[0:00]হ্যালো ভিউয়ার্স বাণীপীঠ শিক্ষাঙ্গনের আরও একটি নতুন ভিডিওয়ে তোমাদের সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি। আজকে আমি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা সবথেকে বিখ্যাত এবং জনপ্রিয় উপন্যাস চোখের বালি, এই উপন্যাসটা সম্পর্কে একটা সামগ্রিক আলোচনা করব। মূল আলোচনা শুরু করার আগে বলে রাখি, তোমরা যারা আমার চ্যানেলে নতুন তারা প্রত্যেকে চ্যানেলটাকে সাবস্ক্রাইব করে রাখো বাংলা সাহিত্য বিষয়ক প্রচুর প্রচুর এই ধরনের আলোচনা পাওয়ার জন্য। আর তোমাদের যাদের আমার আলোচনা ভালো লাগে তারা পার্সোনালি আমার সঙ্গে নিচে দেওয়া কন্টাক্ট নাম্বারে যোগাযোগ করতে পারো। কারণ বাণীপীঠ শিক্ষাঙ্গনের তরফ থেকে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য অনলাইন এবং অফলাইন ক্লাস প্রোভাইড করা হয়। তো তোমরা যারা পার্সোনালি আমার সঙ্গে ক্লাস করতে চাইছো তারা প্রত্যেকে নিচে দেওয়া নাম্বারে হোয়াটসঅ্যাপ করতে পারো বা যোগাযোগ করতে পারো। তো চলো আজকের যে মূল আলোচনা সেটা বর্তমানে শুরু করা যাক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা চোখের বালি উপন্যাসটার প্রসঙ্গ উঠলে অনেকেই সাধারণত মনে করেন যে এটা একটা সাধারণ প্রেমের উপন্যাস, বলা ভালো পরকীয়া প্রেমের উপন্যাস এবং উপন্যাসটার প্রধান যে চারটে চরিত্র রয়েছে অর্থাৎ মহেন্দ্র, বিহারী, আশালতা এবং বিনোদিনী। এই চারটে চরিত্রকে কেন্দ্র করে একটা জটিল প্লট তৈরি হয়েছিল এবং অবশেষে সেই মনস্তাত্বিক জটিলতার গ্রন্থি মোচনের মাধ্যমে উপন্যাসটা শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু খুব খুঁটিয়ে বা তলিয়ে পড়লে আমরা বুঝতে পারব উপন্যাসটাকে ওপর ওপর আমরা যতটা সোজা ভাবছি বিষয়টা কিন্তু ততটা সহজ একেবারেই নয়। চোখের বালি এমন এক ধরনের সামাজিক উপন্যাস যেখানে আমরা অদ্ভুত কিছু সমাজ সমস্যার বাস্তব রূপ দেখতে পাব প্রধান চরিত্রগুলোর মধ্যে দিয়ে। বিহারী, বিনোদিনী, মহেন্দ্র এবং আশালতা চারটে চরিত্র যেন সমাজের চারটে ভিন্ন ভিন্ন রকমের মানুষকে রিপ্রেজেন্ট করছে বা ভিন্ন ভিন্ন কিছু মানুষের চরিত্রের প্রতিনিধিত্ব করছে। এই চরিত্রগুলোর মধ্যে দিয়ে অদ্ভুত সব মনস্তাত্বিক জটিলতা প্রকাশ করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রকৃতপক্ষে এর পূর্ববর্তী বাংলা সামাজিক উপন্যাসের ধারা যদি আমরা লক্ষ্য করি সেখানে আমরা দেখব বিষবৃক্ষ বা কৃষ্ণকান্তের উইলের মতো উপন্যাস লিখে গেছেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। যে উপন্যাসগুলির মধ্যে দিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রকাশ করেছেন সমাজে যুবতী বিধবা নারী থাকলে কত রকম সমস্যা হতে পারে এবং যেকোনো ঘর বা সংসারের পক্ষে বা একটা স্বামী-স্ত্রীর সুস্থ দাম্পত্য সম্পর্কের মাঝখানে যদি কোনো যুবতী বিধবা নারী এসে প্রবেশ করে তাহলে তার পরিণতি হবে অতিব ভয়ংকর। ঠিক এই একই সামাজিক সমস্যাকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গ্রহণ করেছেন তার চোখের বালি উপন্যাসে কিন্তু তার দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বা দেখানোর দৃষ্টিভঙ্গিটা কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় থেকে একেবারেই আলাদা বা পৃথক। তো এই পৃথকত্ব কোথায় রয়েছে সেইটাই আমরা বর্তমানে উপন্যাসটা আলোচনার মাধ্যমে বুঝবো বা জানবো। প্রসংগত চোখের বালি উপন্যাসের নামকরণের সার্থকতা কোথায় আছে সেইটা জানবো চোখের বালি শব্দটার কি ব্যঞ্জনা রয়েছে সেইটা নিয়ে আলোচনা করব। চারটে প্রধান চরিত্র অর্থাৎ বিনোদিনী, আশালতা, বিহারী এবং মহেন্দ্র এই চরিত্রগুলো সম্পর্কে ডিটেইলস আলোচনা করব এবং জানবো। তো এই সমস্ত প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়ার জন্য এই সমগ্র ভিডিওটা মন দিয়ে দেখতে থাকো। আলোচ্য উপন্যাসের প্রধান চরিত্র চারটে সেটা আগেই বলেছি তারা হলো মহেন্দ্র, আশালতা, বিহারী এবং বিনোদিনী। এই চারটে চরিত্রের পারস্পরিক মনস্তাত্বিক টানাপোড়েন উপন্যাসটিতে বিশেষ গুরুত্ব লাভ করেছে। তো এই চারটে চরিত্রের মনস্তাত্বিক টানাপোড়েন বোঝার জন্য আমাদের আগে জানতে হবে এই চরিত্রগুলোর ব্যাকগ্রাউন্ড বা পূর্ব পটভূমি কি রয়েছে সেটা সম্পর্কে। মহেন্দ্র কলকাতার একটি বিখ্যাত বনেদি এবং অর্থবান বংশের একমাত্র সন্তান। তার মা রাজলক্ষ্মী দেবীর স্নেহছায়ায় সে মানুষ হয়েছে। তার মা রাজলক্ষ্মী দেবী একটু বেশি পরিমাণে পুত্র সম্পর্কে অন্ধ স্নেহপরায়ণ। তিনি তার ছেলের খারাপ দিকটা খুব একটা বেশি দেখেন না এবং মহেন্দ্রকে ছেলেবেলা থেকে তিনি প্রচন্ড আদরে আল্লাদে মানুষ করেছেন। সেই জন্য আমরা বুঝতেই পারি যে মহেন্দ্র চরিত্রটা এমন একটা চরিত্র যে কোনোদিনও ছেলেবেলা থেকে কোন কিছু চেয়ে পায়নি এমনটা হয়নি। তো তাই তার মধ্যে ভালো গুণের সঙ্গে সঙ্গে অনেক খারাপ গুণও যুক্ত হয়েছে। যেগুলো স্বাভাবিকভাবেই যেকোনো বড়লোকের বেশি আদর-যত্ন পাওয়া সন্তানদের মধ্যে থাকে সেই ধরনের ছোটখাটো বদগুণ মহেন্দ্র ছিল। অপরদিকে মহেন্দ্রর বন্ধু বিহারী এই উপন্যাসের আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। এই বিহারী চরিত্রটা মহেন্দ্রর বন্ধু হলেও আমরা দেখি সমগ্র উপন্যাসটা জুড়ে সে অনেকাংশে মহেন্দ্রর ছায়াসঙ্গী রূপে কাজ করেছে। যেহেতু মহেন্দ্রর পরিবারে সে তার মা খুড়িমা এদের প্রচুর আদর-যত্ন পেয়ে থাকে এবং বিহারী তার পরিবারে অতটা মাতৃস্নেহ পায়নি বা মাতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়েছে তাই মহেন্দ্রর পরিবারে এসে তার মা জেঠিমা খুড়িমাকে বিহারী তার নিজের মা জেঠিমা খুড়িমা এরকম চোখে দেখে। সেই কারণে সে সবসময় মহেন্দ্রর মঙ্গল কামনা করে। মহেন্দ্রদের পরিবারে এসে বিহারী নিজের বাড়ির ছেলের মতো আদর-যত্ন পায়। সেটাই বিহারীকে যেন ধন্য করে রেখেছে। তাই মহেন্দ্রর কোনটা ভালো হবে মহেন্দ্রকে কোন ধরনের পরামর্শ দিলে সেটা তার জন্য মঙ্গলজনক সেই রকম হিতৈষী মানুষ হিসেবে বিহারী সর্বদাই কাজ করে চলেছে মহেন্দ্রর পশ্চাতে থেকে। এবং কোথাও কোথাও আমরা দেখি মহেন্দ্রর পরিবারের সদস্যরাও মহেন্দ্রর থেকে বেশি বিহারীকে বিশ্বাস করেন বা বিহারীকে বেশি পরিণতমনস্ক ব্যক্তি রূপে মনে করেন। বিহারীর মধ্যে এক অদ্ভুত ধরনের পরিণতি বা ম্যাচিউরিটি রয়েছে যার দ্বারা সে পরিস্থিতি বুঝে কোন কাজটা সঠিক কোন কাজটা বেঠিক এটা বুঝে কাজ করবার একটা ক্ষমতা রাখে। তো মহেন্দ্রর থেকে তুলনামূলক অনেক বেশি ম্যাচিউরড এবং পরিণত মনস্ক একটি চরিত্র হলো বিহারী। এই উপন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্র হলো আশালতা। আশালতা সম্পর্কে মহেন্দ্রর স্ত্রী। কিন্তু এই আশালতার সঙ্গে মহেন্দ্রর বিবাহটা ঘটেছিল বেশ একটু অন্যরকমভাবে। প্রকৃতপক্ষে মহেন্দ্রর খুড়িমা অন্নপূর্ণা দেবীর দুঃসম্পর্কের এক আত্মীয় হন আশালতা। এই আশালতা ছেলেবেলা থেকে অনাথ। তার পারিবারিক কোন ভালো ব্যাকগ্রাউন্ড বা পৃষ্ঠবল ছিল না। সেই কারণে অন্নপূর্ণা চেয়েছিলেন যে কোন একটি সুপাত্র আশালতাকে বিবাহ করে তাকে উদ্ধার করুক। সেই সূত্র ধরে তিনি আশালতার জন্য সম্বন্ধ করেছিলেন বিহারীর সঙ্গে। তিনি চেয়েছিলেন বিহারীর মতো একটি শান্ত শিষ্ট ভদ্র সুপাত্রের হাতে পড়ে আশালতার জীবনটা ধন্য হয়ে যাক। মহেন্দ্রর মতন অতিরিক্ত বড়লোকের ছেলের হাতে তার বঞ্চ যে পড়তে পারে এরকম দুরাশা অন্নপূর্ণা দেবী কোনদিন করেননি। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে ঘটলো অন্যরকম। বিহারীর জন্য সম্বন্ধ দেখতে গিয়ে অর্থাৎ মেয়ে দেখতে গিয়ে মহেন্দ্র নিজে আশালতাকে পছন্দ করে বাড়িতে ফিরে এলো এবং বাড়িতে ফিরে সে পরিষ্কার জানিয়ে দিল বিবাহ যদি তাকে করতেই হয় সে আশালতাকেই বিবাহ করবে। এখানে দর্শকদের মনে একটা ছোট্ট প্রশ্ন উত্থাপন হতে পারে যে বিহারীর জন্য সম্বন্ধটা দেখা হচ্ছে এটা জানা সত্ত্বেও মহেন্দ্র কেন এমন কাজ করল? এর উত্তরও কিন্তু একটা মনস্তাত্বিক জটিলতা কাজ করছে। যার মধ্যে হিতাহিত জ্ঞান বা ভালোমন্দ জ্ঞান খুব একটা নেই বললেই চলে। যেহেতু তার খুড়িমা অন্নপূর্ণা দেবী আশালতার সম্বন্ধটা বিহারীর জন্য এনেছে সেই জন্যই সম্ভবত মহেন্দ্রর মন আশালতার দিকে দুর্নিবার আকর্ষণে ধাবিত হয়েছে। অনেক সময় দেখবে ছোট বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এটা হয় যে অপর একটি বাচ্চাকে কোন একটি খেলনা দিলে অন্য একটি বাচ্চা সবসময় মনে করে যে ওর খেলনাটাই বেশি ভালো। এখানে মহেন্দ্রর ক্ষেত্রে ঠিক এই জিনিসটাই ঘটেছিল। যেহেতু সম্বন্ধটা বিহারীর জন্য এসেছিল তাই তার মনে হয়েছে যে পৃথিবীর বোধহয় সবথেকে ভালো মেয়েটাকে বিহারী পেয়ে যাচ্ছে। তাই একরকম জোর করে অনেক রকম পেছন থেকে ষড়যন্ত্র করে মহেন্দ্র আশালতাকে বিবাহ করে এবং বিবাহ করার পর তার মনে মনে একটা অদ্ভুত মেন্টাল স্যাটিসফ্যাকশন বা সন্তুষ্টি কাজ করেছিল যে সে যেন বিশাল বড় একটা কাজ করে ফেলেছে। আমরা দুটো চরিত্রের তুলনা করে বলতে পারি এই জিনিসটাই যদি বিপরীত দিক থেকে হতো অর্থাৎ মহেন্দ্রর জন্য কোন সম্বন্ধ আসতো কখনোই বিহারী বলতো না যে সেই মেয়েটিকে আমি বিয়ে করব। কারণ বিহারীর মধ্যে এই ধরনের ইম্মাচিউরিটি বা অপরিনত মনস্ক ছেলে মানুষই ছিল না। তো এই দিক থেকে আমরা বুঝতে পারি যে বিহারী চরিত্রটার সঙ্গে মহেন্দ্রর খুব একটা তুলনা চলে না কারণ মহেন্দ্র অনেক ক্ষেত্রেই এমন এমন কাজ করে যেটা একজন পরিণত মনস্ক পুরুষকে মানায় না। তো যাই হোক মহেন্দ্র আশালতাকে বিয়ে করে ঘরে আনলো। এর পরবর্তীকালে আমরা দেখি সংসারে বেশ গোলযোগ সৃষ্টি হলো মহেন্দ্রর এই বিবাহকে কেন্দ্র করে। এক তো এই বিবাহের পর বিহারী পরিষ্কার জানিয়ে দিল জীবনে সে আর কখনো কাউকে বিবাহ করবে না। এবার এই সংকল্পের প্রকৃত অর্থ কি সেটা আমরা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে বিচার করতে পারি। একটা এঙ্গেল থেকে মনে হতে পারে যে বিহারী প্রকৃতপক্ষে আশালতাকে সম্বন্ধ দেখতে গিয়েই ভালোবেসে ফেলেছিল তাই তাকে ছাড়া অন্য কোন নারীকে বিবাহ করা তার পক্ষে সম্ভব না। আবার বিপরীত দিক থেকে এটাও হতে পারে যে একবার এইভাবে ষড়যন্ত্রের সম্মুখীন হয়ে বিবাহ ভেঙে যাওয়ার পর বিবাহ সম্পর্কেই বিহারীর যে ইচ্ছা সেটা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এরপর মহেন্দ্র আশালতাকে বিবাহ করে নিজের গৃহে নিয়ে এলো এবং অদ্ভুতভাবে আমরা দেখলাম যে সে তার পড়াশোনো তার ডাক্তারি তার এক্সামিনেশন সমস্ত কিছু ত্যাগ করে দিয়ে সারাদিন নিলর্জের মতন তার বউকেই নিয়েই পড়ে রইল। চোখের বালি উপন্যাসের খুব সুন্দর একটা জায়গা এটা যেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দেখিয়েছেন যে বাড়িতে নববিবাহিত বউ বিবাহ হয়ে আসার পর যদি লোকলজ্জাকে জলাঞ্জলি দিয়ে সে সর্বক্ষণ তার স্বামীর ঘরে আবদ্ধ থাকে তাহলে সমগ্র সংসারে কেমন একটা গোলযোগ উপস্থিত হয়। প্রথম প্রথম আমরা দেখতে পাই রাজলক্ষ্মী তার নতুন বউমাকে যথেষ্ট ভালোবেসে আপন করে নিয়েছিলেন এবং তিনি চেয়েছিলেন নিজের হাতে ধরে তিনি বউমাকে ঘর কন্যার সমস্ত কাজ শিখিয়ে দেবেন। কিন্তু এখানে বাদ সাধলো মহেন্দ্র। মহেন্দ্র প্রকৃতপক্ষে নতুন বিবাহ করার পর মানসিক উন্মাদনা বশত সর্বক্ষণ চাইলো আশালতার সঙ্গ পেতে। আশালতার সঙ্গ পাওয়ার জন্য সে নতুন একটা অজুহাত আবিষ্কার করলো। সে বলল নববিবাহিত স্ত্রীকে সে লেখাপড়া শেখাবে। স্লেট, পেন্সিল এবং বইপত্র নিয়ে সে একটা প্রহসন রচনা করে তুললো। প্রকৃতপক্ষে এই লেখাপড়া শেখানোর পশ্চাতে মহেন্দ্র তার যে বিবাহ পরবর্তী ভোগ সুখময় জীবন সেটাকেই কিন্তু কার্যক্ষেত্রে পরিণতি দেওয়ার তালে ছিল। রাজলক্ষ্মী দেবী এই বিষয়টাতে প্রচন্ড পরিমাণে অসন্তুষ্ট হলেন এবং তার সব রাগ গিয়ে পড়ল তার জা অন্নপূর্ণা দেবীর ওপর। তিনি ভাবলেন যেহেতু আশালতা সম্পর্কে অন্নপূর্ণা দেবীর আত্মীয়া তাই হয়তো অন্নপূর্ণাই পেছন থেকে কলকাঠি নেড়ে মহেন্দ্রকে বলেছেন যে তার বউকে ঘর সংসারের কোন কাজ করতে না দিয়ে নিজে স্বয়ন গৃহে আবদ্ধ রাখতে। যদিও এই বিষয়টা ছিল একেবারেই ভুল ধারণা। রাগ করে রাজলক্ষ্মী দেবী গৃহত্যাগ করলেন কিন্তু মায়ের মন তাকে তো বোঝানো যায় না। বেশ কিছুদিন বাড়ি ছেড়ে থাকার পর তার মনে হলো এবার তার ছেলে বউয়ের কাছে তার ফেরা প্রয়োজন এবং তখন তিনি কাশি থেকে যখন বাড়িতে ফিরে এলেন সঙ্গে করে নিয়ে এলেন বিপিনের বউ নামক এক যুবতী বিধবা নারীকে। এই বিপিনের বউই পরবর্তীকালে আমাদের আলোচ্য উপন্যাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্র বিনোদিনী। এই বিনোদিনীর এবার পূর্ব বৃত্তান্ত কিছু বলা প্রয়োজন আছে। বিনোদিনীর সঙ্গেই প্রকৃতপক্ষে রাজলক্ষ্মী দেবী তার পুত্র মহেন্দ্রের বিবাহ স্থির করেছিলেন বহু বছর আগে। বিনোদিনীর মায়ের সঙ্গে রাজলক্ষ্মী দেবীর একটি সখী সম্পর্ক স্থাপিত ছিল। তিনি চেয়েছিলেন তার সখীর কন্যা বিনোদিনী মহেন্দ্রর বউ হোক। এই চাওয়ার মধ্যে প্রকৃতপক্ষে কোনো অন্যায় ছিল না কারণ বিনোদিনী সর্বগুণসম্পন্ন নারী। বিনোদিনীর শিক্ষা, দীক্ষা, রুচি সমস্তটাই মার্জিত। হাতের কাজ করতে তার সঙ্গে আর কারোর তুলনা হয় না। সেলাই থেকে শুরু করে রান্না, ঘর গোছানো সাজানো থেকে শুরু করে নিজের যে একটা আত্মমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব পরিস্ফুট করা সবটাই বিনোদিনী করে নিপুণ হাতে। বিনোদিনী নিরলস কর্ম করতে পারে। সংসারের কাজে তার কোন অরুচি নেই এবং তার দ্বারা করা সংসারের প্রত্যেকটা কাজেই ফুটে ওঠে রুচির ছোঁয়া। ইহানো বিনোদিনীকে পুত্রবধূ করতে যেকোনো মা-ই চাইবেন এবং বলা ভালো ইহানো বিনোদিনীকে স্ত্রী রূপে পেলে যে কোন পুরুষ ধন্য হয়ে যাবে। কিন্তু কপালের লিখন ছিল একেবারেই অন্যরকম। রাজলক্ষ্মী দেবী যখন মহেন্দ্রর জন্য বিনোদিনীর সম্বন্ধ এনেছিলেন সেই সময় মহেন্দ্রর বিবাহ করার কোন ইচ্ছাই ছিল না। সেই কারণে বিনোদিনী সম্পর্কে কিছু না জেনে তার ছবি না দেখে তার রূপ গুণ কিচ্ছু বিচার না করে মহেন্দ্র সোজা বলে দিয়েছিল এই মেয়েকে আমি বিয়ে করতে পারব না। পরবর্তীকালে যখন মহেন্দ্রর সঙ্গে বিনোদিনীর সরাসরি সাক্ষাৎ হয়েছে তখন কিছুটা হলেও মহেন্দ্র উপলব্ধি করেছেন যে কি ভুল সে একসময় করেছিল। প্রকৃতপক্ষে মহেন্দ্র চরিত্রের মনস্তাত্বিক যে দিক সেটাই ছিল এরকম যে জিনিসকে তাকে হাতে তুলে ধরে দেওয়া হতো সেই জিনিসের মূল্য তার কাছে থাকতো না। আর যে জিনিস তার কাছে ছিল অপ্রাপ্যনীয় সেই জিনিসকে পাওয়ার জন্য সে পাগলের মতো ধাবিত হতো। ঠিক এই কারণেই সে বিনোদিনীকে বিবাহ করতে অস্বীকার করেছিল আর আশালতাকে বিবাহ করতে চেয়েছিল। পরবর্তীকালে আমরা দেখি যখন বিধবা বিনোদিনী তার সংসারে এসে উপনীত হয়েছে তখন বিনোদিনীকে পাওয়া তার পক্ষে কখনোই সম্ভব নয় জেনে বিনোদিনীর প্রতি মহেন্দ্রর মন ধাবিত হয়েছে এবং আশালতার সঙ্গে তার দাম্পত্য সম্পর্ক সেটা তার কাছে একেবারে বিস্বাদ বলে মনে হয়েছে। এদিকে বিনোদিনীর মনস্তাত্বিক বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাবো সেখানে এক অন্য মনস্তাত্বিক লীলা কাজ করছে। বিনোদিনী সর্বদা মনে হয়েছে যে আমার সঙ্গেই কেন এমনটা ঘটলো বা আমার কপালেই কেন এত খারাপ কিছু লেখা হলো? প্রকৃতপক্ষে বিনোদিনীর তো কোনো অপরাধ ছিল না সে রূপে গুণে সব দিকে একদম যথাযথ এক সর্বগুণসম্পন্ন নারী কিন্তু জীবন থেকে সে কিছুই পেলো না। মহেন্দ্রর সঙ্গে তার সম্বন্ধ ভেঙে যাওয়ার পর তাড়াতাড়ি তাকে এমন এক পুরুষের হাতে তুলে দেওয়া হয় যে বেশিদিন বাঁচেনি এবং যার অর্থনৈতিক অবস্থাও খুব একটা ভালো ছিল না। তো বিবাহের কিছুদিনের মধ্যেই সেই বিপিন নামনি ব্যক্তি মারা যাওয়ার পর বিনোদিনী পড়লো একেবারে অথৈ জলে। তারপরেই কাশিতে তার সঙ্গে দেখা হলো রাজলক্ষ্মী দেবীর এবং রাজলক্ষ্মী দেবী তার এই দুরাবস্থা দেখে আর নিজের যে আবেগ সেটাকে সংবরণ করতে না পেরে তাকে নিয়ে ফিরলেন নিজের সংসারে। এবার মহেন্দ্র আশালতার দাম্পত্য জীবনের মাঝখানে উঠলো এক নতুন ঝড়। প্রকৃতপক্ষে বিনোদিনী রাজলক্ষ্মীর সংসারে আসার পর সে অনায়াসে সারল্লের সঙ্গে সমস্ত সংসারটাকে আপন করে নিলো। ঘরের কাজকর্ম থেকে শুরু করে প্রত্যেকটা মানুষের যত্ন রাখা বা খেয়াল করা। এইসব করতে বিনোদিনীর কোন আলস্য নেই। সে যেমনভাবে বয়স্ক মানুষদের সেবা করতে পারে ঠিক তেমনভাবেই অল্প বয়স্ক মানুষদের মনোরঞ্জন করাও তার স্বভাবজাত। সব দিক থেকে উপযুক্ত এক নারী সংসারে আসার পর সংসারে আশালতার স্থানটা যেন হয়ে উঠলো আরও সংকুচিত। আশালতা নিজের হাতে তার স্বামীর সোহাগ আর সংসার দুটো একেবারেই সামলে উঠতে পারছিল না। তার কারণ সে স্বভাবগতভাবে ছিল খুবই সরল এবং অল্পবয়স্ক এক নারী। সে সর্বদা লজ্জিত কুণ্ঠিত হয়ে থাকতো। বাবা-মার স্নেহ থেকে বঞ্চিত আশালতা সমাজ এবং সংসার সম্পর্কে ছিল একেবারেই অনভিজ্ঞ। তাই নিজের নতুন বিবাহিত সংসারকে সে ঠিকভাবে সামনে রাখতে পারেনি। তুলনামূলকভাবে বিনোদিনী আশালতার সংসারে এসে নিজের হাতে সব দায়িত্ব তুলে নিয়ে সংসারটাকে যেন চোখের নিমেষে আপন করে তুললো। এরপরই শুরু হলো এক অদ্ভুত মনস্তাত্বিক দ্বন্দ কোথাও কোথাও দেখা গেল যে আশালতা সর্বক্ষেত্রে বিনোদিনীর কাছে পরাজিত হয়ে যাচ্ছে। তার থেকে আরও বেশি করে সে সংকুচিত হয়ে থাকতো যখন সে দেখতো তার শাশুড়ি মা পর্যন্ত তার থেকে বেশি বিনোদিনীকে ভালোবাসেন। শেষে পরিস্থিতি এমনই দাঁড়ালো যে মহেন্দ্রর মন প্রাণ সর্বাত্মকভাবে আকৃষ্ট হতে শুরু করলো বিনোদিনীর দিকে। আসলে বিনোদিনীর চরিত্রটাই এমন যার প্রতি আকর্ষণ না হয়ে থাকা যায় না। এই জটিলতা প্রকৃতপক্ষে আশালতা এবং মহেন্দ্রর সংসারকে একেবারে ধ্বংস করে দিতে পারতো। কিন্তু তার মাঝখানে এসে দাঁড়ালো আরেক ব্যক্তিত্ব সে বিহারী। বিহারী কখনোই চায় না যে আশালতার মতন একজন সহজ সরল সাধারণ মেয়ের জীবন বা সংসার ধ্বংস হয়ে যাক। তার কারণ আশালতার জীবনটা আবর্তিতই হয়ে আছে তার স্বামীকে কেন্দ্র করে। সেই কারণে বিহারী নানানভাবে চেষ্টা করলো এই সংসার থেকে বিনোদিনীকে উৎপাটিত করে অন্য স্থানে স্থানান্তরিত করতে। কেননা বিহারী বুঝতে পেরেছিল যে মহেন্দ্র যে ধরনের পুরুষ মানুষ বেশিদিন সে নিজের চরিত্রকে বা নিজের যে আত্মমর্যাদাকে ধরে রাখতে পারবে না এবং বিনোদিনীর পায়ে সে নিজেকে পুরোপুরি সমর্পণ করে দেবে এবং তাহলেই হবে আশালতার জীবনের চরম সর্বনাশ যেটা বিহারী একেবারেই হতে দিতে চায়নি। বিহারী চরিত্রটা একটা অপূর্ব সুন্দর চরিত্র যে কারোর থেকে কোনো কিছু পাওয়ার আশা না করে সবার মঙ্গলের জন্য নিঃশব্দে কাজ করে যায়। এইরকম পুরুষ চরিত্র সংসারে বিরল। বিহারী চরিত্রটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এক অনবদ্ধ সৃষ্টি। তো পরিশেষে আমরা দেখব এই সমস্ত জটিলতার পর উপন্যাসের পরিণতিতে সত্যি সত্যি বিনোদিনী এই রাজলক্ষ্মী দেবীর যে সংসার সেখান থেকে স্থানান্তরিত হবে এবং তাকে অন্নপূর্ণা দেবীর সঙ্গে অন্যত্র পাঠিয়ে দেওয়া হবে। তবে এই পুরো ঘটনাটা ঘটেছিল রাজলক্ষ্মী দেবীর মৃত্যুর পর কারণ আমৃত্যু রাজলক্ষ্মী দেবীকে সেবা করে বিনোদিনী তাকে প্রকৃত যে একটা সেবার স্বাদ সেটা গ্রহণ করিয়েছিল। যে সেবা কোনোদিনও আশালতা তার শাশুড়ি মায়ের জন্য করতে পারেনি। সেটা পরিস্থিতির জন্যই হোক বা আশালতার নিজের চরিত্রের জন্যই হোক। তো উপন্যাসের একদম পরিণতিতে এসে আমরা দেখতে পাবো যে বিনোদিনী এবং অন্নপূর্ণা মহেন্দ্র এবং আশার সংসার থেকে অনেক দূরে চলে যাচ্ছেন এবং পরিশেষে সমস্ত যে জট পাকানো একটা মনস্তাত্বিক পরিস্থিতি সেটা কাটিয়ে উঠে আমরা দেখব। সেটা কাটিয়ে উঠে উপন্যাসটা একটা সরল পরিণতির দিকে এগোচ্ছে। সেখানে আশালতা তার সরল বিশ্বাসে তার স্বামীকে আবার ভালোবেসে তার স্বামীর সংসারে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে এবং সরল বিশ্বাসী আশালতা কোনদিন তার স্বামীকে সন্দেহ করতে পারেনি। তাই শেষ পর্যন্ত সে ভেবে গেছে যে মহেন্দ্র এমনই একজন পুরুষ মানুষ যাকে না ভালোবেসে থাকা যায় না। তাই বিনোদিনীরও কোন দোষ সে শেষ পর্যন্ত দেখেনি। এবং প্রকৃতপক্ষে আশালতা সরল বিশ্বাসে সকলকে ভালোবাসতো তাই বিনোদিনীকেও সে শেষ পর্যন্ত ক্ষমা করে দিয়েছে এবং মহেন্দ্রকেও ক্ষমা করে তার যে দাম্পত্য জীবন তাতে পুনরায় ফিরে এসেছে। পরিশেষে মহেন্দ্র এবং আশালতার পুনরায় দাম্পত্য মিলনের মধ্যে দিয়ে উপন্যাসটা শেষ হয়েছে এবং অন্নপূর্ণা ও বিনোদিনী তাদের যে এই সংসার সেটা ত্যাগ করে অন্যত্র চলে গেছে এবং এই সমস্ত যে ঘটনা সেটা কোনো একটা দিক থেকে নিয়ন্ত্রণ করেছে বিহারী। কারণ বিহারীর জীবনের একটাই লক্ষ্য আশালতার মতন একজন অনাথ এবং সরল নারীর সংসার যাতে কোনভাবেই নষ্ট না হয় সেই দিকে লক্ষ্য রাখা। সেই জন্য উপন্যাসে কোন কোন ক্ষেত্রে বিহারী বিনোদিনীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার পর্যন্ত করেছে। তো এই হলো চোখের বালি উপন্যাসের সমগ্র আখ্যান। আলোচনা পুরোপুরি শেষ করবার পূর্বে আরেকটা বিষয় সম্পর্কে একটু ছোট্ট করে কিছু কথা বলে রাখি উপন্যাসটার নামকরণ চোখের বালি হলো কেন? চিন্তা করে দেখো তো আমাদের চোখে বালি পড়লে কেমন লাগে? খুবই অসহ্য লাগে। যতক্ষণ না সেই বালিটা চোখ থেকে বেরোচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত যেন জীবনে শান্তি নেই। এখানে আলোচ্য উপন্যাসের বিনোদিনীর সঙ্গে আশালতার যে সম্পর্ক সেটা কিন্তু বাস্তবে এই চোখের বালির মতো। অর্থাৎ মহেন্দ্রকে কেন্দ্র করে দুই নারীর যে টানাপোড়েন সেই টানাপোড়েনময় সম্পর্ককে ব্যঞ্জিত করছে এই চোখের বালি শব্দটা। আমরা দেখি উপন্যাসে আশালতা এবং বিনোদিনীর মধ্যে যখন একটা বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপিত হয় এবং বিনোদিনী আশালতাকে বলে যে আমরা সই পাতাবো তখন সেই সইটা তারা কিভাবে পাতাবে এবং কি নাম দুজন দুজনের রাখবে সেই প্রসঙ্গে বিনোদিনী এই চোখের বালি নামটা সাজেস্ট করেছিল বা নির্বাচন করেছিল। প্রকৃতপক্ষে আশালতার মনে কোন পাপ না থাকলেও বা আশালতার মনে কোন জটিলতা না থাকলেও বিনোদিনীর কাছে কিন্তু আশালতা তার চোখের বালি। তার কারণ বিনোদিনীর সঙ্গেই প্রকৃতপক্ষে মহেন্দ্রর বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। তাই এই সংসারে আসার পর যখন বিনোদিনী লক্ষ্য করেছে যে আশালতার মতন একটা সহজ সরল মেয়ে অনায়াসে এত ঐশ্বর্য, বৈভব, প্রাচুর্য এবং মহেন্দ্রের মতো স্বামী পেয়ে গেছে তখন এইটা বিনোদিনী কিছুতেই সহ্য করতে পারেনি। তার বারেবারই মনে হয়েছে যে তার মতন যোগ্যতা সম্পন্ন এক নারীর যা পাওয়ার কথা ছিল সেটা কি করে আশালতার মতন এক পুতুল খেলার যোগ্য মেয়ে পেয়ে গেল? এই জায়গা থেকেই কিন্তু চোখের বালি নামকরণের ব্যঞ্জনা। আমরা কিন্তু এখানে বিনোদিনীকে হিংসুটে বলতে পারি না। এখানে যোগ্যতার বিচার হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষেই কোনো একটা যোগ্য ব্যক্তির যেটা পাওয়ার কথা সেটা সে না পেয়ে কোনো একটা অযোগ্য ব্যক্তি যদি পেয়ে যায় স্বাভাবিকভাবেই জিনিসটা আমাদের চোখে খারাপ লাগে। এই যে চোখে খারাপ লাগা বা খটকা লাগা সেটাকেই চোখের বালি নামটা দিয়ে ব্যঞ্জিত করা হচ্ছে। এই কারণেই উপন্যাসটা চোখের বালি নামকরণ একেবারেই সার্থক হয়েছে এবং এটা উপন্যাসটার প্রেক্ষিতে একটি ব্যঞ্জনাধর্মী নামকরণ হয়েছে। আজকের আলোচনা কেমন লাগলো অবশ্যই কমেন্ট করে জানিও এবং যদি আমার আলোচনা ভালো লেগে থাকে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করো। চ্যানেলে নতুন হলে অবশ্যই চ্যানেলটাকে সাবস্ক্রাইব করে রেখো বাংলা সাহিত্য বিষয়ক এরকম নানান ধরনের আলোচনা পাওয়ার জন্য। আজকের ক্লাস এখানেই শেষ করলাম ধন্যবাদ।
Watch on YouTube
Share
MORE TRANSCRIPTS



