Thumbnail for পারমাণবিক সাবমেরিন কী? কীভাবে কাজ করে ?| আদ্যোপান্ত | How Nuclear Submarines Work by ADYOPANTO

পারমাণবিক সাবমেরিন কী? কীভাবে কাজ করে ?| আদ্যোপান্ত | How Nuclear Submarines Work

ADYOPANTO

14m 6s1,671 words~9 min read
Auto-Generated

[0:00]গভীর সমুদ্রের শীতল অন্ধকার জগতে মাসের পর মাস ধরে নিঃশব্দে ঘুরে বেড়ায় এক অকল্পনীয় শক্তির শিকারী। জ্বালানির জন্য একে কোনো বন্দরে ভেরার প্রয়োজন হয় না, বাতাসের জন্য প্রয়োজন হয় না ভেসে ওঠার। এটি নিউক্লিয়ার সাবমেরিন। স্নায়ুযুদ্ধের চূড়ান্ত প্রযুক্তি এবং আধুনিক সমন্বিতির সবচেয়ে গোপন শক্তিশালী স্তম্ভ। এই সাবমেরিনগুলো কি পারমাণবিক বোমা বহনকারী? নাকি এগুলো শুধুমাত্র পারমাণবিক শক্তিচালিত? এ দুটির মধ্যে পার্থক্যটি বিশাল এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিভাবে একটি ছোট পারমাণবিক চুল্লীকে একটি ডুবন্ত জাহাজের পেটের ভেতর বসানো হয় এবং কিভাবে এই প্রযুক্তি নৌযুদ্ধের ইতিহাসকে চিরদিনের জন্য বদলে দিয়েছে? আদ্যপান্তের আজকের পর্বে আমরা জানবো পারমাণবিক সাবমেরিন গভীর সমুদ্রের এক নীরব শিকারীর গল্প, যা আধুনিক বিশ্বের ক্ষমতার ভারসাম্যকে নিয়ন্ত্রণ করে। সমুদ্রের গভীর থেকে আক্রমণ হাজার হাজার বছর ধরে সমুদ্রের উপর আধিপত্য বিস্তার করা ছিল বিশ্বজুড়ে ক্ষমতা দখলের অন্যতম প্রধান একটি উপায়। ব্রিটেন, ফ্রান্স, স্পেইন, পর্তুগাল এবং নেদারল্যান্ডসের মত দেশগুলো বাণিজ্য পথ নিয়ন্ত্রণ, নিজেদের জাহাজ রক্ষা এবং উপনিবেশ বিস্তারের জন্য শত শত বছর ধরে গভীর সমুদ্রে যুদ্ধ করেছে। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতার সামনে অন্য সব দেশই ছিল অসহায়। এই ক্ষমতার ভারসাম্যকে চ্যালেঞ্জ করার জন্যই জন্ম নেয় এক নতুন ধারণা। সমুদ্রের গভীর থেকে লুকিয়ে আক্রমণ করা। যদিও লিওনার্দো দা ভিঞ্চি ১৫১৫ সালের দিকেই একটি আদিম সাবমেরিনের নকশা এঁকেছিলেন এবং ১৫৭৮ সালে উইলিয়াম বোর্ন একটি ডুবন্ত যানের প্রথম নকশা তৈরি করেন। তবে প্রথম সফল সাবমেরিনটি তৈরি হয় ১৬২০ সালে করনেলিয়াস ড্রেবেলের হাত ধরে, যা টেমস নদীতে তিন ঘন্টার এক সফল যাত্রা সম্পন্ন করেছিল। ১৭২৭ সালের মধ্যে অন্তত ১৪টি ভিন্ন ভিন্ন সাবমেরিনের ডিজাইন প্যাটেন্ট করা হয়েছিল। এই প্রাথমিক ডিজাইনগুলো ছিল মূলত কাঠ এবং তেল শিকত চামড়া দিয়ে তৈরি আত্মঘাতী টিউব, যা একজন ব্যক্তি হাত দিয়ে ক্র্যাঙ্ক ঘুরিয়ে চালাতো। প্রথম সামরিক সাবমেরিনটি তৈরি করেন আমেরিকান উদ্ভাবক ডেভিড বুশনেল ১৭৭৫ সালে আমেরিকান বিপ্লবের সময়। দা টার্টল নামের এই সাবমেরিনটি ১৭৭৬ সালের ৭ই জুলাই এটি ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজের নিচে গিয়ে বিস্ফোরক লাগানোর চেষ্টা করে। কিন্তু জাহাজের গায়ে স্ক্রু দিয়ে বিস্ফোরক লাগাতে ব্যর্থ হয়। এটি প্রমাণ করে যে, পানির নিচে একটি কার্যকর অস্ত্র ব্যবস্থা তৈরি কতটা কঠিন। শুরুর দিকের সাবমেরিনগুলোর প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল দুটি- গতি এবং অস্ত্র। হাত দিয়ে চালানো এই যানগুলো যুদ্ধ জাহাজের গতির সাথে পাল্লা দিতে পারতো না আর জাহাজের গায়ে বিস্ফোরক লাগানো ছিল এক অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। ১৮৬৪ সালে আমেরিকান গৃহযুদ্ধের সময় কনফেডারেটদের সাবমেরিন এইচএল হানলি সফলভাবে একটি মার্কিন যুদ্ধ জাহাজকে ডুবিয়ে দেয়। কিন্তু বিস্ফোরণের অভিঘাতে হানলি নিজে ও তার আটজন ক্রু সহ ডুবে যান। ডিজেল এবং বিদ্যুতের যুগ ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে সাবমেরিনের প্রযুক্তিতে এক বড় পরিবর্তন আসে। ১৮৬৬ সালে স্পেনের নার্সিস মন্তুরিওল বিশ্বের প্রথম বাষ্পচালিত সাবমেরিন ইক্তেনিয়ো টু সফলভাবে তৈরি করেন।

[3:33]এটি ছিল এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ, কারণ আধুনিক পারমাণবিক সাবমেরিনগুলো আদোতে বাষ্পের শক্তি দিয়েই চলে। তবে আসল বিপ্লবটি আসে ডিজেল ইলেকট্রিক হাইব্রিড সিস্টেমের মাধ্যমে। এই সাবমেরিনগুলো যখন সমুদ্রের উপরে থাকতো তখন ডিজেল ইঞ্জিন ব্যবহার করতো এবং একই সাথে ব্যাটারি চার্জ করতো। আর যখন পানির নিচে যেতো তখন তারা নিঃশব্দ ইলেকট্রিক মোটরের উপর চলতো। এই পদ্ধতিটি পানির নিচে মূল্যবান অক্সিজেন বাঁচাতো এবং সাবমেরিনকে অনেক বেশি সময় ধরে লুকিয়ে থাকতে সাহায্য করতো। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সাবমেরিন একটি ভয়ঙ্কর অস্ত্রে পরিণত হয়। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির নাৎসি ইউবোটগুলো মিত্রশক্তির জন্য এক বিভীষিকা হয়ে দাঁড়ায়। এই ইউবোটগুলোতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি ছিল। একটি হলো উন্নত স্ট্রিমলাইনড হাল বা কাঠামো, যা তাদের দ্রুত গতিতে চলতে সাহায্য করতো এবং অন্যটি হলো স্নরকেল। যা ছিল দুটি পাইপ, যা সাবমেরিনকে পানির নিচে থাকা অবস্থাতেই ডিজেল ইঞ্জিন চালানোর জন্য বাতাস নিতে এবং দূষিত বাতাস বের করে দিতে সাহায্য করতো। যুদ্ধের পর আমেরিকা এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয়ই এই উন্নত জার্মান ইউবোটের নকশা নিয়ে গবেষণা শুরু করে এবং নিজেদের সাবমেরিনগুলোকে আরো উন্নত করে তোলে।

[4:47]এই ডিজেল ইলেকট্রিক সাবমেরিনগুলো এতটাই কার্যকর এবং কম খরচের যে আজও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নৌবাহিনীতে এর আধুনিক সংস্করণ ব্যবহৃত হয়। পারমাণবিক বিপ্লব ইউএসএস নটিলাস দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন নৌবাহিনী এক নতুন এবং দুঃসাহসিক ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করে, যা নৌযুদ্ধের ইতিহাসকে চিরদিনের জন্য বদলে দেয়। ১৯৩৯ সালে মার্কিন নেভাল রিসার্চ ল্যাবরেটরির পদার্থবিদ রস গান প্রথম পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করে সাবমেরিন চালানোর ধারণাটি প্রস্তাব করেন। এই অসম্ভবকে সম্ভব করার দায়িত্ব নেন ক্যাপ্টেন হাইম্যান জি রিকওভার, যাকে মার্কিন পারমাণবিক নৌবাহিনীর জনক বলা হয়। তার নেতৃত্বে ১৯৫১ সালের জুলাই মাসে মার্কিন কংগ্রেস বিশ্বের প্রথম পারমাণবিক সাবমেরিন তৈরির অনুমোদন দেয়। ১৯৫৪ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বর ফার্স্ট লেডি ম্যামি আইজেনহাওয়ারের হাত ধরে বিশ্বের প্রথম পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন ইউএসএস নটিলাস তার যাত্রা শুরু করে। নটিলাস ছিল এক প্রযুক্তিগত বিপ্লব। এর সুবিধাগুলো ছিল অকল্পনীয়। প্রথমত, সীমাহীন পাল্লা। ডিজেল ইলেকট্রিক সাবমেরিনের যেখানে কয়েকদিন পর পরই ব্যাটারি চার্জ করার জন্য ভেসে উঠতে হতো, সেখানে নটিলাসের পারমাণবিক জ্বালানি প্রায় ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলতে পারতো। এর পাল্লা ছিল কার্যত সীমাহীন।

[6:06]দ্বিতীয়ত, দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকার ক্ষমতা। পারমাণবিক বিক্রিয়ার জন্য বাতাসের প্রয়োজন হয় না। এর ফলে নটিলাস মাসের পর মাস পানির গভীরে লুকিয়ে থাকতে পারতো। জাহাজে থাকা খাবার এবং অন্যান্য রসদ ফুরিয়ে যাওয়াই ছিল এর একমাত্র সীমাবদ্ধতা। এরপর রয়েছে গতি এবং গভীরতা। পারমাণবিক চুল্লী দ্বারা উৎপাদিত শক্তি নটিলাসকে উচ্চ গতিতে দীর্ঘ সময় ধরে চলার ক্ষমতা দিত। নটিলাসের সবচেয়ে ঐতিহাসিক মুহূর্তটি আসে ১৯৫৮ সালের ৩ আগস্ট, যখন এটি বিশ্বের প্রথম চলযান হিসেবে উত্তর মেরুর বরফের নিচ দিয়ে সফলভাবে যাত্রা করে। এটি প্রমাণ করে যে পারমাণবিক সাবমেরিন পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে যেকোনো পরিস্থিতিতে পৌঁছাতে সক্ষম। নটিলাসের এই সাফল্যে আতঙ্কিত হয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নও দ্রুত তাদের নিজস্ব পারমাণবিক সাবমেরিন তৈরির কাজ শুরু করে। ১৯৫৮ সালে তারা তাদের প্রথম পারমাণবিক সাবমেরিন কে থ্রি লেনিনস্কি কমসমোল তৈরি করে। তবে তাদের প্রাথমিক সাবমেরিনগুলো যেমন কে নাইনটিন, যা দা উইডো মেকার নামে কুখ্যাত ছিল বিভিন্ন যান্ত্রিক ত্রুটি এবং মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিল। কিভাবে কাজ করে পারমাণবিক সাবমেরিন? একটি পারমাণবিক সাবমেরিন আদোতে একটি জটিল বাষ্পীয় ইঞ্জিন।

[7:26]এর মূল চালিকা শক্তি হলো একটি ছোট আকারের পারমাণবিক চুল্লী বা রিঅ্যাক্টর, যা সাধারণত সাবমেরিনের পেছনের অংশে বসানো থাকে। নিউক্লিয়ার সাবমেরিনের রিঅ্যাক্টরের কেন্দ্রে রয়েছে নিউক্লিয়ার ফিশন বা পারমাণবিক বিভাজন প্রক্রিয়া। সাবমেরিনের চুল্লিতে জ্বালানি হিসেবে সাধারণত ইউরেনিয়াম ব্যবহার করা হয়। প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামের মধ্যে থাকা একটি বিশেষ আইসোটোপ ইউরেনিয়াম ২৩৫। এই বিক্রিয়ার ফলে যে প্রচুর পরিমাণ শক্তি নির্গত হয় তা মূলত তাপ শক্তি। একটি বদ্ধ কয়েলের ভেতর থাকা পানিকে এই তাপ ব্যবহার করে প্রচন্ড চাপে রেখে উত্তপ্ত করা হয়, যা ফুটতে পারে না। এই অতিউত্তপ্ত পানিকে এরপর একটি দ্বিতীয় পানির উৎসের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত করা হয়, যা তাৎক্ষণিকভাবে বাষ্পে পরিণত হয়। এই বাষ্প টার্বাইনকে ঘুরায়, যা জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে এবং সাবমেরিনের প্রপেলারকে চালায়। এই পুরো প্রক্রিয়াটির জন্য কোনো অক্সিজেনের প্রয়োজন হয় না, যা সাবমেরিনকে মাসের পর মাস পানির নিচে থাকতে সাহায্য করে। এছাড়া রিঅ্যাক্টর থেকে উৎপন্ন বিদ্যুৎ গোটা সাবমেরিনের বিদ্যুতের যোগান নিশ্চিত করে। একটি পারমাণবিক সাবমেরিনের দুটি হাল বা কাঠামো থাকে। ভেতরের হালটি অত্যন্ত শক্তিশালী এইচ ওয়াই এইটি স্টিল দিয়ে তৈরি, যা গভীর সমুদ্রের প্রচন্ড চাপ থেকে ক্রুদের রক্ষা করে। আর বাইরের হালটি সাবমেরিনকে একটি স্ট্রিমলাইন আকার দেয়। এর উপরে থাকা সেইল অংশে পেরিস্কোপ, রেডার এবং যোগাযোগের অ্যান্টেনা থাকে। ব্যালাস্ট ট্যাংকে পানি ঢুকিয়ে বা বের করে সাবমেরিনের গভীরতা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এসএসএন বনাম এসএসবিএন

[9:07]স্নায়ুযুদ্ধের সময় মার্কিন নৌবাহিনী দুই ধরনের পারমাণবিক সাবমেরিন তৈরি করেছিল, যাদের কাজ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রথমত, এসএসএন বা অ্যাটাক সাবমেরিন। এদেরকে ফার্স্ট অ্যাটাক সাবমেরিনও বলা হয়। এগুলো আকারে কিছুটা ছোট, প্রায় ৩৬০ ফুটের মতো হয়, কিন্তু অত্যন্ত দ্রুতগতির এবং নিঃশব্দ। এদের প্রধান কাজ হলো শত্রুপক্ষের সাবমেরিন এবং যুদ্ধ জাহাজকে খুঁজে বের করে ধ্বংস করা। নিজেদের বিমানবাহী রণতরিগুলোকে সুরক্ষা দেয়া এবং নেভী সীলের মতো বিশেষ বাহিনীকে শত্রুপক্ষের উপকূলে গোপনে পৌঁছে দেয়া। এদের অস্ত্রাগারে থাকে এমকে ফোরটিএইট টরপেডো এবং টমাহক ক্রুজ মিসাইল, যা দূরবর্তী স্থানেও নির্ভুলভাবে আঘাত আনতে পারে। দ্বিতীয়ত, এসএসবিএন বা ব্যালিস্টিক মিসাইল সাবমেরিন। সংক্ষেপে এদেরকে বুমার বলা হয়। এগুলো বিশাল আকারের প্রায় ৫৬০ ফুটের মতো লম্বা এবং এদের প্রধান কাজ হলো কৌশলগত প্রতিরোধ বা স্ট্র্যাটেজিক ডেটারেন্স। এরা পারমাণবিক বোমা বহনকারী ব্যালিস্টিক মিসাইল নিয়ে সমুদ্রের গভীরে মাসের পর মাস লুকিয়ে থাকে। এদের উদ্দেশ্য হলো, যদি কোনো দেশ আমেরিকার উপর পারমাণবিক হামলা চালায়, তবে এই সাবমেরিনগুলো পাল্টা পারমাণবিক হামলা চালিয়ে সেই দেশকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেবে। এই মিউচুয়াল এসিউড ডেস্ট্রাকশন বা পারস্পরিক নিশ্চিত ধ্বংসের ভয়েই স্নায়ুযুদ্ধের সময় দুই পক্ষকে সরাসরি যুদ্ধ থেকে বিরত রেখেছিল। এই এসএসবিএনগুলো প্রথমে পোলারিস, পরে পোজাইডন এবং বর্তমানে ট্রাইডেন্ট টু নামক সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ব্যালিস্টিক মিসাইল বহন করে। প্রতিটি ট্রাইডেন্ট টু মিসাইল ৪০০০ নটিক্যাল মাইলেরও বেশি দূরে যেতে পারে এবং একাধিক পারমাণবিক ওয়ারহেড বহন করতে পারে। ভবিষ্যতের প্রযুক্তি বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীতে মোট ৭১টি সাবমেরিন রয়েছে, যা সবগুলোই পারমাণবিক শক্তিচালিত। এদের মধ্যে রয়েছে ওয়াহাইও ক্লাস সাবমেরিন। ১৪টি ওয়াহাইও ক্লাস এসএসবিএন মার্কিন পারমাণবিক ট্রায়াডের সামুদ্রিক অংশ হিসেবে কাজ করে। আরো চারটি ওয়াহাইও ক্লাসকে এসএসজিএন বা গাইডেড মিসাইল সাবমেরিনে রূপান্তরিত করা হয়েছে, যা ১৫৪টি টমাহক ক্রুজ মিসাইল বহন করতে পারে। লস অ্যাঞ্জেলেস ক্লাস সাবমেরিন। প্রায় ৩৪টি লস অ্যাঞ্জেলেস ক্লাস এসএসএন মার্কিন সাবমেরিন বহরের মেরুদন্ড হিসেবে বিবেচিত হয়। সিউলফ ক্লাস সাবমেরিন। মাত্র তিনটি সিউলফ ক্লাস সাবমেরিন রয়েছে, যেগুলো অত্যন্ত দ্রুত এবং নিঃশব্দ, কিন্তু বেশ ব্যয়বহুল। ভার্জিনিয়া ক্লাস সাবমেরিন। ২২টি ভার্জিনিয়া ক্লাস সাবমেরিন হলো নতুন প্রজন্মের এসএসএন, যা উপকূলীয় এবং গভীর সমুদ্রে সমানভাবে কার্যকর। ভবিষ্যতে মার্কিন নৌবাহিনী ওয়াহাইও ক্লাসকে প্রতিস্থাপন করার জন্য আরো উন্নত এবং নিঃশব্দ কলম্বিয়া ক্লাস সাবমেরিন তৈরি করছে। এগুলোতে মেকানিক্যাল সিস্টেমের পরিবর্তে ইলেকট্রিক ড্রাইভ প্রপারশন সিস্টেম থাকবে, যা এদেরকে আরো বেশি লুকিয়ে থাকতে সাহায্য করবে। প্রথম কলম্বিয়া ক্লাস সাবমেরিনটি ২০৩১ সাল নাগাদ তার প্রথম যাত্রা শুরু করবে বলে আশা করা হচ্ছে। নাবিকের জীবন একটি পারমাণবিক সাবমেরিনের জীবনযাত্রা সবার জন্য নয়। সাবমেরিনের একজন নাবিককে কঠোর শারীরিক এবং মানসিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সাবমেরিনের ভেতর জীবনযাত্রা অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত। একটি দিন হয় ১৮ ঘন্টার, যা তিনটি ছয় ঘন্টার শিফটে বিভক্ত। ঘুমানোর জন্য বাঙগুলো একটির উপর আরেকটি সাজানো থাকে এবং জায়গা এতটাই কম যে দুজন নাবিককে অনেক সময় একই বাংক ভাগ করে নিতে হয়, যাকে হট-বাংকিং বলা হয়। একটি সাবমেরিনের জীবনকাল প্রায় ২৫ থেকে ৩০ বছর। এরপর এর কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে এবং এটি পরিচালনা করা দারুণ ব্যয়বহুল হয়ে যায়। পারমাণবিক সাবমেরিনকে নিষ্ক্রিয় করা বা ডিকমিশনিং একটি অত্যন্ত জটিল এবং ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া। এর পারমাণবিক চুল্লী থেকে জ্বালানি বের করে তেজস্ক্রিয় অংশগুলোকে সাবধানে কেটে আলাদা করতে হয় এবং বিশেষ স্থানে মাটির নিচে পুঁতে ফেলতে হয়। পারমাণবিক সাবমেরিন হলো মানব প্রকৌশলের এক চূড়ান্ত নিদর্শন। ডেভিড বুশনেলের কাঠ এবং চামড়ার টার্টল থেকে শুরু করে আজকের কলম্বিয়া ক্লাস পর্যন্ত এর বিবর্তন এককথায় অবিশ্বাস্য। এর সীমাহীন পাল্লা, গতি এবং মাসের পর মাস লুকিয়ে থাকার ক্ষমতা এটিকে এক অপ্রতিরোধ্য অস্ত্রে পরিণত করেছে। কিন্তু এর অসুবিধাও রয়েছে। প্রতিটি সাবমেরিন তৈরি করতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ হয় এবং এর পারমাণবিক জ্বালানি নিষ্ক্রিয় করা বা ডিকমিশনিং প্রক্রিয়াও অত্যন্ত জটিল এবং ব্যয়বহুল। ১৯ শতকের নৌকৌশলবিদ আলফ্রেড থায়ার লিখেছিলেন, সমুদ্র যার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, পৃথিবী থাকবে তার নিয়ন্ত্রণে। একবিংশ শতাব্দীতে সেই নিয়ন্ত্রণের একটি বড় অংশ লুকিয়ে আছে সমুদ্রের গভীরে অন্ধকার এবং নিঃশব্দ জগতে এই অবিশ্বাস্য পারমাণবিক সাবমেরিনগুলোর ভেতরে।

Need another transcript?

Paste any YouTube URL to get a clean transcript in seconds.

Get a Transcript