[0:00]অস্ত্র হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের আর্চ ডিউক ফার্দিনেন্ড বসে আছেন তার গাড়িতে।
[0:09]সাথে তার স্ত্রী সোফি ডাচেস অফ উডেনবার্গ গিয়েছেন নিজেদের সাম্রাজ্যেরই একটা অংশ দেখতে।
[0:19]হঠাৎই ছুটে এলো এক আততায়ী গাড়ির পাদানি দাঁড়িয়ে পয়েন্ট ব্ল্যাক রেঞ্জে পর পর কয়েকবার গুলি। স্বামীর কোলে ঢলে পড়লেন সোফি। শরীরের দুটি গুলি নিয়ে একই সাথে জ্ঞান হারালেন আর্চ ডিউক। বলছিলাম এমন একটা সময়ের কথা যা পাল্টে দিয়েছিল সমগ্র পৃথিবীর ইতিহাস। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের জের ধরেই শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। অতঃপর 85 লক্ষ সৈন্য আর এক কোটি 30 লক্ষ সাধারণ মানুষের রক্তের বিনিময়ে শেষ হয় সেই মহাযুদ্ধ। কিন্তু মাত্র তিনটি গুলি কিভাবে ঘুরিয়ে দিল সমগ্র পৃথিবীর মোড়। সেটি জানাতেই আমি সাইফুল্লাহ সাইফ আবারও চলে এলাম আপনাদের সামনে। শুধুমাত্র একটা হত্যাকাণ্ড কিভাবে সমগ্র পৃথিবীকে একটা বিশ্বযুদ্ধের দিকে নিয়ে গেল সেটা জানতে বুঝতে হবে তখনকার রাজনৈতিক অবস্থা। মূল সমস্যার সূত্রপাত অস্ত্র হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যে। অস্ত্র হাঙ্গেরির বসনিয়া ও হার্ডজে গেভিনা অঞ্চলে বসবাস করত বসনিয়ার সার্ভ জনগোষ্ঠী। আর তাদের মূল লক্ষ্য ছিল অস্ত্র হাঙ্গেরি থেকে আলাদা হয়ে আরেকটি স্লাভিক রাষ্ট্র গঠন করবে। আর এই আগুনে ঘি ঢালছিল পাশের দেশ সার্বিয়া। তাই তখন অস্ত্র হাঙ্গেরির ভবিষ্যৎ সম্রাট আর্চ ডিউক ফার্দিনেন্ট ওই অঞ্চলের রাজধানী সারাজাতে ভ্রমণের ঘোষণা দিলেন। তখন সেটিকেই এক মোক্ষম সুযোগ হিসেবে বেছে নিল বিদ্রোহীরা। কিন্তু তাকে হত্যা করার পরিকল্পনা ছিল আসলে সার্বিয়ার মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স এর প্রধান কর্নেল ড্রাগুতিন দিমিত্রি জেভিকার। জুনের 28 তারিখ সকাল 11টা। 1914 সালের সেই দিনে কেউ ভাবতেও পারেনি কি হতে যাচ্ছে। কিন্তু আসলে তা হওয়ারই কথা ছিল। কারণ আর্চ ডিউক ফার্ডিন্যান্ড আসার আগে তার গাড়িবহর শহরের কোন রাস্তা দিয়ে যাবে তা আগেই পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। আর্চ ডিউককে স্বাগতম জানাতে সারি বেধে দাঁড়িয়ে ছিল অসংখ্য মানুষ। আর তার ভেতরেই ছিল চার-পাঁচ জন আততায়ী। প্রথম দু’জন বোমা মারার সুযোগ না পেলেও সুযোগটা পেয়ে যায় তৃতীয় আততায়ী সাবরি নভিচ। কিন্তু তার বোমা গাড়িতে বাড়ি খেয়ে ছিটকে যায় পেছনে। সেই বোমার আঘাতে আহত হয় পেছনের গাড়ির কিছু অফিসার। এই ঘটনায় হতভম্ব হয়ে যান আর্চ ডিউক। কিন্তু তার উচিত ছিল তখনই পালিয়ে যাওয়া। কিন্তু তিনি তা না করে টাউন হলে যান বক্তব্য দিতে। সেখানে তিনি বলেন, আমি এখানে এসেছি ভ্রমণে, আর আমাকে বরণ করা হলো বোমা দিয়ে। এরপর আর্চ ডিউক আর তার স্ত্রী যান আহত অফিসারদের দেখতে। ফেরার পথে হঠাৎই ভুল রাস্তায় ঢুকে পড়ে আর্চ ডিউকের ড্রাইভার। হ্যাঁ, রাস্তাটা ভুল আর সেই ছোট্ট ভুলের কারণেই বদলে যায় পৃথিবীর ইতিহাস। ভুল রাস্তায় এসেছিলেন বোঝার পর যখন ড্রাইভার ব্রেক করে বসেন ঠিক তখনই সেখানে ছিল আরেক আততায়ী। পুরোপুরি ভাগ্যের খেলায় সে হাতের কাছে পেয়ে যায় আর্চ ডিউককে এবং পয়েন্ট ব্ল্যাক রেঞ্জে গুলি করে হত্যা করে ডিউক ও তার স্ত্রীকে। এই ঘটনায় ফুঁসে ওঠে অস্ত্র হাঙ্গেরি। সারা দেশ জুড়ে সার্বিদের আক্রমণ করা হয়। অস্ত্র হাঙ্গেরিও সার্বিয়াকে দোষী করে তাদের কাছ থেকে ভয়াবহ কিছু দাবি করে বসে। কিন্তু মজার ব্যাপার কি জানেন, সার্বিয়া যেই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত তা সার্বিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিজেই জানিয়েছিলেন অস্ত্র হাঙ্গেরিকে। কারণ প্রধানমন্ত্রী নিকোলাই পাশিফ ছিলেন কর্নেল ড্রাগুত্রিন দিমিত্রি জেভিকার চরম শত্রু। কিন্তু নিজের অবস্থানের কারণে প্রধানমন্ত্রী নিকোলাই সরাসরি কিছু জানাতে পারেননি। তার চিঠিটা এতটাই ঘুরানো পেঁচানো ছিল যে আর্চ ডিউক কিছুই বোঝেননি। কিন্তু আর্চ ডিউক মারা যাওয়ার পরে সার্বিয়ার ওপরেই পুরো দোষ দেওয়া হয়। আর অস্ত্র হাঙ্গেরির অসম্ভব দাবিগুলো না মানাতে তারা সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে বসে। কিন্তু অস্ত্র হাঙ্গেরি যুদ্ধ ঘোষণা করার আগেই তাদের কিছুটা ব্যাকাপের প্রয়োজন ছিল। কারণ সার্বিয়াকে আক্রমণ করলে সেখানে রাশিয়ার নাক গলানোর সমূহ সম্ভাবনা ছিল। আর রাশিয়া যদি অস্ত্র হাঙ্গেরির ওপর ঝাপিয়ে পড়ত তাহলে ছিল ভীষণ বিপদ। কিন্তু জার্মান সম্রাট উইলিয়াম দি সেকেন্ড পাশে থাকার নিশ্চয়তা দিলে জুলাই এর 28 তারিখে সার্বিয়ার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে অস্ত্র-হাঙ্গেরি। আর সেখানেই বাধ সাধলো রাশিয়া। রাশিয়ার জার নিকোলাস দি সেকেন্ড সার্বিয়ার মত একটি স্লাভিক রাষ্ট্রকে বাঁচানো তার নিজের নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করলেন। রাশিয়া আংশিকভাবে সৈন্যদের প্রস্তুত করা শুরু করলে জার্মানি রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে বসে। কিন্তু রাশিয়ার সাথে ফ্রান্সের এমন চুক্তি ছিল যে জার্মানি একই সাথে রাশিয়া ও ফ্রান্স দুইটি দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধেই জড়িয়ে পড়ে। তবে সেরকম চুক্তি কিন্তু ফ্রান্স আর ব্রিটেনের মধ্যেও ছিল। ফ্রান্স প্রথমে যখন ব্রিটেনের সাহায্য চায়, ব্রিটেন অতটা আগ্রহ দেখায়নি তখন। কিন্তু ব্রিটেনের মত সুপার পাওয়ারকে যুদ্ধে টেনে আনে জার্মানি। কিভাবে? জার্মান জেনারেল স্লিপেনের পরিকল্পনা ছিল আগে আক্রমণ করতে হবে ফ্রান্সকে। কারণ রাশিয়া এত বড় দেশ ছিল যে তাদের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতেই অনেকটা সময় লেগে যাবে। আর সে সময়ের মধ্যেই বিদ্যুৎ গতিতে ফ্রান্সকে দখল করে জার্মানি তার পূর্ণ শক্তি নিয়ে রাশিয়াকে মোকাবেলা করবে। এটাই ছিল স্লিপেনের প্ল্যান। কিন্তু এই প্ল্যানের অংশ হিসেবে জার্মান সেনাদের বেলজিয়ামের উপর দিয়ে পরিবহন করাটা জরুরি হয়ে পড়েছিল। কেন? কারণ পুরো ফ্রেঞ্চ জার্মান বর্ডার জুড়ে ছিল অসংখ্য সামরিক স্থাপনা। আর সেই অঞ্চল দিয়ে যুদ্ধ করে ফ্রান্সে ঢুকতে গেলে জার্মানির সম্পদ আর সময়, দুটিই প্রচুর পরিমাণে নষ্ট হতো। তাই জার্মানি বেলজিয়ামের ওপর দিয়ে তার সেনা পরিবহনের দাবি জানায়। বেলজিয়াম জার্মানদের দাবি উপেক্ষা করলে আগস্টের তিন তারিখ রাতে বেলজিয়ামকে আক্রমণ করে জার্মানি। আর এতেই চটে যায় ব্রিটেন। কারণ বেলজিয়াম ছিল একটা নিরপেক্ষ রাষ্ট্র। নিরপেক্ষ রাষ্ট্রের শান্তি নষ্ট করায় আগস্টের চার তারিখ জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে ব্রিটেন। পুরো আগস্ট মাস জুড়ে ইউরোপ আর বিশ্বের বিভিন্ন শক্তিশালী দেশগুলো একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।
[6:17]যার সময়কালটা ছিল অনেকটা এরকম। জুলাই 28 সার্বিয়ার বিরুদ্ধে অস্ত্র-হাঙ্গেরির যুদ্ধ ঘোষণা। জুলাই 31 রাশিয়া ও ফ্রান্সকে যুদ্ধের প্রস্তুতি বন্ধে জার্মানির আল্টিমেটাম। আগস্ট 1 রাশিয়ার বিরুদ্ধে জার্মানির যুদ্ধ ঘোষণা। আগস্ট 2 লুক্সেমবার্গ ও বেলজিয়ামের দ্বারপ্রান্তে জার্মান সেনা। আগস্ট 3 জার্মানি কর্তৃক নিরপেক্ষ বেলজিয়াম আক্রান্ত। আগস্ট 4 জার্মানির বিরুদ্ধে ব্রিটেনের যুদ্ধ ঘোষণা। আগস্ট 5 রাশিয়ার বিরুদ্ধে অস্ত্র-হাঙ্গেরির যুদ্ধ ঘোষণা। আগস্ট 6 জার্মানির বিরুদ্ধে সার্বিয়ার যুদ্ধ ঘোষণা। আগস্ট 7 অস্ত্র-হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে সার্বিয়ার প্রতিবেশী মন্টেনিগ্রোর যুদ্ধ ঘোষণা। আগস্ট 12 জার্মানির বিরুদ্ধে মন্টেনিগ্রোর যুদ্ধ ঘোষণা। আগস্ট 10 ও 12 অস্ত্র-হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে ফ্রান্স ও ব্রিটেনের যুদ্ধ ঘোষণা। আগস্ট 23 জার্মানির বিরুদ্ধে জাপানের যুদ্ধ ঘোষণা। আগস্ট 25 জাপানের বিরুদ্ধে অস্ত্র-হাঙ্গেরির যুদ্ধ ঘোষণা। আগস্ট 28 বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে অস্ত্র-হাঙ্গেরির যুদ্ধ ঘোষণা। সব মিলিয়ে পুরো পৃথিবীর রাজনৈতিক পরিস্থিতি হয়ে যায় অসম্ভব রকম ঘোলাটে।
[7:25]যুদ্ধ শুরুর আগে ইউরোপে ছিল দুইটি শক্তি ট্রিপল আনটেন্ট ও ট্রিপল অ্যালায়েন্স। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হলে সারা বিশ্ব দুইটি ভাগে ভাগ হয়ে যায়। মধ্য শক্তিতে ছিল জার্মানি, অস্ত্র-হাঙ্গেরি, অটোম্যান সাম্রাজ্য ও বুলগেরিয়া। অন্যদিকে মিত্র শক্তিতে ছিল রাশিয়া, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি, আমেরিকার, জাপান, রোমানিয়া, সার্বিয়া, বেলজিয়াম, গ্রীস, পর্তুগাল এবং মন্টেনিগ্রো। যদিও এর মাঝে অনেক দেশই যুদ্ধের মাঝামাঝি অথবা শেষের দিকে যুদ্ধে এসেছিল। সে যাই হোক, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের যুদ্ধে আসাটা জার্মানির জন্য ছিল খুবই খারাপ সংবাদ। আর তার চেয়েও খারাপ সংবাদ ছিল রাশিয়া। হ্যাঁ, জার্মানির প্রিপ্ল্যান সব হিসাব-নিকাশকে গড়বড় করে দিয়ে খুব দ্রুতই রাশিয়া যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। তখন প্রমোদগণে জার্মানি অস্ত্র-হাঙ্গেরিক অনুরোধ করা হয় রাশিয়ানদের আটকে রাখতে। কিন্তু অস্ত্র-হাঙ্গেরি পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। ফলে জার্মানি বাধ্য হয়ে বিশাল সংখ্যক সৈন্য আবার রাশিয়ান বর্ডারে ফেরত পাঠায়। এভাবেই যুদ্ধ ভাগ হয়ে যায় দুইটি ফ্রন্টে। ইস্টার্ন ফ্রন্টে রাশিয়া আর ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টে ফ্রান্স ও ব্রিটেন। অর্থাৎ স্লিপেন প্ল্যান ততদিনে ব্যর্থ হয়ে গেছে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে ব্যাটল অফ টেনেনবার্গের যুদ্ধে জার্মান বাহিনী রাশিয়ানদের অবিশ্বাস্য দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেয়। শুধু ঠেকিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হয় না। 23 থেকে 30 আগস্টের মা রাশিয়ান সেকেন্ড আর্মিকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে ফেলে। রাশিয়ানরা এতটাই অপ্রস্তুত ছিল যে তারা তাদের রেডিও যোগাযোগ এনক্রিপ্ট পর্যন্ত করেনি। ফলস্বরূপ 13000 জার্মান সৈন্যের বিপরীতে মারা যায় 30000 রাশিয়ান সৈন্য। বন্দী হয় 92000 সেনা। জার্মানরা রাশিয়ানদের ঠেকিয়ে একই সাথে এগোতে থাকে ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টে। শুধু তাই নয় সেপ্টেম্বরের 6 তারিখের মধ্যে প্যারিসের মাত্র 30 কিলোমিটারের মধ্যে চলে আসে। যদি জার্মানরা আসলেই প্যারিস দখল করে নিতো তাহলে হয়তো পৃথিবীর ইতিহাস অন্যরকম হতো। কিন্তু দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় প্যারিসের মিলিটারি গভর্নর জেনারেল জে এস গ্যালিয়ানি ফ্রেঞ্চ কমান্ডার ইন চিফ জোসেফ জফ্রে কে বহু কষ্টে আক্রমণের নির্দেশ দেওয়াতে সমর্থ হন। সেপ্টেম্বরের 6 থেকে 12 তারিখ পর্যন্ত চলে ভয়াবহ যুদ্ধ। সেই যুদ্ধটা ফার্স্ট ব্যাটল অফ মার্নে নামে পরিচিত। এই একটি যুদ্ধে আহত হয় প্রায় আড়াই লাখ ফ্রেঞ্চ সেনা ও 3 লাখ জার্মান সেনা। মারা যায় 15000 ব্রিটিশ, 80000 ফ্রেঞ্চ আর প্রায় কাছাকাছি সংখ্যক জার্মান সেনা। অবশেষে ফ্রেঞ্চ ব্রিটিশ যৌথ আক্রমণে পিছু হটতে বাধ্য হয় জার্মানি। এরপরে যুদ্ধ করাতে থাকে সাগর পর্যন্ত যাকে বলা হয় দ্য রেস টু দা সি। এরপর সাগর থেকে সুইজারল্যান্ড পর্যন্ত পুরো 350 মাইল অঞ্চল জুড়ে শুরু হয় ট্রেঞ্চ ওয়ারফেয়ার। এতদিন যুদ্ধ ইউরোপে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়তে থাকে পুরো পৃথিবীতে। অস্ট্রেলিয়া মিত্রশক্তির পক্ষে এসে প্রথম সুযোগেই জার্মান নিউগিনি দখল করে নেয়। একই কাজ করে জাপান। আফ্রিকাতে অবস্থিত জার্মান কলোনিগুলো আক্রমণের শিকার হয়। ওদিকে 1914 সালের 31শে অক্টোবর মধ্যশক্তির হয়ে যুদ্ধ জড়ায় অটোমান সাম্রাজ্য। ফলস্বরূপ 5 নভেম্বর ফ্রান্স ও ব্রিটেন পাল্টা যুদ্ধ ঘোষণা করে। এদিক পুরো নভেম্বর-ডিসেম্বর মাস জুড়েই ককেশাস অঞ্চলে অটোম্যান সাম্রাজ্য আর রাশিয়ার তুমুল লড়াই চলতে থাকে। কিন্তু প্রচন্ড ক্ষয়ক্ষতি ছাড়া আর তেমন কোন লাভই হয়নি। কিন্তু অটোম্যান তেলের খনিগুলোর প্রতি প্রথম থেকেই ব্রিটিশদের নজর ছিল। তাই 1915 সালের 25শে এপ্রিল মিত্রবাহিনী গ্যালিপোলি ক্যাম্পেইন শুরু করে। তাদের লক্ষ্য ছিল অটোমান রাজধানী কনস্টানটিনোপল দখল করা। কিন্তু 9 মাসের এই ক্যাম্পেইনে প্রায় 2 লক্ষ সৈন্য আহত নিহত হওয়ার পর টনে ভঙ্গ দেয় মিত্রবাহিনী। ওদিকে মে মাসের 7 তারিখে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। জার্মান ইউবোটের আক্রমণে লুসিটানিয়া নামে একটি বিশেষ জাহাজ প্রায় 1200 সিভিলিয়ান নিয়ে ডুবে যায়। আর তার ভিতর 128 জন যাত্রী ছিল আমেরিকান। ফলে আমেরিকান জনগণের মতামত পুরোপুরি জার্মানির বিরুদ্ধে চলে যায়। একই মাসের 23 তারিখে যুদ্ধে যোগ দেয় ইতালি। কিন্তু তারা ছিল ট্রিপল অ্যালায়েন্সের অংশ। অর্থাৎ ইতালির যুদ্ধ করার কথা ছিল মধ্যশক্তিতে। কিন্তু তারা বিশ্বাসঘাতকতা করে মিত্রবাহিনীতে যোগ দিয়ে অস্ত্র-হাঙ্গেরি সাম্রাজ্যকে আক্রমণ করে বসে। অবশ্য তাতে কোন লাভ হয়নি কোন। অর্থাৎ বুঝতেই পারছেন পুরো পৃথিবীতে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লেও যুদ্ধের ফলাফল কিন্তু সেই একই ছিল। শুধু একটা অঞ্চল বাদে সার্বিয়ার প্রতিবেশী বুলগেরিয়াকে লোভ দেখিয়ে 1915 সালের অক্টোবর মাস নিজেদের দলে ভেড়ায় মধ্যশক্তি। এবং অবশেষে অস্ত্র-হাঙ্গেরি সাম্রাজ্য আর বুলগেরিয়া মিলে সার্বিয়াকে দখল করে নেয়। সাল 1916 বিশ্বযুদ্ধ তখন তুঙ্গে। এরই মধ্যে লিপসন হারবরে নোঙর করে থাকা একটি জার্মান জাহাজকে সিজ করে পর্তুগাল। ফলস্বরূপ মার্চের 16 তারিখ জার্মানি পর্তুগালের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ ঘোষণা করে। কিন্তু যুদ্ধের প্রথম দিকে শুরু হওয়া নেভাল ব্ল্যাকেডের কারণে জার্মানির অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল খুবই কঠিন। তাই 1916 সালের 31শে জুন প্রথমবারের মতো জার্মান আর ব্রিটিশ নৌবাহিনী পূর্ণ শক্তিতে মুখোমুখি হয় যার ফলাফল ছিল খুবই ভয়াবহ। ব্যাটল অফ জুটল্যান্ড খ্যাত সেই নৌযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল প্রায় 250 জাহাজ। মাত্র 2 দিনের যুদ্ধে 6000 নাবিকসহ 14টি ব্রিটিশ জাহাজ ধ্বংস হয়। অন্যদিকে 2500 মানুষসহ 11টি জাহাজ হারিয়ে ক্লান্ত হয় জার্মান নৌবাহিনী। কিন্তু সাম্রাজ্যগুলোর রক্তের পিপাসা তখনও শেষ হয়নি। 1916 সালের 21শে ফেব্রুয়ারি থেকে 18ই ডিসেম্বর ফ্রান্সের ভার্ভুনে সংগঠিত হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দীর্ঘতম যুদ্ধ। এই সময় আহত হয় 4 লক্ষ ফ্রেঞ্চ ও সাড়ে তিন লক্ষ জার্মান সেনা। দুই পক্ষ মিলিয়ে মারা যায় প্রায় 3 লক্ষ মানুষ। অন্যদিকে ব্রিটিশরা জার্মানদের দমানোর প্রাণপণে চেষ্টা করতে থাকে। পহেলা জুলাই 1916 ব্যাটল অফ সম্মে শুধু একদিনে হতাহত হয় 57000 ব্রিটিশ সেনা। এবং একই যুদ্ধের প্রথমবারের মত ট্যাঙ্ক ব্যবহার হয়। ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টে যখন এমন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলছে তখন ইস্টার্ন ফ্রন্টে রাশিয়া শুধু পিছই হাটছিল। কিন্তু ব্যাটল অফ সম্মে ব্রিটিশদের আক্রমণ দেখে রাশিয়ানরাও পাল্টা আক্রমণ শুরু করে যা আজও পরিচিত ব্রুসেলফ অফেনসিভ নামে। কিন্তু সাপ্লাই শেষ হয়ে যাওয়ায় তারা জার্মানির তেমন কিছুই করতে পারেনি। রাশিয়ানদের এভাবে এগিয়ে আসতে দেখে রোমানিয়ানরাও যুদ্ধে যোগ দেয়। কিন্তু রাশিয়ানদের থেমে যাওয়ার পরে রোমানিয়ানদের ভাগ্যে ছিল নির্মম পরাজয়। অন্যদিকে গ্রিসে তখন চলছিল অভ্যন্তরীণ কোন্দল। গ্রিসের রাজার ইচ্ছা ছিল মধ্যশক্তিতে যোগ দেওয়া। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সাথে না পেরে রাজা পিছু হটে এবং গ্রিস মিত্রশক্তিতে যোগ দেয়। কিন্তু ইউরোপে মিত্রশক্তি খুব একটা সুবিধা করতে না পারলেও অটোম্যান সাম্রাজ্যের অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছিল। রাশিয়ার আক্রমণে অটোম্যানরা দিন দিন পিছু হটে। একই সাথে ব্রিটিশরা মেসোপটেমিয়াম অঞ্চল ধরে এগিয়ে আসতে থাকে। কিন্তু এখানে সবচেয়ে বড় খেলা খেলে লরেন্স অফ অ্যারাবিয়া খ্যাত একজন ব্রিটিশ অফিসার। মূলত তার প্ররোচনাতেই আরব গোত্রগুলো অটোম্যান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। কিন্তু তবুও ইউরোপের যুদ্ধ একটি ডেডলকে আটকে ছিল। এরই মধ্যে 1917 সাল ঘটে যায় রুশ বিপ্লব। ক্ষমতায় আসে বলশেভিক পার্টি। আর এসেই তাদের প্রথম কাজই ছিল জার্মানির সাথে চুক্তি করে রাশিয়াকে যুদ্ধ থেকে সরিয়ে নেওয়ার। আর এটি ছিল জার্মানদের জন্য বিশাল এক সুসংবাদ। কিন্তু দুঃসংবাদ হয়ে উঁকি দিচ্ছিল ইউনাইটেড স্টেটস অফ আমেরিকা। সত্যি বলতে এই পুরো যুদ্ধে একমাত্র লাভবান হচ্ছিল আমেরিকা। কারণ মিত্রশক্তির কাছে প্রচুর পরিমাণে রসদ বেঁচে তাদের অর্থনীতি ছিল চাঙ্গা। সামরিক প্রস্তুতিও ছিল সম্পূর্ণ। আর এখানেই জার্মানি একটি মারাত্মক ভুল করে বসে। তারা আমেরিকাকে ব্যস্ত রাখার জন্য মেক্সিকোর জার্মান অ্যাম্বাসেডরের কাছে একটি গোপন টেলিগ্রাম পাঠায় যা জিমেরম্যান টেলিগ্রাম হিসেবে খ্যাত। জার্মানির লক্ষ্য ছিল মেক্সিকোকে দিয়ে আমেরিকাকে আক্রমণ করা। কিন্তু এই টেলিগ্রাম ডিকোড করে ফেলে ব্রিটিশরা আর তার পরেই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে আমেরিকা। আমেরিকান নতুন ট্রুপস আসায় ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে জার্মানি। শেষ বারের মতো সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে জার্মানি। সমসহ লাইন অফ কন্ট্রোলের মোট চারটি স্থানে পিছু হটে মিত্রবাহিনী। কিন্তু পঞ্চম ধাক্কায় জার্মানদের আটকে দেয় ব্রিটেন আর ফ্রান্স। আর এরপরেই চলে আসে আমেরিকা আর এরপরের ইতিহাসটা তো সবারই জানা। প্রতিটি ফ্রন্টেই হাঁটতে থাকে মধ্যশক্তি। প্রথমে হার শিকার করে বুলগেরিয়া। এরপরে অটোমান সাম্রাজ্য এরপরে অস্ত্র-হাঙ্গেরি আর সবার শেষ 1918 সালের নভেম্বর মাসের 11 তারিখ আত্মসমর্পণ করে জার্মানি। আর এর মধ্য দিয়েই শেষ হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। খুব শীঘ্রই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে আমাদের আরেকটা ভিডিও চলে আসছে। কমেন্টে আপনার মতামত জানিয়ে ফেলুন আর নতুন কোন টপিকের সাজেশন থাকলে তাও জানিয়ে দিন। দেখা হচ্ছে পরের ভিডিওতে।



