[0:00]আজকে আমরা কয়েকটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে যাচ্ছি। একটা হচ্ছে মন কাকে বলে? মনের বৈশিষ্ট্য কী? মন কিভাবে কাজ করে? এবং মনের সাথে আমাদের ব্রেইন বা মস্তিষ্কের কি সম্পর্ক রয়েছে?
[0:24]আমি হাসান আজিজ সরকার। আমি একজন সাইকিয়াট্রিস্ট বা মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ। আমি চাকরি করি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে। ডাক্তারির পাশাপাশি আমি গবেষণা করে থাকি। আমি একটা সাইকিয়াট্রিক জার্নালের এডিটর হিসেবে কাজ করি। আমার স্পেশাল ইন্টারেস্ট হচ্ছে সাইকিয়াট্রি, নিউরোসাইকিয়াট্রি এবং বিহেভিয়ারাল নিউরোসায়েন্সের মতো সাবজেক্টে। আমি বিশ্বাস করি মানুষকে যদি সাইন্টিফিক্যালি সঠিক তথ্য দেওয়া যায়, তাহলে মানুষ নিজেকে বুঝতে পারে এবং মানুষ যদি নিজেকে বুঝতে পারে তাহলে তার পার্সোনাল গ্রোথ এবং ওয়েলবিং দুটাই নিশ্চিত হয়। তো আমরা বলছিলাম যে, মন কাকে বলে? তো মনের অনেকগুলো সংজ্ঞা আছে। মনের সবচেয়ে পুরাতন সংজ্ঞার একটা হচ্ছে মন হচ্ছে তাই যা চিন্তা করে। থমাস অ্যাকুইনাস বলে একজন ফিলোসফার ছিলেন। তিনি অনেক আগে একটা বলেছেন যে, আই থিঙ্ক দেয়ারফোর আই এক্সিস্ট। এই চিন্তাধারা যে, আমি চিন্তা করি তাই আমার অস্তিত্ব আছে। এখান থেকে মনের এই সংজ্ঞা যে, মন হচ্ছে তাই যা চিন্তা করে। এটার বাইরে মনের আরেকটা সংজ্ঞা আছে। যেমন মন হচ্ছে তা যার সম্পর্কে আমরা সজাগ। যেমন ফ্রয়েডের মতে, মনের দু'টো অংশ আছে। একটা অবেচেতন বা অচেতন মন, আরেকটা হচ্ছে সচেতন মন। তো মনের এই সংজ্ঞাটা হচ্ছে মন হচ্ছে তা যার সম্পর্কে আমরা সজাগ। মনের আরেকটা সংজ্ঞা আছে। আরেকটা সংজ্ঞা হচ্ছে, মন হচ্ছে তা যার কোন ফিজিক্যাল এক্সিস্টেন্স নাই। অর্থাৎ আমাদের দু'টো অংশ আছে, একটা হচ্ছে শরীর আরেকটা হচ্ছে মন। শরীরের ফিজিক্যাল এক্সিস্টেন্স আছে। কিন্তু মনের কোন ফিজিক্যাল এক্সিস্টেন্স নাই। এই সংজ্ঞা দিয়ে হয়তো মনকে খুব পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় না। মনকে পরিষ্কারভাবে বুঝতে হলে আরেকটা জিনিস করা যায়। সেটা হচ্ছে মন কি কি কাজ করে সেটাকে ডেসক্রাইব করা। তো আমরা একটু দেখি যে, মন কি কি কাজ করে। মনের একটা কাজ হচ্ছে অনুভূতি বা সেনসেশন। মনের আরেকটা কাজ হচ্ছে উপলব্ধি করা। অ্যাটেনশন বা মনোযোগ। চিন্তা করা। আবেগ, আমাদের মেমোরি, আমাদের বিশ্বাস, আমাদের ইচ্ছা শক্তি, আমাদের প্রেরণা, আমাদের স্বপ্ন। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে আমাদের চেতনা। এই সবগুলোই হচ্ছে একটার পর একটা মনের কাজ। এই সবগুলো কাজকে আমরা একসাথে বলতে পারি যে, মন। তো অনুভূতি বা সেনসেশন আসলে কী? আমাদের কতগুলো সেন্স অর্গান আছে। যেমন আমাদের নাক, কান, চোখ, মুখ, ত্বক, এর মাধ্যমে আমরা বাইরের পরিবেশ থেকে নানারকম ইনফরমেশন নেই। এটা হচ্ছে অনুভূতি। শুধু বাইরের পরিবেশ না। আমাদের অনেক সময় শরীর থেকেও অনেকগুলো অনুভূতি আসে। যেমন আমাদের ক্ষুধা লাগে, আমাদের তৃষ্ণা পায়। এগুলো হচ্ছে শারীরিক অনুভূতি। তো এই অনুভূতি বা সংবেদন যেটা বলা হয়, এটা হচ্ছে মনের একটা কাজ। মনের আরেকটা কাজ হচ্ছে উপলব্ধি করা, যেটাকে আমরা বলি হচ্ছে পারসেপশন। যে আমার চোখের সামনে ধরা যাক আলো আসছে। এই আলোটা কি লাইটের আলো? সূর্যের আলো? নাকি চাঁদের আলো? তিনটাই আলো। আমার চোখের রেটিনাতে যখন পড়ছে, আমি তিনটাকে আলো হিসেবে দেখছি। কিন্তু আমি যখন এটা বুঝতে পারি যে, এটা লাইটের আলো না সূর্যের আলো না চাঁদের আলো, তখন এটাকে বলে উপলব্ধি বা পারসেপশন। তো এটা হচ্ছে মনের আরেকটা কাজ। অনুভূতি আর উপলব্ধি এই দুটোর মধ্যে মনের আরেকটা অংশ আছে, সেটাকে বলা হয় অ্যাটেনশন বা মনোযোগ দেওয়া। আমি একটা ঘর ভর্তি মানুষের মধ্যে আছি। তার মধ্যে অনেক মানুষ থেকে একজন মানুষের দিকে আমার মনোযোগ যাচ্ছে, এটাকে বলা হয় অ্যাটেনশন।
[4:11]অ্যাটেনশনটা অনেকটা স্পটলাইটের মতো বা টর্চলাইটের মতো। অন্ধকার ঘরের মধ্যে আমি শুধুমাত্র যেই অংশটাতে আলো ফেলব, সেই অংশটাই দেখতে পারবো। এটা হচ্ছে মনোযোগ দেওয়া।
[4:39]অ্যাটেনশন বা মনোযোগ দেওয়ার আবার অনেকগুলো অংশ আছে। যেমন একটা অ্যাটেনশনকে বলা হয় ফোকাস অ্যাটেনশন। কোন কিছুতে ফোকাস করা।
[4:52]একটা অ্যাটেনশনকে বলা হয় সিলেক্টিভ অ্যাটেনশন। যে অনেকগুলো জিনিস আছে তার মধ্যে থেকে একটা জিনিসকে সিলেক্ট করা। যেমন একটা বই আছে, বইয়ে অনেকগুলো লাইন আছে, একটা পৃষ্ঠার মধ্যে, সেখান থেকে আমি জাস্ট একটা লাইনে মনোযোগ দিচ্ছি, এটা হচ্ছে সিলেক্টিভ অ্যাটেনশন। একটা অ্যাটেনশনকে বলা হয় সাসটেইন অ্যাটেনশন। যে লম্বা সময় ধরে আমি অ্যাটেনশন ধরে রাখছি, এটা হচ্ছে সাসটেইন অ্যাটেনশন। সাসটেইন অ্যাটেনশনকে আবার বলা হয় কনসেনট্রেশন। আরেক ধরনের অ্যাটেনশন আছে যেটাকে বলা হয় অল্টারনেট অ্যাটেনশন। দু'টো জিনিসের মধ্যে আমি আমার অ্যাটেনশন চেঞ্জ করছি। স্যার লেকচার দিচ্ছি আমি নোট করছি। আবার লেকচার শুনছি আবার নোট করছি, অল্টারনেট অ্যাটেনশন। আরেক ধরনের অ্যাটেনশন আছে যেটাকে বলা হয় ডিভাইডেড অ্যাটেনশন। দু'টা জিনিসের উপর আমি অ্যাটেনশন দিচ্ছি। রান্না করছি এবং মোবাইলে কথা বলছি, ডিভাইডেড অ্যাটেনশন। তাহলে মনের কাজ হচ্ছে অনুভূতি, মনের কাজ হচ্ছে মনোযোগ দেওয়া বা অ্যাটেনশন দেওয়া, মনের কাজ হচ্ছে উপলব্ধি করা। কোন কিছু উপলব্ধি করার পরে যেটা আসে আমাদের মাথার মধ্যে চিন্তা আসে বা আবেগ আসে। তাহলে আবেগ হচ্ছে মনের আরেকটা কাজ।
[6:20]আবেগের আবার তিনটা কম্পোনেন্ট আছে আমরা যেটা কি বলে থাকি যেকোনো আবেগের।
[6:29]একটা কম্পোনেন্ট হচ্ছে আমাদের ফিলিংক্স, অনুভব। আমাদের ভালো লাগে খারাপ লাগে, এটা হচ্ছে আবেগের একটা অংশ। আরেকটাকে বলা হয় যে শারীরিক কম্পোনেন্ট। যে ভালো লাগা বা খারাপ লাগার পরে আমাদের শরীরের মধ্যে অনেক অনুভূতি তৈরি হয়। যেমন আমরা যদি ভয় পাই, তাহলে আমাদের বুক ধড়ফড় করে। আমাদের ভালো লাগলে আমাদের মুখ হয়তো স্মাইলিং ফেস হয়ে যায়। তো এটা একটা শারীরিক অংশ আছে। আরেকটা হচ্ছে আবেগের সাথে হচ্ছে আচরণ আমরা যে আচরণগুলো করে থাকি তার রিলেটেড। তো আবেগের হচ্ছে তিনটা অংশ, আরেকটা হচ্ছে আমাদের একটা ফিলিংক্স দেয়, আমাদের শরীরে একটা অনুভূতি তৈরি করে এবং তার করেসপন্ডিং একটা আচরণ বা ব্যবহার আছে। আবেগকে আমরা আবার পজিটিভ এবং নেগেটিভ এরকম দুই ভাগে ভাগ করি। পজিটিভ আবেগ যেমন ভালো লাগা। নেগেটিভ আবেগ হতে পারে দুঃখ, কষ্ট, রাগ, দুশ্চিন্তা। এগুলোকে বলা হয় নেগেটিভ আবেগ। পজিটিভ এবং নেগেটিভ আবেগ ছাড়াও আবেগকে আমরা আরেকটা ভাগে ভাগ করি। সেটা হচ্ছে প্রাইমারি ইমোশন, সেকেন্ডারি ইমোশন। কিছু কিছু ইমোশন একেবারে ছোটবেলা থেকে আমাদের মধ্যে থাকে।
[8:04]যেমন আনন্দ, হাসি, তারপরে কষ্ট, রাগ, এই জিনিসগুলো একেবারে ছোটবেলা থেকে আমাদের মধ্যে থাকে। আর কিছু কিছু ইমোশন আছে যেগুলা আমরা বড় হওয়ার পরে ডেভেলপ করে। যেমন আমাদের প্রাইড বা অহংকার, আমাদের দয়া মায়া বা অন্যের প্রতি কম্প্যাশন যেটাকে বলে, গিল্ড ফিলিং বা অপরাধবোধ, লজ্জা এগুলোকে আবার সোশ্যাল ইমোশনও বলে। এগুলো বড় হওয়ার পরে আমাদের মধ্যে ডেভেলপ করে। তো আবেগের পরে যেই জিনিসটা আসে সেটা হচ্ছে চিন্তা। আমরা যখন কোন কিছু অনুভব করি, তখন আমাদের বাইরে থেকে একটা সেনসেশন আসতে হয়। যে বাইরে লাইট আছে, সেই লাইটের আলো আমার রেটিনাতে পড়ছে, আমি অনুভব করছি। কিন্তু আমি যখন চিন্তা করি তখন আমার বাইরে থেকে কোন সেনসেশনের প্রয়োজন নাই। তো চিন্তা হচ্ছে সেটা যেটার জন্য বাইরের কোন উদ্দীপনার প্রয়োজন নাই। আমি সূর্য না দেখেও সূর্যের চিন্তা মাথার মধ্যে আনতে পারি। তো চিন্তা হচ্ছে এই জিনিসটা। চিন্তার আবার কতগুলো কম্পোনেন্ট আছে। চিন্তার একটা কম্পোনেন্ট হচ্ছে, যেটাকে বলা হয় কনসেপ্ট ফর্ম করা। যে আমরা কোন কিছু একটা দেখলাম, দেখার পরে সেটা আসলে কি ধরনের বস্তু সেই সম্পর্কে একটা ধারণা দেওয়া। যেমন আমি একটা চেয়ার বা টেবিল দেখলাম, সেটা আসবাবপত্র। এইভাবে হচ্ছে ক্লাসিফাই করা। এটাকে বলা হয় কনসেপ্ট ফরমেশন। চিন্তার আরেকটা অংশ হচ্ছে জাজমেন্ট। কোন কিছু ভালো না খারাপ, ভালো মন্দ বিচার করা, এটাকে বলা হয় জাজমেন্ট। এটা হচ্ছে চিন্তার একটা অংশ। চিন্তার আরেকটা অংশ হচ্ছে প্রবলেম থেকে প্রবলেম সলভ করার চেষ্টা করা, ডিসিশন নেওয়া। তো আবেগ, চিন্তা এর পরে যেই জিনিসটা আছে সেটা হচ্ছে বিশ্বাস। আমাদের বিশ্বাস হচ্ছে মনের একটা অংশ। আমাদের প্রত্যেকের কিছু নির্দিষ্ট বিশ্বাস আছে। আমাদের নিজের সম্পর্কে কিছু ধারণা থাকে, চারপাশের পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা থাকে, আমাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ধারণা থাকে। বিশ্বাস হচ্ছে সিম্পলি কোন জিনিসটাকে আমি সত্য বা মিথ্যা মনে করি। যেমন আমার বিশ্বাস থাকতে পারে যে, একজন সৃষ্টিকর্তা আছে, আমার বিশ্বাস থাকতে পারে যে, আমি খুব কনফিডেন্ট একজন মানুষ, আমার বিশ্বাস থাকতে পারে যে, আমি এই কাজটা করতে পারি। এগুলো হচ্ছে বিশ্বাস। বিশ্বাস খুব গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, বিশ্বাস দিয়ে আমি বুঝতে পারি আমার ব্যবহার কি হবে। আমার আবেগ, আমার চিন্তা, আমার ব্যবহার, এই জিনিসগুলো নির্ভর করে হচ্ছে আমার বিশ্বাসের উপর। যেমন একটা উদাহরণ দেই যে, কোন মানুষ হয়তো বিশ্বাস করে যে, পৃথিবীর কোন মানুষকে ট্রাস্ট করা যায় না। তাহলে সে যদি কোন নতুন মানুষের সামনে যায় তাহলে তার একটা আবেগ আসবে তার অ্যাংজাইটি তৈরি হবে। সে এক ধরনের ইনসিকিউরিটিতে ভুগবে নতুন মানুষের সাথে যখন সামনে যাবে। তার মাথায় চিন্তা আসবে যে, মানুষকে বিশ্বাস করা যায় না। তাহলে যেহেতু সে এরকম চিন্তা আসছে, তো ওই মানুষটা যদি কোন রিকোয়েস্ট করে তাহলে সে সেই রিকোয়েস্টটা রাখবে না। অর্থাৎ তার ব্যবহার, আবেগ, চিন্তা, সবকিছু হচ্ছে আপনার বিশ্বাস দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। আবার অন্য আরেকজন মানুষ যদি এরকম বিশ্বাস করে যে, পৃথিবীর সব মানুষকে বিশ্বাস করা যায়। তাহলে তার মধ্যে একটা অন্য একটা নতুন মানুষ আসল তার মধ্যে আবেগ আসবে যে ভালো লাগার একটা আবেগ যে নতুন কিছু একটা এক্সপেরিয়েন্স করছি। তার মাথায় চিন্তা আসবে যে, আমি তার সাথে ফ্রেন্ডলি বিহেভ করব। সে যদি কোন রিকোয়েস্ট করে, সে তার রিকোয়েস্টটা রাখার চেষ্টা করবে। তো এইভাবে আবেগ, চিন্তা, ব্যবহার, সবকিছু হচ্ছে আপনার বিশ্বাস দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হয়।
[13:20]আবেগ, চিন্তা, বিশ্বাস এর পাশাপাশি মনের আরেকটা ইম্পর্টেন্ট কাজ হচ্ছে মেমোরি বা স্মৃতিশক্তি। স্মৃতিশক্তি বলা হয় কোন কিছু মনে রাখার ক্ষমতা এবং মনে রাখার পরে সেটাকে বের করে নিয়ে আসার ক্ষমতা বা তথ্য কাজে লাগানোর ক্ষমতা। আমাদের স্মৃতিশক্তি আবার আমরা দুই তিন ভাগে ভাগ করতে পারি। এক ধরনের স্মৃতি বলা হয় ইমিডিয়েট মেমোরি। বা তাৎক্ষণিক মেমোরি। আমি মনে রাখলাম আবার ভুলে গেলাম। আমি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি, অনেক মানুষ আমার চোখের সামনে পার হয়ে যায়। তাদেরকে দেখলাম, একটু পরেই আমি ভুলে যাচ্ছি। এটা হচ্ছে ইমিডিয়েট মেমোরি। আরেক ধরনের মেমোরি যেটাকে বলা হয় শর্ট টার্ম মেমোরি।
[14:20]শর্ট টার্ম মেমোরি হচ্ছে আমি সকালবেলা কি দিয়ে নাস্তা করেছি বা গতকাল কি নিউজ ছিল, এগুলোকে বলা হয় শর্ট টার্ম। আমি এক মাস আগে কি নাস্তা করেছি ওটা মনে করা সম্ভব না। আর আরেক ধরনের মেমোরিকে বলা হয় লং টার্ম মেমোরি। আমি ছোটবেলায় কোন স্কুলে পড়েছি, ছোটবেলায় আমার সাথে কি হয়েছে, এগুলো আমার মাথার মধ্যে আছে। এগুলোকে বলা হয় লং টার্ম মেমোরি। আর মেমোরিকে আবার আরও একটা ভাগে ভাগ করা যায় যে, মেমোরিকে আমরা বর্ণনা করতে পারি কি পারি না। কিছু কিছু মেমোরি যেমন আমার জীবনে কি ঘটে গেছে, এই জিনিসগুলোকে আমরা বর্ণনা করতে পারি। এগুলোকে বলা হয় এপিসোডিক মেমোরি। আরেক ধরনের মেমোরি আছে যেগুলোকে বর্ণনা করা কঠিন দেখানো সহজ। সেগুলোকে বলা হয় প্রসিডিউরাল মেমোরি। যে আমি কিভাবে জুতার ফিতা বাঁধবো? কিভাবে সাইকেল চালাবো? এগুলো হচ্ছে প্রসিডিউরাল মেমোরি। এগুলো হচ্ছে দেখানো সহজ কিন্তু বর্ণনা করা কঠিন। এছাড়া ইমোশনাল মেমোরি আছে। ইমোশনাল মেমোরি হচ্ছে আমরা যেকোনো কিছু এক্সপেরিয়েন্স করার পরে তার সাথে আমাদের কিছু ইমোশন যুক্ত হয়। এই ধরনের মেমোরিকে বলা হয় ইমোশনাল মেমোরি। তো মেমোরির পরে মনের আরেকটা কাজ, সেটা হচ্ছে ইচ্ছাশক্তি বা আমাদের প্রেরণা। আমরা যেকোনো কাজ করতে একটা মোটিভেশন লাগে বা প্রেরণা লাগে। এই মোটিভেশন বা প্রেরণা হচ্ছে আমাদের মনের একটা কাজ। তো মোটিভেশন অনেক মোটিভেশনের অনেক থিওরি আছে। একটা থিওরি হচ্ছে আমাদের আনকনসাস মোটিভেশন আছে। যে আমরা সবসময় আনন্দ চাই এবং অন্যকে ডোমিনেট করতে চাই, অন্যের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে চাই। এটা হচ্ছে এক ধরনের মোটিভেশন। আবার অনেক সময় সোশ্যাল অনেক মোটিভেশন থাকে যে, সমাজ যা চায় আমরা সেই কাজটা করি। এটাকে বলা হয় সামাজিক মোটিভেশন। মোটিভেশনের পরে মনের আরেকটা ইম্পর্টেন্ট কাজ হচ্ছে স্বপ্ন, ড্রিম। ঘুমের মধ্যে আমরা যে স্বপ্নগুলো দেখে থাকি, সেটা হচ্ছে মনের একটা কাজ।
[17:16]দিবা স্বপ্ন আমরা অর্থাৎ জেগে থেকে যে স্বপ্নগুলো দেখি, সেই স্বপ্ন হচ্ছে চিন্তার অংশ। এটা আর ঘুমের মধ্যে যে স্বপ্ন দেখি, সেটা চিন্তার অংশ না। এটাকে হচ্ছে মনের একটা আলাদা কাজ বলা হয়ে থাকে। তো স্বপ্নের কতগুলো বৈশিষ্ট্য থাকে। যেমন আমরা যখন স্বপ্ন দেখি, তখন আমাদের কাছে মনে হয় যে আমরা বাস্তব যে অভিজ্ঞতা সেটাই এক্সপেরিয়েন্স করছি। আবার আমরা যখন স্বপ্ন দেখি, তখন আমাদের একটা ইমোশন তৈরি হয় সেই স্বপ্নের সাথে করেসপন্ডিং একটা ইমোশন থাকে। আমরা যখন স্বপ্ন দেখি তখন টাইম এবং স্পেস ডিসটরটেড হয়ে যায়। যে আমি একটা সময় ছোট ছিলাম, স্বপ্নের মধ্যে আবার দেখা যায় একটু পরে ১০ বছর পরে বড় হয়ে গেছি। কিংবা এই মুহূর্তে আমি ঢাকায় আছি, স্বপ্নে একটু পরে দেখা যায় আমি ইউকেতে চলে গেছি। অর্থাৎ আমার টাইম এবং স্পেস এটা হচ্ছে ডিসটরটেড হয়ে যায়। মনের আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে কনসাসনেস বা চেতনা। অনেকে এটাকে আত্মার সাথে মিলিয়ে ফেলেন। আমরা জাস্ট কনসাসনেস বা চেতনার মধ্যে থাকি। কনসাসনেস বা চেতনা হচ্ছে আমাদের চিন্তা, আমাদের আবেগ এবং আমাদের উপলব্ধি সম্পর্কে সজাগ থাকা। কনসাসনেস বা চেতনার আবার বলা হয়ে থাকে যে তিনটা অংশ আছে। একটা হচ্ছে সজাগ থাকা বা অ্যালার্ট থাকা। আমরা যখন ঘুমিয়ে থাকি তখন আমাদের চেতনা থাকে না।
[19:21]দ্বিতীয় যে অংশটা, সেটাকে বলা হয়ে থাকে যে সেল্ফ কনসাসনেস বা নিজের চিন্তা, নিজের ইমোশন, নিজের ব্রেনের মধ্যে কি চলছে, এটাকে উপলব্ধি করা বা এটাকে অবলোকন করার ক্ষমতা। এটা হচ্ছে কনসাসনেসের একটা পার্ট। কনসাসনেসের আরেকটা পার্ট হচ্ছে পরিষ্কারভাবে চিন্তা ভাবনা করতে পারা। মানুষ যখন পুরোপুরি কনসাস থাকে তখন সে পরিষ্কারভাবে চিন্তা ভাবনা করতে পারে। আমরা অনেক সময় বলি না যে, জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকে। তখন হচ্ছে মানুষের কনসাসনেস লো হয়ে যায়। তো চেতনা বা কনসাসনেস হচ্ছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। কনসাসনেসের কতগুলো বৈশিষ্ট্য আছে বা চেতনার কতগুলো বৈশিষ্ট্য আছে। চেতনার একটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যেমন এটা হচ্ছে প্রাইভেট। আমি অন্যকে বর্ণনা করতে পারবো না যে আমার মধ্যে কি চেতনা বা আমি কি সম্পর্কে সজাগ।
[20:41]চেতনার আরেকটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সবকিছু মিলে একটা আমাকে ইউনিফাইড ধারণা দেয়। যে আমি এই ঘরের মধ্যে বসে আছি, এখানে ফ্যান আছে, আমার শরীরে এক ধরনের স্পর্শ হচ্ছে, কানে একটা শব্দ হচ্ছে, সব মিলে আমাকে বলে যে, আমি একটা ক্যামেরার সামনে বসে কথা বলছি। তো কনসাসনেস হচ্ছে এরকম একটা চেতনার ধারণা দেয়। কনসাসনেসের আরেকটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তার সবসময়ই কোন না কোন উদ্দেশ্যের সাথে সম্পর্কিত। অর্থাৎ চেতনা সবসময় গোল ডিরেক্টেড চিন্তা ভাবনা করে থাকে বা এটার একটা উদ্দেশ্য থাকে। তাহলে আমরা যদি মনের ফাংশনগুলোকে সামারাইজ করার চেষ্টা করি বা মন কি কি কাজ করে? একটা হচ্ছে অনুভূতি, একটা হচ্ছে মনোযোগ দেওয়া, একটা হচ্ছে উপলব্ধি, একটা হচ্ছে আবেগ, একটা হচ্ছে আমাদের মেমোরি বা স্মৃতিশক্তি, একটা হচ্ছে চিন্তা, একটা হচ্ছে বিশ্বাস, একটা হচ্ছে ইচ্ছাশক্তি বা আমাদের মোটিভেশন, একটা হচ্ছে স্বপ্ন, এবং সবশেষে কনসাসনেস বা চেতনা। তো মনের কাজ সম্পর্কে আমরা একটা ধারণা পেলাম। এখন যে বিষয়টা সেটা হচ্ছে মনের বৈশিষ্ট্য কী? বা মন কিভাবে কাজ করে?
[22:31]মনের একটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আমরা যা কিছু এক্সপেরিয়েন্স করি তার সবসময় কোন বিষয়বস্তু থাকে। বা তার একটা বস্তু থাকে বা ফিজিক্যাল এক্সিস্টেন্স থাকে। যেই জিনিসের অস্তিত্ব নাই, আমাদের মন সেই জিনিস নিয়ে কাজ করতে পারে না। আমরা যা কিছুই এক্সপেরিয়েন্স করি তার একটা বিষয়বস্তু থাকে।
[23:00]মনের আরেকটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে, মন সবসময় যে জিনিসটা নিয়ে মন চিন্তা করছে বা ব্যস্ত থাকছে তা কোন না কোন উদ্দেশ্য পূরণ করার জন্য করে থাকে। অর্থাৎ একটা লক্ষ্য থাকে। মন যা কিছুই করে তার একটা লক্ষ্য থাকে। অনেকে হয়তো বলতে পারে যে, আমরা যে দিবা স্বপ্ন দেখি তার কি লক্ষ্য বা স্বপ্ন দেখি তার কি লক্ষ্য? দিবা স্বপ্ন হচ্ছে আমাকে হয়তো কিছু সময়ের জন্য বাইরের চারপাশের যে জগত, সেখান থেকে সরায় অ্যাটেনশন সরিয়ে রাখতে সাহায্য করে। দিবা স্বপ্ন হয়তো আমাকে পরিকল্পনা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে সাহায্য করে। এরকম। তো মন সবসময় যেভাবেই ব্যস্ত থাকুক, কোন না কোন লক্ষ্য পূরণের চেষ্টা করে।
[24:06]মনের সর্বশেষ যে বৈশিষ্ট্য, সেটা হচ্ছে আমরা যখন মানসিক যে অনুভূতিগুলোর মধ্যে দিয়ে যায় বা এক্সপেরিয়েন্সের মধ্যে দিয়ে যায়, আমাদের মধ্যে একটা অনুভূতির তৈরি হয় যে, আমাদের একটি ফ্রি উইল আছে বা স্বাধীন ইচ্ছা আছে। আমরা এরকম মনে হয় না যে বাইরে থেকে কেউ আমাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করছে। অর্থাৎ আমাদের আবেগ, আমাদের নিজস্ব চিন্তা, এগুলো আমরা বুঝতে পারি যেটা হচ্ছে আমাদের নিজস্ব। এটাকে বলা হয় ফ্রি উইল। তো মনের এই বৈশিষ্ট্যগুলোর পাশে আমরা আরেকটা যে বিষয় নিয়ে চিন্তা করতে চাই সেটা হচ্ছে ব্রেইনের সাথে মনের আসলে কি সম্পর্ক? তো আমাদের যে মানুষের যে ব্রেন, মানুষের ব্রেনের হচ্ছে তিনটা অংশ আছে। একটা হচ্ছে সামনের ব্রেন, মাঝখানের ব্রেন এবং পিছের ব্রেন। সামনের যে ব্রেন বা মস্তিষ্ক তাকে আবার চারটা ভাগে ভাগ করা হয়েছে। আমাদের এখানে যে অংশটা সেটাকে বলা হয় ফ্রন্টাল লোব, এখানে যে অংশটা সেটাকে বলা হয় প্যারাইটাল। এখানে অংশটাকে বলা হয় টেম্পোরাল লোব এবং পিছের অংশটাকে বলা হয় অক্সিপিটাল লোব। এই ব্রেনের প্রত্যেকটা অংশের আবার ভিন্ন ভিন্ন কাজ আছে।
[25:47]যেমন ব্রেনের সামনের যে অংশটা যেটাকে আমরা ফ্রন্টাল লোব বলি, সেটা আমাদের পার্সোনালিটি বা ব্যক্তিত্ব কি রকম হবে সেটা নির্ধারণ করে। কোনটা ভালো না, কোনটা খারাপ, কোনটা ঠিক না বেঠিক, সেটা নির্ধারণ করে হচ্ছে ফ্রন্টাল লোব। আমাদের অ্যাটেনশন, কোন কিছুতে মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা এটা হচ্ছে ফ্রন্টাল লোবের কাজ। আমাদের মেমোরি এটাও ফ্রন্টাল লোবের কাজ। টেম্পোরাল লোব যেটা আছে সেটা আবার আমাদের মেমোরির কাজ করে। আমাদের রেটিকুলার অ্যাক্টিভেটিং সিস্টেম বলে একটা সিস্টেম আছে যে, যেটা আমাদেরকে সজাগ রাখতে সহায়তা করে।
[26:44]আমাদের ইমোশন যেটা, লিম্বিক সিস্টেম বলে আমাদের একটা সিস্টেম আছে। অ্যামিগডালা বলে একটা অংশ আছে। এই সিস্টেম এবং অংশগুলো আমাদের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে। তো আমরা যেটা বুঝতে পারলাম যে, ব্রেনের বিভিন্ন অংশ মনের বিভিন্ন কাজ নিয়ন্ত্রণ করে। এর বাইরে যেই জিনিসটা রয়েছে সেটাকে বলা হয় নিউরোট্রান্সমিটার বলে একটা জিনিস রয়েছে। নিউরোট্রান্সমিটার হচ্ছে কিছু রাসায়নিক পদার্থ যেগুলো আমাদের স্নায়ু কোষ থেকে নিঃসৃত হয়। এই রাসায়নিক পদার্থগুলো আমাদের মনের কাজ বাড়িয়ে দেয় বা কমিয়ে দেয়। একভাবে নিয়ন্ত্রণ করে বা মডিফাই করার চেষ্টা করে। যেমন একটা নিউরোট্রান্সমিটার হচ্ছে ডোপামিন। আমরা যদি কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার খাই তাহলে আমাদের ব্রেনের মধ্যে ডোপামিন নিঃসৃত হয় এবং আমাদের মধ্যে ভালো লাগার অনুভূতি তৈরি হয়। কোন কারণে যদি ডোপামিন কমে যায় তাহলে আমরা আবার ডিপ্রেশনে ভুগি। সেরোটোনিন বলে একটা নিউরোট্রান্সমিটার রয়েছে। সেরোটোনিন আমাদের ঘুম নিয়ন্ত্রণ করে, আমাদের ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ করে, আমাদের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে। সেরোটোনিন যদি বেড়ে যায় তাহলে আমরা হ্যালুসিনেশন, হ্যালুসিনেশন হয়। সেরোটোনিন যদি কমে যায় তাহলে আমাদের মন খারাপ হয়, আমাদের অ্যাংজাইটি হয়। আমরা অনেক সময় রেগে যাই সেরোটোনিনের কারণে। অ্যাসিটালকোলিন বলে আরেকটা নিউরোট্রান্সমিটার আছে, যেটা আমাদের মেমোরির সাথে সম্পর্কযুক্ত, আমাদেরকে সজাগ রাখতে সহায়তা করে। এর পাশাপাশি গামা অ্যামাইনো বিউটারিক অ্যাসিড বা গাবা বলে একটা নিউরোট্রান্সমিটার আছে, যেটা আমাদের ঘুমাতে সাহায্য করে। তো এই নিউরোট্রান্সমিটার বা কেমিক্যালগুলো আমাদের মনের যে ফাংশন সেগুলোকে কমিয়ে দেয় বা বাড়িয়ে দেয়।
[29:20]তাহলে আমি যদি সামারাইজ করার চেষ্টা করি আজকের আলোচনাকে যে, মনকে আমরা একটা বাড়ির মতো চিন্তা করতে পারি। যে বাড়ির বিভিন্ন রুম থাকে ড্রইং রুম, ডাইনিং রুম, বেডরুম। প্রত্যেকটা রুমের হচ্ছে আলাদা আলাদা কাজ। আমাদের ব্রেনের বিভিন্ন অংশ রয়েছে। তো এই বিভিন্ন অংশগুলো আলাদা আলাদা কাজকে নিয়ন্ত্রণ করে বাড়ির রুমের মধ্যে। আর বাড়ির প্রত্যেকটা রুমের মধ্যে আবার আলো আসে বাতাস আসে, তাপ আসে। তো আলো বাতাস তাপ এগুলো একটা নির্দিষ্ট লেভেলে থাকতে হয়। যদি বেড়ে যায় সেটাও যে রকম ভালো না আবার কমে গেলেও ভালো না। একটা অপটিমাম বা এভারেজ লেভেলে সবসময় থাকতে হয়। তাহলে আলোচনা শুরু করেছিলাম যে, মন কাকে বলে, মনের বৈশিষ্ট্য কি, মনের সাথে আমাদের ব্রেইনের সম্পর্ক কি এটা নিয়ে। আমার মনে হয় যে আমি আপনাদেরকে মোটামুটি একটা ধারণা দিয়েছি। ভবিষ্যতে মনের যে বিভিন্ন ফাংশন আছে, সেটা নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করব। মনোযোগ দিয়ে এতক্ষণ শোনার জন্য আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ। আপনারা ভালো থাকবেন, আবার দেখা হবে ইনশাল্লাহ।



