[0:08]পৃথিবীর মানচিত্রে এমন কিছু জায়গা আছে, যেগুলো আকারে ছোট হলেও তাদের গুরুত্ব অনেক বেশি। ঠিক তেমনই একটি জায়গা হলো হরমজ প্রণালী। এটি একটি সরু সমুদ্রপথ, যার উপর নির্ভর করে পুরো বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তার একটি বড় অংশ। এই ছোট্ট সমুদ্রপথটি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, এখানে কোন সংঘাত শুরু হলে তার প্রভাব পড়ে পুরো বিশ্বের অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে। আর বর্তমানে ঠিক সেটাই ঘটছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরাইল এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনার কারণে বিশ্বজুড়ে আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে হরমজ প্রণালী। বিশ্ব প্রান্তরের আজকের পর্বে আমরা জানবো, হরমজ প্রণালী কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? এবং কেনই বা এই ছোট্ট সমুদ্রপথটি নিয়ে বারবার এত বড় আন্তর্জাতিক উত্তেজনা তৈরি হয়?
[1:15]হরমজ প্রণালী হলো পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মাঝখানে অবস্থিত একটি সংকীর্ণ সমুদ্রপথ। এর উত্তরে রয়েছে ইরান আর দক্ষিণে রয়েছে ওমান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো এই প্রণালীর সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশ মাত্র 33 কিলোমিটার চওড়া। কিন্তু এই ছোট্ট পথ দিয়েই প্রতিদিন চলাচল করে শত শত তেলবাহী জাহাজ। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ যেমন সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাক এবং কাতার তাদের উৎপাদিত তেল ও গ্যাস বিশ্ববাজারে পাঠাতে এই প্রণালীর উপর নির্ভর করে। বিশ্বের মোট তেলবাহী জাহাজের প্রায় 20 শতাংশ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। আর এই কারণেই অনেক বিশেষজ্ঞ একে বলেন বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডর। যদি কখনো এই পথ বন্ধ হয়ে যায় তাহলে বিশ্বজুড়ে তেলের সরবরাহ হঠাৎ কমে যেতে পারে এবং তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও ইরানের মধ্যকার সংঘাত এই জলপথের নিরাপত্তার বিষয়টি আবারো সামনে নিয়ে এসেছে। ইরান অতীতে হরমজ প্রণালী বন্ধের হুমকি দিয়েছিল পশ্চিমা চাপের জবাবে। কিন্তু 2026 সালে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে আবারও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ইসরাইল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার পর ইরান পাল্টা হুমকি দিয়ে হরমজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে। দেশটির এই ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনের এই রুটটি কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতির কারণে অনেক তেলবাহী জাহাজ এই পথে চলাচল বন্ধ করে দেয় এবং অনেক জাহাজ নিরাপদ দূরত্বে অপেক্ষা করতে থাকে। এমনকি বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন এই পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় 70 শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ক্রমাগত বাড়ছে এবং অনেক দেশ জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় পড়েছে। ইতোমধ্যে তেলের দামের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুড ব্যারেল প্রতি 79 ডলার ছাড়িয়ে গেছে। হামলার প্রথম দিন অর্থাৎ 28 ফেব্রুয়ারির সঙ্গে তুলনা করলে এই দাম প্রায় 9 শতাংশ বেড়েছে। নতুন তথ্য বলছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে চীনের তেল পরিবহনের জন্য সুপার ট্যাঙ্কার ভাড়া করার খরচ গত সপ্তাহের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে, যা প্রতিদিন 4 লাখ ডলারেরও বেশি। এবং এখনো পর্যন্ত সর্বোচ্চ বলেই মনে করা হচ্ছে।
[4:08]আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী হরমজ প্রণালী দিয়ে যাওয়া জ্বালানি ও তেলের প্রায় 82 শতাংশ গন্তব্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশ। চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া এই চারটি দেশ সম্মিলিতভাবে এই প্রণালী দিয়ে যাওয়া তেল ও কনডেনসেটের প্রায় 70 শতাংশ আমদানি করে। ফলে এই দেশগুলোই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে যদি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। এই আবহাওয়ায় মনে করা হচ্ছে যে হরমজ প্রণালী বন্ধের ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় শক্তিগুলো যারা সাম্প্রতিক সংঘাতে ইসরাইলের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে জোটবদ্ধ তাদের চাইতে আরব এবং এশীয় দেশগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এদিকে বেশ কয়েকটা এশীয় দেশ ইরানের সঙ্গে ভালো বা কিছু ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। অন্যদিকে হরমজ প্রণালী শুধু একটি সমুদ্রপথ নয় এটি একটি চোকপয়েন্ট। অর্থাৎ এমন একটি সংকীর্ণ জায়গা যেখান দিয়ে বিশাল পরিমাণ বাণিজ্যিক পণ্য চলাচল করে। যদি কোন দেশ এই পথ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে তাহলে সে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। এই কারণেই এখানে প্রায় সময়েই সামরিক নজরদারি থাকে। বিশেষ করে ইউনাইটেড স্টেট নেভি এবং আঞ্চলিক নৌবাহিনীর। বিশ্বের অনেক দেশ এখন বিকল্প জ্বালানি পাইপলাইন এবং নতুন বাণিজ্য পথ তৈরির চেষ্টা করছে। তবুও বাস্তবতা হলো আগামী অনেক বছর ধরেই হরমজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পথ হিসেবেই থাকবে। কারণ এত বিশাল পরিমাণ তেল পরিবহনের জন্য এর মত কার্যকর সমুদ্রপথ পৃথিবীতে আর নেই বললেই চলে। মাত্র কয়েক কিলোমিটার চওড়া একটি সমুদ্রপথ, কিন্তু তার প্রভাব পুরো পৃথিবী জুড়ে। হরমজ প্রণালী শুধু একটি ভৌগোলিক স্থান নয় এটি বিশ্ব রাজনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। আর তাই বলা হয় এই সংকীর্ণ পথটি শুধু জাহাজের পথ নয় এটি বিশ্ব অর্থনীতির একটি প্রধান ধমনী। হরমজ প্রণালী বন্ধের কারণে বাংলাদেশে এর প্রভাব কেমন পড়তে পারে বলে আপনি মনে করেন, তা জানিয়ে দিন কমেন্ট বক্সে।



