[0:00]মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু করেছে, তা এরই মধ্যে দ্বিতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে। ইরানে একের পর এক মিসাইল আছড়ে পড়ছে, আর সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বদলাচ্ছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক ও সামরিক বয়ান। কখনো তিনি বলছেন, ইরানের শাসন ব্যবস্থার পতন ঘটাতে, কখনো চাইছেন চুক্তি করতে, আবার কখনো দাবি করছেন নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মার্কিন বাহিনী ইরানে প্রায় দুই হাজার লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। এই হামলায় নিহত হয়েছে ইরানের বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা, যার মধ্যে সবচেয়ে বড় নাম দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। এছাড়া পারমাণবিক স্থাপনা, তেল শোধনাগার, পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র এবং বেসামরিক এলাকাগুলো এই ভয়াবহ হামলার শিকার হয়েছে। অন্যদিকে ইরানও বসে নেই। তারা ইসরাইল এবং উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের লক্ষ্য করে শত শত মিসাইল এবং হাজার হাজার ড্রোন ছুড়েছে। যার লক্ষ্যবস্তু ছিল মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, জ্বালানি অবকাঠামো এবং দূতাবাস। এখনো পর্যন্ত এই যুদ্ধে বারোশ'রও বেশি ইরানি নিহত হয়েছেন। যার মধ্যে একটি স্কুলে বোমা হামলায় প্রাণ হারিয়েছে ১৬০ জনেরও বেশি নিরীহ শিশু। অন্যদিকে ৭ জন মার্কিন সেনার মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে। এত রক্তপাত, এত ধ্বংসযজ্ঞের পরও বিশ্লেষকরা একটি জায়গায় এসে হোঁচট খাচ্ছেন। ট্রাম্প এবং তার প্রশাসন এখনো স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেনি যে, তারা আসলে এই যুদ্ধ কিভাবে শেষ করতে চায়। তাহলে ওয়াশিংটনের আসল লক্ষ্য কি? এই যুদ্ধের শেষ কোথায়? আর ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের এন্ড গেম বা শেষ খেলাটি আসলে কি? এসব প্রশ্নের উত্তর জানার চেষ্টা করব আদোপান্তরের আজকের পর্বে।
[1:35]২৮শে ফেব্রুয়ারি, যুদ্ধের শুরুতে এক অভাবনীয় আঘাত হানে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন হামলায় নিহত হন ইরানের সুপ্রিম লিডার বা সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আলী খামেনি। দীর্ঘ ৩৭ বছর ধরে যিনি অত্যন্ত শক্ত হাতে ইরানের শাসনভার সামলেছেন এবং এর আগে দেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তার এই আকস্মিক মৃত্যু পুরো শাসন ব্যবস্থায় একটি বড় শূন্যতা তৈরি করবে এমনটাই ছিল মার্কিন প্রশাসনের হিসাব। যদিও আগে ট্রাম্প প্রশাসন প্রকাশ্যে কখনোই রেজিম চেঞ্জ বা ক্ষমতা পরিবর্তনের কথাটি উচ্চারণ করেনি। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, তাদের প্রতিটি পদক্ষেপের মূল লক্ষ্যই ছিল বর্তমান ইরানী এস্টাবলিশমেন্ট বা শাসন ব্যবস্থার সম্পূর্ণ পতন ঘটানো। পাকিস্তান-চীন ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক মোস্তফা হায়দার সৈয়দ এই মার্কিন মনস্তত্ত্বের চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, এই হামলাগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল শাসন ব্যবস্থার পতন ঘটানো এবং এর ফলে দেশের ভেতরে একটি গণঅভ্যুত্থানের মঞ্চ তৈরি করা। দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজ এর আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও নিরাপত্তার সহকারী অধ্যাপক মুহান্নাদ সেলুমও একই মত পোষণ করেন। তার মতে, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের পেছনে একটি অঘোষিত বাজি কাজ করেছে। ওয়াশিংটনের হিসাবটি ছিল খুব সহজ। কোনো শক্তিশালী কাঠামোর মাথা বা শীর্ষ নেতাকে যদি সরিয়ে দেয়া যায় এবং শরীরে যথেষ্ট আঘাত করা যায়, তবে পুরো সিস্টেমটি হয় ভেঙে পড়বে অথবা এতটাই দুর্বল হয়ে যাবে যে পরবর্তীতে যারা ক্ষমতায় আসবে তারা আর কখনোই যুদ্ধপূর্ববর্তী ইরানের সেই শক্তিশালী অবস্থান ফিরিয়ে আনতে পারবে না। কিন্তু বাস্তবতা তুলে ধরেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। খামেনি ছাড়াও বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডার এবং নেতা নিহত হওয়ার পরও ইসলামিক রিপাবলিককে টিকিয়ে রাখা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে গভীর কোনো ফাটলের প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। বরং সমস্ত জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে রবিবার ইরান খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে তার ৫৬ বছর বয়সী ছেলে মুস্তফা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করেছে। এই ঘোষণা প্রমাণ করে যে, ট্রাম্পের হিসেব নিকেশে একটি বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ভুল বা মিসক্যালকুলেশন ছিল। মুস্তফা হায়দার সৈয়দের মতে মার্কিন প্রশাসন বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিল যে, একটি দীর্ঘ প্রলম্বিত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো রেজিলিয়েন্স বা সহিষ্ণু শক্তি ইরানের শাসন কাঠামো রয়েছে। অপারেশন এপিক ফিউরি নামের এই সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকেই ট্রাম্প একের পর এক স্ববিরোধী কথাবার্তা বলে আসছেন। একজন ব্যবসায়ী হিসেবে তার মজ্জাগত স্বভাব হলো ডিল বা চুক্তি করা। অন্যদিকে একজন যুদ্ধকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি চাইছেন শত্রুকে ধ্বংস করতে। যুদ্ধের প্রথম দিকে ট্রাম্প ইরানের ইসলামিক রেভোলুশনারি গার্ড কোর আইআরজিসির সদস্যদের অস্ত্র সমর্পণ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যারা আত্মসমর্পণ করবে তাদের দায় মুক্তি দেওয়া হবে। পরবর্তীতে তিনি ইরানী কূটনীতিকদের পক্ষ ত্যাগ করারও আহ্বান জানান। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা ট্রাম্পের এই আহ্বানের ঠিক বিপরীত। আইআরজিসি আত্মসমর্পণ তো করেইনি, বরং তারাই এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের বিরুদ্ধে ইরানের পাল্টা আক্রমণের নেতৃত্ব দিচ্ছে। শুধু তাই নয়, উপসাগরে অন্যান্য দেশগুলোতে ইরানের আক্রমণের ছকও কষছে এই আইআরজিসি। অন্যদিকে ইরানি কূটনীতিকরাও প্রকাশ্যে চিঠি দিয়ে ট্রাম্পের প্রস্তাব দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং ইসলামিক রিপাবলিকের প্রতিনিধি হিসেবে নিজেদের অবিচল থাকার কথা জানিয়েছেন। অধ্যাপক সেলুম একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, আইআরজিসি সদ্যই নতুন সর্বোচ্চ নেতার প্রতি তাদের পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে ট্রাম্প তাদের একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। যখন আকাশ থেকে একের পর এক বোমা পড়ছে, তখন কোনো পক্ষেরই এই ধরনের আলোচনার জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সমীকরণ বা স্পেস অবশিষ্ট নেই। এরপরও ট্রাম্প দমে যাননি। ২৮শে ফেব্রুয়ারির হামলার পর তিনি ইরানের জনগণের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, স্বাধীনতার সময় সমাগত। আমাদের কাজ শেষ হলে আপনারা আপনাদের সরকার দখল করে নেবেন। তিনি এও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, যুদ্ধোত্তর ইরানের নেতৃত্বে তিনি দেশের ভেতরের কাউকেই দেখতে চান। এর মাধ্যমে তিনি কার্যত ইরানের সাবেক শাহের ছেলে রেজা পাহলভীর আশায় জল ঢেলে দিয়েছেন। যিনি কয়েক দশক ধরে আমেরিকায় বসবাস করলেও পুনরায় ইরানের ক্ষমতায় ফেরার স্বপ্ন দেখছেন। কিন্তু ট্রাম্পের এই নিজেদের সরকার নিজেরাই বেছে নেওয়ার আহ্বানের পেছনেও ছিল তার নিজস্ব শর্ত। মোস্তফা খামেনি নতুন নেতা নির্বাচিত হওয়ার পর ট্রাম্প সরাসরি তার বিরোধিতা করেন। ৬ই মার্চ তার নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লেখেন, নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ছাড়া ইরানের সাথে কোন চুক্তি হবে না। তিনি আরও যোগ করেন যে, শাসন ব্যবস্থা আত্মসমর্পণ করার পর এমন নেতা নির্বাচন করতে হবে যিনি হবেন মহান এবং গ্রহণযোগ্য। অর্থাৎ কে সেই নেতা হবেন তা পরোক্ষভাবে ট্রাম্পই ঠিক করে দিতে চান। এর জবাবে তেহরানের অবস্থান ছিল পাহাড়ের মতো অটল। কোনো আত্মসমর্পণ নয়, বোমাবর্ষণের মুখে কোনো আলোচনা নয় এবং বাইরে থেকে চাপিয়ে দেয়া কোনো নেতৃত্বও তারা মেনে নেবে না। বিশ্লেষকদের মতে মোস্তফা খামেনিকে নির্বাচন করাটা ছিল ওয়াশিংটনের এই উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতি তেহরানের একটি সরাসরি চপেটাঘাত। কারণ ট্রাম্প যাকে অগ্রহণযোগ্য বলেছেন, ইরানিস্টাবলিশমেন্ট ঠিক তাকেই বেছে নিয়েছে কেবলমাত্র এই কারণে যে, শত্রু তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। যদি ক্ষমতা পরিবর্তনই ট্রাম্পের লক্ষ্য হয়ে থাকে, তবে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তা ইতোমধ্যেই চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। ট্রাম্প এবং তার সামরিক উপদেষ্টারা বারবার ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করার কথা বলে আসছেন। তাদের প্রধান লক্ষ্য হলো ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল, সেই মিসাইল তৈরির কারখানা এবং নৌবাহিনী সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের সম্মিলিত হামলাগুলো ঠিক সেই লক্ষ্যেই পরিচালিত হচ্ছে। তারা মিসাইল অবকাঠামোর পাশাপাশি শ্রীলঙ্কার উপকূলে থাকা একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজেও আঘাত হেনেছে। এমনকি দুই দেশই দাবি করেছে যে, ইরানের আকাশসীমা এখন তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু ভূরাজনৈতিক সমীকরণে শুধুমাত্র আকাশ থেকে বোমা ফেলে কোনো রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করা যায় না। অধ্যাপক সেলুমের ভাষায়, সামরিক শক্তিকে এমন পর্যায়ে ব্যবহার করা হচ্ছে যা দিয়ে কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন করা কার্যত অসম্ভব। যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ইরানের হার্ডওয়্যার বা অস্ত্রশস্ত্র ধ্বংস করতে পারে। কিন্তু তারা আকাশ থেকে বোমা ফেলে একটি রাজনৈতিক বিকল্প তৈরি করতে পারবে না। তাহলে এই যুদ্ধে ইসরাইলের আসল উদ্দেশ্য কি? ইসরাইল দীর্ঘদিন ধরে ইরানকে তাদের সবচেয়ে বড় শত্রু হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের গালফ স্টাডিজ সেন্টারের পরিচালক মাহবুব জাউরি মনে করেন, ইসরাইল বর্তমান যুদ্ধটিকে একটি বৃহত্তর প্রকল্পের অংশ হিসেবে দেখছে। ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবরের হামাসের হামলার পর তারা পুরো মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র নতুন করে সাজাতে চাইছে। জাউরি বলেন, ইসরাইল মূলত ৭ অক্টোবরকে একটি অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছে। তাদের ভাষায় মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন করে রূপ দেয়ার জন্য ঠিক যেভাবে নাইন ইলেভেনের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র করেছিল, ইসরাইলের লক্ষ্য অত্যন্ত স্পষ্ট। তারা ইরানসহ এমন প্রতিটি সম্ভাব্য খেলোয়াড়কে নির্মূল বা পরাজিত করতে চায় যারা ভবিষ্যতে তাদের চ্যালেঞ্জ করার ক্ষমতা রাখে। আকাশপথে হামলার পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ভেতরে একটি বৃহত্তর অভ্যুত্থানের মঞ্চ তৈরি করতে অন্যান্য বিকল্প নিয়েও চিন্তা করেছে। এর মধ্যে একটি হলো কুর্দি বাহিনী দিয়ে ইরানি সামরিক বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালানো। ইরাকে কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে এবং এরবিলে তাদের একটি সামরিক উপস্থিতিও রয়েছে। কুর্দি নেতারা নিশ্চিত করেছেন যে, ট্রাম্প তাদের সাথে এই বিষয়ে আলোচনা করেছেন। কিন্তু বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন যে, ইরানের ভেতরে কুর্দি যোদ্ধাদের লেলিয়ে দেয়াটা একটি চরম মাত্রার ভুল পদক্ষেপ হতে পারে। অধ্যাপক সেলুমের মতে, ইরানি কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর এমন কোনো সক্ষমতা, ঐক্য বা লজিস্টিকস নেই যা দিয়ে তারা একটি আগ্রাসন চালাতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, কুর্দিদের যেকোনো বড় ধরনের সমর সজ্জা বা মোবিলাইজেশন তুরস্ককে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করবে। এর ফলে পুরো অঞ্চলে এমন একটি দ্বিতীয় সংকটের জন্ম হবে যা এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সামাল দেয়া প্রায় অসম্ভব। তাহলে স্থল অভিযান বা বুটস অন দ্যা গ্রাউন্ডের সম্ভাবনা কতটুকু? ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রী আব্বাস আরাগুচি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, মার্কিন স্থলা আগ্রাসনের যেকোনো সম্ভাবনার জন্য ইরান সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত রয়েছে। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনও এখনো পর্যন্ত স্থল অভিযানের সম্ভাবনাটি পুরোপুরি নাকচ করে দেয়নি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং ইতিহাসের পাতা ঘাটলে অন্য চিত্র দেখা যায়। ইউএস ভিত্তিক নিউ লাইনস ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজি এন্ড পলিসির সিনিয়র ডিরেক্টর কামরান বোখারী মনে করেন, ট্রাম্পের জন্য স্থল অভিযানের নির্দেশ দেয়াটা রাজনৈতিকভাবে এক প্রকার আত্মহত্যার শামিল হবে। কারণ ট্রাম্প এবারের নির্বাচনে জিতেছেন একটি যুদ্ধবিরোধী বা এন্টিওয়ার প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে। এর পাশাপাশি ইরাক এবং আফগানিস্তানে মার্কিন স্থলবাহিনীর চরম ব্যর্থতার স্মৃতি এখনো আমেরিকানদের তাড়িয়ে বেড়ায়। বোখারী বলেন, প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা এবং ইরাক-আফগানিস্তানের ব্যর্থতার কথা মাথায় রাখলে স্থলসেনা মোতায়েন করাটাই হলো সবচেয়ে অসম্ভব একটি বিকল্প। এতগুলো পরস্পর বিরোধী লক্ষ্য, সামরিক ব্যর্থতা এবং রাজনৈতিক হিসেব নিকেশের পর প্রশ্ন জাগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই যুদ্ধের একটি বাস্তবসম্মত শেষ পরিণতি বা রিয়ালিস্টিক এন্ডগেম আসলে কি হতে পারে? কিংস কলেজ লন্ডনের সিকিউরিটি স্টাডিজ এর সহযোগী অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিক মনে করেন, একটি দীর্ঘমেয়াদী স্থলযুদ্ধের বদলে জোরপূর্বক আপস বা কোয়ারসিভ সেটেলমেন্টই হলো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত বিকল্প। তার মতে, ওয়াশিংটন এখনো ইরানের শাসন ব্যবস্থার কিছু অংশের সাথে এমনকি আইআরজিসি সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালীদের সাথেও একটি সমঝোতায় আসতে আগ্রহী হতে পারে। যদিও প্রভাবশালীরা নিজেদের রাষ্ট্র বাঁচাতে মিসাইল প্রকল্প, পারমাণবিক বিধিনিষেধ এবং আঞ্চলিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যথেষ্ট ছাড় দিতে রাজি হয়, তবে ট্রাম্প সেটাকেই নিজের বিশাল বিজয় হিসেবে দাবি করতে পারবেন। পাকিস্তান-চীন ইনস্টিটিউটের মোস্তফা হায়দার সৈয়দও এই মতের সাথে একমত। তিনি ট্রাম্পের ব্যবসায়ী বা প্রাগমেটিস্ট চরিত্রের কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, ট্রাম্প মূলত একজন বাস্তববাদী মানুষ। তিনি একটি চুক্তি করতে চাইবেন, ঘোষণা করবেন যে যুক্তরাষ্ট্র তার সমস্ত লক্ষ্য অর্জন করেছে এবং তারপর এই যুদ্ধে সমাপ্তি টানবেন। রাজনৈতিক সমীকরণ বলছে, ট্রাম্প খুব সহজে এই যুদ্ধের বিজয়ের সংজ্ঞাটি নতুন করে লিখতে পারেন। তিনি নিজের দেশের জনগণের সামনে দাঁড়িয়ে বলতে পারেন যে, আলী খামেনিকে হত্যা করা হয়েছে, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ও মিসাইল কাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। অতএব আমেরিকা জয়ী হয়েছে। এর বাইরে গিয়ে তিনি যদি সত্যিই একটি স্থল যুদ্ধ শুরু করেন, তবে তা অভ্যন্তরীণভাবে তার জন্য চরম রাজনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনবে এবং আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন বা মিডটার্মে তার দলের ভরাডুবি নিশ্চিত করবে। পরিশেষে বলা যায়, জিওপলিটিক্সের এই দাবা খেলায় ট্রাম্প হয়তো শুরুটা করেছেন খুব আগ্রাসীভাবে। কিন্তু শেষ চালটি দেওয়ার আগে তাকে নিজের দেশের রাজনৈতিক অবস্থান এবং মধ্যপ্রাচ্যের অদম্য বাস্তবতার কথাটি সবচেয়ে বেশি মাথায় রাখতে হবে। কারণ বোমার আওয়াজ একসময় থেমে যায়, কিন্তু সেই ধ্বংসস্তুপের উপর দাঁড়িয়ে থাকা রাজনৈতিক সমীকরণগুলোই ঠিক করে দেয় ইতিহাসের পাতায় কার নামের পাশে লেখা থাকবে বিজয়ের মুকুট আর কে হবে চরম ব্যর্থতার প্রতীক।



