[0:00]প্রতি বছর বাজেট ঘোষণা যদি আপনার কাছে জটিল মনে হয়, তাহলে এই কন্টেন্টটি আপনার জন্য। বাজেট কী, কেন করা হয়, আয়-ব্যয়ের হিসাব কিভাবে হয়, বাজেট ভালো হয়েছে নাকি খারাপ, কিভাবে বুঝবেন, এইসব বিষয়ে ধারণা দেয়ার চেষ্টা করব আমি সানজানা চৌধুরী।
[0:18]এই মাসে আপনি কোথা থেকে কত টাকা আয় করবেন, কোন খাতে কিভাবে কত টাকা ব্যয় করবেন, কাকে কত টাকা দেবেন, কিভাবে আপনার ব্যয় কমাবেন, এই হিসেবই হলো আপনার ব্যক্তিগত বাজেট। সরকার জাতীয় বাজেটে ঠিক সেই কাজটাই করে। তবে ব্যক্তিগত বাজেটে যেখানে মাসে হিসেব করা হয়, জাতীয় বাজেটে হিসেব ধরা হয় এক বছরের জন্য। জাতীয় বাজেটের অর্থবছর শুরু হয় প্রতিবছর পহেলা জুলাই থেকে পরের বছরের ৩০শে জুন পর্যন্ত। এ সময়ে দেশের সরকারের প্রত্যাশিত আয় কত হতে পারে এবং কোন কোন সম্ভাব্য খাতে তা ব্যয় হবে এই হিসেবই হলো বাজেট। তবে ব্যক্তিগত বাজেটের সঙ্গে জাতীয় বাজেটের একটা বড় পার্থক্য রয়েছে। ব্যক্তিগত বাজেটে মানুষ আগে আয় করে সেই আয়ের উপর ভিত্তি করে ব্যয়ের খাতগুলো ঠিক করে। কিন্তু জাতীয় বাজেট এর ঠিক উল্টো। সরকার আগে ব্যয়ের খাতগুলো নির্ধারণ করে তারপর সেই ব্যয় বহন করতে সরকার কোন কোন খাত থেকে সেই পরিমাণ আয় করবে তা পরিকল্পনা করে। অর্থাৎ দেশের বাজেটের ক্ষেত্রে আয় বুঝে ব্যয় নয়, বরং ব্যয় বুঝে আয় হয়। জুনের প্রথম সপ্তাহে অর্থমন্ত্রী সংসদে প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করেন। জুনের ৩০ তারিখের মধ্যে সংসদে ভোটের মাধ্যমে প্রস্তাবিত বাজেট পাস হয়, এরপর রাষ্ট্রপতির সম্মতিতে বাজেট কার্যকর হয়। নতুন বাজেট ঘোষণার পর সেপ্টেম্বর থেকে পরের অর্থবছরের বাজেটের কাজ শুরু হয়। এজন্য অর্থ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট অন্যসব মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে পরিকল্পনার কাজ শুরু করে।
[1:52]সরকার বিভিন্ন খাতে ব্যয় করে থাকে, এর মধ্যে কিছু খাত উন্নয়নমূলক এবং কিছু অ-উন্নয়নমূলক। যেমন, কৃষি ও শিল্প, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন, পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, শিক্ষা ও প্রযুক্তি, পানি সম্পদ, গুহায়ন, শ্রম ও জনশক্তি, মহিলা ও যুব উন্নয়নমূলক ব্যয়ের খাত। সহজ করে বললে এই যে রাস্তাঘাট, সেতু, স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল নির্মাণ হচ্ছে, বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন হচ্ছে, গ্রামীণ উন্নয়ন হচ্ছে, এগুলো এই উন্নয়নমূলক ব্যয়েরই অংশ। এসব খাতে ব্যয় করলে দেশ ও জনগণের উন্নয়ন হয় এবং সরকারের আয় বাড়ে। এক কথায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করা যায়। এ কারণে সরকার প্রতি বছরের বাজেটে নানা উন্নয়ন কর্মসূচি হাতে নেয় এবং তা বাস্তবায়নে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থ যোগাড় করে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি এডিবি নামের একটি প্রকল্প খাতে এই উন্নয়ন বাজেটের খরচ দেখানো হয়। অন্যদিকে, অ-উন্নয়নমূলক ব্যয়ের খাতগুলো হলো জনপ্রশাসন, প্রতিরক্ষা, জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা, সামাজিক নিরাপত্তা, বিনোদন, সংস্কৃতি, ধর্ম, পেনশন, ভর্তুকি, ঋণ ও সুদ পরিশোধ। এগুলো অ-উন্নয়নমূলক খাত কারণ এসব খাতে ব্যয় করলে সরাসরি কোনো উন্নয়ন হয় না। ব্যয়ের হিসেবে সরকার তেমন আয় বা মুনাফা করতে পারে না। কিন্তু দেশ রক্ষা ও প্রশাসন পরিচালনায় সরকারকে এই ব্যয় করতেই হয়। অ-উন্নয়ন খাতে ব্যয় খুব একটা পরিবর্তন হয় না। এজন্য বাজেট করার সময় সরকার এই অ-উন্নয়নমূলক খাতে আগে ব্যয় করে। তারপর বাকিটা দিয়ে বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে।
[3:31]সরকার মূলত দুটি খাত থেকে আয় করে থাকে। এক, কর থেকে আয় এবং দুই, কর বহির্ভূত আয়। এর মধ্যে জনগণের দেয়া কর বা ট্যাক্স হলো সরকারি আয়ের মূল উৎস। এর মধ্যে রয়েছে আয়কর, কর্পোরেট কর, মুনাফা। কারো চাকরি বা ব্যবসা থেকে আয় ও মুনাফা একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ছাড়িয়ে গেলেই এই কর দেয়া বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। আয় যত বেশি হয়, কর আরোপের হার তত বাড়ে। এছাড়া বিভিন্ন পণ্য কেনা বা সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে নাগরিকদের থেকে কর আদায় করে সরকার। এর মধ্যে রয়েছে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট, সম্পত্তি কর যেমন ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থ, নগদ অর্থ, বীমা ইত্যাদি। সেই সাথে ভূমিকর, যানবাহন কর, বিভিন্ন শুল্ক যেমন আমদানি শুল্ক, আবগারী শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক, নিবন্ধন ও স্ট্যাম্প বিক্রয়, মাদক শুল্ক, ভ্রমণ কর ও অন্যান্য এই কর থেকে আয়ের মধ্যে পড়ে। জনগণের থেকে সরকারের এই আয়কে রাজস্ব আয়ও বলা হয় যা সরকারের স্থিতিশীল আয় অর্থাৎ খুব বেশি ওঠানামা করে না। অন্যদিকে কর বহির্ভূত আয়ের মধ্যে রয়েছে ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণের সুদ, সঞ্চয়পত্র, বন্ড, ট্রেজারি বিল, প্রশাসনিক ফি বা সরকারি সেবার সার্ভিস চার্জ, জরিমানা, দণ্ড, বাজেয়াপ্ত থেকে পাওয়া অর্থ, ভাড়া ও ইজারা, টোল, লেভি, রেলওয়ে, ডাক বিভাগ, তার ও টেলিফোন, সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে লভ্যাংশ ও মুনাফা। কিন্তু সরকার যখন দেখে তাদের সম্ভাব্য ব্যয়ের তুলনায় প্রত্যাশিত আয় কম সেক্ষেত্রে অতিরিক্ত কর ধার্য করে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বন্ডের মাধ্যমে ঋণ করে সেই সাথে বৈদেশিক সাহায্য কিংবা বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আইএমএফ, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এডিবি বা অন্যান্য উৎস থেকে বৈদেশিক ঋণ নিয়ে সরকার বাজেটের এই ঘাটতি মেটায়। তবে বৈদেশিক সাহায্য কিংবা বৈদেশিক ঋণ নিতে গেলে তাদের কিছু শর্ত মানতে হয়। কর বহির্ভূত আয় স্থির নয়। এটা কমবেশি হয়ে থাকে।
[5:33]জাতীয় বাজেট কতটা কার্যকর ও ফলপ্রসূ হবে সেটা নির্ভর করে ওই বাজেটে আয় ব্যয়ের ভারসাম্য আছে কিনা অর্থাৎ সেটা সুষম বাজেট নাকি অসম বাজেট। সরকার জাতীয় বাজেটে যে পরিমাণ ব্যয় করবে সেই পরিমাণ আয়ের সম্ভাব্য খাত নির্ধারণ করতে পারলে সেটাকে সুষম বাজেট বলে। অন্যদিকে অসম বাজেট হলো ব্যয়ের চাইতে আয় কম হলে বা বেশি হলে। বাংলাদেশের বাস্তবতা হলো ঘাটতি বাজেট অর্থাৎ আয় থেকে ব্যয় বেশি হওয়া। সাধারণত উন্নত দেশগুলো সুষম বাজেট প্রণয়ন করে থাকে। ইতালি, অস্ট্রিয়া এবং সুইজারল্যান্ডে এ নিয়ে রীতিমত আইন আছে। তবে স্বল্পোন্নত বা উন্নয়নশীল দেশের ক্ষেত্রে বিষয়টা ভিন্ন। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন যেকোনো দরিদ্র, স্বল্পোন্নত বা উন্নয়নশীল দেশের ক্ষেত্রে ঘাটতি বাজেট থাকা স্বাভাবিক, বরং এটা উন্নয়নের জন্য ভালো। কারণ দরিদ্র, স্বল্পোন্নত বা উন্নয়নশীল দেশগুলো যদি প্রবৃদ্ধি করতে চায় তাহলে উন্নয়নমূলক খাতে বেশি বেশি ব্যয় করতে হবে। এতে বাজেট ঘাটতি দেখা দেয়। আর ঘাটতি বাজেট থাকলে অব্যবহৃত সম্পদের ব্যবহার বাড়ে, ঘাটতি পূরণের চাপ থাকে যার কারণে অর্থনীতিতে উদ্দীপনা দেখা দেয় ফলে প্রবৃদ্ধি হতে থাকে। কিন্তু ঘাটতির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা ভীষণ জরুরি বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। জিডিপি হলো একটি দেশের ভেতরে এক বছরে যত পণ্য ও সেবা উৎপাদন হয়েছে তার সমষ্টি। ঘাটতি রাখতে হবে এই জিডিপির ৫ শতাংশের মধ্যে। এর বেশি হলে দেউলিয়া হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আবার ঘাটতি বাজেটের ব্যবস্থাপনাও বেশ জরুরি বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন। ঘাটতি বাজেটের অর্থ এমন খাতে বরাদ্দ দিতে হবে যেন তার থেকে আয় এই ঘাটতি এবং এ বাবদ পরিশোধ করা ঋণের সুদের চাইতে বেশি হয়। এই ঘাটতি ব্যয় মেটাতে সরকার ব্যাংক সহ দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নিয়ে থাকে। বিবিসি বাংলায় এমন নানা ধরনের কন্টেন্ট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের YouTube চ্যানেল এবং চোখ রাখুন আমাদের ওয়েবসাইটে। এছাড়া আপনারা আর কি ধরনের কন্টেন্ট দেখতে চান সে বিষয়ে আমাদেরকে কমেন্ট বক্সে জানাতে ভুলবেন না।



