[0:04]ঘটনাগুলো মনে আসে সেই আট বছর বয়সে। তার দু'বছর পর রামকৃষ্ণ মিশনে বরানগরে ভর্তি হলাম। তখন থেকেই ওই গঙ্গা পার হলেই তো বেলুড় মঠ। সেই তিন বছর তখন ওখানে থেকে পড়েছি আর সেই হচ্ছে প্রথম প্রেম। হ্যাঁ ঠাকুরের সঙ্গে। তারপর আমি তো আর জানি না, তিনি তো সব জানেন, ভূত ভবিষ্যৎ।তিনি তখনই হয়তো ওই যে বলে না, খুঁটো বেঁধে রাখা। তখনই খুঁটো বেঁধে রেখেছিলেন যে ভবিষ্যতে আবার ডাকবেন।আরেকজন সাধু হয়েছিল আমাদেরই ব্যাচে দুইজন আমরা হয়েছিলাম। সে ট্রেনিং সেন্টারেই ছিল, তারপরে কোনো একটা কারণে সে চলে যায় নিমপিঠে।ওখানে হেডমাস্টার, এখন রিটায়ার্ড লাইভ। তো আমরা এই দুইজন তখন সাধু হয়েছিলাম বরানগরের।আপনার মানিক মহারাজ ছিলেন তো, আপনারা দেখোনি বোধহয়। হ্যাঁ মানিক মহারাজ ছিলেন।উনি ওখানে অনাথাশ্রমের ছাত্র ছিলেন।
[1:21]তা তারপর সঞ্জীব মহারাজ তখন যে নরেন্দ্রপুরের পূর্বাশ্রম বরানগর। তো যাওক,তারপরে সেই তখন থেকেই যে বেলুড় মঠ ঢুকেছে, আর তারপর আর ছাড়ছে না। এমন দিন যায় না, এমন দিন যেমন এখানে এসে জাপানের কথা মনে হয় না। যদি ৩০ বছর ওখানে কেটে গেলো। কিন্তু এমন একটা দিন যায় না, যে দিন বেলুড় মঠের কথা স্মরণ করি না।আর এমন দিন যেনো কখনও না হয়, যে যেন বেলুড় মঠের কথা যেনো স্মরণ করতে পারি না।এরকম যেনো কোনোদিনও যেনো না হয়। বেলুড় মঠ তো মহা তীর্থস্থান।এবং ওই সময়ে সৌভাগ্য হয়েছিল দালাই লামা, পঞ্চেন লামা, ওরা এসেছিলেন তখন, তিব্বতের ধর্ম।এগুলো তো আপনাদের সব শোনা, তাই তো? আর এগুলো আমাদের দেখা। তা আমার বয়সের নিশ্চয়ই কেউ কেউ আছেন আপনারা,কিন্তু থাকলেই তো হয় না, সুযোগ তো থাকা দরকার। তা তারা তখন এসেছিলেন, কত বয়স?আমার থেকে,আমার তখন দশ বছর বয়স, তাঁদের ওই ১৯-২০, খুব ইয়ং।পরে ছবিও আছে। ওই দালাই লামা, পঞ্চেন লামা গিয়েছেন ঠাকুরের সামনে। তারপর বহু বছর পর দালাই লামার সঙ্গে দেখা হয়,কয়েকবারই দেখা হয়েছে আমার।
[3:00]হ্যাঁ দেখা হলো প্রথমবারে।উনি তখন যাচ্ছেন ভারতবর্ষ থেকে জাপানে। একই প্লেনে।তো উনি নামছেন,এখন যেহেতু প্রোটোকলের ব্যাপার আছে,ইন্ডিয়ার এমব্যাসি ওদের অফিসার পাঠিয়ে ওকে নিয়ে যাবে এস্কর্ট করে।আর নিজস্ব তো আছেই। তা যে অফিসার এসেছিলেন,ইন্ডিয়ান এমব্যাসিতে, তিনি আমারে খুব ভালো করে চিনতেন।চেনেনও।তো তিনি পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন, যে ইনি হচ্ছে রামকৃষ্ণ মিশনের। দালাই লামা সঙ্গে সঙ্গে আমার হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিলেন,বুঝলেন? কি আন্তরিকতা দেখো। হাতের মধ্যে নিয়ে বললেন, আই হ্যাভ এ গ্রেট রেস্পেক্ট ফর রামকৃষ্ণ মঠ এন্ড মিশন। তারপর আমি বললাম, আপনি তো বেলুড় মঠে গিয়েছিলেন তো? বললেন, হ্যাঁ আমি গিয়েছিলাম।আমি আপনাকে তখন দেখেছি। বুঝতে পেরেছিস? কত যুগ আগের ব্যাপার। বললেন, হ্যাঁ আমি গিয়েছিলাম তো। তারপর আবার দিল্লিতে যখন একটা সেমিনার হয়,তখন ওকেও ডাকা হয়েছিল, আমি এসেছিলাম।বক্তব্য ছিল।তখনও আবার দেখা হলো।এবং কয়েকবারই হয়েছে আর কি।
[4:31]তা তারপর আবার বিদ্যামন্দির কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ হলো, স্কুলের পর। সেখানে তিন বছর কাটলো,তারপর আবার একটু পড়াশোনার জন্য বাইরে গিয়ে আবার শেষ পর্যন্ত সেই বিদ্যামন্দিরেই কাটলো। ১৯৭৩ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত।মাঝখানে কয়েক বছর পড়িয়েছি ওখানে।তারপর ওখানে ব্রহ্মচারী ওখানেই কলেজের দায়িত্ব পড়লো ১৯৮০ থেকে ৯৩ পর্যন্ত। এবং তারপর জাপান।
[5:18]তো সেই বেলুড় মঠের অত সন্ন্যাসী।শারদা পিঠ আর বেলুড় মঠ, আপনারা শারদা পিঠে গিয়েছেন? গিয়েছেন? পাশেই। তো ওটাকে আলাদা করা যায় না। পাশেই রেপাশ আর ওপাশ। হঠাৎ একটা মহাসমুদ্রের মাঝখান থেকে কোত্থায় পাঠানো হলো আমাকে একটা দ্বীপে। আমি বলি আমাকে দ্বীপান্তরে পাঠানো হয়েছে। জাপান দ্বীপ তো।এই অপরাধ-টপরাধ করলে দ্বীপান্তরে পাঠানো হতো না, ওহ্ না মানে আমি সে অপরাধ করিনি। ভালো কাজের জন্যই পাঠানো হয়েছিল কর্তৃপক্ষ।ওখানে বেদান্ত সোসাইটি।তারপর ভেবেছিলাম, তিন বছর পর আমার যখন।
[6:19]হ্যাঁ।মাইক্রোফোনটা একটু ডিস্টার্ব করছে। কেউ ওটা বন্ধ করে দিন না।
[9:05]হ্যাঁ মহাত্মারা বলছেন এটা শুনলে একটু অসুবিধা হয়েছে, একটু এগিয়ে দিচ্ছি। আচ্ছা। এবার ঠিক আছে? হ্যাঁ। আগে বলছেন, বলছেন উনি কেন?সব দরকারি কথাগুলো হয়ে গেলো। তারপর মহারাজ তখন বললেন যে তোমার যেতে হবে, আমার তো কিছু বলার নেই, আপনারা যা যা ঠিক করবেন তাই করুন।
[9:39]তো তিন বছরের ভিসা নিয়ে গেলাম মিশনারি ভিসা।বললেন, চেষ্টা করে দেখি, না পারলে চলে আসবো, কি আর আছে। কিন্তু না বললে পরে পরে কোথায় পাঠাবেন তো তার ঠিক নেই। তার থেকে প্রথমে গিয়ে চেষ্টা করে তখন আমার একটা জোর থাকবে না আমি গিয়েছিলাম চেষ্টা করেছিলাম, পারিনি। সেই তিন বছরের পরে কখন যে একটা শূন্য বসে গেলো,কত হলো? ৩০ বছর কেটে গেলো। তারও বেশি, ৯৩, আর হচ্ছে ২৬। হ্যাঁ স্যার। হ্যাঁ। হ্যাঁ।
[10:24]তা এইবারে আমার হঠাৎ আসাটা হলো,ওখানে প্রচন্ড ঠান্ডা, ভাবলাম কিছুদিন ভারতবর্ষে এই ফাল্গুন, অনির্বাণ মহারাজ ফোন, বললেন মহারাজ দুবার বরফ পড়েছে। আমরা যেখানে থাকি,বরফ পড়া মানে যে -২ ডিগ্রি, -৭ ডিগ্রি, ১-২ ডিগ্রি। আমি তো জানি কি অবস্থা। গিয়ে আবার ওই সেই ঠান্ডার মধ্যেই পড়তে হবে। ঠিক যেমন গরমকালে যখন কলেজের ছুটি হয় না, আমরা তখন ট্রেকিংয়ে সব যেতাম,মায়াবতী, টায়াবতীতে।ক'দিনের জন্য? তখন কিছুদিন অন্তত কাটিয়ে আসি বলে, হয়তো তিন সপ্তার জন্য গেলাম, ফিরে এসে সেই গরমটা আরও বেশি গরম লাগতো,বুঝলেন?আরও বেশি গরম লাগতো। তিন সপ্তায় আর কি হবে? এখন অবস্থা আমার সেই রকমই হবে আর কি, গিয়ে আরও ঠান্ডা লাগবে। তো ফেব্রুয়ারি ওদের ঠান্ডাটা শুরু হয় নভেম্বরে।আর সেই এপ্রিলেও কম্বল দিতে হয় গায়ে। আর এখানে আমরা গেঞ্জি গায়ে দিয়ে কাপড়টা ফোল্ড, না, সাউথ, দক্ষিণী, দক্ষিণ ভারতীয় ঢঙে কাপড়টা ফোল্ড করে হাঁটতাম, চটি পায়ে একটা মজা ও নেই, টুপি ও নেই। এই এইভাবেই তো অভ্যস্ত।হঠাৎ সেখান থেকে গিয়ে একেবারে মাথার থেকে শুরু করে পা পর্যন্ত সব না ঢাকলে চলবে না, সে যে অবস্থা। কি আর করা যাবে?তবুও তো আমরা ভালো।রাশিয়াতে জ্যোতিরূপানন্দজি -২০ ডিগ্রি, -২৫ ডিগ্রি, এসব ভাবা যায়? শিকাগোতে -৩০ ডিগ্রি। যদিও সেন্ট্রাল হিটিং ঘরের ভিতর ঢুকলে,কিন্তু এক পা বেরোলেই তো তারপর,ঠান্ডা, মানে মানুষের একটা বোধ শক্তি আছে তো, তারপরে হলো আর তার কোনো বোধ শক্তি থাকে না।
[12:31]কত ঠান্ডা! শুধু কি হবে? হয়তো নাক ট্যাগ ঘসে গেলো,আঙুলটা ঘসে গেলো।
[12:40]ফ্রস্টবাইট হয়।ফ্রস্ট বাইট।
[13:00]ত আমরা যারা ভক্ত,তাদের মধ্যে আপনারা অনেকেই তো দীক্ষা নিয়েছেন, নাকি? আপনারা একটু হাত তুলবেন, কজন আপনারা দীক্ষিত? ওরে বাবা! এসব মহারাজ আসার পর নাকি তার আগে থেকেই হচ্ছিলো? আগে থেকেই দীক্ষিত। বেশ। আচ্ছা, দীক্ষা কারো কারো পাঁচ বছর, দশ বছর, পনেরো বছর, হয়েছে তো, নাকি? আমি জানি, হ্যাঁ। আমি জানি। কিছু পরিবর্তন হয়েছে? এইটাই হচ্ছে প্রশ্ন। জীবনে যদি কিছু পরিবর্তন হয়,তাহলেই দীক্ষার সার্থকতা। তা যদি না হয়,কিছুই হলো না। যদি যারা দীক্ষা নেন, মনে করেন রামকৃষ্ণ মঠের একটা পাসপোর্ট পেয়ে গেলাম।আর কিচ্ছু করতে হবে না, রামকৃষ্ণের দায়, গুরুর দায়।আর সব ব্যাপারে আমি।
[16:58]আর শুধু ঠাকুরকে ডাকবার বেলা তিনি।
[17:11]সকল কাজের বায়ে এ সময়, তারপর কি? ঘুমাবার সময় আছে, খাবার সময় আছে, গল্প করার সময় আছে, টেক্সটিং করার সময় আছে, ইন্টারনেট সার্ফিং করার সময় আছে। এক-দু-তিনটে শুধু জপ করার সময় নেই। আত্মপ্রবঞ্চনার কাকে বলে? ভগবান আমাদের থেকে বেশি চালাক না হলেও একটু চালাক। তাঁকে তো আর ফাঁকি দেওয়া যায় না। বিশ্বাস আছে যে ঠাকুর পার করে নেবেন, বাজে কথা।বিশ্বাস তো শেষের কথা। কি বলো? বিশ্বাস হচ্ছে শেষের কথা।
[18:06]তা সেইটাই হচ্ছে কথা যে দীক্ষা নিলাম, ঠাকুরের নাম নিলাম,নাম নিচ্ছি, কিন্তু কোন পরিবর্তন হচ্ছে না।যে অশান্তি সেই অশান্তি। যে বাসনা সেই বাসনা, যে আসক্তি সেই আসক্তি।বিপদে পড়ে ভয়, কে রক্ষা করবে?
[18:34]কি হলো দীক্ষা নিয়ে?
[18:39]এইটা হচ্ছে আত্ম-সমীক্ষা। দীক্ষা যে নিলাম,মঠে আসছি, কি কি পরিবর্তন হলো? আমরা এসব কথাই আমাদের ওখানকার ভক্তদের বলি। ভূতেশানন্দজি মহারাজের কাছে একজন মধ্যবয়স্কা মহিলা এসেছেন। মহারাজ আমার মেয়ে দীক্ষা আমাকে দিতে হবে।
[19:08]তখন মহারাজ বলছেন, মা তোমার দীক্ষা হয়েছে? হ্যাঁ, মা হয়েছে। গুরু নাম কি? মা মনে তো পড়ছে না।
[19:23]তবে তাঁকে দেখতে অনেকটা আপনার মতন।
[35:56]কেউ বলছেন হ্যাঁ, কেউ বলছেন না।বুঝতে পারছি না। ঠিক আছে, এখন আপনাদের হাতে।নমস্কার, ভালো থাকবেন।জয় ঠাকুর।



