[0:00]যুদ্ধ, তেল আর পরাশক্তির শক্তি প্রদর্শনে ভরা এই পৃথিবীতে এমন এক জায়গা আছে, যেখানে সমুদ্রের রঙ রক্তের মতো লাল। আর পাহাড়গুলো দেখে মনে হয় বরফে ঢাকা। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে তাপমাত্রা পৌঁছে যায় ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এই দ্বীপে মানুষ শুধু মাটির ওপর হাঁটে না, তারা সেই মাটিকেই খায়। এ যেন পৃথিবীর শেষ প্রান্তে টিকে থাকার এক অদ্ভুত গল্প। এটি হরমুজ। মানচিত্রে ক্ষুদ্র এক বিন্দু। অথচ অবস্থান এমন, যেন পুরো বিশ্বের গলায় আটকে থাকা একটি সংকীর্ণ পথ।
[0:37]পৃথিবীর প্রায় ২০ শতাংশ তেলের সরবরাহ প্রতিদিন এই পথ দিয়ে যায়। অর্থাৎ আপনি যখন জ্বালানির দাম কমার অপেক্ষায় থাকেন, তখন বিশ্বের বিপুল অর্থ ঠিক তাদের বাড়ির সামনে দিয়েই ভেসে যায়। মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে তাকালে যে সরু জলপথটি চোখে পড়ে, সেটাই হরমুজ প্রণালী। তেলবাহী জাহাজের ব্যস্ত মহাসড়ক। আর তার মাঝখানে ছোট্ট একটি দ্বীপ, যেন সুপের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া একটি ডিম। এই দ্বীপে পৌঁছতে হলে বন্দর আব্বাস থেকে ঘাম ভেজা ভীড়ের একটি ফেরিতে উঠতে হয়। ধীরে ধীরে মূল ভূখণ্ড দূরে সরে গেলে স্বাভাবিক পৃথিবী যেন মিলিয়ে যায়, আর সামনে খুলে যায় এক অচেনা জগত। এখানে সবুজ নেই, নেই সতেজতার ছোঁয়া। আছে শুধু পাথর, লবণ আর নরকের মতো লাল মাটি। বিশাল তেলবাহী জাহাজগুলো যখন পাশ দিয়ে যায়, তাদের ভারে সাগরের পানি তীরে ধাক্কা খায়। আর ঠিক নিচেই অন্য এক দৃশ্য। ছোট নৌকায় জেলেরা জাল ফেলছে। নেই জিপিএস, নেই রাডার। পথ দেখায় শুধু পাহাড়ের আকার। একটি ট্যাঙ্কারের সামান্য ভুল মানেই সব শেষ, নৌকা উল্টে যায়, জীবন থেমে যায়। বিশ্বের চোখে এখানে উত্তেজনা, রাজনীতি আর যুদ্ধের ছায়া। কিন্তু তাদের কাছে এটি শুধু একটি সাধারণ মাছ ধরা গ্রাম। তেলের দাম তাদের ভাবায় না। তাদের ভাবনা শুধু সন্ধ্যায় খাবার জুটবে কিনা। সমুদ্রের লগনে তাদের হাত মোটা আর ফেটে গেছে। এটি কোনো স্কিনকেয়ার নয়, টিকে থাকার চিহ্ন। তবে প্রকৃত শত্রু আরেকটি- নির্দয় আবহাওয়া। জুলাই এলে বাতাস যেন থেমে যায়, তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি, যেন পুরো দ্বীপটি বাষ্পে সেদ্ধ হচ্ছে। নেই গাছ, নেই ছায়া, নেই শীতল হাওয়ার মুহূর্ত। শুধু পাথর আর সূর্যের আগুন। এখানে হাঁটলেই শরীর ঘামে ভিজে যায়, আর সেই ঘামের সঙ্গে হারিয়ে যায় অমূল্য পানি। হরমুজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস তেল নয়, পানি। প্রতিটি ফোঁটা পানি আসে মূল ভূখণ্ড থেকে ডিজেল চালিত ফেরিতে। ঢেউ বা ঝড়ে যদি সেই ফেরি দেরি করে, সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় বেঁচে থাকার লড়াই। এই দ্বীপে জীবন মানে প্রতিদিন প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম, আর সেই সংগ্রামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে পৃথিবীর এক বিস্ময়কর, কঠিন অথচ মুগ্ধকর বাস্তবতা। কিন্তু ডিসেম্বর এলে হরমুজ যেন হঠাৎ বদলে যায়। তাপমাত্রা নেমে আসে প্রায় ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। আর তখনই এই উত্তপ্ত দ্বীপে নেমে আসে স্বস্তির ছোঁয়া। ঠান্ডার সঙ্গে আসে পর্যটকদের ঢল, আর সেই সঙ্গে আসে অর্থের প্রবাহ। যে ঘাট একসময় নীরব ছিল, তা মুহূর্তেই রঙিন বাজারে পরিণত হয়। চারদিকে অদ্ভুত রঙ, মানুষের কোলাহল, পেট্রোলের গন্ধ আর দ্রুতগতির টুকটুক চালকদের ডাক। সব মিলিয়ে যেন হঠাৎ প্রাণ ফিরে পায় দ্বীপটি। এটাই তাদের বড় আয়ের সময়। কারণ শীতকাল স্থায়ী হয় মাত্র তিন থেকে চার মাস। এখনই উপার্জন করতে হবে। কারণ গ্রীষ্ম এলেই আবার নেমে আসবে নরকের মতো উত্তাপ। প্রতিটি যাত্রা মানে একটি পরিবারের একদিনের খাবার। তাই চালকদের চোখে ক্লান্তি থাকলেও থামে না তাদের ছুটে চলা। এখানে বাড়িগুলো যেন খোলা দরজার বাড়ি। আপনাকে তারা চিনুক বা না চিনুক, তবুও ঘরে ঢুকতে দেবে, থাকার জায়গা দেবে, অতিথির মতো সম্মান করবে। আপনাকে তারা ভিআইপির মতোই দেখবে। শুধু খাবারের ব্যাপারে খুব বাছবিচার না করলেই হয়। কয়েক মাসের জন্য এই দ্বীপ আর টিকে থাকার যুদ্ধক্ষেত্র নয়, হয়ে ওঠে এক স্বপ্নের ছুটির স্বর্গ। টুকটুক আপনাকে নিয়ে যায় পৃথিবীর সবচেয়ে অদ্ভুত দৃশ্যের দিকে। গ্রাম ছেড়ে একটু দূরে গেলেই শুধু পাথর আর শুকনো ঘাস। মনে হয় যেন আপনি মঙ্গল গ্রহে পা রেখেছেন। বালু নরম নয়, বরং ভেজা লোহা গুঁড়োর মতো কঠিন। বাতাসে উড়ে আসে লাল ধুলো, যেন বিনামূল্যেের ফেসিয়াল স্ক্রাব। হার বৃষ্টি নামলে দৃশ্য আরও অদ্ভুত হয়ে ওঠে। চারদিকে যেন রক্তের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। পর্যটকেরা বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে, কিন্তু সেই লাল ধুলো জুতোর ভেতর ঢুকে পড়ে, নখে লেগে থাকে, কাপড়ের রং ছড়ায় এবং সহজে আর যায় না। তখনই বোঝা যায়, কেন কেউ কেউ এই জায়গার প্রতি এতটা মুগ্ধ। কারণ এর মতো আর কোথাও নেই। তবে সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়টি এখানে শেষ নয়। তারা শুধু এই মাটিকে দেখে বা বিক্রি করে না। তারা সেই লাল মাটিই খায়। তারা একে বলে গেলাক। মাটি থেকে পাথর আলাদা করে, তারপর পানি আর মসলা মিশিয়ে তৈরি করে পাহাড়ের তৈরি এক বিশেষ সস। এর স্বাদ লবণাক্ত, গন্ধে মাটির ছোঁয়া আর মনে হয় যেন বৃষ্টির ফোঁটা লোহার ওপর পড়ছে। এটি কোন পর্যটকদের আকর্ষণের জন্য তৈরি নয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা এমনটাই করে আসছে। মাছের সঙ্গে, সুপে এমনকি আচারের ভেতরেও ব্যবহার হয় এই মাটি। তাদের বিশ্বাস, এতে থাকা লোহা রক্তকে শক্তিশালী করে। এখানকার নারীদের দেখলে মনে হয়, যেন তারা অন্য এক সময়ের মানুষ। তারা এমন মুখোশ পরে, যা দেখতে বর্মের মতো। রঙিন নকশায় ভরা যেন মরুভূমির সুপারহিরো। এটি শুধু ফ্যাশনের জন্য নয়, এখানে সূর্য এক শত্রু। আর বাতাসে উড়ে আসে লবণ আর বালি, যা প্রতিদিন মুখে স্যান্ডপেপারের মতো আঘাত করে। তাই মুখোশ লুকানোর জন্য নয়, বরং সুরক্ষার জন্য। সৌন্দর্য রক্ষার জন্য। তারা বলে এই কারণেই তীব্র রোদেও তাদের ত্বক সতেজ থাকে। রঙ আর আকৃতিরও অর্থ আছে। লাল আয়তক্ষেত্র মানে তিনি বিবাহিত আর সোনালী রঙ বিশেষ অনুষ্ঠানের জন্য। মা থেকে মেয়ের কাছে চলে আসে এই ঐতিহ্য। পুরো গ্রামের জন্য এক নীরব ভাষা হয়ে। কোন কথা ছাড়াই বোঝা যায় একজন মানুষের গল্প। তবে নতুন প্রজন্ম এখন আরও আধুনিক। তারা মুখোশের বদলে বেছে নিচ্ছে সানগ্লাস আর স্কার্ফ। আর ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে এই অনন্য দ্বীপের চেহারা। ইরানের কিছু অঞ্চলে বিশেষ করে হরমুজের মতো জায়গায় অনেক মেয়ের বিয়ে হয়ে যায় মাত্র ১৫ বছর বয়সেই। তাদের কাছে এটি অস্বাভাবিক নয়, বরং সংস্কৃতির অংশ, জীবনের বাস্তবতা। কাজের সুযোগ কম, সম্পদের অভাব। এই বাস্তবতায় বিয়ে অনেক সময় পরিবারের খরচ কমানোর উপায় হয়ে ওঠে, নিরাপত্তার পথ হয়ে দাঁড়ায়। এখানে বিয়ে শুধু ভালোবাসার গল্প নয়। এটি বেঁচে থাকার কৌশল। তবুও হরমুজের নারীদের স্বপ্ন খুব সাধারণ। উত্তর ইরানের সবুজ বন দেখতে চাওয়া, গভীরভাবে নির্মল বাতাসে শ্বাস নেওয়া আর এমন পাহাড়ের সামনে দাঁড়ানো, যা লবণ দিয়ে তৈরি নয়। তাদের কাছে সেটি যেন অন্য এক গ্রহের অভিজ্ঞতা। তাদের জীবন সহজ। তারা তেলবাহী জাহাজ বা ভূ-রাজনীতি নিয়ে ভাবে না। তারা ভাবে ময়দার দাম বেড়েছে কিনা, কিংবা আজ ভালো বাতাস বইবে কিনা। সেই বাতাস গ্রাম পেরিয়ে পৌঁছে যায় বালুর মাঝে এক অদ্ভুত স্থানে। সেখানে দেখা যায় রঙিন গম্বুজ, যেন ভিন গ্রহের ডিম মাটিতে ছড়িয়ে আছে। মাজারা হোটেল। মাটি, সিমেন্ট আর পাতার মিশ্রণে হাতে তৈরি এই স্থাপনা, যেন মরুভূমির বুকেই জন্ম নেওয়া এক শিল্পকর্ম। কিন্তু যাত্রা এখানেই শেষ নয়। সামনে আছে সাদা পাহাড়। দেখতে যেন বরফে ঢাকা, অথচ গরম এখনো তীব্র। সেখানে আছে রেইনবো গুহা। ভেতরে ঢুকতেই হঠাৎ ঠান্ডা আর নিস্তব্ধতা নেমে আসে। আলো পড়তেই লাল, বেগুনি, কমলা রং ফুটে ওঠে। মনে হয় যেন পৃথিবী নিজেই এক চিত্রকর্মে এঁকেছে। দেয়ালগুলো কখনো খসখসে, কখনো দাঁড়ালো, আবার কোথাও কাঁচের মতো মসৃণ। সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, নিস্তব্ধতা। কারণ লবণ শব্দ প্রতিফলিত করে না, বরং শোষণ করে নেয়। আপনি নিজের হৃদস্পন্দন শুনতে পান, বুকের ভেতর চাপ অনুভব করেন। অনেকেই বিশ্বাস করে এই লবণের ভেতর আছে নিরাময়ের শক্তি। একটি খাড়া পাহাড়ের নিচে সমুদ্র থেকে ধীরে ধীরে উঠে আসে একটি কচ্ছপ। ভারী শরীর, কষ্টকর পথ, তবুও সে এগিয়ে চলে। শত শত বছর ধরে তার পূর্বপুরুষরা যে স্থানে ডিম দিয়েছে, ঠিক সেই জায়গাতেই সে বালু খুঁড়ে নতুন জীবন রেখে যায়। সেই সাধারণ বালুর ভেতরেই শুরু হয় আরেকটি গল্প। বিশ্বের চোখে হরমুজ এক চেকপয়েন্ট, এক কৌশলগত অঞ্চল, এক বিপদসংকুল স্থান। কিন্তু এখানকার মানুষের কাছে এটি শুধু বাড়ি। জাহাজ হারিয়ে গেলেও, তেল শেষ হয়ে গেলেও, দ্বীপটি থাকবে। আর সেটাই গল্পের শেষ। একটি জায়গা দেখতে নরকের মতো, তবুও যেখানে মানুষ বেঁচে থাকে, সংগ্রাম করে আর হাসতে জানে। পৃথিবীর মানচিত্রে এমন কিছু জায়গা আছে, যেগুলো আকারে ছোট হলেও, প্রভাবের দিক থেকে বিশাল। তেমনি এক জায়গা হলো স্ট্রেট অফ হরমুজ। একটি সংকীর্ণ জলপথ, যার বুক চিরে প্রতিদিন পৃথিবীর বিপুল তেলবাহী জাহাজ চলাচল করে। এই পথের আশেপাশে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট গ্রামগুলো যেন পৃথিবীর ব্যস্ত অর্থনীতির ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নিঃশব্দ জীবনের প্রতিচ্ছবি। এখানে যুদ্ধ, রাজনীতি বা আন্তর্জাতিক কৌশলের বড় বড় শব্দ নেই। আছে মানুষের সহজ জীবন, সংগ্রাম আর প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে টিকে থাকার গল্প। এই গ্রামগুলোর সকাল শুরু হয় খুব ভোরে। সূর্য ওঠার আগেই সমুদ্রের হালকা নীল আলোয় জেগে ওঠে জেলেদের ছোট নৌকা। ঢেউ তখন শান্ত, বাতাসে লবণের গন্ধ। ঘরের ভেতর চুলায় জ্বলে ওঠে আগুন। রুটি আর চা তৈরি হয় দিনের প্রথম শক্তি হিসেবে। পুরুষেরা জাল কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। আর নারীরা পানির হাঁড়ি হাতে দূরের উৎস থেকে পানি সংগ্রহে যায়। এখানে পানিই সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। তেলের চেয়ে দামি, সোনার চেয়েও জরুরি। কখনো কখনো পানি আসে মূল ভূখণ্ড থেকে, যেমন বন্দর আব্বাস থেকে। ছোট ফেরিতে ভরে আনা ড্রামগুলো গ্রামে ভাগ করে দেওয়া হয়। একটি ড্রামের পানি মানে পুরো পরিবারের কয়েকদিনের জীবন। এই অঞ্চলের প্রকৃতি কঠিন, কিন্তু সুন্দর। চারদিকে লাল মাটি, লবণের পাহাড় আর দূরে নীল সমুদ্র, সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত রঙের জগত। দুপুরের দিকে সূর্য যখন মাথার ওপর ওঠে, তখন গ্রাম যেন থমকে যায়। তাপমাত্রা এত বেশি হয়ে ওঠে যে মানুষ ছায়া খোঁজে নেয় ঘরের ভেতর। যুদ্ধের খবর, তেলের দাম, আন্তর্জাতিক রাজনীতি সবকিছুর বাইরে দাঁড়িয়ে তারা প্রতিদিন সূর্যোদয় দেখে। সমুদ্রের সঙ্গে লড়ে আর সন্ধ্যায় পরিবারের পাশে বসে হাসে। সেই হাসির মধ্যেই লুকিয়ে আছে এই গ্রামের আসল শক্তি। একটি জীবন যা কঠিন হলেও সুন্দর, কঠোর হলেও মানবিক আর সীমিত সম্পদের মাঝেও অশেষ সম্ভাবনায় ভরা।



