[0:00]গভীরভাবে দেখুন এই স্যাটেলাইট ছবিটা। প্রথম দেখায় মনে হবে এখানে বিরান শুষ্ক মরুভূমি ছাড়া আর কিছুই নেই। অথচ ঠিক মাঝখানেই দেখা যায় এক অদ্ভুত কাঠামো। জুম করে ভালো করে দেখলে স্পষ্ট হয়, এটা দেখতে অবিকল একটা এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারের মতো। সেই বিশাল বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ, যেগুলো সামরিক বাহিনী ভাসমান বিমানঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে। রানওয়ে থেকে শুরু করে ফাইটার জেট আর অস্ত্রশস্ত্র। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো এটা কোনো মহাসাগরের বুকে না, বরং এটা পড়ে আছে মাঝ মরুভূমির বালুর উপরে। এবার একটু জুম আউট করে এর চারপাশটা দেখা যাক। ছবিটা তোলা হয়েছে উত্তর পশ্চিম চীনের তাকলামাকান মরুভূমির উপর থেকে। সাধারণ এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার চলে সমুদ্রের উত্তাল পানিতে। কিন্তু এই মরুভূমির পরিবেশও ভীষণ নির্মম। পানির বদলে এখানে আছে শুধুই বালু। অথচ তাপমাত্রা এবং প্রতিকূলতার দিক থেকে সমুদ্রের মতোই চরম। আয়তনের হিসেবে তাকলামাকান পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম বালুময় মরুভূমি। উপগ্রহ থেকে দেখলে সেটা যেন বালির এক বিশাল চোখ আর আমাদের পরিচিত পৃথিবীর এক অচেনা অংশের মতো মনে হয়। এতদূর নির্জন এই মরুভূমির মাঝে চীনের সেনাবাহিনী কেন একটা এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারের মতো রহস্যময় এই জিনিস বানাচ্ছে, প্রশ্নটা স্বাভাবিকভাবেই ওঠে। যদিও গত কয়েক দশকে চীন তাদের বিমানবাহী রণতরি কর্মসূচি দুরন্ত গতিতে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। 15 বছর আগেও তাদের হাতে একটাও এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারই ছিলো না। এখন তাদের নৌবহরে তিনটা ক্যারিয়ার আর তার একটা তারা নিজেরাই নির্মাণ করেছে। কিন্তু স্যাটেলাইট ছবিতে মরুভূমির বুকে এই যে জাহাজের অবয়ব দেখা যাচ্ছে, তার নকশা চীনের নিজের ক্যারিয়ারগুলোর সঙ্গেই মিলছে না। বরং কাঠামোটা অবিকল আমেরিকান ক্যারিয়ারের ডিজাইনের মতো। উদাহরণ হিসেবে মার্কিন নৌবাহিনীর সর্বাধুনিক জেরাল্ড আরফোর্ড ক্লাস ক্যারিয়ারের আকারের কথাই ভাবুন। মরুভূমির এই নকল জাহাজটার সঙ্গেও সেটার এক আশ্চর্য মিল রয়েছে। সেই স্থান থেকে একটু দূরে তাকিয়ে দেখা যায় মরুভূমির বুক চিরে একটা সরল রেখার মত পথ চলে গেছে। ভালো করে লক্ষ্য করলে বোঝা যায় এটা আসলে একটা রেললাইন। এই ট্র্যাকের ঠিক অপর পাশে আরেকটা বড় কাঠামো চোখে পড়ছে। এটাকে দেখতে এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারের মতো নয়, বরং অনেকটা যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত আর্লিবর্গ শ্রেণীর ডেস্ট্রয়ার যুদ্ধজাহাজের আদলে তৈরি। মরুভূমির এই কাঠামোটা ওই ডেস্ট্রয়ার জাহাজের হুবহু নকশা নকল করেছে। ব্রিজ, ফানেল থেকে শুরু করে ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চারের মতো গুরুত্বপূর্ণ সব অংশের অবস্থানও একই রকমভাবে বসানো হয়েছে। ভাবা যায়, এটা স্পষ্ট যে এইসব কাঠামো আসলে জাহাজ নয়, বরং মাটিতে বানানো সমতল মকআপ বা রেপ্লিকা। অবাক করা বিষয় হলো পুরনো স্যাটেলাইট ছবিতে ধরা পড়েছে 2020 সালে প্রথম ঘনক্ষেত্র আর লম্বা খুঁটি সাজিয়ে জাহাজের আকৃতি বোঝানো হয়েছিলো। পরে গিয়ে সেখানে পুরো জাহাজের আউটলাইন আরো স্পষ্ট করে আঁকা হয়েছে। এখানে আরেকটা বিষয় বেশ অদ্ভুত। ওই নকল জাহাজগুলোর মাঝখান দিয়ে যে রেললাইনটা গেছে তার গতিপথ খুবই বাঁকা এবং অস্বাভাবিক আকারের। চারদিকে সমতল মাঠ, কোথাও প্রাকৃতিক বাধা নেই, তবুও ট্র্যাকটা সোজা না গিয়ে যেন একে বেঁকে গেছে। মাঝপথে মোচর নিয়ে হঠাৎ ডানদিকে মোড় নিয়েছে। তাহলে রেললাইনটা এভাবে বাঁকানো হলো কেন? গোটা কাহিনী আরো রহস্যময় হয়ে ওঠে যদি আমরা সেই রেললাইনটাকে অনুসরণ করি। উত্তরে গিয়ে দেখা যায় ট্র্যাকটা গিয়ে থেমেছে একটা ঘাঁটির কাছে, যেখানে একটা বড় হ্যাঙ্গার, কিছু ভবন আর কয়েকটা ট্র্যাক দেখা যায়। আর দক্ষিণ দিকে কিছুদূর যাওয়ার পরেই রেললাইনটা হঠাৎ করেই শেষ। মরুভূমির মধ্যে গিয়ে হঠাৎ যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। কি উদ্দেশ্যে এমন একটা অদ্ভুত ট্র্যাক বানানো হয়েছে তা এখনো স্পষ্ট নয়। একবার ভাবুন তো মরুভূমিতে বানানো এই মার্কিন যুদ্ধজাহাজের নকলগুলোর আসল যুদ্ধজাহাজ আসলে কোথায় থাকে? আশ্চর্য হলেও সত্যি, এই মরুভূমির কাছাকাছি প্রায়শই যুক্তরাষ্ট্রের ক্যারিয়ার এবং রণতরিগুলো ঘোরাফেরা করে। দক্ষিণ চীন সাগরে নিয়মিত মার্কিন নৌবহর টহল দেয়। আবার চীনের যুদ্ধজাহাজও সেখানে থাকছে। একবার তো চীনা ডেস্ট্রয়ার এত কাছে গিয়ে একটা মার্কিন জাহাজকে পেরিয়েছিল যে প্রায় সংঘাতই লেগে যাচ্ছিল। এসব ঘটনাই বলে দেয় চীনের আশেপাশে বহুদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েই যাচ্ছে। এই টানা পোড়েনের মূলে আছে দুইটা ইস্যু, দক্ষিণ চীন সাগর এবং তাইওয়ান। দক্ষিণ চীন সাগরের প্রায় পুরোটাই চীন নিজের বলে দাবি করে। এবং ইতিমধ্যে চীন সেখানে কৃত্রিম দ্বীপ বানিয়ে সামরিক ঘাঁটিও গড়ে তুলেছে। এর বিরোধিতা করে যুক্তরাষ্ট্র নিয়মিত যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়ে সেখানে মহড়া চালায়। দ্বিতীয় বিরোধটা তাইওয়ান নিয়ে। দ্বীপটা আলাদা সরকার নিয়ে চললেও চীন একে সবসময়ই নিজের একটা বিচ্ছিন্ন প্রদেশ হিসেবে মনে করে এবং প্রয়োজনে শক্তি দিয়ে দখলেরও হুমকি দিয়ে আসছে। তাইওয়ানে চীনের আক্রমণের সংখ্যা যে একেবারে বাস্তব, যুক্তরাষ্ট্র সেটা স্পষ্ট করে জানিয়েছে। এবং এটাও জানিয়েছে যে এই ধরনের জবরদস্তি তারা কোনোভাবেই মেনে নিবে না। তাই তাইওয়ান প্রণালীতে মার্কিন নৌবাহিনী সতর্ক অবস্থানে থাকে। আর এই দুইটা বিরোধ ভবিষ্যতে বড় সংঘাতের রূপ নিতে পারে। তাই সেই আশঙ্কায় চীন মরুভূমিকে একপ্রকার প্রশিক্ষণের মাঠ বানিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছে। মরুভূমিতে বানানো কাঠামো গুলো আসলে অনুশীলনের লক্ষ্যবস্তু। চীনের ক্ষেপণাস্ত্র আসলে আমেরিকান যুদ্ধজাহাজে কতটা নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে পারবে তা পরখ করার ব্যবস্থা। অনেকে মনে করেন এই কাঠামো গুলোর সাথে থাকা লম্বা ধাতব খুঁটিতে সেন্সর বা রাডার প্রতিফলক লাগানো আছে। যাতে করে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে তথ্য সংগ্রহ এবং রাডার নির্ভুল নিশানা করার ট্রেনিং করা যায়। অন্যান্য স্যাটেলাইট ছবিতেও দেখা গেছে চীনের ক্ষেপণাস্ত্র এই টার্গেট গুলোকে নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে পারছে। কিন্তু আসল যুদ্ধজাহাজ তো আর থেমে থাকবে না। চলন্ত টার্গেটে আঘাত হানার মতো মহড়ার জন্যই ওখানে রেললাইন ধরে মডেল জাহাজ বসানো হয়েছে। এই ট্র্যাক বরাবর রয়েছে আরেকটা এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারের মডেল। আগেরটার তুলনায় আরো উন্নত ত্রিমাত্রিক কাঠামো, যার গায়ে অসংখ্য খুঁটি লাগানো আছে। চীনের একটা প্রতিরক্ষা প্রদর্শনীতে এই সিস্টেমের একটা স্কেল মডেলও দেখানো হয়েছে। এবং জানা গেছে চীনা সংস্থা ক্যাসিক এই চলমান মকআপ পদ্ধতিটা তৈরি করেছে। রেললাইনের এমন বাঁকানো নকশার উদ্দেশ্য হলো হামলা থেকে বাঁচতে একটা এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার জাহাজ যেভাবে হঠাৎ দিক বদল করবে বা দ্রুত গতি বদলাবে সেই গতিবিধি নকল করা। স্যাটেলাইট চিত্রেও ইঙ্গিত মিলেছে যে লক্ষ্যবস্তুতেও চীন সফলভাবে আঘাত হানার পরীক্ষাও চালিয়েছে। নকল টার্গেট বানিয়ে মহড়া করা কোন নতুন কৌশল না। যেমন 2014 সালে ইরান একটা মার্কিন এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারের রেপ্লিকা বানিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র মেরে সেটাকে ডুবিয়ে দিয়েছিল। যদিও সেই মহড়ায় বাস্তব প্রশিক্ষণের চেয়ে প্রচারণার উদ্দেশ্যই বেশি ছিলো। তবুও নকল লক্ষ্য নিয়ে মহড়া সামরিক দুনিয়ায় অস্বাভাবিক কোনো কিছু না। যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের মহড়ায় শত্রুপক্ষের নকল অস্ত্রের ব্যবহার করে। যেমন প্রশিক্ষণে চীনের জে 20 জঙ্গি বিমানের রেপ্লিকা কিংবা রুশ সুখই সু 27 যুদ্ধবিমানও উড়ানো হয়েছে। কিন্তু চিন্তার বিষয় হলো চীন এখানে কোনো সাধারণ অস্ত্রের পরীক্ষা করছে না। তারা এমন একটা সিস্টেম প্রদর্শন করতে চায় যা ওই সম্ভাব্য যুদ্ধগুলোর কৌশলী পাল্টে দিতে পারে। মার্কিন পর্যবেক্ষকদের মতে চীনের ডংফেং 21ডি নামের একটা বিশেষ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যা বিশেষভাবে নড়তে থাকা এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারকে ধ্বংসের জন্য তৈরি করা হয়েছে। এই ক্ষেপণাস্ত্রটা প্রথমে বায়ুমণ্ডলের অনেক উঁচুতে উৎক্ষেপণ করা হয় এবং তা প্রচন্ড গতিতে নিচে নেমে আসে। নিচে পড়ার সময় এর ওয়ারহেড অংশটা মূল ক্ষেপণাস্ত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং মাঝপথেই পথ পাল্টাতে পারে। ফলে এটা ছোট বা চলমান লক্ষ্যবস্তুতেও নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে এ ধরনের অস্ত্র প্রতিরোধ করা খুবই কঠিন। কারণ সাবমেরিন থেকে ছোঁড়া টরপেডো হামলা ঠেকাতে শত্রু ডুবোজাহাজকে এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারের কাছে আসতে হয়। কিন্তু এই ক্ষেপণাস্ত্র চীনের মাটি থেকেই অনেক দূরের জাহাজে আঘাত হানতে পারে। মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এত দূরের এবং দ্রুতগতির হামলার বিরুদ্ধে সময়মতো সাড়া নাও দিতে পারে। আর শেষ পর্যায়ে ক্ষেপণাস্ত্রের ওয়ারহেডটা আকস্মিকভাবেই দিক বদলাবে বলে তাকে গুলি করে নামানো প্রায় অসম্ভব। মরুভূমিতে প্রকাশ্যে এই পরীক্ষা চালিয়ে চীন সম্ভবত প্রতিপক্ষের উদ্দেশ্যে এক ভয়ংকর বার্তা দিচ্ছে। তারা চায় সবাই জানুক যে তাদের এই সক্ষমতা আছে। কারণ তাতেই শক্তির ভারসাম্য অনেকটা তাদের পক্ষে ঘুরে যাবে। যুক্তরাষ্ট্র আর সহজে ক্যারিয়ার নিয়ে তাদের কাছে ঘেষতে সাহস করবে না। কারণ মিসাইলের নাগাল এলেই বিশাল রণতরিটা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে। সংক্ষেপে বলতে গেলে মার্কিন ক্যারিয়ারগুলোর বিরুদ্ধে দূরপাল্লা থেকে আঘাত হানার কৌশল তৈরি করতেই চীন এই মরুভূমিতে নকল যুদ্ধজাহাজ বানিয়ে ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালাচ্ছে। অর্থাৎ মিসাইলটা ব্যবহার না করলেও এর উপস্থিতির আতঙ্কই চীন সাগর এবং তাইওয়ানের মতো সংঘাতপূর্ণ এলাকাগুলোতে চীনের ক্ষমতা প্রদর্শনের সক্ষমতা বহুগুণে বেড়ে যাচ্ছে। আসলে চীনের কৌশল বড়ই রহস্যময়।

চীন মরুভুমির মধ্যে কি লুকাচ্ছে ? চীনের নীরব খেলা চলছে গোপনেই !
মায়াজাল
8m 26s1,186 words~6 min read
Auto-Generated
Watch on YouTube
Share
MORE TRANSCRIPTS

![Thumbnail for Precardium Examination Video [Comprehensive_For Under & Post Graduates] by Dr Adil Mahmood Ranjha](/_next/image?url=https%3A%2F%2Fimg.youtube.com%2Fvi%2FxMOrOmAHypk%2Fhqdefault.jpg&w=3840&q=75)
