[0:03]আজ থেকে প্রায় এক লাখ বছর আগে মানুষ প্রথম আফ্রিকা মহাদেশ ছেড়ে এশিয়া, ইউরোপ এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো বিশ্বের অন্যান্য স্থলভাগ গুলোয় বসতি স্থাপন শুরু করেছিল। বিজ্ঞানের ভাষায় প্রস্তর যুগ নামে পরিচিত ওই সময়ে বিভিন্ন গুহা আদিম মানুষের অভিবাসন প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কারণ ঝড় বা বৃষ্টির মত প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর রাতের অন্ধকারে হিংস্র প্রাণীর শিকারে পরিণত হওয়া থেকে বাঁচতে তখন এই গুহা গুলোই ছিল মানুষের একমাত্র আশ্রয়স্থল। কিন্তু কালের পরিক্রমায় আধুনিক মানুষের কাছে সেই গুহাগুলোর অধিকাংশই এখন অনাবষ্কৃত অবস্থায় রয়েছে। অবশ্য বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির অগ্রযাত্রার কল্যাণে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে নিয়মিতই নতুন নতুন গুহা আবিষ্কার করা হচ্ছে। যার ধারাবাহিকতায় মাত্র এক দশক আগে বিশ্বের বৃহত্তম গুহাটির খোঁজ পাওয়া যায়। এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত গুহাগুলোর মধ্যে উচ্চতা, দৈর্ঘ্য এবং আয়তনের হিসেবে বৃহত্তম এই গুহাটির অবস্থান ভিয়েতনামে। প্রতিবেশী লাউসের সাথে দেশটির সীমান্ত এলাকায় অবস্থিত কুয়াংবিন প্রদেশে বিদ্যমান এই গুহার ভেতর প্রথম মানুষের পদচিহ্ন পড়ে 2009 সালে। কারণ এই গুহার প্রবেশপথ এতটাই দুর্গম যে, একবিংশ শতকের আগে মানুষের কাছে এমন দুর্গম গুহায় প্রবেশ করার মতো উপযুক্ত প্রযুক্তি ছিল না। স্থানীয় ভাষায় এই গুহাটির নাম হাং সং দুং, যা বাংলা করলে দাঁড়ায় পাহাড়ি নদীর গুহা। 2020 সাল পর্যন্ত আবিষ্কৃত বিশ্বের বৃহত্তম গুহার খেতাবধারী হাং সং জুং সম্পর্কে আপনাদের বিস্তারিত জানাতে এই ভিডিওটি তৈরি করা হয়েছে। তাই চলুন আর দেরি না করে আদ্যপান্ত এই পর্বে ভিয়েতনামের অনন্য এই গুহাটি সম্পর্কে জেনে আসি। বর্তমানে ভিয়েতনাম লাউস সীমান্ত এলাকায় অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম গুহা হাং সং দুং এর সৃষ্টি হয়েছিল আনুমানিক 20 থেকে 50 লাখ বছর আগে। সৃষ্টির সময়কালে পুরো 30 লাখ বছরের তফাত থাকার কারণ এই ধরনের গুহা সৃষ্টির প্রক্রিয়া। বিজ্ঞানের ভাষায় এ ধরনের গুহাকে সলিউশনালকেইভ বলা হয়। কারণ পানিতে পাহাড়ের লাইমস্টোন বা চুনাপাথর দ্রবীভূত হওয়ার ফলে এ ধরনের গুহার সৃষ্টি হয়। সাধারণত বৃষ্টি বা নদীর পানির কারণে এমনটা হয়ে থাকে। ভূপৃষ্ঠের মাটি চুঁয়ে ভূগর্ভস্থ চুনাপাথরের স্তরে পৌঁছানোর আগে সেই পানিতে বাতাসের কার্বন ডাই অক্সাইড মিশ্রিত হয়। যার ফলে ওই পানির অম্লতা বেড়ে যায়। যাতে চুনাপাথর সহজেই দ্রবীভূত হয় এবং পাহাড়ের অভ্যন্তর ভাগ ক্ষয়ে এমন গুহার রূপ ধারণ করে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ করতে লাখ লাখ বছর সময় লেগে যায়। হাং সং দুং গুহাটির ক্ষেত্রে প্রায় 50 লাখ বছর আগে শুরু হওয়া এই প্রক্রিয়াটি শেষ হয়েছিল আনুমানিক 20 লাখ বছর আগে। অবশ্য যে চুনাপাথর দ্রবীভূত হয়ে বিশাল এই গুহার সৃষ্টি হয়েছে, তার বয়স কিন্তু 25 কোটি বছরেরও বেশি। হাং সং দুং গুহাটির আয়তন প্রায় 3 কোটি 85 লাখ ঘনমিটার। অর্থাৎ এটি আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত বিশ্বের বৃহত্তম গুহা হিসেবে পরিচিত মালয়েশিয়ার ডিয়ারকেইভ নামক গুহাটির আয়তন এর অর্ধেকও কম। গুহাটির দৈর্ঘ্য 5.6 মাইল বা 9 কিলোমিটারেরও বেশি। এর দৈর্ঘ্য জুড়ে গুহাটির গড় উচ্চতা 200 মিটার বা সাড়ে 600 ফুটের বেশি। তবে এর মেঝে থেকে ছাদের সর্বোচ্চ দূরত্ব 500 মিটার বা 1600 ফুটের বেশি। গুহাটির দুটো প্রবেশপথ বেশ দুর্গম হলেও ভেতরে এটি বেশ প্রশস্ত। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হাং সং দুং এর গড় প্রস্থ 150 মিটার বা প্রায় 500 ফুট। যে নদীর কারণে গুহাটির সৃষ্টি হয়েছিল সেটি এখনো এই গুহার ভেতরে প্রবাহিত হচ্ছে। কিছু জায়গায় এই নদীর স্রোত এত তীব্র যে কোন অবলম্বন ছাড়া তা পার হওয়া অসম্ভব। আবার গুহাটির কিছু জায়গায় এই নদী এতটাই শান্ত যে তা সুইমিং পুল হিসেবেও ব্যবহার করা সম্ভব। এই গুহার আরেকটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর ভেতর দুটো বিশাল সাইজের ডলিন রয়েছে। একটি ভূগর্ভস্থ গুহার ছাদের একাংশ কোন কারণে ধসে গিয়ে গুহাটির যে এলাকায় সূর্যের আলো এবং বৃষ্টির পানি সরাসরি প্রবেশ করতে পারে তাকে ডলিন বলা হয়। ভূগর্ভস্থ গুহাগুলোর জীববৈচিত্র্য বেশ সাদা মাটা হলেও এই ডলিনগুলোয় পাহাড়ি জীববৈচিত্র্যের দেখা পাওয়া যায়। সাধারণত ভূগর্ভস্থ গুহাগুলোর দৈর্ঘ্য 3 থেকে 4 কিলোমিটারের বেশি হয় না। কারণ দৈর্ঘ্যের সাথে সাথে গুহাটির ছাদের ভরও বাড়তে থাকে। ভেতরটা ফাঁপা হওয়ায় একটা নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যের পর গুহার দেয়ালের পক্ষে আর ছাদের সেই ভার বহন করা সম্ভব হয় না। অথচ ভিয়েতনামের এই হাং সং দুং গুহাটির দৈর্ঘ্য স্বাভাবিকের তুলনায় দুই গুণেরও বেশি। একাধিক পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়ে অবশেষে এই ব্যতিক্রমের কারণ খুঁজে পেয়েছেন গবেষকরা। হাং সং দুং এর রেকর্ডধারী দৈর্ঘ্যের কারণ মূলত এই গুহার খাড়া দেওয়াল। মেঝের সাথে সমকোণে দাঁড়িয়ে থাকায় এই দেওয়ালগুলো স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি ভার বহনে সক্ষম। এর ফলেই হাং সং দুং বিশ্বের বৃহত্তম গুহার খেতাব অর্জন করেছে। বর্তমানে ভিয়েতনামের একটি জাতীয় উদ্যানের অংশ এই গুহাটি প্রথম আবিষ্কার করেন স্থানীয় এক রাখাল। হোখান নামের সেই রাখাল 1990 সালের এক দুপুরে ঝড় বৃষ্টির সময় এই গুহার প্রবেশপথে আশ্রয় নেন। হোখানের ভাষ্য অনুযায়ী সেদিন তিনি গুহাটির ভেতর থেকে জোরালো গর্জন শুনতে পেয়েছিলেন। সেই সাথে একটু পর পর গুহার ভেতর থেকে মেঘের মতো কুয়াশাও বেরিয়ে আসছিল। সব মিলিয়ে ভয় পেয়ে যাওয়ায় ঝড়ের মধ্যেই ঘরে ফিরে আসেন হোখান। তারপর প্রায় দুই দশক ঐ গুহাটির কথা ভুলেই ছিলেন তিনি। এরপর 2009 সালে ব্রিটিশ কেইভ রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশন সেখানে বড় গুহার খোঁজে একটি সার্ভে করার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই খবর পেয়ে হোখান সার্ভেকারী দলের সদস্যদের সাথে দেখা করেন এবং 19 বছর আগে খুঁজে পাওয়া গুহাটির কথা তাদের জানান। হোখানের দেখানো পথ ধরেই সার্ভেকারী দলটি হাং সং দুং পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম হয়। ব্রিটিশ সেই সার্ভে দলের নেতৃত্বে ছিলেন হাওয়ার্ড লিমবার্ট। অভিজ্ঞ এই গুহাচরী এর আগেও একাধিক বড় গুহা সার্ভে করেছেন। 2009 সালে হাং সং দুং গুহায় তার প্রথম অভিযান দ্বিতীয় মুখের 1 কিলোমিটার আগেই থেমে যায়। কারণ সেখানে গুহাটির মেঝে থেকে 200 ফুটের বেশি উঁচু একটি নরম এবং পিচ্ছিল পাথরের দেওয়াল রয়েছে। ফ্লোস্টোন নামে পরিচিত এ ধরনের পাথর বেড়ে উঠতে গেলে তা খসে পড়ে যায়। তাই উপযুক্ত সরঞ্জাম ছাড়া এ ধরনের দেয়ালে চড়া সম্ভব হয় না। পরের বছরে আবার হাওয়ার্ড ও তার দল উপযুক্ত সরঞ্জাম সহ এই গুহায় ফিরে আসেন এবং পুরো গুহাটির সার্ভে সম্পন্ন করেন। সেই থেকে গত 10 বছর হাওয়ার্ড এই গুহাটি 100 বারের বেশি অতিক্রম করেছেন। এমনকি সেখানে পর্যটন ব্যবসার সাথেও তিনি সংশ্লিষ্ঠ জড়িয়ে গেছেন। হাং সং দুং গুহায় পর্যটন সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইলে ভিডিওটি শেষ পর্যন্ত দেখতে ভুলবেন না। হাওয়ার্ড লিম্বারটের দ্বিতীয় অভিযাত্রী দলের সদস্যদের মধ্যে একাধিক জীববিজ্ঞানীও ছিলেন। গুহাটির মধ্যে থাকা ডলিন দুটোই তারা বিপুল সংখ্যক উদ্ভিদ প্রজাতির সন্ধান পেয়েছেন। ভূগর্ভস্থ সেই জঙ্গলে বাইরে থেকে শুধু কয়েক প্রজাতির বানরই প্রবেশ করতে পারে। গুহার 200 মিটার উঁচু দেওয়াল বেয়ে উঠা নামা এসব বানরের জন্য কোন ব্যাপারই না। জঙ্গলের মেঝেতে ঘুরে বেড়ানো সুস্বাদু শামুকের খোঁজে প্রায়ই বানরগুলো এখানে আসে। আর এই জঙ্গলের স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির সরীসৃপ, বাদুড়, কাঠবিড়ালি, ইঁদুর এবং পাখি। এছাড়া প্রাণী জগতের নতুন সদস্য হিসেবেও কয়েকটি প্রজাতি আবিষ্কার করেছেন তারা। যার মধ্যে আছে মাছ, কাঁকড়াবিছা, চিংড়ি এবং কাঠওকোন। গুহার ভেতর অন্ধকারে স্থায়ীভাবে বসবাস করায় এদের প্রায় সবারই গায়ের রং স্বচ্ছ এবং অনেকেরই কোনো চোখ নেই। বিষয়টিকে অন্ধকার গুহায় বিবর্তনের স্বাভাবিক ফলাফল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। ভূপৃষ্ঠের এতটা গভীরে অবস্থান হওয়ায় আনসান্ড দুং গুহার ভেতরের আবহাওয়া ব্যবস্থাও বাইরে থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। অনেক সময় বাইরে আকাশ মেঘমুক্ত হলেও গুহার ভেতর বাড়তি আদ্রতার কারণে হাং সং দুং এর ছাদ মেঘে ঢাকা থাকে। 1990 সালের সেই ঝড়ের দুপুরে তেমন মেঘই বেরিয়ে আসতে দেখেছিলেন হোখান। ভূগর্ভস্থ এই মেঘের কারণে হাওয়ার্ড লিম্বারটের সার্ভেও বেশ কয়েক দফা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। 2019 সালে সে নতুন করে রেকর্ড গড়ে এই হাং সং দুং। পেশাদার ডুবুরির একটি দল ওই বছর এপ্রিল মাসে এই গুহায় অভিযানে অংশ নেয়। তারা আবিষ্কার করেন হাং সং দুং একটি ভূগর্ভস্থ সুরঙ্গের মাধ্যমে নিকটবর্তী হ্যাংথুং নামে আরেকটি গুহার সাথে সংযুক্ত। বছরের 12 মাসই অবশ্য এই সুরঙ্গটি পানিতে ডুবে থাকে। তাই পেশাদার ডুবুরি ছাড়া এটি আবিষ্কার সম্ভব ছিল না। নতুন এই গুহাটির সাথে সংযুক্ত হওয়ায় হাং সং দুং এর মোট আয়তন এখন প্রায় 4 কোটি ঘনমিটার। এত বড় হওয়া সত্ত্বেও হাং সং দুং আর বেশিদিন বিশ্বের বৃহত্তম গুহার খেতাবটি ধরে রাখতে পারবে না বলেই মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। স্যাটেলাইট প্রযুক্তির কল্যাণে এখন বড় গুহা আবিষ্কারের হার বেড়ে গেছে। এ কাজে জড়িতদের ধারণা অনুযায়ী দক্ষিণ আমেরিকার অ্যামাজন জঙ্গলের মধ্যে হাং সং দুং এর চাইতেও বড় গুহার অস্তিত্ব থাকার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। আবিষ্কারের চার বছর পর অর্থাৎ 2013 সাল থেকে গুহাটি পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ভিয়েতনামের আইন অনুযায়ী প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত চলা পর্যটন মৌসুমে সর্বোচ্চ 1000 পর্যটক এই গুহাতে প্রবেশ করতে পারেন। হাং সং দুং এর অনন্য পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে এমন সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এই গুহা পরিদর্শনে মাথাপিছু 3000 ডলারের মতো খরচ হবে। ধীরে ধীরে ভিয়েতনামের এই এলাকা পর্যটকপ্রিয় হয়ে উঠছে। যাদের চাহিদা মেটাতে ভিয়েতনাম সরকার গুহাটির ভেতর প্রায় 10.5 কিলোমিটার দীর্ঘ একটি কেবল লাইন স্থাপনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। প্রায় 20 কোটি ডলারের এই প্রকল্পটি অবশ্য পরিবেশবাদীদের প্রতিবাদের মুখে স্থগিত অবস্থায় আছে। প্রতিবাদকারীদের দাবি, যে যুক্তিতে প্রতি বছর 1000 এর বেশি পর্যটক ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না সেই একই যুক্তিতে এখানে কেবল লাইন স্থাপনও অনুচিত কাজ হবে। আগস্ট থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বর্ষা মৌসুম চলায় এই গুহায় প্রবেশ করা সম্ভব হয় না।

সবচেয়ে বড় গুহা হাং সন ডুং | পৃথিবীর ভেতর আরেক পৃথিবী | আদ্যোপান্ত | Hang Son Doong Cave Facts
ADYOPANTO
10m 15s1,353 words~7 min read
YouTube auto captions
Transcript source
YouTube auto captions
This transcript was extracted from YouTube's auto-generated caption track. The transcript below is server-rendered so it can be read, searched, cited, and shared without opening the original YouTube player.
Use this transcript
Related transcript hubs
Watch on YouTube
Share
MORE TRANSCRIPTS


