[0:00]এই পৃথিবীতে কেউ টাকা পয়সা চায়, কেউ ক্ষমতা চায়, কেউ প্রেম ভালোবাসা চায়, কেউ বিখ্যাত হতে চায়। মানুষের এই চাওয়া পাওয়ার ভিন্নতা কেন? এর মধ্যে কি কোন কমন লিংক আছে? আজকে আমরা জানার চেষ্টা করব মানুষ জীবনে কি চায় এবং কেন চায়?
[0:28]আমি আহসান আজিজ সরকার। আমি একজন সাইকিয়াট্রিস্ট বা মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ। এছাড়া আমি গবেষণা করি, আমি একটা সাইকিয়াট্রিক জার্নালের এডিটর হিসেবে কাজ করি। আমার ইন্টারেস্ট হচ্ছে সাইকিয়াট্রি, নিউরোসাইকিয়াট্রি এবং বিহেভিয়ারাল নিউরোসাইন্সে। আমি বিশ্বাস করি মানুষকে যদি বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক তথ্য দেয়া যায় তাহলে মানুষ নিজেকে বুঝতে পারে। এবং মানুষ নিজেকে বুঝতে পারলে তার বিকাশ এবং ওয়েলবিং দুটাই নিশ্চিত হয়। মানুষ জীবনে কি চায় তার অনেকগুলো থিওরি আছে। সবচেয়ে পুরাতন থিওরি গুলার একটা হচ্ছে ফ্রয়েডের দেয়া যে মানুষের দুটা বেসিক ইন্সটিংট আছে। একটা হচ্ছে আনন্দ চায়, আরেকটা হচ্ছে অ্যাগ্রেশন যেটা অন্যের উপর কর্তৃত্ব করতে চায়, অন্যের সাথে কম্পিটিশন করতে চায়। অন্যকে ডোমিনেট করতে চায়। তো ফ্রয়েডের মতে এগুলা হচ্ছে প্রবৃত্তির অংশ এবং অবচেতন মনের মধ্যে থাকে। এবং সব মানুষের মধ্যেই এটা আছে। ফ্রয়েডের পরে আব্রাহাম ম্যাজলো বলে একজন সাইকোলজিস্ট আসেন। তিনি মানুষের চাওয়া পাওয়া বা চাহিদা নিয়ে একটা ইন্টারেস্টিং থিওরি দেন। তার মতে মানুষের যে চাওয়া পাওয়া এটা পুরোপুরি অবচেতন না, এটা সম্পর্কে মানুষ সচেতন। তিনি ডিসক্রাইবড করেছেন মানুষের পাঁচটা বেসিক চাওয়া পাওয়া আছে। এই বেসিক চাওয়া পাওয়াগুলো তিনি পিরামিডের মতো করে চিন্তা করেছেন। অর্থাৎ পিরামিডের সবচেয়ে নিচে যে চাওয়া পাওয়াটা আছে সেটা হচ্ছে সবচেয়ে শক্তিশালী চাওয়া। তার উপরে যেটা আছে সেটা তার চেয়ে কম শক্তিশালী। সবচেয়ে উপরে যেটা আছে সেটা হচ্ছে মানুষের সবচেয়ে কম শক্তিশালী চাহিদা। এটাকে আমরা অনেকটা সিঁড়ির মতো চিন্তা করতে পারি। যে সিঁড়ির নিচের ধাপে যে চাহিদা আছে সেই চাহিদাটা হচ্ছে সবচেয়ে শক্তিশালী। এবং সিঁড়ির নিচের ধাপ যদি আপনি পার না করেন তাহলে পরের ধাপে যেতে পারবেন না। তাহলে পাঁচ ধরনের যে চাওয়া পাওয়া বা মানুষের চাহিদা কি এই পাঁচ ধরনের চাহিদা? সবচেয়ে নিচে যে চাহিদা আছে সেটা হচ্ছে মানুষের জৈবিক চাহিদা। ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ঘুম, সেক্স - এগুলা হচ্ছে সবচেয়ে নিচের। ম্যাজলর মতে মানুষের এই চাহিদাগুলো হচ্ছে সবচেয়ে শক্তিশালী চাহিদা। এই চাহিদা পূরণ না হয়ে মানুষ পরবর্তী ধাপে যেতে পারে না। এই চাহিদাগুলো যখন পূরণ হয় তখন মানুষ পরবর্তী ধাপে যায়। সেকেন্ড ধাপে যে চাহিদাগুলো আছে সেটা হচ্ছে নিরাপত্তার চাহিদা। শারীরিক এবং মানসিক নিরাপত্তা। শারীরিক নিরাপত্তা যেমন মানুষ অন্যের আক্রমণ থেকে বাঁচতে চায়, যুদ্ধ থেকে বাঁচতে চায়, দুর্যোগ থেকে বাঁচতে চায়। এগুলো হচ্ছে শারীরিক নিরাপত্তা। এজন্য মানুষ বাসা করে অনেক সময় এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় মাইগ্রেট করে। আর মানসিক নিরাপত্তা মানে? মানুষ অন্যের ভার্বাল আক্রমণ থেকে বাঁচতে চায়। মানুষ অপমান থেকে বাঁচতে চায়, ইনসাল্ট থেকে বাঁচতে চায়। মানুষ আইন চায়, তার জীবনের মধ্যে একটা রুটিন চায়, তার জীবনের মধ্যে অর্ডার চায়। এগুলা মানুষকে এক ধরনের মানসিক নিরাপত্তা দেয়। তো জৈবিক চাহিদা ক্ষুধা, তৃষ্ণা এটা পূরণ হওয়ার পরে মানুষ শারীরিক এবং মানসিক নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে। শারীরিক এবং মানসিক নিরাপত্তার চাহিদা যখন মানুষের পূরণ হয়ে যায় তখন মানুষ তৃতীয় স্টেপের চাহিদার কথা চিন্তা করে। তৃতীয় স্টেপের চাহিদা কি? তৃতীয় স্টেপের চাহিদার মধ্যে আছে প্রেম, ভালোবাসা, বন্ধুত্ব এগুলো। মানুষ বিয়ে করে, বাচ্চাকাচ্চা নেয়, বন্ধুত্ব করে, বিভিন্ন ক্লাবের সদস্য হয়। এই চাহিদাগুলো মানুষের এই স্টেপ থেকে আসে যে প্রেম, ভালোবাসা এবং বন্ধুত্ব করার চাহিদা থেকে। যখন এই স্টেজের চাহিদাগুলো মানুষের পূরণ হয়ে যায় তখন মানুষ চতুর্থ স্টেজে পৌঁছায়। চতুর্থ স্টেজে মানুষ কি চায়? চতুর্থ স্টেজে মানুষ চায় আত্মমর্যাদা আত্মসম্মান এই জিনিসগুলো। মানুষ জীবনে কোন কিছু অ্যাচিভ করতে চায়, কোন একটি স্কিল অর্জন করতে চায়। মানুষ অন্যের সম্মান পেতে চায়, বিখ্যাত হতে চায়। এগুলো হচ্ছে চতুর্থ স্টেজের চাহিদা। সব শেষে যে স্টেজ আছে সেটাকে বলা হয় সেলফ অ্যাকচুয়ালাইজেশন। মানুষের যখন সব ধরনের চাহিদা পূরণ হয়ে যায় তখন মানুষের এই চাহিদাটা দেখা যায়। সেলফ অ্যাকচুয়ালাইজেশনের মধ্যে আবার দুই-তিন ধরনের চাহিদা আছে। একটা হচ্ছে জানার আগ্রহ। অনেকে দেখবেন যে প্রচুর বই পড়তে পছন্দ করে, জানতে পছন্দ করে, এটাকে বলা হয় কগনিটিভ নিড। কগনিটিভ নিডের বাইরে আরেকটা চাহিদা আছে সেটা হচ্ছে সৌন্দর্য চর্চা করা। সুন্দর কিছু দেখা, সুন্দর কিছু উপভোগ করা, অবলোকন করা এই জিনিসগুলো হচ্ছে মানুষের চাহিদা। আর এটার আরেকটা পার্ট হচ্ছে সেলফ অ্যাকচুয়ালাইজেশন। তখন আমরা যখন সেলফ অ্যাকচুয়ালাইজেশনের কথা বলি তখন আসলে মূলত তিনটা জিনিস, একটা হচ্ছে কগনিটিভ নিড বা জানার আগ্রহ। একটা হচ্ছে মানুষের সৌন্দর্যের প্রতি আগ্রহ এবং সবশেষে হচ্ছে সেলফ অ্যাকচুয়ালাইজেশন। তাহলে সেলফ অ্যাকচুয়ালাইজেশন বা মানুষের সর্বোচ্চ স্তরের চাহিদা যেটা সেটা আসলে কি? সেলফ অ্যাকচুয়ালাইজেশন বলা হয়ে থাকে মানুষের মধ্যে যে সম্ভাবনা আছে সেই সম্ভাবনাটা পূরণ করার যে চাহিদা সেটা হচ্ছে সেলফ অ্যাকচুয়ালাইজেশনের চাহিদা। বা মানুষের যেই যোগ্যতা আছে সেই যোগ্যতার পরিপূর্ণ বিকাশ। অর্থাৎ মানুষ যা হতে চায় তা হওয়ার যে ইচ্ছা, সেই ইচ্ছাটা পূরণ করার যে চাহিদা সেটা হচ্ছে সেলফ অ্যাকচুয়ালাইজেশনের চাহিদা। খুব অল্প মানুষের মধ্যে এই চাহিদাটা দেখা দেয়। অধিকাংশ মানুষ কি নিয়ে ব্যস্ত থাকে? অধিকাংশ মানুষ যদি চিন্তা করেন তাহলে তিন বা চার নম্বরের স্তরের চাহিদা নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকে। প্রেম, ভালোবাসা, বন্ধুত্ব অথবা আত্মমর্যাদা আত্মসম্মান মানে বিখ্যাত হতে চায়, ক্ষমতা চায়, টাকা পয়সা চায় এগুলা মানুষের মর্যাদা বৃদ্ধি করে। তো মানুষ এগুলা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। এই স্তর পার হয়ে হাইয়েস্ট স্তরে পৌঁছানো। অর্থাৎ জানার আগ্রহ, সৌন্দর্য উপভোগ করার আগ্রহ, সেলফ অ্যাকচুয়ালাইজেশন এই স্তরে খুব অল্প মানুষ পৌঁছাতে পারে। তো আমরা মানুষের পাঁচ ধরনের চাহিদার কথা বলছিলাম, সবচেয়ে নিচে আছে মানুষের জৈবিক চাহিদা এটা সবচেয়ে শক্তিশালী। এটা পূরণ হলে মানুষ তার পরবর্তী ধাপে যায়। আস্তে আস্তে মানুষ উপরের দিকে যায় এবং সেলফ অ্যাকচুয়ালাইজেশন বা মানুষ নিজের মধ্যে যে সম্ভাবনা সেটা পূরণ করার চেষ্টা করে।
[9:16]তো আপনার মধ্যে কি সম্ভাবনা আছে বা আপনার কি যোগ্যতা এটা নিয়ে চিন্তা করেন এবং আপনি এই পাঁচ স্তরের মধ্যে কোন স্তরে আছেন সেটা নিয়ে চিন্তা করেন। এরপরে আপনি উপরের দিকে উঠার চেষ্টা করেন। উপরের দিকে উঠার চেষ্টা করা গুরুত্বপূর্ণ কারণ ম্যাজলো মনে করেন যে মানুষ যদি উপরের দিকে উঠার চেষ্টা না করে তাহলে তার মধ্যে নানারকম মানসিক সমস্যা দেখা যায়। তো আজকে এতটুকুই, পরবর্তীতে এই বিষয়ে আরো কথা বলব। ভালো থাকবেন ইনশাল্লাহ আবার দেখা হবে।



