[0:03]ইউরোপের দেশ ইতালির এক একটি শহর স্থাপত্যকলা এবং নির্মাণ শৈলীর জন্য বিশ্বখ্যাত। এ দেশের ফ্লোরেন্স, ভেনিস, রোম এবং মিলানের মতো শহরগুলো তাই স্থাপত্য প্রেমীদের কাছে রীতিমতো তীর্থস্থানের মতো জনপ্রিয়। এই ভিডিওতে আপনাদের ইতালির শহর ভেনিস সম্পর্কে বিস্তারিত জানাবো। অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের উপকূলবর্তী ব্রেন্টা এবং সিলে নদীর মোহনায় অবস্থিত এই ভেনিস শহরটি মূলত 118 টি ছোট বড় দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত। এই দ্বীপের অনেকগুলোই মানুষের তৈরি। ত্রয়োদশ এবং চতুর্দশ শতকে শক্তিশালী নৌবাহিনীর কল্যাণে এই ভেনিস বিশ্বের অন্যতম বিত্তশালী জনপদে পরিণত হয়েছিল। অবশ্য 200 বছরের মাথায় ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং স্পেইনের মতো সাম্রাজ্যগুলোর দাপটে ভেনিস তার প্রভাব হারিয়ে ফেলতেও সময় নেয়নি তেমন। বর্তমানে প্রায় 415 বর্গ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত ভেনিস জেলার জনসংখ্যা আড়াই লাখের কিছু বেশি। এর মধ্যে 50 হাজারের বেশি মানুষ ঐতিহ্যবাহী ভেনিস শহরটির সীমানার ভেতর বসবাস করেন। সুপ্রিয় দর্শক, চলুন তবে আর কথা না বাড়িয়ে আদ্যোপান্তের এই পর্বে বিশ্বের সুন্দরতম শহরগুলোর মধ্যে শীর্ষস্থানীয় ভেনিস সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে আসি।
[1:25]বর্তমানে ভেনিস নামে পরিচিত এলাকাটি এখন থেকে 3000 বছর আগে স্রেফ একটি জলাভূমি ছিল। অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের উত্তর উপকূলে ব্রেন্টা এবং সিলে নদীর মোহনা সংলগ্ন এই এলাকাটির নাম রাখা হয়েছে এখানে প্রথম বসতি স্থাপনকারী ভেনিটি গোত্রের নাম থেকে। ভাষাবিদদের ধারণা, কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া ইন্দো ইউরোপিয়ান ভাষার ওয়ে নেই শব্দটি থেকে এই ভেনিটি নামটির উৎপত্তি হয়েছিল। যার অর্থ ছিল বন্ধুসুলভ। সম্ভবত এই গোত্রের সদস্যদের মিশুক স্বভাবের কারণেই এদের এমন নাম দেয়া হয়েছিল। প্রাচীন গ্রিকরা এ গোত্রটির নাম রেখেছিলেন এনেটুই। যা অপভ্রংশ হয়ে ভেনিটিতে পরিণত হয়। আবার কারো মতে, ভেনিটি এবং তাদের বাসস্থান ভেনেশিয়া নামটির উৎপত্তি লাতিন ভেনিটুস শব্দটি থেকে হয়েছিল। যার অর্থ সাগরের মতো নীল। এই পক্ষের দাবি অনুযায়ী অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের সুনীল জলরাশির কারণেই এই এলাকার এমন নাম রাখা হয়েছিল। খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতকে ইতালীয় উপদ্বীপ এলাকায় রোমান রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর এক পর্যায়ে ভেনিস অঞ্চলটিও তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। কাগজে-কলমে রোমানদের দখলে থাকলেও দুর্গম এই জলাভূমিতে তাদের কার্যকরী কোন প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ছিল না বললেই চলে। ফলে রাজবংশের চক্ষুশূলে পরিণত হওয়া অনেকেই প্রাণ বাঁচাতে এই অঞ্চলে আশ্রয় নিতেন। প্রতিষ্ঠার প্রায় দেড় হাজার বছর পর রোমান সাম্রাজ্য পূর্ব এবং পশ্চিম দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছিল। পশ্চিম অংশের নাম রোমান সাম্রাজ্য থাকলেও পূর্ব অংশটির নাম রাখা হয় বাইজান্টিয়াম। এরপর ধীরে ধীরে পশ্চিম অংশটি তার ক্ষমতা হারানো শুরু করে। যার ধারাবাহিকতায় রোমান সাম্রাজ্যের সীমান্তবর্তী এলাকায় বহিরাগতরা উপর্যপুরী আক্রমণ চালানো শুরু করেছিল। লম্বার্ড, ভিসিগথ এবং হান নামক এই বহিরাগত শত্রুদের হামলা থেকে বাঁচতে ইতালির পা দুয়া, ট্র্যাভিসো এবং আলচিনোর মতো এলাকার অধিবাসীরা দল বেঁধে ভেনেশিয়া এলাকায় পালিয়ে আসা শুরু করে। বসতি স্থান নির্মাণের উপযোগী করতে এই অভিবাসীরা দুই নদীর মোহনায় অবস্থিত জলাভূমিতে অল্ডার গাছের বিশাল বিশাল গুঁড়ি পুঁতে দিয়েছিলেন। এই গুঁড়ি গুলো সমুদ্রের নোনা পানিতে পচে যাবার পরিবর্তে ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে রীতিমতো পাথরে পরিণত হয়েছে। গুঁড়ি গুলোর উপর পলি মাটি জমে তৈরি হওয়া নতুন দ্বীপে বসতভিটা তৈরি করা শুরু করেন অভিবাসীরা। অবশেষে খ্রিস্টাব্দ পঞ্চম শতকে পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতন হয়। এরপর ভেনিসের অধিবাসীরা প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখতে নিজেদের একটি প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করে। জেনে অবাক হবেন রিপাবলিক অফ ভেনিস নামক এই প্রজাতন্ত্রটি প্রায় দেড় হাজার বছর নিজের সার্বভৌমত্ব ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ঊনবিংশ শতকের শুরুতে ফরাসি সেনাপতি নেপোলিয়ন বোনাপার্টের হাতে নিজের স্বাধীনতা হারায় এই প্রজাতন্ত্র। প্রতিষ্ঠার পর ধীরে ধীরে পূর্ব দিকে অবস্থিত বাইজান্টিয়াম সাম্রাজ্যের সাথে ভেনিসের বাণিজ্যিক এবং কূটনৈতিক বন্ধুত্ব তৈরি হয়। বাণিজ্যিক সম্পর্কের কারণে বাইজান্টিয়াম থেকে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্য সরবরাহের জন্য এই ভেনিস বন্দরকে ব্যবহার করতেন ওই সময়ের ব্যবসায়ীরা। এই বন্দরে নোঙর ফেলা জাহাজে থাকা পণ্যের উপর আরোপিত শুল্ক সংগ্রহের ফলে ভেনিসের কোষাগার ফুলে ফেপে উঠা শুরু করে। পশ্চিমে ফরাসি সাম্রাজ্যের পূর্বসূরী ফ্র্যাঙ্কি রাজত্ব এবং পূর্বে বাইজান্টিয়াম সাম্রাজ্যের মধ্যে অবস্থিত ভেনিস প্রজাতন্ত্রের শাসন ব্যবস্থা ওই সময়ের তুলনায় বেশ অগ্রগামী ছিল। 697 সালে ভেনিসের জনগণ সাধারণ নির্বাচনে ভোট দিয়ে নিজেদের প্রথম শাসককে বেছে নিয়েছিলেন। ডোজি উপাধিধারী এ শাসক একটি নির্বাচিত সংসদের পর্যবেক্ষণে থাকতেন। লাতিন ভাষার ডোজি শব্দটির বাংলা হবে সর্দার বা মাতাব্বর। বিশ্বের অন্য সব অঞ্চলে যখন রাজতন্ত্রই একমাত্র শাসন ব্যবস্থা হিসেবে প্রচলিত ছিল তখন ভেনিসের এই ব্যতিক্রমী অবস্থানের প্রশংসা করতেই হচ্ছে। বাইজান্টিয়াম সাম্রাজ্যের সাথে উষ্ণ কূটনৈতিক সম্পর্কের কারণে একাদশ, দ্বাদশ এবং ত্রয়োদশ শতকে ক্রুসেডের বিভিন্ন পর্বে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে ভেনিস। কার্যত ভেনিসের নৌবাহিনী একাধিকবার পুরো ইউরোপের সেনাবাহিনীকে ভূমধ্যসাগরের পূর্ব উপকূলে পরিবহনের দায়িত্ব পালন করে। কারণ পুরো ইউরোপের সেরা জাহাজ নির্মাতারা এই ভেনিসের অধিবাসী ছিলেন। এই ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধগুলোর মধ্যে 1203 সালে সূচিত চতুর্থ ক্রুসেডটি ভেনিসের ইতিহাসে বেশ গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দখল করে আছে। সেবার ক্রুসেড যোদ্ধাদের গন্তব্য ছিল মিশর। কারণ মিশরের ক্ষমতাসীন আইওবিড রাজবংশ জেরুজালেম দখল করে নিয়েছিল। যথারীতি ভেনিসের নৌবাহিনীর প্রতি ধর্মযুদ্ধরা সেনাবাহিনী পরিবহনের অনুরোধ জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেবার ভেনিস সরকার জাহাজ ব্যবহারের জন্য একটি শর্ত বেঁধে দেন। শর্ত অনুযায়ী মিশরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করার আগে এক বিদ্রোহী যুবরাজকে বাইজান্টিয়ামের সিংহাসনে বসাতে সাহায্য করতে হবে। শর্ত অনুযায়ী খ্রিস্টান ধর্মযোদ্ধারা বাইজান্টিয়ামের রাজধানী কনস্টান্টিনোপোলের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। সেখানে পৌঁছে প্রথম দফায় তারা সফল হয়েছিলেন। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পরেই স্থানীয়রা ঐক্যবদ্ধ হয়ে নতুন রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ডাক দিয়ে বসেন। এক পর্যায়ে বিদ্রোহীদের হাতে রাজার মৃত্যু হয়। এর ফলে প্রতিশ্রুতিও পারিশ্রমিক না পাওয়ার আশঙ্কায় ধর্মযোদ্ধারা কনস্টান্টিনোপল শহর জুড়ে লুটতরাজ এবং গণহত্যা শুরু করেন। এ সময় ভেনিসের যোদ্ধারা এই শহর থেকে বিপুল পরিমাণ ধন-সম্পদ তাদের জন্মভূমিতে নিয়ে গিয়েছিলেন। বলা হয় কনস্টান্টিনোপল থেকে লুণ্ঠিত সম্পদের ফলেই ভেনিসের মত ইতালির বিভিন্ন শহরে রেনেসাঁ বা নবজাগরণ যুগের সূচনা সম্ভব হয়েছিল। এরপর 1453 সালে কনস্টান্টিনোপল সহ পুরো বাইজান্টিয়াম সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ অটোম্যানদের হাতে চলে যায়। এরপরেও ভেনিসের সাথে আনাতোলিয়া নামক এই অঞ্চলের বাণিজ্যিক সম্পর্ক অটুট ছিল। ওই সময় বিভিন্ন ধর্ম অনুসারীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা রাজ্যগুলোর মধ্যে সম্পর্ক ছিল সাপে নেউলের মতো। তবে এবারও যথারীতি রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দেয় ভেনিস। তাদের ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থানের কারণে সব ধর্মাবলম্বীদের সাথেই ভেনিসের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক অব্যাহত ছিল। এ সুসম্পর্কের কারণে ভেনিসের অর্থনীতি দারুণ সমৃদ্ধ অবস্থানে চলে যায়। বিশেষ করে ভারত এবং চীন থেকে আমদানি করা দুর্লভ সব পণ্য সামগ্রী এই ভেনিস বন্দরে নোঙর ফেলত। এরপর একে একে স্পেন, ফ্রান্স এবং ব্রিটেন বিশ্বের অন্যতম নৌ পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। এর ফলে ভূমধ্যসাগরীয় এলাকায় ভেনিসের কর্তৃত্ব কিছুটা কমে যায়। কিন্তু ভেনিসের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকেছিল পর্তুগিজ সাম্রাজ্য। এই সাম্রাজ্যের নাবিকরা ভারতবর্ষে যাবার নতুন পথ খুঁজে বের করেছিলেন। আফ্রিকা মহাদেশের দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে ভারত মহাসাগর পেরিয়ে তারা ইউরোপ থেকে ভারত পর্যন্ত সরাসরি সমুদ্র পথ আবিষ্কার করেন। নৌপথে পণ্য পরিবহন অনেক বেশি স্বাশ্রয়ী হওয়ায় এরপর ভূমধ্যসাগর বা ভেনিসের বন্দর ব্যবহারের আর প্রয়োজন ছিল না তেমন। এরপর ভেনিসের স্বাধীনতায় আঘাত হানেন ফরাসি সেনাপতি নেপোলিয়ন বোনাপার্ট। 1797 সালে ফ্রান্সের সম্রাট হিসেবে অভিষেক গ্রহণের পর তিনি ভেনিস সহ পুরো ইতালীয় উপদ্বীপটাই দখল করে নিয়েছিলেন। পরের 50 বছরে ভেনিসের কর্তৃত্ব কয়েক দফা ফ্রান্স এবং অস্ট্রিয়ার মধ্যে হস্তান্তর হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত 1866 সালে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর সদ্য প্রতিষ্ঠিত ইতালি রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয় ভেনিস। সেই থেকে ইতালির অংশ হিসেবেই ঐতিহ্যবাহী এই জনপদটি তার অস্তিত্ব বজায় রেখেছে। উনবিংশ শতকের শেষ ভাগে পুরো ভেনিস শহরটিকে ঠেলে সাজানো হয়। ওই সময় নির্মিত নান্দনিক সেতু গুলো এই শহরের অন্যতম আকর্ষণ। এছাড়া 118 টি ছোট বড় দ্বীপের মধ্যে বয়ে যাওয়া খালে গন্ডোলা নামক নৌকাও পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। 2017 সালের আনুষ্ঠানিক হিসেব অনুযায়ী ভেনিটি ভেনিস শহরে প্রতিদিন গড়ে 60 হাজার পর্যটক ঘুরতে আসেন। অর্থাৎ প্রতিবছর প্রায় আড়াই থেকে 3 কোটি মানুষ এই শহরটি পরিদর্শন করেন। এ বিপুল সংখ্যক পর্যটকের কারণে ভেনিসের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়ে গিয়েছে। এদের থাকা খাওয়ার জন্য নির্মিত অবকাঠামো গুলো ভেনিসের কৃত্রিম দ্বীপগুলোর উপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। বিজ্ঞানীদের গবেষণা অনুযায়ী এই ধারা অব্যাহত থাকলে এই শতকের মধ্যেই ভেনিস শহরটি সার্বক্ষণিক জলাবদ্ধতার কারণে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে। এখনই অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের জোয়ারের সময় প্রাচীন শহরটির বিশাল অংশ পানির নিচে তলিয়ে যায়। এই হুমকি মোকাবেলায় পর্যটক সংখ্যা কমিয়ে আনতে ভেনিসের নগর কর্তৃপক্ষ একাধিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছে। এর মধ্যে একটি নির্দিষ্ট ওজনের বেশি জাহাজের ভেনিসে প্রবেশাধিকার বাতিল এবং নতুন কোন আবাসিক হোটেল নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিশ্ববাসীর আশা ঐতিহ্যবাহী এই শহরটির অস্তিত্ব রক্ষায় আরো তত্পর হবে স্থানীয় সরকার। সেই সাথে এই বিষয়ে পর্যটকদের মাঝেও সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



