[0:00]এটা উত্তর কোরিয়া। পৃথিবীর সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন আর স্বৈরাচারী দেশগুলোর একটি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রতিষ্ঠা সময় থেকেই এখানে চলছে কিম পরিবারের শাসন। জুচে ভাবাদর্শের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠা দেশটির শাসন ব্যবস্থায় জোর দেওয়া হয় আত্মনির্ভরশীলতা আর নেতার প্রতি আনুগত্যের উপর। যার ভিত তৈরি করে দিয়ে গিয়েছিলেন কিম ইল-সাং। যা আরো শক্তিশালী হয় তার ছেলে কিম জং-ইল-এর সময়ে। আর এখন চলছে সেই পরিবারেরই উত্তরাধিকারী কিম জং-উন-এর শাসন। জানেন হয়তো, কোনো ভিন্ন মত এখানে সহ্য করা হয় না। আর সর্বোচ্চ নেতার হাতে থাকে অবাধ ক্ষমতা। খাদ্য সংকট, ভিন্নমত পোষণকারীদের জন্য কঠোর শাস্তি এবং দেশত্যাগীদের কাছ থেকে পাওয়া ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিবরণ সত্ত্বেও এই শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তনের কোন সম্ভাবনা আপাতত নেই বললেই চলে। পশ্চিমারা দীর্ঘদিন ধরে আশা করে আসছে যে উত্তর কোরিয়া চীনা ও রুশ প্রভাব থেকে বেরিয়ে এসে তাদের দক্ষিণের প্রতিবেশীদের মতো গণতন্ত্র গ্রহণ করবে। কিন্তু এটা কখনোই সম্ভব বলে মনে হয়নি। তাহলে প্রশ্ন হলো, সেখানে কখনোই কেন শাসন ব্যবস্থায় পরিবর্তন, কোনো সফল গণঅভ্যুত্থান বা সামরিক অভ্যুত্থান হয়নি? মানে, শেষ কবে আপনি কিম পরিবারের একচ্ছত্র ক্ষমতার উপর কোনো অভ্যুত্থানের চেষ্টার কথা শুনেছেন? কিম পরিবার ৭০ বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশ শাসন করছে। এর সময়ের মধ্যে যদিও একাধিক দুর্ভিক্ষ, অর্থনৈতিক সংকট এবং নেতৃত্বের ব্যর্থতাও দেখা গেছে। এখন প্রশ্ন করতে পারেন, নাগরিকদের এত দুর্ভোগ সত্ত্বেও কেন সফল কোনো বিদ্রোহ বা অভ্যুত্থান হয়নি? মোটা দাগের উত্তর, এজন্য এমন এক রাজনৈতিক ব্যবস্থা দরকার যা অন্য কোনো ব্যবস্থার চেয়ে নেতার প্রতি বেশি আনুগত্যকে উৎসাহিত করে। এছাড়াও একটি সামরিক অভ্যুত্থান কখন এবং কিভাবে সংঘটিত হয়, সেটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সাধারণ অভ্যুত্থান প্রক্রিয়ায় সেনাবাহিনী অথবা সেনাবাহিনীর একটি অংশ রাজধানী বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবনের দিকে অগ্রসর হয় এবং নেতাদের পদত্যাগ করতে বলে অথবা জোর করে ক্ষমতা দখল করে। এগুলো সাধারণত অসন্তুষ্ট জেনারেলদের নেতৃত্বে হয়, যাদের পেছনে সরকারের সদস্য বা এমনকি বিদেশী সরকারের সমর্থন থাকে এবং প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সাধারণ মানুষেরও সমর্থন থাকতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২০ সালে মালিতে বা ২০২২ সালে বুর্কিনা ফাসোতে সফল অভ্যুত্থানে উচ্চপদস্থ সামরিক কর্তাদের নির্দেশে সেনারা রাষ্ট্রপতিকে গ্রেফতার করেছিল। এমনকি ওই সরকারের নীতিগত ব্যর্থতার কারণে যেসব নাগরিকরা অসন্তুষ্ট ছিলেন, তারাও নৈতিকভাবে সমর্থন দিয়েছিল। তাহলে এই ফর্মুলা উত্তর কোরিয়ায় কেন কাজ করে না? প্রথমত, কিম পরিবার বিশেষ করে সাম্প্রতিক দশকগুলোতে অভ্যুত্থান এড়ানোর জন্য দেশের রাজনৈতিক অভিজাতদের নির্মমভাবে সরিয়ে দিয়েছে। যখনই রাজনৈতিক শ্রেণি এবং সামরিক নেতারা সম্মিলিতভাবে মনে করেন যে, তাদের অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে বা সর্বোচ্চ নেতাকে প্রতিস্থাপন করা দরকার, তখনই অভ্যুত্থানের ঝুঁকি খুব বাস্তব হয়ে ওঠে। কিন্তু যদি উত্তর কোরিয়ার অভিজাত শ্রেণীর এই অংশগুলোকে নিয়মিত বিরতিতে হত্যা করা বা কারারুদ্ধ করা হয়, তাহলে সমস্যাটা অনেকাংশেই সমাধান হয়ে যায়। যেমন ধরুন ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে যখন উত্তর কোরিয়া তাদের কোরিয়ান পিপলস আর্মি বা গণফৌজের ৭৫তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উদযাপন করছিলো, তখন বরাবরের মতো সামরিক কুচকাওয়াজে তাদের আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। অবধারিতভাবে সেখানে সামরিক ও রাজনৈতিক উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকেন। কিন্তু এ বছর দেশটির পলিটিক্যাল ব্যুরো, যা কমিউনিস্ট শাসনের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক মন্ত্রিসভা, সেখান থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সদস্য কুচকাওয়াজে উপস্থিত ছিলেন না। অথচ তাদের সেখানে থাকার কথা ছিল। এর কারণ হলো, কুচকাওয়াজের আগের কয়েক সপ্তাহ কিম জং-উন পার্টি সচিবালয়ের ১২ জন কর্মকর্তার মধ্যে ৫ জন এবং ১৭ সদস্যের পলিটিক্যাল ব্যুরোর ৭ জনকে প্রতিস্থাপন কারছিলেন বলে জানা যায়। এর আগে কিম জং-উন যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন তিনি একেবারেই তরুণ, অনভিজ্ঞ। তার প্রথম বছরগুলো ছিল বিশেষভাবে বিপজ্জনক। কারণ তখনই তার কর্তৃত্ব ছিল সবচেয়ে বেশি প্রশ্নবিদ্ধ। প্রতিষ্ঠিত অভিজাতদের কাছ থেকে বিশ্বাসঘাতকতা এবং পেছন থেকে ছুরি মারার আশঙ্কা ছিল প্রবল। তাই তার বাবা ক্ষমতা সুসংহত করার জন্য যা করার, করেছিলেন ঠিক তাই। তিনি ২০১০ সালে তার মৃত্যুর কিছুদিন আগে পলিটিক্যাল ব্যুরোর প্রায় ৮০% সদস্যকে প্রতিস্থাপন করেন। যাতে তার ছেলে কোনো চ্যালেঞ্জ ছাড়াই গ্রহণ করতে পারে ক্ষমতা। কয়েক মাস পর ক্ষমতা গ্রহণের পর পার্টির সম্মেলনে কিম জং-উন পলিটিক্যাল ব্যুরোর আরো অন্তত ৪২% এবং ২০২৩ সালে ফের ১৩% সদস্যকে প্রতিস্থাপন করেন। এর আগে ২০১২ সালে সেনাবাহিনীর উপমন্ত্রী কিম চল-কে কিম জং-ইল-এর মৃত্যুর পর সরকারি শোক পালনের সময় মদ্যপান ও হই-হুল্লোড় করার অভিযোগে দেওয়া হয়েছিলো মৃত্যুদণ্ড। উত্তর কোরিয়ার সেনাপ্রধান রি ইয়ং-হো, যিনি এমনকি কিম জং-উন-কে তার বাবার কাছ থেকে ক্ষমতা গ্রহণের জন্য প্রশিক্ষণ দিতে সাহায্য করেছিলেন, অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে দ্বিমত পোষণ করায় তাকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিলো বলে জানা যায়। ২০১৭ সালে কিম জং-উন-এর সৎ ভাই কিম জং-নাম, যিনি একসময় কিম পরিবারের উত্তরাধিকারী বলে বিবেচিত হতেন, তাকেও কিম জং-উন হত্যা করেন বলেও অভিযোগ আছে। রাজনৈতিক সংস্কারের পক্ষে কথা বলায় কিম জং-নাম চীনে নির্বাসনে ছিলেন। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে কুয়ালালামপুর বিমানবন্দরে একটি নার্ভ এজেন্ট প্রয়োগ করে তাকে হত্যা করা হয়। এমনকি তার অত্যন্ত প্রভাবশালী চাচা, জ্যাং সং থেক, যিনি কিম-এর আক্ষরিক অর্থেই অভিভাবক ছিলেন, তাকেও দেওয়া হয়েছিল মৃত্যুদণ্ড। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে ৬৭ বছর বয়সী জ্যাং তার ভাগ্নেকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা করেছিলেন বলেও অভিযোগ আছে। তবে এটি নতুন তরুণ নেতার নেওয়া আরেকটি সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হতে পারে বলেও মনে করেন অনেক বিশ্লেষক। এগুলো উত্তর কোরিয়ায় চালানো শুদ্ধি অভিযানের অনেক উদাহরণের মধ্যে কয়েকটি মাত্র। এতে দেশটির সর্বোচ্চ নেতার নীতির বিরোধিতাকারীদের সরিয়ে দেয় শুধু নয়, ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখার পথে যেকোনো কাঁটাও অপসারণ করেছে কিম পরিবার। সাথে সম্ভাব্য যেকোনো অভ্যুত্থানের আশঙ্কাও দূর করেছে তারা।
[6:22]এই শুদ্ধি অভিযানগুলোর নৃশংসতা কিম পরিবারের নিরাপত্তা ও ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য দারুণ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার মানে এই নয় যে মানুষ তাদের থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার চেষ্টা কখনোই করেনি। আসলে এমন বেশ কয়েকবার হয়েছে যখন উত্তর কোরিয়ার অভ্যুত্থানের পরিকল্পনাকারীরা কিম পরিবারকে ক্ষমতাচ্যুত করার খুব কাছাকাছি চলে এসেছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ঘটনাটি ঘটেছিলো যুদ্ধ পরবর্তী সময়ের প্রথম দিকে। কিম ইল-সাং উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা এবং দীর্ঘতম সময়ের সর্বোচ্চ নেতা, দেশের অভ্যন্তরে চীনপন্থী এবং সোভিয়েতপন্থী গোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকেই সবচেয়ে শক্তিশালী বিরোধিতা এবং চাপের মুখোমুখি হয়েছিলেন। এদের মধ্যে একটি ছিল সোভিয়েত কোরিয়ানরা, যারা ছিলো জাতিগতভাবে কোরিয়ান। রাশিয়াতে জন্ম ও বা বেড়ে ওঠার পর যুদ্ধোত্তর কোরিয়ায় ফিরে এসেছিলেন, যাদের অনেকেই কিম ইল-সাং-এর মতো রেড আর্মিতে যুদ্ধও করেছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পিয়ংইয়ং-এর উন্নয়নের গোড়ার বছরগুলোতে উত্তর কোরিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের ঘনিষ্ঠ যোগ ছিল। এদিকে এই অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার আরেকটি মূল গোষ্ঠী ছিল ইয়ান'আন গোষ্ঠী। এরা ছিল চীনপন্থী কমিউনিস্ট এবং গঠিত হয়েছিল কোরিয়ান নির্বাসিতদের নিয়ে। যারা যোগ দিয়েছিল চীনা কমিউনিস্ট পার্টি সিসিপিতে। তাদের অনেকেই যুদ্ধ করেছিল চীনা সেনাবাহিনীতে, যে কারণে তারা মাও সেতুং-এর প্রতি বেশি অনুগত ছিলেন। যদিও এদের বেশিরভাগই শেষ পর্যন্ত উত্তর কোরিয়ার ওয়ার্কার্স পার্টিতে মিশে যায়। কিন্তু ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়, রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কোরিয়ানদের এই গুরুত্বপূর্ণ দলগুলো নিজ দেশের চেয়ে আশেপাশের দেশগুলোর রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং আরও গুরুত্বপূর্ণভাবে- সামরিক বাহিনীর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। কিম জানতেন যে ক্ষমতা সুসংহত করার জন্য তাকে এই দলগুলোকে সরিয়ে ফেলতে হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত একই সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে চলছিলো ডি-স্টালিনাইজেশন। অর্থাৎ স্টালিনের প্রচণ্ড কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থা থেকে সোভিয়েত রাজনীতিকে বের করে এনে খানিকটা সংস্কারের চেষ্টা করছিলেন তৎকালীন সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ।
[8:29]১৯৫৬ সালের গ্রীষ্মে ক্রুশ্চেভ ৬ সপ্তাহের জন্য মস্কোতে ডেকে পাঠান কিম-কে। সোজা কথায় তাকে পথে আসতে বলেন। তখনই সোভিয়েত ও চীনা দলগুলোর নেতারা এক বৈঠকে কিম-এর দেশে প্রত্যাবর্তনের পর তাকে আক্রমণ করার পরিকল্পনা তৈরি করেছিলেন। কিন্তু কিম-এর অনুগতরা যাদের অনেকেই ওই ষড়যন্ত্রে পরোক্ষভাবে জড়িত ছিল, শেষ পর্যন্ত তারা পিছিয়ে আসে। চলে যায় বিরোধীদের বিপক্ষে। শাস্তির ভয় ছাড়াও এর একটি বড় কারণ ছিল যে, কিম-এর বিরোধী এই দলগুলোকে বহিরাগত এবং দেখা হতো বিদেশী এজেন্ট হিসেবে। যেখানে কিমকে দেখা হতো একজন প্রকৃত কোরিয়ান হিসেবে। আর বেশিরভাগ পার্টি সদস্যের কাছে একজন নৃশংস কোরিয়ান নেতা চীন বা রাশিয়ার প্রতি অনুগত নেতার চেয়ে ভালো ছিল। এরপর কি ঘটলো তা হয়তো আপনি খানিকটা আন্দাজ করে ফেলেছেন। চালানো হলো আরো শুদ্ধি অভিযান। উভয় দলের অনেক সদস্য শুদ্ধি অভিযান থেকে বাঁচতে চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নে পালিয়ে গেলেন। যদিও চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন কিমকে শুদ্ধি অভিযান না চালানোর পরামর্শ দিয়েছিল। তবে তিনি তা শোনেননি। ১৯৫৯ সালের মধ্যে, গণপরিষদের ২৫% এরও বেশি সদস্যকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ১৯৬০ এর দশকের শেষের দিক, উভয় দলের প্রত্যেক সদস্যকে বহিষ্কার বা মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। ১৯৯০ এর দশকে আবার একটি অভ্যুত্থানের চেষ্টা হয় উত্তর কোরিয়ায়। ১৯৯৪ সালে কিম ইল-সাং-এর মৃত্যুর কাছাকাছি সময়ে এই অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা খুবই একটা আশ্চর্যের বিষয় নয়। কারণ ওই সময়ে উত্তর কোরিয়ার মানুষ চরম খাদ্য ঘাটতি ও দুর্ভিক্ষের সম্মুখীন হয়েছিল। যার ফলে দাঙ্গা, কর্মবিরতি এমনকি খাদ্য বিতরণ কর্মকর্তাদের মারধরের ঘটনাও ঘটে। অনুমান করা হয় যে ওই দুর্ভিক্ষে দেশটির ১০ লাখের বেশি মানুষ মারা গিয়েছিল। এর সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের ঘটনায় উত্তর কোরিয়া তাদের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদারকে হারায়। সেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য উত্তর কোরিয়ার আরেক মিত্র চীন যথেষ্ট ছিল না। যে কারণে পরিস্থিতি ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিলো। এমন অবস্থায় একটি গণবিদ্রোহ ছিল কেবল সময়ের অপেক্ষা। এমনকি বিভিন্ন অঞ্চলে ততদিনেই শুরু হয়ে গিয়েছিল বিক্ষোভ আন্দোলনও। এই সময়েই উত্তর কোরিয়ার গণবাহিনীর একাংশ এবং হামহুই-এর সদর দফতরে অবস্থিত সপ্তম কোর তাদের নিজস্ব অভ্যুত্থান পরিকল্পনা তৈরি করে। সংস্কারকামী ৩০ জনেরও বেশি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা IAEA যখন দেশটিতে পরিদর্শনে এসেছিল, ঠিক তখনই একটি বিদ্রোহ করার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা চেয়েছিলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জানাতে যে, তাদের সমর্থন প্রয়োজন। কিন্তু এবারও কিম পরিবারের জয় হয়। IAEA সেখানে পৌঁছানোর আগেই ষড়যন্ত্রকারীদের সব সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। যেহেতু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়াকে গোপনীয় পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে IAEA-কে তদন্ত পরিচালনার অনুমতি দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছিল, উত্তর কোরিয়া মনে করছিল যে IAEA তাদের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করছে এবং আসলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তাবেদারি হিসেবে কাজ করছে। যে কারণে পরের বছর ১৯৯৪ সালে উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক বিস্তার রোধ চুক্তি নিউক্লিয়ার প্লোরিফারেশন ট্রিটি থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়। এতে করে সংস্থাটি, যাকে তারা মার্কিন পুতুল হিসেবে দেখতো, তাদের উত্তর কোরিয়ার পরমাণু কর্মসূচি পরিদর্শনের পথ বন্ধ হয়ে যায়। এদিকে ১৯৯৩ সালে যখন IAEA-কে কেন্দ্র করে ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দেওয়া হয়, সেসময় সিনুইজুতে আরেকটি সামরিক ইউনিট ছোট পরিসরে একটি বিদ্রোহ করেছিল। কিন্তু তারাও পরাজিত হয় এবং পরে বিদ্রোহীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। এরই মধ্যে দুর্ভিক্ষের প্রভাবে বিভিন্ন জায়গায় শ্রমিকদের মধ্যে চলা দাঙ্গা থামার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল না। অন্যদিকে ১৯৯৫ সালের দিকে কিম জং-ইল-কে হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে ১০ জন সামরিক কর্মকর্তাকে দেওয়া হয় মৃত্যুদণ্ড। যদিও এই তথ্য নির্ভুল কিনা তা নিশ্চিত করা কঠিন। কারণ পরস্পরবিরোধী প্রতিবদেন এবং কিম পরিবারের পক্ষ থেকে এই ধরনের কোনো ঘটনা ঘটার অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করা হয়েছে। উত্তর কোরিয়ার এই চরম অস্থিতিশীলতার সময়ে চংজিন-এ ষষ্ঠ আর্মি কোরের অভ্যুত্থানের চেষ্টাকে সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলা যেতে পারে। ১৯৯৫ সালে এই অভ্যুত্থানের চেষ্টা সংঘটিত হয়েছিল বলে মনে করা হয়। দুর্ভিক্ষের সময় হামহুং-এর মতো প্রদেশগুলোতে খাদ্য না পাঠানোর পিয়ংইয়ং-এর সিদ্ধান্তে ক্ষুদ্ধ ছিল ষষ্ঠ আর্মি কোরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। তারা পরিকল্পনা করে চংজিন-এর যোগাযোগ কেন্দ্র, বন্দর, কিছু ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং বিশ্ববিদ্যালয় দখল করার। তারপর তারা হামহুং-এর উপকূলে সপ্তম কোরকে তাদের সাথে যোগ দেওয়ার জন্য ডাকবে এবং তারা সবাই মিলে পিয়ংইয়ং-এর দিকে অগ্রসর হয়ে রাজনৈতিক অভিজাতদের গ্রেফতার করবে এবং দেশের শাসন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ নেবে। তবে এই পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ওই অঞ্চলের ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাগুলো নিয়ন্ত্রণে নেওয়া। কারণ ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাগুলো নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তারা সেই সুবিধা ব্যবহার করে দাবি জানাতে পারতো। কিন্তু আবারও রাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ আগে থেকেই জেনে যায় এই ষড়যন্ত্রের খবর। চংজিন স্থাপনায় অভিযান চালিয়ে অভ্যুত্থান শুরু হওয়ার আগেই গ্রেফতার করা হয় জড়িত সবাইকে। কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে ষষ্ঠ কোরের প্রধান কিম ইয়ং-চুন নিজেই রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিভাগে গিয়েছিলেন এবং নিজের কোরের বিরুদ্ধেই তথ্য ফাঁস করেছিলেন। এমনও গল্প আছে যে সোভিয়েত ইউনিয়নের মিলিটারি একাডেমিতে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত কোরিয়ান সেনারা সর্বোচ্চ নেতা কিম ইল-সাং-এর মৃত্যুর পর উত্তর কোরিয়ায় ফেরত আসে এবং পরে একাধিক অভ্যুত্থান প্রচেষ্টায় জড়িত ছিল। এই সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে ৩০ থেকে ৪০ জন ১৯৯২ সালে একটি সামরিক কুচকাওয়াজের সময়ে কিম জং-ইল-এর দিকে তাদের ট্যাংক ঘুরিয়ে দিয়ে তাকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। এবং কেউ কেউ মনে করেন যে তারা সম্ভবত ষষ্ঠ কোরের অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার সাথেও জড়িত ছিল। যদিও এ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি। কিছু বিশেষজ্ঞ মান করেন যে ষষ্ঠ কোরের অভ্যুত্থানটি সফল হতে পারেনি কারণ কিম জং-ইল ইতিমমধ্যেই তাদের সরিয়ে ফেলার পরিকল্পনা করছিলেন। কারণ চীনা সীমান্তে যে লাভজনক বাণিজ্য ছিল সেখান থেকে খুব বেশি অংশ চলে যাচ্ছিল তাদের হাতে। কিন্তু এই সময় চলা দুর্ভিক্ষের কারণে সাধারণ অনেক সৈন্যও অনাহারে মারা যায়। যে কারণে হতাশা থেকেও সম্ভবত একটি বিদ্রোহের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু অভ্যুত্থান পরিকল্পনাকারীদের ভাগ্য তাদের সহায় ছিল না। অভ্যুত্থান ঘটানোর আগেই গ্রেফতার হয় তাদের। এই ঘটনায় প্রায় ৪০০ কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, কারারুদ্ধ করা হয় কিংবা নিখোঁজ হয়ে যান। অর্থাৎ দেশের সবচেয়ে চরম অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের সময় তাদের সেনাবাহিনীর একটি প্রধান ইউনিটকে সম্পূর্ণ রূপে নির্মূল করা হয়েছিল। তবে যাই ঘটুক না কেন, সবকিছু এটাই প্রমাণ করে যে, উত্তর কোরিয়ায় একটি অভ্যুত্থান সফল হওয়ার সম্ভাবনা কতটা কম। কারণ যখনই কোন অভ্যুত্থান পরিকল্পনা সামনে এসেছে, তা আগে থেকেই আঁচ করতে পেরেছে কিম পরিবার ও ক্ষমতাসীন উচ্চপদস্থরা। এবং অবশ্যই এর পরে যে শুদ্ধি অভিযানগুলো চালানো হয়েছে, তাতে করে সমস্ত রাষ্ট্রবিরোধী শক্তিকে হত্যা বা নির্মূল করা হয়েছে। যার ফলে পরবর্তী সময়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেখানে কোন সফল অভ্যুত্থান ঘটানো সম্ভব হয়নি। কারণ সমস্ত বিরোধী শক্তি হয় ইতিমধ্যেই মৃত কিংবা শ্রম শিবিরে বন্দী হয়ে আছে। একই সময়, অভ্যুত্থান ঘটাতে চাওয়া এই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সংখ্যাও যে খুব বেশি ছিল তা বলার সুযোগ নেই। কারণ শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকর্তারা এত বেশি নগদ টাকা এবং বিলাসবহুল জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত যে, তাদের অবস্থা পরিবর্তন করার কোন ইচ্ছে নেই। সাধারণ অবস্থা থেকে উচ্চপদে আসায় এই অনুসারীরা কিমের কাছে সবদিক থেকেই যেমন ঋণী, তেমনি তারা খুব ভালো করেই জানে যে, যদি কিমের পতন হয় তবে তাদের পতনও অবশ্যম্ভাবী। এতে করে তারা কিম পরিবারের প্রতি আরো অনুগত হয়ে ওঠে এবং কোন অভ্যুত্থান প্রচেষ্টায় যোগ দেওয়ার আগ্রহ তাদের নেই। এদিকে সাধারণ সৈন্য এবং কর্মকর্তাদের খুব কমই তাদের নিজ শহরে মোতায়েন করা হয়। তার পরিবর্তে তাদের পাঠানো হয় দূরবর্তী অঞ্চলগুলোতে। এভাবে তাদের কর্মস্থলে সহকর্মীদের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের পথ বন্ধ করে দিয়ে অভ্যুত্থানের আশঙ্কা অনেকটাই কমিয়ে দেওয়া হয়। যদিও এই কর্তৃত্ববাদী শাসন এবং বিরোধীদের দমন একনায়কতন্ত্রের সবসময় দেখা যায়, তবে আধুনিক যুগে কিম পরিবারের এত দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতা ধরে রাখা বেশ বিস্ময়কর এবং অনন্য। চরম কর্তৃত্বের সাথে এত দীর্ঘ সময় ধরে একটি পরিবারের হাতে দেশ শাসন ইতিহাসে খুবই বিরল। এখন প্রশ্ন করতে পারেন, পশ্চিমা শক্তিগুলো এখানে কি হস্তক্ষেপ করছে না? মোটা দাগে বললে, অন্যান্য দেশের সরকার উৎখাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ত থাকার উদাহরণের অভাব নেই। বিশেষ করে যখন তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কথা শোনে না। কেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজে বা সম্মিলিত জোট নেটোর মাধ্যমে কিংবা একটি অভ্যুত্থান ঘটিয়ে কিম পরিবারকে সরিয়ে দিচ্ছে না? বিশেষ করে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে সরকার পতনে যখন তারা এত পারদর্শী। উত্তর কোরিয়ার শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তনে কোন বিদেশী শক্তির সফল না হওয়ার প্রধান কারণ হলো তারা আসলে আপনার ধারণার চেয়েও বেশি শক্তিশালী। প্রথম সমস্যা হলো সাধারণ নাগরিকদের মধ্য থেকে বিদ্রোহ হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ সেখানে থ্রি জেনারেশন রুল বা তিন প্রজন্মের শাস্তির নিয়ম রয়েছে। যেখানে শুধু একজনের দেশদ্রোহিতার জন্য তাকেই জেলখানায় পাঠানো হয় না। বরং তার পরিবারের তিন প্রজন্মকেও পাঠানো হয়। সুতরাং সেখানে বিদ্রোহের ব্যর্থ প্রচেষ্টার অর্থ তার পরিবারের উপর অভিশাপ নেমে আসা। এদিকে বিদেশী শক্তিগুলোর অভ্যুত্থান বা বিদ্রোহে সাহায্য করার চেষ্টার দ্বিতীয় সমস্যা হলো সিআইএ-এর সাধারণ কৌশল উত্তর কোরিয়ায় খাটে না। রাজনৈতিক বিরোধী দলগুলোকে সমর্থন যোগানো, বিক্ষোভ আয়োজনে সাহায্য করা, এবং গণতন্ত্রপন্থী এনজিও-র মতো সংগঠনগুলোকে অর্থায়ন করে নাগরিকদের মধ্যে ক্ষোভ উসকে দিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার ওয়াশিংটনের যে কৌশল, তা উত্তর কোরিয়ায় অসম্ভব। কারণ দেশটি খুবই বিচ্ছিন্ন। এই ধরনের সংগঠনগুলোর দেশটিতে প্রবেশের কোন পথই নেই বলতে গেলে। যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েত পরবর্তী রাষ্ট্র যেমন আর্মেনিয়া, জর্জিয়া বা ইউক্রেনে বিপ্লব উসকে দিতে পেরেছিল। কারণ সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ওই দেশগুলোতে তথ্যের স্বাধীনতা বড় একটা ভূমিকা রেখেছিলো। মার্কিন সরকারের ডেমোক্রেসি অ্যাসিস্টেন্স প্রোগ্রামস বা গণতন্ত্র সহায়তা কর্মসূচির মাধ্যমে উত্তর কোরিয়ার রাজনৈতিক বিপ্লবের বীজ বপন করার কোন সুযোগ নেই। কারণ তথ্যের এই যুগেও এই দেশটি বলতে গেলে বিচ্ছিন্ন। আর এটাই বলে দেয় অনেক কিছু। উত্তর কোরিয়ার সীমান্ত এককথায় নিশ্চিদ্র। গণতন্ত্রপন্থী কোন গোষ্ঠী সেখানে প্রবেশ করে কোন প্রভাব ফেলতে পারবে এমন ধারণা অবাস্তব। বিশেষ করে এই মুহূর্তে কিম জং-উন-এর দেশের উপর নিয়ন্ত্রণ কতটা দৃঢ় তা বিবেচনা করলে। আমরা আগেও দেখেছি দক্ষিণ কোরিয়ার কোন মিডিয়া দেশে প্রবেশ করলে কত দ্রুত ব্যবস্থা নেন তিনি। বিচ্ছিন্নতার দিকটি ছাড়াও উত্তর কোরিয়া আসলে একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক সামরিক শক্তি। অবশ্যই তাদের পারমাণবিক অস্ত্রাগার সম্পর্কে জানেন আপনি। বলতে পারেন তা হয়তো কিছুটা অতিরঞ্জিত। কিন্তু তা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক সম্পর্কে এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বাধা। কিম জং-উন-এর শাসনামলে তার বাবার আমলের তুলনায় ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের পরিমাণ বেড়েছে ১০ গুণ। সবচেয়ে কম বয়সী নেতা কিম জানেন তার সুবিধা কোথায়। সুতরাং যদি উত্তর কোরিয়ার শাসকগোষ্ঠী জানতে পারে যে কিম জং-উন-কে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য কোন ধরনের পশ্চিমা ষড়যন্ত্র চলছে এবং তারা যদি মনে করে যে এটি কিম পরিবারের টিকে থাকার জন্য এবং সেই দেশের অস্তিত্বের জন্য হুমকি, তাহলে সিওল বা এমনকি ওয়াশিংটন ডিসির দিকে পারমাণবিক বোমা ছুড়তে তাদের কে বাধা দেবে? যদি তারা মনে করে যুক্তরাষ্ট্র রয়েছে এর পেছনে। এভাবে ভাবলে ওয়াশিংটনের জন্য ঝুঁকিটা ঠিক নেওয়ার মতো নয়। এটা হয়তো অবিশ্বাস্য শোনাতে পারে। কিন্তু কিম পরিবার ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য কি করতে পারে, তা ধারণা করা আপনার আমার সাধ্যের বাইরে। যাই হোক, শুধু পারমাণবিক অস্ত্রই নয়। উত্তর কোরিয়ার কাছে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ আর্টিলারি ফোর্স। তাদের প্রচলিত বাহিনীও বিশাল, বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম সেনাবাহিনী তাদের, যেখানে আনুমানিক ১.২ মিলিয়ন বা ১২ লক্ষ সৈন্য রয়েছে। পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ পারমাণবিক অস্ত্রাগারের পাশাপাশি তাদের কাছে রাসায়নিক ও জৈব অস্ত্রও রয়েছে বলে বিশ্বাস করা হয়। এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তারা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি ও পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে। যখন ঝুঁকি নিয়ে খেলার কথা আসে, তখন উত্তর কোরিয়া হলো এক অপ্রত্যাশিত শক্তি বা ডার্ক হর্স। আর এই কারণেই বিদেশী শক্তিগুলোর প্রকাশ্যে কোন অভ্যুত্থানে সহযোগিতা বা বিপ্লব উসকে দেওয়ার চেষ্টা করা সম্ভব নয়। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি হচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া, বিশেষ করে সিউলের জন্য। পিয়ংইয়ং-এর আশপাশে এবং কোরিয়ার সীমান্তে সিউলের দিকে যে সংখ্যক কামান দাগ করা রয়েছে, তাতে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে নগরীটি। আর পুতিন ও কিম-এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক কিংবা চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সমর্থনের কারণে উত্তর কোরিয়ায় একটি সামরিক অভিযান চালানো হলে, তা এই জোটের বিরুদ্ধে পশ্চিমা আক্রমণ হিসেবে দেখা হতে পারে। এতে করে তৈরি হতে পারে নতুন বিপদ। আপাতত উত্তর কোরিয়ার শাসন ক্ষমতা থেকে কিম পরিবারের পতনের কোন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। যদিও অনেকদিন ধরে ভবিষ্যদ্বাণী করা হচ্ছে এই পরিবারের পতনের বিষয়ে। তবে সম্প্রতি কিমের নিয়ন্ত্রণে কিছুটা দুর্বলতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। কার্নেগী এন্ডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস ২০২৪ সালে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়ার অর্থনৈতিক সমস্যা নতুন সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। কারণ তারা দীর্ঘস্থায়ী খাদ্য ঘাটতি সত্ত্বেও তাদের জিডিপি-র ৩০% পর্যন্ত প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করে চলেছে। বাধ্যতামূলক শ্রম শিবির এবং মৃত্যুদণ্ডের মাধ্যমে জনসাধারণের মধ্যে প্রথিত করা মতাদর্শগত শিক্ষা এবং ভয় তার তেজ কিছুটা হারাতে শুরু করেছে।
[22:44]সেই সাথে আনুগত্যের লৌহকঠিন সংস্কৃতি আগের মতো নেই। এছাড়াও কিম পরিবারের চতুর্থ প্রজন্মকে ঘিরে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। কিম জং-উন তার কন্যা কিম জু-আয়-কে তার উত্তরাধিকারী হিসেবে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন বলে জানা গেছে। এটি একটি বড় অভ্যন্তরীণ সমস্যা তৈরি করতে পারে। সাধারণত যখন সময় আসে উত্তরাধিকার নিয়ে বিবাদ সবসময়ই একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে এটা স্পষ্ট যে নতুন ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট উত্তর কোরিয়া সহ সকলকেই আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। এই পরিস্থিতিতে কিম পরিবারের শাসনের ভিত আরো মজবুত হবে না ভেঙে পড়বে, তা কেবল সময়ই বলতে পারবে।


![Thumbnail for Precardium Examination Video [Comprehensive_For Under & Post Graduates] by Dr Adil Mahmood Ranjha](/_next/image?url=https%3A%2F%2Fimg.youtube.com%2Fvi%2FxMOrOmAHypk%2Fhqdefault.jpg&w=3840&q=75)
