরে রাখার চেষ্টা করছিল। ডিকোর কাছে যখনই বল আসছিল তখনই সুইডেনের প্লেয়াররা ওকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিচ্ছিল। আর এভাবে প্রচন্ড এগ্রেসিভ ভাবে খেলে মাত্র চার মিনিটের মধ্যেই সুইডেনের টিম একটা গোল করে দেয়। যেটা দেখে সমস্ত ব্রাজিলিয়ান প্লেয়ার ব্রাজিলিয়ান দর্শক প্রত্যেকেই খুবই ঘাবড়ে গেছিল। কিন্তু আগামী কিছু মিনিটের মধ্যেই ডিকো একাই সমস্ত সুইডেন প্লেয়ারদের সঙ্গে লড়াই করে একটা গোল করে দেয়। যেটা দেখে এখন সমস্ত ব্রাজিলিয়ানরা আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছিল। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই সমস্ত ব্রাজিলিয়ান প্লেয়াররা একসাথে জিঙ্গা স্টাইলে খেলে আরো একটা গোল করে দেয়। এটা দেখে এখন সুইডেনের প্লেয়ার আর দর্শকরাই উল্টে চিন্তায় পড়ে গেছিল। কিছুক্ষণের জন্য সুইডেনের পুরো স্টেডিয়াম একদম নিস্তব্ধ হয়ে গেছিল। এরপর ব্রাজিল প্লেয়াররা হাসতে হাসতে খুব সহজেই আরো তিনটে গোল করে দেয়। সেই দিন ব্রাজিলের ওই খেলা দেখে মাঠে থাকা সুইডেনের সমস্ত দর্শকরাও খুবই মুগ্ধ হয়ে গেছিল। এদিকে আজ টিভিতে এই খেলা দেখে ডিকোর বাবা আর বাকি সমস্ত ব্রাজিলিয়ানদের চোখে আবারও জল চলে আসে। তবে আজকের এই জলটা ছিল আনন্দ আর খুশির। অবশেষে পাঁচ দুই গোলে ব্রাজিল ১৯৫৮ সালের ফুটবল ওয়ার্ল্ড কাপের ফাইনাল ম্যাচটা জিতে যায়। আর এইভাবে ব্রাজিল একটা ইতিহাস তৈরি করে। কারণ এই বছর ব্রাজিল প্রথমবারের জন্য ওয়ার্ল্ড কাপ জিতেছিল। আর এই দিনের পরেই ১৭ বছরের ডিকো পুরো পৃথিবীর কাছে পেলে নামে পরিচিত হয়। এই ঘটনার পর পুরো ব্রাজিলে উৎসবের পরিবেশ তৈরি হয়। সমস্ত লোকজন রাস্তায় নেমে আনন্দ করতে শুরু করে। এই ঘটনার পর ব্রাজিলিয়ান জিঙ্গা স্টাইল পুরো পৃথিবীতেই খুবই ফেমাস হয়ে ওঠে। ১৯৬১ সালে ব্রাজিলিয়ান প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন পেলে হল ব্রাজিলেন ন্যাশনাল ট্রেজার বা রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি। আর এখনও অব্দি ফুটবলের ইতিহাসে পেলেই হল সবচেয়ে ইয়াঙ্গেস্ট প্লেয়ার যে ওয়ার্ল্ড কাপ ফাইনালে গোল করে সেটাকে জিতেছে। পরবর্তীকালে ১৯৬২ আর ১৯৭০ সালের ওয়ার্ল্ড কাপও ব্রাজিল জিতে। আর এখনও অব্দি ফুটবলের ইতিহাসে পেলে হল একমাত্র প্লেয়ার যে তিনটে ওয়ার্ল্ড কাপ জিতেছে। আর এছাড়াও পেলের কাছে আরো একটা রেকর্ড আছে। সেটা হল ও নিজের ফুটবল ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বেশি গোল করেছে। যে নাম্বারটা হলো ১২৮৩। কিন্তু একটা রেকর্ড পেলে কখনোই ভাঙতে পারেনি। সেটা হলো একটা ম্যাচে পাঁচটা গোল করার। আর এই রেকর্ডটা ছিল পেলের বাবার কাছে। যার নাম হলো ডনডিনহো দো নাসিমেন্টো। পরবর্তীকালে ইন্টারন্যাশনাল অলিম্পিক কমিটি পেলেকে শতাব্দীর সবচেয়ে সেরা অ্যাথলেটের উপাধি দেয়। আর এর সাথেই পেলের জীবন কাহিনীটা এখানেই শেষ হয়। তো আজকের মতন এই ভিডিওটাকে এখানেই শেষ করছি। এই ভিডিওটা আপনাদের কেমন লাগল বা এই ভিডিও সম্পর্কে যেকোনো রকম মতামত আপনারা কমেন্ট বক্সে জানাতে পারেন। ভিডিওটা ভালো লেগে থাকলে এটাকে একটা লাইক করতে পারেন আর খারাপ লেগে থাকলে অবশ্যই একটা ডিসলাইক করবেন। আবার খুব তাড়াতাড়ি দেখা হবে নতুন অন্য একটা ভিডিওতে।



