[0:02]বিশ্বের বৃহত্তম উষ্ণ মরুভূমির খেতাবটি আফ্রিকা মহাদেশে অবস্থিত সাহারা মরুভূমির দখলে রয়েছে। তবে সাহারা কিন্তু বিশ্বের বৃহত্তম মরুভূমি না। আয়তনের বিচারে এটি বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মরুভূমি। সাধারণত কোনো এলাকায় বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১০০ মিলিমিটারের কম হলে তাকে মরুভূমি বলা হয়। সেই হিসেবে বিশ্বের বৃহত্তম দুটি মরুভূমি যথাক্রমে দক্ষিণ এবং উত্তর মেরুতে বিদ্যমান। তাছাড়া এই সাহারা মরুভূমি আনুমানিক ২০ হাজার বছর আগেও সবুজে ছাওয়া একটি তৃণভূমি এবং বনাঞ্চল ছিল। বিশ্বের বৃহত্তম উষ্ণ মরুভূমি সম্পর্কে আপনাদের বিস্তারিত জানাতে এই ভিডিওটি তৈরি করা হয়েছে। সুপ্রিয় দর্শক, চলুন তবে আর দেরি না করে আদোপান্তরে এই পর্বে সাহারা মরুভূমি সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে আসি।
[0:58]আফ্রিকা মহাদেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এলাকা নিয়ে বিস্তৃত সাহারা মরুভূমি পূর্ব-পশ্চিমে ৪ হাজার ৮০০ কিলোমিটার বা ৩ হাজার মাইল লম্বা। আর উত্তর-দক্ষিণে এটি ১ হাজার ৮০০ কিলোমিটার বা ১ হাজার ১০০ মাইল চওড়া। সব মিলিয়ে সাহারা মরুভূমির আয়তন ৯২ লাখ বর্গকিলোমিটার বা ৩৬ লাখ বর্গমাইল। যা যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের আয়তনের সমান। এর সাথে বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ২৫০ মিলিমিটারের কম এমন এলাকা যোগ করা হলে পুরো সাহারা মরুভূমির আয়তন দাঁড়াবে ১ কোটি ১০ লাখ বর্গকিলোমিটার বা ৪২ লাখ বর্গমাইলে। ভৌগোলিকভাবে সাহারা মরুভূমি উত্তরে ভূমধ্যসাগর, পূর্বে লোহিতসাগর এবং পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগর দিয়ে ঘেরা। মরুভূমিটির দক্ষিণে নাইজার নদী বয়ে গেছে। আর রাজনৈতিক সীমানার বিচারে বর্তমানে ১০টি দেশ সাহারা মরুভূমির বিভিন্ন অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। এই দেশগুলো হচ্ছে আলজেরিয়া, চাদ, মিশর, লিবিয়া, মালি, মৌরিতানিয়া, নাইজার, ওয়েস্টার্ন সাহারা, সুদান এবং তিউনিশিয়া। দিগন্ত বিস্তৃত বালিয়াড়ি আর লু হাওয়ার জন্য সুপরিচিত এই মরুভূমির বালিয়াড়িগুলোর উচ্চতা প্রায় ২০০ মিটার বা সাড়ে ৬০০ ফুট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। অর্থাৎ এগুলো প্রায় ৬৫ তলা ভবনের সমান উচ্চ। এই মরুভূমিকে যাতায়াতের পথ হিসেবে ব্যবহারকারী বেদুঈনদের জন্য এমন বালিয়াড়ি অতিক্রম করা দৈনন্দিন কাজে পরিণত হয়েছে। তবে অনভ্যস্তদের জন্য বিষয়টি প্রাণঘাতীও হয়ে উঠতে পারে। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এই বালিয়াড়িগুলোর অবস্থান কিন্তু নির্দিষ্ট নয়। প্রচণ্ড ধুলিঝড়ের কারণে তৈরি হওয়া এই বালিয়াড়িগুলো ঝড়ো বাতাসে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে। তাই এই মরুভূমিকে ভৌগোলিকভাবে জীবন্ত বলা যেতে পারে। এই সাহারা মরুভূমির বালি বাতাসে ভেসে আটলান্টিক মহাসাগরও পাড়ি দেয় নিয়মিত। সুদূর দক্ষিণ আমেরিকায় অবস্থিত অ্যামাজন বনাঞ্চলের গাছপালার জন্য সার হিসেবে কাজ করে এই সাহারা মরুভূমির বালি। রোমাঞ্চকর বিভিন্ন চলচ্চিত্র এবং উপন্যাসের কল্যাণে সাহারা মরুভূমি পুরোপুরি বালুময় মনে হলেও বাস্তবতাটা চমকে ওঠার মতো। ভূতাত্ত্বিকদের গবেষণা অনুযায়ী, সাহারা মরুভূমির শতকরা মাত্র ৩০ ভাগ বালি দিয়ে গঠিত। বাকি ৭০ ভাগই পাথরে। মরুভূমিটির পূর্ব এবং পশ্চিম প্রান্তে উপকূলীয় এলাকাগুলো রীতিমতো পাহাড়ি বলা যায়। প্রাগৈতিহাসিক আমলে এই সাহারা মরুভূমি একসময় বিশাল এক সাগরের নিচেও ডুবে ছিল কয়েক লাখ বছর। বর্তমানে চাদ নামক দেশটির উত্তর প্রান্তে অবস্থিত টিবেস্টি পর্বতমালা অংশ হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকা এমি কউশি আগ্নেয়গিরিটি এই মরুভূমির সর্বোচ্চ বিন্দু। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এ আগ্নেয়গিরিটির উচ্চতা ৩ হাজার ৪১৫ মিটার বা প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার। মৃত এ আগ্নেয়গিরিটির পাদদেশে উষ্ণ পানির একাধিক ঝর্ণা রয়েছে। এগুলোকে পানির তাপমাত্রা থাকে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস এর মতো। যা গোসলের জন্য ভীষণ আরামদায়ক। এ ঝর্ণাগুলো তাই পর্যটকদের কাছে ভীষণ প্রিয়। সাহারা মরুভূমির তাপমাত্রা বেশ চড়া সেটা বলাই বাহুল্য। কিন্তু এখানে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা আর ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রার মধ্যে ফারাক শুনলে রীতিমতো আঁতকে উঠতে হয়। সাহারার গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস এর মধ্যে ওঠানামা করে। আর আনুষ্ঠানিকভাবে ধারণকৃত সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু এটা শুধু বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা। একে তো মরুভূমির আকাশ সারাবছরই ঝকঝকে এবং মেঘমুক্ত থাকে তার উপর ভূপৃষ্ঠের বালি সূর্যের তাপ বিকিরণে সিদ্ধহস্ত। যে কারণে এই মরুভূমির বিভিন্ন এলাকায় ভূপৃষ্ঠের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা প্রায় ৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করে। এখন পর্যন্ত ধারণকৃত ভূপৃষ্ঠের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা সাড়ে ৮৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যা এই সাহারা মরুভূমিতে অবস্থিত পোর্ট সুদানে পরিমাপ করা হয়। এর বিপরীতে বালি তাপ ধারণে দুর্বল হওয়ায় সূর্যাস্তের পর সাহারা মরুভূমির বিভিন্ন অঞ্চলের তাপমাত্রা দিনের তুলনায় ১৩ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে। সাহারায় দিনভর সূর্যের এই খরতাপের অসুবিধার পাশাপাশি সম্ভাবনাও রয়েছে প্রচুর। এই মরুভূমির অধিকাংশ এলাকা বছরে গড়ে ৩ হাজার ৬০০ ঘণ্টার বেশি সূর্যালোক পেয়ে থাকে। আর মরুভূমির পূর্বাঞ্চলে কিছু এলাকায় বছরে গড়ে ৪ হাজার ঘণ্টার বেশি সময় আকাশে সূর্য বিদ্যমান থাকে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় অংশ হিসেবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে পুরো বিশ্বই জীবাশ্ম জ্বালানির বদলে নবায়নযোগ্য মাধ্যম ব্যবহারে আগ্রহী হয়ে উঠছে। যার ধারাবাহিকতায় সৌরবিদ্যুৎ ক্রুমে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বিজ্ঞানীদের গবেষণা অনুযায়ী, সৌর প্যানেলের মাধ্যমে সাহারা মরুভূমির প্রতি বর্গমিটার এলাকা বছরে প্রায় ৩ হাজার কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম। অর্থাৎ, ১ কোটি বর্গ কিলোমিটারের বেশি আয়তনের এই মরুভূমি থেকে প্রতি বছরে কয়েক হাজার গিগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এই পরিমাণ বিদ্যুৎ পুরো বিশ্বের চাহিদা মেটাবে সহজেই। সেটাও আবার পরিবেশবান্ধব প্রক্রিয়ায়। তাই অনেকেই জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার যুদ্ধে এই সাহারা মরুভূমিকে মুখ্য অস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করছেন। তাপমাত্রার এই বর্ণনা শুনে অনেকের কাছে সাহারা মরুভূমিকে বসবাসের অযোগ্য মনে হতে পারে। এই ধারণাটা মানুষের ক্ষেত্রে সত্যি হলেও অন্য অনেক প্রজাতির প্রাণী এবং উদ্ভিদই এই সাহারা মরুভূমিতে জীবন ধারণ করছে। এই মরুভূমি অতিক্রমের সময় যে প্রাণীটি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়বে তা হলো উট। এই উটগুলো অধিকাংশই বন্য। আবার বেদুঈনদের পোশাক কিছু উটও চোখে পড়তে পারে। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য প্রাণীর মধ্যে সাহারা মরুভূমিতে শিয়াল এবং বিভিন্ন প্রজাতির গিরগিটি ও হরিণের বসবাস রয়েছে। এছাড়া সাহারান চিতা নামক এক প্রজাতির চিতাও এই মরুভূমিতে বসবাস করে। সাহারা মরুভূমির উদ্ভিদ জগতও কম বিচিত্র নয়। বিজ্ঞানীদের গবেষণা অনুযায়ী, এখানে বিভিন্ন প্রজাতির ক্যাকটাস সহ প্রায় ৩ হাজার প্রজাতির উদ্ভিদ জীবন ধারণ করে যাচ্ছে। তাছাড়া এই সাহারা মরুভূমিতে সুদীর্ঘকাল ধরেই মানুষেরও বসবাস রয়েছে। এদের মধ্যে আদিবাসী কিছু গোত্রের সদস্যরা কয়েক হাজার বছর ধরে বংশপরম্পরায় এই সাহারা মরুভূমির বুকে যাযাবরের মতো জীবনযাপন করে আসছে। ইতিহাস অনুযায়ী ফিনিশীয় সভ্যতার মানুষজন প্রায় ৩ হাজার বছর আগে ভূমধ্যসাগরের পূর্ব উপকূল থেকে দক্ষিণ উপকূলে অভিবাসনে বাধ্য হয়েছিলেন। বিজ্ঞানীদের মাঝে এই অভিবাসনের কারণ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ দাবি করেন, বহিঃশত্রুর হামলার কারণেই এই ঘটনা ঘটেছিল। আবার কারো দাবি অনুযায়ী, ভূমধ্যসাগরের পূর্ব উপকূলের জলবায়ুতে বিশাল পরিবর্তন আসাতেই অভিবাসনে বাধ্য হয়েছিলেন ফিনিশীয়রা। উত্তর আফ্রিকার তিউনিশিয়া, আলজেরিয়া এবং মরক্কোর ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল জুড়ে একাধিক জনপদ স্থাপন করে ফিনিশীয় অভিবাসীরা। এই জনপদগুলো সামষ্টিকভাবে কার্থেজীয় সভ্যতা নামে পরিচিত। এই কার্থেজ সভ্যতার মানুষদের নাম বারবার। স্থানীয় এই আদিবাসী মানুষগুলো এখনো উত্তর আফ্রিকার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী হিসেবে টিকে আছে। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, ডিএনএ গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এই বারবার বংশোদ্ভূতদের সাথে উত্তর মেরুবৃত্তের ভেতর বসবাসকারী সামি জনগোষ্ঠীর বেশ মিল খুঁজে পেয়েছেন। তাই তাদের ধারণা মেরুবৃত্তের ভেতর বসবাসকারী মানুষদের পূর্বসূরিরা এই উত্তর আফ্রিকা থেকেই তাদের উত্তরমুখী যাত্রা শুরু করেছিলেন। কয়েক হাজার বছর আগের সেই অভিযাত্রীরা সম্ভবত মরক্কোর উপকূলে অবস্থিত স্ট্রেট অব জিব্রাল্টার পেরিয়েই ইউরোপে প্রবেশ করেছিলেন। এই বারবার আদিবাসীদের মধ্যে তোয়ারেগরা সংখ্যায় বেশি।
[8:37]বর্তমান দক্ষিণ আলজেরিয়া, দক্ষিণ-পশ্চিম লিবিয়া, নাইজার, মালি এবং বুরকিনা ফাসোর বিভিন্ন অংশে এই আদিবাসীরা বসবাস করে আসছেন। পশুপালক ও যাযাবর তুবু সম্প্রদায় ছাড়াও নুবিয়ান, হাউজা, বেজা এবং কানুরির মতো বেশ কিছু আদিবাসী গোত্রের মানুষের বাস রয়েছে এই সাহারা মরুভূমির বুকে। সাহারার বুকে বয়ে চলা নদী বা জলাশয়গুলোর বেশিরভাগই সাময়িক। অর্থাৎ শুধুমাত্র পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হলে কেবল এসব জলধারাগুলোর সৃষ্টি হয়। তবে এর ব্যতিক্রম বলা যায় আফ্রিকা মহাদেশের উত্তর-পূর্ব প্রান্ত দিয়ে বয়ে চলা জলধারা নীলনদকে। ভিক্টোরিয়া রদে উৎপন্ন হয়ে দীর্ঘ ৬ হাজার ৬৫০ কিলোমিটার বা ৪ হাজার ১৩০ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে এই জলধারা ভূমধ্যসাগরে এসে মিলিত হয়েছে। এই নদটি মূলত দুটো জলধারার সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে। ভিক্টোরিয়া লেকে উৎপন্ন অংশটির নাম হোয়াইট নাইল। আর তানা রদে উৎপন্ন অংশটির নাম ব্লু নাইল। সাধারণত নীলনদ নামটা শুনলেই চোখের সামনে মিশরের দৃশ্য ভেসে উঠতে পারে। তবে এ জলধারাটি মিশর ছাড়াও আরও ১০টি দেশের মধ্য দিয়ে বয়ে চলেছে। তাই এই নদটি আন্তর্জাতিক জলধারা হিসেবেই বিবেচিত হয়। এই দশটি দেশ হচ্ছে তানজানিয়া, উগান্ডা, রুয়ান্ডা, বুরুন্ডি, কঙ্গো, কেনিয়া, ইথিওপিয়া, ইরিত্রিয়া, দক্ষিণ সুদান এবং রিপাবলিক অব সুদান। শুনে আশ্চর্য হতে পারেন যে এই সাহারা মরুভূমিতেও কিন্তু মাঝেমধ্যে তুষারপাতের মতো ঘটনা ঘটে। বিশেষ করে মরুভূমির উঁচু পার্বত্য এলাকায় প্রায়ই তুষারপাত হয়। তবে ১৯৭৯ সালে আলজেরিয়ার সাহারা মরুভূমিতে তুষারপাতের রেকর্ড রয়েছে। ২০১২, ১৬ এবং ১৮ সালেও এখানে তুষারপাত হয়েছে বলে জানা যায়। সাহারা মরুভূমির আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সিরোকো বায়ুপ্রবাহ। সাধারণত মার্চ এবং নভেম্বর মাসে সাহারা মরুভূমিতে উৎপন্ন এই সিরোকো বায়ুপ্রবাহের গতি ঘণ্টা ১০০ কিলোমিটার বা ৬৫ মাইল ছাড়িয়ে যায়। এর ফলে আফ্রিকার উত্তর উপকূলীয় অঞ্চলগুলো তীব্র গরম এবং বালি ঝড়ের কবলে পড়ে। এই তীব্র সিরোকো বায়ুপ্রবাহ একদিন থেকে কয়েকদিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো এই সাহারা মরুভূমি মাত্র ২০ হাজার বছর আগেও সবুজে ছাওয়া এক বিস্তীর্ণ তৃণভূমি ছিল। এখন থেকে ১৫ হাজার বছর পর অর্থাৎ ১৭ হাজার সাল নাগাদ আবারও এই মরুভূমিটি তৃণভূমির রূপ ধারণ করবে। বিজ্ঞানীদের গবেষণা অনুযায়ী, পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণের সময় ২৩.৪ ডিগ্রি হেলে থাকে। কিন্তু এই হেলে থাকার দিকটি প্রতি ৪১ হাজার বছর পর পর পাল্টে যায়। যার ধারাবাহিকতায় পুরো উত্তর আফ্রিকার ঋতুচক্রে বিশাল পরিবর্তন সূচিত হয়। ফলে সাহারা এলাকায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এ কারণে একসময় সাহারা তৃণভূমি ছিল এবং একসময় আবারও তৃণভূমিতে পরিণত হবে। বর্তমানে মরুভূমি হিসেবে চিহ্নিত হলেও সাহারা মরুভূমির বিভিন্ন এলাকায় এখনো প্রায় দুই ডজন রদ রয়েছে। তবে এর মধ্যে লেক চাদ ছাড়া বাকি সবগুলোর রদের পানি লবণাক্ত। কারণ কয়েক লাখ বছর আগে পুরো সাহারা মরুভূমি সাগরের তলায় ডুবে ছিল। ওই সাগরের টিকে থাকা অংশগুলোই বর্তমানে রদ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। এই রদগুলো ছাড়াও সাহারা মরুভূমির বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৯০টি মরুদ্যান রয়েছে। বেঁধুয়ীনদের কাছে সুপরিচিত এই মরুদ্যানের ঝর্ণা বা পানির কুপ কেন্দ্র করে ছোট আকারের তৃণভূমি চোখে পড়বে সাহারার বিভিন্ন এলাকায়। মরুভূমিতে পানির এত উৎস রয়েছে শুনে আবার সাহারার বুকে অভিযাত্রায় বেরিয়ে পড়বেন না আশা করি। কারণ পানির উৎসগুলো ৩৬ লাখ বর্গমাইল এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তাই সুনির্দিষ্ট অবস্থান জানা না থাকলে আপনার পথ হারাবার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে। যার পরিণতি নির্ঘাত মৃত্যু। জীববিজ্ঞানীরা যেমন এই সাহারা মরুভূমির বুকে বর্ণিল জীববৈচিত্র্যের সন্ধান পেয়েছেন, তেমনি প্রত্নতাত্ত্বিকদেরও খালি হাতে ফেরায়নি এই মরুভূমি। এখানে তারা ৬ হাজার বছরের পুরনো বৃত্তাকার স্থাপনা খুঁজে পেয়েছেন। মানুষের তৈরি এই স্থাপনাগুলো সম্ভবত বিভিন্ন গোত্রের ধর্মীয় আচারে ব্যবহৃত হতো। এছাড়া এখানে পাথরের গায়ে প্রাচীন বহু চিত্রকর্মে খুঁজে পেয়েছেন তারা। এছাড়া সাহারা মরুভূমির বিভিন্ন এলাকায় বিপুল সংখ্যক প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর ফসিলও খুঁজে পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ডাইনোসরের ফসিলের সংখ্যাও কম না। গত বছরও সাহারার একটি মরুদ্যান সংলগ্ন এলাকা থেকে ৮ কোটি বছরের পুরনো একটি ডাইনোসরের ফসিল উদ্ধার করেন বিজ্ঞানীরা। তারা এই ডাইনোসর প্রজাতিটির নাম দিয়েছেন মনসুরাসোরা সাহিনী। তাদের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, এই ডাইনোসরটি ৩৩ ফুট লম্বা ছিল আর ওজন ছিল সাড়ে ৫ টন। এই সাহারা মরুভূমির একটি অংশও কিন্তু স্টার ওয়ার্স মুভি সিরিজের কল্যাণে বেশ জনপ্রিয়। তিউনিশিয়ার অন্তর্ভুক্ত সাহারার এই অংশটি একাধিকবার স্টার ওয়ার্স সিরিজের বিভিন্ন পর্বে শুটিং এ ব্যবহার করেছেন সিরিজের পরিচালক জর্জ লুকাস। যৌবনের তিউনিশিয়া সফরের সময় বারবারদের একটি জনপদ লুকাসের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। চ্যাটুইন নামক এই জনপদটিই পরবর্তী সময়ে লুকাস তার মুভির নায়ক লিউক স্কাইওয়াকারের জন্মস্থান হিসেবে ব্যবহার করেন। মুভিটি মুক্তি পাবার পর তিন দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো এই সেটগুলো দেখতে যাওয়া সম্ভব। যদিও অনেকগুলো সেটই উপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে গেছে।



