[0:02]সময়টা বর্ষাকাল। বছরের ঠিক এই সময়টাতেই আদি সপ্তগ্রামে মাছের মেলা বসে। এ কোন যেশে মেলা নয়। বঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে জনে জনে লোক আসে এই মেলা দেখতে। কেউ কেউ হাঁটা পথে, কেউ বা গরুর গাড়িতে, আবার কেউ নৌকায় করে আসে এই মাছের মেলায়। মাছ দামদর করে পাল্লায় ওঠে। মেলাটার সঙ্গে আমার একটা আলাদা ভালোবাসা জড়িয়ে আছে। প্রতিবছর এসে একটা মাছ না কিনলেই নয়। মেলার ঠিক মাঝে একটা দোকানে বড় একটা কাতলা ঝুলিয়ে দর হাকছিল। মেলার অনেক লোকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল মাছটা। এ ৫০০, ৫০০, ৫০০, ১২০০ ওজনের কাতলা। ৫০০, ৫০০, ৫০০। এত বড় আর সুন্দর কাতলাটা হাতছাড়া করতে ইচ্ছে হলো না। তাই কেউ কিছু বলার আগেই আমি বললাম, আমি নেবো। দোকানদার মাছটা আমার হাতে দিল। বেশ ভারী। মেলার কিছু লোক তো আমার মাছটার দিকেই তাকিয়ে ছিল। আমি কোন কথা না বলে বাড়ির দিকে হাঁটা দিলাম। আকাশে মেঘ করে এসেছে। ঝড় বৃষ্টি আসার আগেই বাড়ি ফিরতে হবে। এসেছিলাম গরুর গাড়িতে, তবে যাব কিসে তা ঠিক করা হয়নি। একটা ভ্যান বা রিক্সা পেয়ে যাব নিশ্চয়ই। রাস্তার সামনে একটা বাঁশের মাচায় বসে অপেক্ষা করতে লাগলাম। তবে সারাদিন মেলার লোকজনের হইহুল্লোর আওয়াজে পরিপূর্ণ এই আদি সপ্তগ্রাম, সন্ধ্যার পরে যে এত নিস্তব্ধ হয়ে যাবে, তা আমি ভাবতেও পারিনি। দু ঘন্টা ধরে বসে রইলাম। রিক্সা তো দূরের কথা, একটা মানুষেরও দেখা পেলাম না। বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালাম। না, আজ আর কোন রিক্সা পাব বলে তো মনে হচ্ছে না। ঠিক সেই সময় লক্ষ্য করলাম, দূরে অন্ধকার থেকে একটা রিক্সা এ দিকেই এগিয়ে আসছে। আমি বললাম, দাঁড়াও দাঁড়াও, শুনছো ভাই, একটু দাঁড়াও, দাঁড়াও ভাই। মাছ নিয়ে ফিরছেন বুঝি? হ্যাঁ, হ্যাঁ, এই মেলায় গিয়েছিলাম। তা আমাকে একটু দোলতলা ছেড়ে দেবে? তোমাকে না হয় আমি একটু বেশি ভাড়া দেবো। তা ছাড়ব না কেন? উঠে আসুন। উঠে আসুন। আমি রিক্সায় উঠে বসলাম। মাছটা তখনও আমার হাতে। রিক্সাওয়ালা বলে উঠলো, মাছটা আমারে দেন বাবু। আমি রেখে দেই। আপনার দূরে বসতে অসুবিধা হবে। না না, ঠিক আছে। আমি পারবো। তুমি চলো, আর দেরি করো না। রিক্সার চাকা গড়াতে শুরু করল। আমি বললাম, তুমি কি এই আদি সপ্তগ্রামেই থাকো? হ্যাঁ বাবু, আসলে মাছ খুব ভালোবাসি তো, তাই এই আদি সপ্তগ্রামেই থেকে গেছি। এতক্ষণ বসে থেকেও কোন রিক্সা পাইনি। তোমাকেই দেখলাম এত রাত্রে ভাড়া নিয়ে যেতে। রিক্সা পাবেন কিভাবে? আপনি যে ভুল পথে এসেছেন। ওইদিকের মোড়ের মাথায় সব রিক্সা দাঁড়ায়ে থাকে। এ দিকে কেউ আসে না। এ দিকে যে সব মাছ খেকোরা আছে। হঠাৎ চারিদিকে ঝড়ো হাওয়া বইতে শুরু করল। বৃষ্টি নামার আগেই বাড়ি ফিরতে হবে। সামনে গাছের তলার অন্ধকারে একটা ছায়ামূর্তি দেখতে পেলাম। কিরে ভুতু! পুরো মাছটাকে কি একাই হজম করবি নাকি হ্যাঁ? হিংসা করবি না কেছো। একদম হিংসা করবি না। নিজে তো সারাদিন এই গাছ থেকে ও গাছ আর ও গাছ থেকে এই গাছ। কোথায় কি হলো, কোন খোঁজ খবর রাখিস? ওরে, ওরে ভুতু, তুই তো রেগে গেলি রে বাপ। রাগ করিস না, রাগ করিস না। অন্তত মাথার দিকটা দে। কত বড় কথা। বলে কিনা মাথার দিকটা। তোকে আমি এক টুকরো আশও দেবো না। চলি। কাজটা ভালো করলি না ভুতু। তুই আবার এদিকে আসবি না। তখন তোকে দেখে নেবো, দেখে নিস হ্যাঁ। ওরে কেছো, নাম আমার ভুতু। দেবো তোরে গুতো। ওদের মধ্যে কি কথা হলো, কিছুই বুঝতে পারলাম না।
[5:07]তবে একটা জিনিস বেশ বুঝলাম। যে এখানকার গতিপ্রকৃতি সুবিধার নয়। মনের মধ্যে একটা অজানা ভয় কাজ করতে লাগল। আমি বললাম, আর কতদূর ভাই? আর একটুখানি পথ বাবু। এ কোন রাস্তা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছো তুমি? আসার সময় তো এই রাস্তা ছিল না। এই রাস্তা দিয়ে অনেক তাড়াতাড়ি দোলতলা পৌঁছানো যায়। তাই এই রাস্তা দিয়েই নিয়ে এলাম। এমন ভয়াবহ রাস্তা আমি এর আগে কখনো দেখিনি। রাস্তার পাশে একটা গাছে একটা নরকঙ্কাল বসে বসে পা দোলাচ্ছে। আরে আরে আরে আরে বাস! বেশ সুন্দর একটা মাছের গন্ধ আসছে বলে মনে হচ্ছে। ওই ভুতটা নিশ্চয়ই আবার কাউকে নিয়ে ওই গোরস্থানের দিকে যাচ্ছে। এই ভুতু! এই! এ কোথায় যাচ্ছিস? কোথায় যাচ্ছিস, হ্যাঁ? ওরে সর্বনাশ করেছে। আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, কি? কি কি হয়েছে? ওই গাছের মামদোটা আমাদের দেখে ফেলেছে। মাছের গন্ধ পেয়েছে নিশ্চয়ই। কে এই নিম গাছের মামদো? আর তুমি আমাকে এইসব ভুতুরে রাস্তা দিয়ে এবার নিয়ে এলে কেন? রিক্সা ধরে বসুন বাবু। মামদোটা পেছনেই আসছে মনে হচ্ছে। লোকটা এই কথা বলে খুব জোরে জোরে রিক্সা চালাতে শুরু করল। রিক্সার গতি দেখে মনে হলো রিক্সা যেন মাটিতে নেই, হাওয়ায় ভেসে চলেছে। আশ্চর্য! একটা মানুষের পক্ষে এত জোরে রিক্সা চালানো কিভাবে সম্ভব? পিছন থেকে একটা আওয়াজ শুনতে পেলাম। ওরে, ওরে যাস নে, যাস নে, একবার দাঁড়া। কতদিন মাছ খাইনি। দাঁড়া, দাঁড়া, একবার দাঁড়া। রিক্সা প্রবল গতিতে ছুটে চলেছে। এমন সময় আকাশে প্রবল শব্দ করে বিদ্যুৎ চমকে উঠলো। ঝিরিঝিরি করে বৃষ্টি পড়া শুরু হলো। রিক্সার পেছন থেকে আসা ছপছপ আওয়াজটা আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল। একটা গাছের সামনে এসে লোকটা রিক্সা দাঁড় করালো। আমি বললাম, বাপ রে, এই তোমার আর নিয়ে যেতে হবে না। আমি আমি একাই যেতে পারবো। কি কুকক্ষণে যে তোমার রিক্সায় উঠেছিলাম। একা একা কোথায় যাবেন বাবু? দেখুন, আমরা গোরস্থানের মাঝখানে আছি। চারপাশে চোখ পড়তেই দেখি, আমাদের চারপাশে শাড়ি শাড়ি কবর। সবকটাই পুরনো জরাজীর্ণ আর ভয়াবহ। তারপর হঠাৎ কবরের এব্রো খেব্রো মাটি থেকে একটা কঙ্কালের হাত বেরিয়ে এল। তারপর আস্তে আস্তে পুরো দেহটাই কবর থেকে বেরিয়ে এল। দেহ বলা ভুল হবে, আসলে দেহ নয়, কঙ্কাল। তারপর একে একে সব কবর থেকেই একটা করে কঙ্কাল উঠে আসতে লাগল। সবার মুখে একই কথা, মাছ, আমাকে মাছটা দিয়ে যাও। সেই কবে মাছ খেয়েছি মরার আগে। কি সুন্দর গন্ধ। আমাকে মাছটা দিয়ে যাও।
[9:18]আমি আমি ভয়ে এক পা দু পা পিছোতে লাগলাম। দেখলাম রিক্সাওয়ালা একেবারে গাছের ওপরে একটা মগ ডালে উঠে বসেছে। মাছটা তোরা নি। আমি শুধু গোটা মানুষটাকে খাবো। আমি আমি ভয়ে দিলাম এক ছুট। নরকঙ্কালগুলো আমার পেছন পেছন ছুটতে লাগল। পাচ্ছি পাচ্ছি। আমাদের মাছ খাওয়া হবে না গো। কে খেয়ে থোর। পালিয়েছিস, পালাবি না। তোকে কে ধরবে।
[10:11]দৌড়াতে দৌড়াতে মাছটা হাত থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিলাম। সমস্ত কঙ্কালগুলো একেবারে হামলে পড়ল মাছটার দিকে। মাছ খাবো, মাছ খাবো। আমি আমি ছুটে চললাম। দৌড়ে একেবারে গঙ্গার ঘাটে এসে হাঁপ ছাড়লাম। দেখলাম একটা নৌকা সবেমাত্র ঘাটে এসে ভিড়েছে। একটুও দেরি না করে নৌকায় উঠে বসলাম। হাঁপ ছেড়ে বললাম, আমাকে আমাকে রামঘাটে নামিয়ে দিও মাঝি। ছাউনীর ওপাশ থেকে আওয়াজ এল, বাবু কি মাছ নিয়ে ফিরলেন নাকি?



