Thumbnail for বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের সবচেয়ে বড় রহস্য—Flight 19 | আদ্যোপান্ত | Flight 19 Mystery by ADYOPANTO

বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের সবচেয়ে বড় রহস্য—Flight 19 | আদ্যোপান্ত | Flight 19 Mystery

ADYOPANTO

27m 31s3,754 words~19 min read
Auto-Generated

[0:03]৫ ডিসেম্বর, ১৯৪৫। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা। দিনটি ছিলো ঝলমলে। আটলান্টিক মহাসাগরের উপরের আকাশ ছিলো পরিষ্কার, বাতাসে ছিলো মৃদু নোনা গন্ধ। ফোর্ট লডারডেল নেভাল এয়ার স্টেশনের রানওয়েতে প্রস্তুত পাঁচটি টিবিএম অ্যাভেঞ্জার টরপেডো বোমারু বিমান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে মাত্র কয়েক মাস আগে। কিন্তু আমেরিকার নৌবাহিনীর প্রশিক্ষণ তখনো পুরো দমে চলছে। ঘড়িতে তখন দুপুর ২টা ১০ মিনিট। একে একে রানওয়ে ছেড়ে নীল আকাশে ডানা মেললো পাঁচটি বিমান। এই স্কোয়াড্রনটির নাম দেওয়া হয়েছিলো ফ্লাইট ১৯। মিশনের লক্ষ্য ছিলো খুবই সাধারণ। নেভিগেশন প্রবলেম নম্বর ওয়ান। অর্থাৎ পূর্ব দিকে উড়ে গিয়ে কিছুটা বোম্বিং প্র্যাকটিস করা, এরপর উত্তরে ঘুরে আবার ঘাঁটিতে ফিরে আসা। সব মিলিয়ে ঘণ্টা তিনেকের একটা রুটিন ফ্লাইং মিশন। বিমানের নেতৃত্বে ছিলেন অভিজ্ঞ ফ্লাইট ইনস্ট্রাক্টর লেফটেন্যান্ট চার্লস টেইলর। সাথে ছিলেন আরো ১৩ জন ক্রু। ফুয়েল ট্যাঙ্কে পর্যাপ্ত জ্বালানি, আবহাওয়া অনুকূলে এবং সবাই যুদ্ধের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন। কিন্তু তারা আর ফিরে আসেননি। সূর্য ডোবার আগেই পাঁচটি বিমান এবং ১৪ জন মানুষ আটলান্টিকের বুকে যেন কর্পূরের মতো উবে গেলো। কোন ধ্বংসাবশেষ মিললো না, কোন তেল ভাসতে দেখা গেলো না। এমনকি তাদের উদ্ধার করতে যাওয়া আরেকটি বিশাল সি-প্লেনও ১৩ জন ক্রু সহ নিখোঁজ হয়ে গেলো। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ২৭ জন মানুষ এবং ছয়টি বিমান পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলো। কি ঘটেছিলো সেই বিকেলে? কেন অভিজ্ঞ পাইলট চার্লস টেইলর দিকভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন? আর তাদের শেষ রেডিও বার্তায় কেন তারা বলছিলেন Everything looks wrong, even the ocean looks different? এই একটি ঘটনা কি জন্ম দিয়েছিলো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রহস্য বারমুডা ট্রাইঅ্যাঙ্গেলের? নাকি এর পেছনে ছিলো ভুলের এক করুন ট্রাজেডি। ইতিহাসের অন্যতম অমীমাংসিত এই রহস্যের জট খোলার চেষ্টা করবো আদ্যোপান্ত আজকের পর্বে।

[2:14]৫ ডিসেম্বর, ১৯৪৫। দুপুর ১টা ১৫ মিনিট। ফ্লোরিডার ফোর্ট লডারডেল নেভাল এয়ার স্টেশন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার মাত্র তিন মাস পর আমেরিকার সামরিক ঘাঁটিগুলোতে তখন এক অদ্ভুত স্বস্তির বাতাস। বারুদের গন্ধ মিলিয়ে গেছে, সাইরেনের শব্দ আর শোনা যায় না। সৈন্যরা এখন আর মৃত্যুর দিন গোনে না। তারা গোনে বাড়ি ফেরার দিন। ঠিক এমনি এক অলস দুপুরে রানওয়ের পিচ ঢালা পথে দুপুরের কড়া রোদ ঠিকরে পড়ছে। আটলান্টিক মহাসাগর থেকে ভেসে আসা নোনা বাতাস নারিকেল গাছের পাতা দুলিয়ে যাচ্ছে। আপাত দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গাগুলোর একটি। কিন্তু এই শান্ত পরিবেশের আড়ালে নেভাল এয়ার স্টেশনের অপারেশন রুমে তখন চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। ফ্লাইট অপারেশনের ব্ল্যাকবোর্ডে চক দিয়ে লেখা হলো একটি কোড নেইম ফ্লাইট ১৯। এটি কোন গোপন বা বিপদজনক মিশন ছিলো না। এটি ছিলো অ্যাডভান্সড কম্বেট ট্রেইনিদের গ্র্যাজুয়েশনের আগে চূড়ান্ত পরীক্ষা। নেভাল পরিভাষায় যাকে বলা হয় নেভিগেশন প্রবলেম নম্বর ওয়ান। মিশনের লক্ষ্য ছিলো অত্যন্ত সাধারণ। প্রথমে ঘাঁটি থেকে সোজা পূবে ৫৬ মাইল উড়ে গিয়ে হেন্স অ্যান্ড চিকেন শোলস নামক এলাকায় কিছু প্র্যাকটিস বোমা ফেলা। এরপর আরো ৬৬ মাইল পূবে গিয়ে বাহামাস দ্বীপপুঞ্জের কাছে পৌঁছানো। সেখান থেকে ৭৩ মাইল উত্তরে ঘুরে যাওয়া এবং সবশেষে দক্ষিণ-পশ্চিমে ১২০ মাইল উড়ে সোজা ফোর্ট লডারডেলে ফিরে আসা। সব মিলিয়ে ৩১৫ মাইলের একটি ত্রিভুজাকৃতির পথ। সময় লাগার কথা আনুমানিক তিন ঘণ্টা। আবহাওয়া ছিলো চমৎকার, আকাশ পরিষ্কার, সাগর শান্ত। রানওয়েতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে পাঁচটি বিশাল যুদ্ধবিমান। এগুলোর নাম টিবিএম অ্যাভেঞ্জার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রশান্ত মহাসাগরে জাপানি নৌবহর ধ্বংস করার জন্য এই বিমানগুলো তৈরি করা হয়েছিলো। জেনারেল মোটরসের তৈরি এই বিমানগুলোকে পাইলটরা আদর করে ডাকতেন দ্য আয়রন বার্ডস বা লোহার পাখি। কেন? কারণ এগুলো ছিলো উড়ন্ত ট্যাঙ্কের মতো। এর ১৮০০ হর্স পাওয়ারের রাইট সাইক্লোন ইঞ্জিন এতটাই শক্তিশালী ছিলো যে, এটি নিজের ওজনের চেয়েও বেশি ওজনের বোমা বা টরপেডো বহন করতে পারতো। যুদ্ধের সময় দেখা গেছে জাপানি বিমান বিধ্বংসী কামানের গুলিতে ঝাঁজরা হয়ে যাওয়া বা ডানা ভেঙে যাওয়ার পরেও অ্যাভেঞ্জার বিমানগুলো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ঠিকই বিমানবাহী রণতরীতে ফিরে এসেছে। এই বিমানগুলোতে ছিলো উন্নত মানের রেডিও, জাইরো কম্পাস এবং রাডার। সবচেয়ে বড় কথা এগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছিলো যে জরুরি অবস্থায় পানিতে নামলে বা ডিচিং করলে এগুলো অন্তত ৯০ সেকেন্ড ভেসে থাকতে পারতো। এই সময়টুকু ক্রুদের লাইফ র‍্যাপড বা ভেলায় চড়ে বাঁচার জন্য যথেষ্ট। অর্থাৎ এই পাঁচটি বিমান একসাথে যান্ত্রিক গোলযোগে পড়ে হারিয়ে যাবে এটা ছিলো এক কথায় অসম্ভব। ফ্লাইট ১৯ এর মোট সদস্য সংখ্যা ছিলো ১৪ জন। এর মধ্যে ১৩ জন ছিলেন ট্রেইনি পাইলট। কিন্তু তাদের শিক্ষানবীশ বলাটা ভুল হবে। এদের কেউ নতুন বা কাঁচা হাতের পাইলট ছিলেন না। এদের প্রত্যেকেই ছিলেন যুদ্ধের ময়দান ফেরত অভিজ্ঞ যোদ্ধা। ক্যাপ্টেন এবং মেরিন কর্পসের অফিসার পদমর্যাদার এই পাইলটরা যুদ্ধের সময় ৩০০ থেকে ৪০০ ঘণ্টা বিমান চালানোর অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন। আজকের ফ্লাইটটি ছিলো কেবল তাদের নেভিগেশন দক্ষতার একটি আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। দলের নেতৃত্বে ছিলেন লেফটেন্যান্ট চার্লস ক্যারল টেইলর। ২৮ বছর বয়সী টেইলর ছিলেন একজন ভেটেরান বা যুদ্ধ ফেরত পোড়খাও পাইলট। তার ঝুলিতে ছিলো আড়াই হাজার ঘণ্টারও বেশি ফ্লাইং আওয়ার। প্রশান্ত মহাসাগরে যুদ্ধের সময় তিনি জাপানিদের বিরুদ্ধে সাহসিকতার সাথে লড়েছিলেন। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় টেইলর সম্পর্কে একটি বিতর্কিত তথ্য পাওয়া যায়। বলা হয় ৫ ডিসেম্বর সকালে টেইলর ফ্লাইটে যেতে চাননি। তিনি ডিউটি অফিসারের কাছে গিয়ে বলেছিলেন, আমাকে আজকের ফ্লাইট থেকে অব্যাহতি দেওয়া হোক। কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি কোন সদুত্তর দিতে পারেননি। অনেকে বলেন তিনি আগের রাতে পার্টি করেছিলেন বলে শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিলেন। আবার কেউ কেউ বলেন তার মনে হয়তো কোন অশুভ ইঙ্গিত বা প্রিমোনেশন কাজ করছিলো। কিন্তু যেহেতু তার কোন উপযুক্ত কারণ ছিলো না এবং অন্য কোন ইনস্ট্রাক্টর তখন ফ্রি ছিলেন না তাই তার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা হয়। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ককপিটে ওঠেন টেইলর। ফ্লাইট ১৯ এ আসলে মানুষ থাকার কথা ছিলো ১৫ জন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে একজন আসেননি। তার নাম কর্পোরাল অ্যালান কসনার। ফ্লাইটের আগে কসনার তার ফ্লাইট লিডারের কাছে গিয়ে বলেছিলেন, স্যার, আজকে আমি না গেলে চলে? যেহেতু এটি একটি ট্রেনিং ফ্লাইট ছিলো এবং কসনার ইতোমধ্যেই তার প্রয়োজনীয় ঘন্টা পূর্ণ করেছিলেন তাই তাকে ছুটি দেওয়া হয়। কসনার ব্যারাকে ফিরে যান। তিনি জানতেন না এই একটি ছোট অনুরোধ এবং অলসতা তাকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলো। পরবর্তী জীবনে কসনার এই ঘটনাটিকে বলতেন ঈশ্বরের অলৌকিক হস্তক্ষেপ। ফ্লাইট ১৯ এর বাকি ১৪ জন যখন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রহস্যের অংশ হতে যাচ্ছিলেন কসনার তখন ব্যারাকে শুয়ে বই পড়ছিলেন। দুপুর ২টা ১০ মিনিট। পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন গ্রাউন্ড ক্রুরা শেষবারের মতো বিমানগুলো চেক করলেন। ফুয়েল ট্যাংক পূর্ণ করা হলো। প্রতিটি বিমানে জ্বালানি ছিলো ১১০০ নটিক্যাল মাইল ওড়ার মতো, যা তাদের রুটিন মিশনের দূরত্বের তিনগুণ। ইঞ্জিন চালু করার সাথে সাথে পাঁচটি অ্যাভেঞ্জারের ১৮০০ হর্স পাওয়ারের ইঞ্জিনের গর্জনে কেঁপে উঠলো পুরো এয়ারবেস। প্রপেলারগুলো বাতাসের বুকে ঝড় তুললো। লিড প্লেন হিসেবে প্রথমে রানওয়ে ছাড়লেন লেফটেন্যান্ট টেইলর। তার পেছনে একে একে আকাশে ডানা মেললো বাকি চারটি বিমান। তাদের ফরমেশন ছিলো নিখুঁত। দুপুরের সোনালী রোদে বিমানের মেটালিক বডি চকচক করছিলো। কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে তাদের শেষবারের মতো দেখা গেলো দিগন্ত রেখায় ছোট বিন্দু হয়ে মিলিয়ে যেতে। গ্রাউন্ড কন্ট্রোলাররা কফির কাপে চুমুক দিয়ে ভাবলেন আর মাত্র তিন ঘণ্টা। বিকেলের চায়ের আগেই ছেলেরা ফিরে আসবে। কিন্তু তারা কেউ ঘুনাক্ষরেও ভাবতে পারেননি যে এই পাঁচটি বিমান আর কখনোই পৃথিবীর কোন রানওয়ে স্পর্শ করবে না। তারা এমন এক যাত্রায় বের হয়েছে যার কোন ফিরতি পথ নেই। প্রথম এক ঘণ্টা সবকিছু ঠিকঠাকই ছিলো। দুপুর ৩টা নাগাদ তারা হেন্স অ্যান্ড চিকেন শোলসে সফলভাবে বোমা ফেলেছিলো। ফিশিং বোটের একজন ক্যাপ্টেন পরে জানিয়েছিলেন তিনি নিচু দিয়ে পাঁচটি বিমানকে উড়ে যেতে দেখেছিলেন এবং বোমা ফেলার শব্দ শুনেছিলেন। কিন্তু বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে যখন তাদের মিশনে অর্ধেক পথ শেষ করে উত্তরে ঘোরার কথা, ঠিক তখনই ফোর্ট লডারডেলের রেডিওতে ভেসে এলো এক অদ্ভুত বার্তা। কোন মে ডে কল নয়, কোন যান্ত্রিক ত্রুটির রিপোর্ট নয়, বরং এটি ছিলো পাইলটদের নিজেদের মধ্যে কথোপকথন। একজন পাইলটকে বলতে শোনা গেলো আমার কম্পাস কাজ করছে না। আমরা কোথায় আছি বুঝতে পারছি না। শান্ত রৌদ্রোজ্জ্বল বিকেলটা হঠাৎ করেই পাল্টে যেতে শুরু করলো। অভিজ্ঞ টেইলর, যিনি সমুদ্রকে হাতের তালুর মতো চিনতেন তিনি কেন দিকভ্রান্ত হলেন? কেন তাদের কাছে নিজের চেনা সমুদ্রকে অচেনা মনে হতে লাগলো?

[8:56]বিকেল ৩টা ৪০ মিনিট। আটলান্টিক মহাসাগর। মিশন শুরুর প্রায় দেড় ঘণ্টা পার হয়েছে। ফ্লাইট ১৯ এর পাঁচটি বিমান তাদের নির্ধারিত প্র্যাকটিস বোম্বিং সফলভাবে শেষ করেছে। হেন্স অ্যান্ড চিকেন শোলস এলাকায় সমুদ্রের বুকে ডামি বোমাগুলো ফেলার পর তাদের এখন ফেরার পালা। পরিকল্পনা অনুযায়ী এই মুহূর্তে তাদের থাকার কথা গ্রেট বাহামা ব্যাংকের উপরে। নিচে থাকার কথা ছোট ছোট দ্বীপপুঞ্জ, ফিরোজা রঙের স্বচ্ছ পানি এবং প্রবাল প্রাচীর। এখান থেকে তাদের কম্পাস ধরে উত্তরে ঘুরে সোজা ফোর্ট লডারডেলের দিকে যাওয়ার কথা। আকাশে তখনো বিকেলের রোদ ঝলমল করছে। ভিজিবিলিটি চমৎকার, প্রায় ১০ থেকে ১২ মাইল।

[9:37]আপাতদৃষ্টিতে সবকিছুই স্বাভাবিক। কিন্তু ঠিক এই সময়ে ফোর্ট লডারডেলের কন্ট্রোল টাওয়ারের রেডিও অপারেটররা এমন কিছু শুনতে পেলেন যা তাদের মেরুদণ্ড দিয়ে ঠান্ডা স্রোত নামিয়ে দিলো। এটি কোন আনুষ্ঠানিক মে ডে কল বা বিপদের সংকেত ছিলো না। বরং রেডিও ফ্রিকুয়েন্সিতে ভেসে আসছিলো পাইলটদের নিজেদের মধ্যকার কথোপকথন। সেখানে আতঙ্কের ছাপ ছিলো স্পষ্ট। একজন পাইলটকে বলতে শোনা গেলো আমি জানি না আমরা কোথায় আছি। আমরা মনে হয় শেষ বারের বাঁকটি ভুল নিয়েছি। এই কথাটি শোনার পর গ্রাউন্ড কন্ট্রোলে থাকা ফ্লাইট ইনস্ট্রাক্টর লেফটেন্যান্ট রবার্ট কক্স, যিনি তখন অন্য একটি বিমানে ওই এলাকার কাছেই ছিলেন তিনি সাথে সাথে রেডিওতে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেন। তিনি ফ্লাইট ১৯ এর কল সাইন বোথ টেইলর উল্লেখ করে জিজ্ঞেস করলেন তোমাদের সমস্যা কি? উত্তরে ফ্লাইট লিডার লেফটেন্যান্ট চার্লস টেইলরের যে কণ্ঠস্বর ভেসে এলো তাতে সেই পরিচিত আত্মবিশ্বাসের লেশমাত্র ছিলো না। তিনি বললেন আমার দুইটি কম্পাসই নষ্ট হয়ে গেছে। আমি ফোর্ট লডারডেল খুঁজে পাচ্ছি না। আমি ডাঙ্গা চিনতে পারছি না। দুইটি কম্পাস একসাথে। এখানেই এই রহস্যের প্রথম এবং সবচেয়ে বড় খটকা। টিবিএম অ্যাভেঞ্জার বিমানে দুই ধরণের কম্পাস থাকতো। একটি জাইরো কম্পাস যা ইলেকট্রিক্যালি বা বৈদ্যুতিকভাবে চলে। আর অপরটি ম্যাগনেটিক কম্পাস যা পৃথিবীর চুম্বক ক্ষেত্রের উপর নির্ভর করে। একইসাথে একটি বিমানের দুইটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রযুক্তির কম্পাস নষ্ট হয়ে যাওয়াটা প্রায় অসম্ভব এর পর্যায়ে পড়ে। আর যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নি যে টেইলরের বিমানের যান্ত্রিক ত্রুটি ছিলো তবুও বাকি চারটি বিমানে কম্পাস তো অক্ষতই ছিলো। তাহলে কেন টেইলর অন্য পাইলটদের কম্পাস অনুসরণ করলেন না? নাকি তিনি এতটাই বিভ্রান্ত বা প্যানিকড হয়ে পড়েছিলেন যে নিজের যন্ত্রপাতির উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলেন। চার্লস টেইলর রেডিওতে বারবার বলছিলেন আমি নিশ্চিত আমরা ফ্লোরিডা কিসের উপর আছি। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না আমরা এতটা দক্ষিণে এলাম কি করে? এই একটি ভুল ধারণা বা ফিকসেশনই পুরো স্কোয়াড্রনটিকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিলো। চলুন বিষয়টি একটু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা যাক। ফোর্ট লডারডেল থেকে ফ্লোরিডা কিস দ্বীপপুঞ্জের অবস্থান অনেক দক্ষিণে। টেইলরের ফ্লাইট প্ল্যান অনুযায়ী তার থাকার কথা ছিলো বাহামাসের উপরে, যা ফোর্ট লডারডেলের পূর্বে অবস্থিত। কিন্তু সমস্যা হলো উপর থেকে দেখলে বাহামাসের ছোট ছোট দ্বীপগুলো এবং ফ্লোরিডা কিসের দ্বীপগুলো দেখতে প্রায় একই রকম। নিচে নীল সমুদ্র আর ছোট ছোট স্থলভাগ। টেইলর সদ্যই মিয়ামী নেভাল বেস থেকে ফোর্ট লডারডেলে বদলি হয়ে এসেছিলেন। মিয়ামিতে থাকাকালীন তিনি ফ্লোরিডা কিসের উপর দিয়ে অনেকবার উড়েছেন। তাই যখন তিনি নিচে ছোট ছোট দ্বীপ দেখলেন তার মস্তিষ্ক তাকে বোঝালো তুমি ফ্লোরিডা কিসের উপরে আছো। যদি টেইলর সত্যিই ফ্লোরিডা কিসের উপরে থাকতেন তবে বাড়ি ফেরার জন্য তার ওড়ার কথা ছিলো উত্তরে। তিনি সেই বিশ্বাস থেকেই তার দলকে নির্দেশ দিলেন সবাই উত্তর দিকে ওড়ো। কিন্তু বাস্তবতা ছিলো ভিন্ন। তারা ছিলেন বাহামাসের উপরে। আর বাহামাস থেকে উত্তর দিকে ওড়া মানেই হলো স্থলভাগ ছেড়ে আটলান্টিক মহাসাগরের আরো গভীর এবং জনমানবহীন অংশের দিকে চলে যাওয়া। বিকেল ৪টা নাগাদ পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠলো। রেডিও ট্রান্সমিশনে বোঝা যাচ্ছিলো যে দলের বাকি পাইলটরা টেইলরের সিদ্ধান্তের সাথে একমত হতে পারছিলেন না। এই ট্রেইনি পাইলটরা ছিলেন স্থানীয়। তারা ফ্লোরিডার আবহাওয়া এবং বাহামাসের ভূগোল সম্পর্কে টেইলরের চেয়ে ভালো জানতেন। তাদের মনে হচ্ছিলো তারা আটলান্টিকের উপরেই আছেন এবং তাদের উচিত পশ্চিম দিকে ওড়া। পশ্চিম দিকে ফ্লোরিডার বিশাল মূল ভূখণ্ড। যদি তারা ভুলও করেন তবু পশ্চিমে উড়ে কোন না কোন ডাঙ্গায় তাদের পৌঁছানোর কথা। কিন্তু সামরিক বাহিনীতে চেইন অফ কমান্ড বা শৃঙ্খলা ই সব। ইনস্ট্রাক্টরের আদেশ অমান্য করে দল ছুট হয়ে যাওয়ার সাহস বা অনুমতি তাদের ছিলো না। টেইলর তাদের লিডার। তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও তারা তাকে অনুসরণ করে উত্তরের দিকে অর্থাৎ মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। এদিকে সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। বিকেল ৪টা ৩০ মিনিট। শীতকাল হওয়ায় সূর্য তখন দ্রুত পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ছে। আর এই ডুবন্ত সূর্য তাদের বিভ্রান্তি আরো বাড়িয়ে দিল। টেইলর আশা করছিলেন উত্তরে উড়লে তিনি ফ্লোরিডা পাবেন। কিন্তু তিনি দেখছিলেন কেবল দিগন্ত জোড়া পানি। যতদূর চোখ যায় কেবল পানি আর পানি। তার মনে হতে শুরু করলো তিনি হয়তো মেক্সিকো উপসাগরের উপর আছেন। তাই তিনি আবার সিদ্ধান্ত বদলালেন। তিনি বললেন আমরা এখন পূব দিকে উড়বো, যতক্ষণ না ডাঙ্গা দেখা যায়। অন্ধকার ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে রেডিও সিগন্যালগুলো অস্পষ্ট হয়ে আসছিলো। ফোর্ট লডারডেলের কন্ট্রোল টাওয়ারের কর্মকর্তারা অসহায়ের মতো শুনছিলেন টেইলরের বিভ্রান্তিকর আদেশগুলো। তারা রাডারে ফ্লাইট ১৯ কে খুঁজছিলেন কিন্তু পাচ্ছিলেন না। টেইলরের কণ্ঠে তখন আর কোন কমান্ডারের গাম্ভীর্য ছিলো না। ছিলো এক অসহায় মানুষের আর্তনাদ। তিনি বুঝতে পারছিলেন তার কম্পাস নষ্ট হয়নি। নষ্ট হয়ে গেছে তার বিচার বুদ্ধি। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। তারা পৌঁছে গেছেন এমন এক জায়গায় যেখান থেকে ফেরার বা জ্বালানি বাঁচানোর আর কোন উপায় নেই। সবকিছু কেমন যেন ভুল মনে হচ্ছে। এমনকি সমুদ্রকেও আজ অন্যরকম লাগছে। টেইলরের এই শেষ কথাগুলো কি কেবলই বিভ্রান্তি ছিলো নাকি তিনি সত্যিই এমন কিছু দেখেছিলেন যা স্বাভাবিক ব্যাখ্যার বাইরে?

[14:40]বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিট। আটলান্টিক মহাসাগরের আকাশ। শীতের ছোট দিন। সূর্য পশ্চিম আকাশে দ্রুত ঢলে পড়ছে। আটলান্টিকের নীল জলরাশি ধীরে ধীরে ধূসর হতে শুরু করেছে। ফ্লাইট ১৯ এর পাঁচটি বিমান তখনো আকাশে। তাদের ফুয়েল ট্যাংকের কাঁটা ধীরে ধীরে নিচের দিকে নামছে। কিন্তু তার চেয়েও দ্রুত নামছে ১৪ জন মানুষের বেঁচে থাকার আশা। বাতাসে তখন আর কেবল নোনা গন্ধ নেই, আছে আতঙ্কের গন্ধ। রেডিও ফ্রিকুয়েন্সিতে ভেসে আসছে একের পর এক অসংলগ্ন বার্তা যা শুনলে বোঝা যায় ককপিটের ভেতরে তখন চলছে এক নীরব কিন্তু ভয়াবহ মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। এটি কেবল দিকভুলের ঘটনা ছিলো না। এটি ছিলো সামরিক শৃঙ্খলা বা চেইন অফ কমান্ড বনাম সাধারণ বুদ্ধিমত্তার এক ট্রাজিক লড়াই। এদিকে মাটিতে ফোর্ট লডারডেলের নেভাল এয়ার স্টেশনের অপারেশন রুমে তখন পিনপতন নীরবতা। ফ্লাইট ইনস্ট্রাক্টররা এবং রাডার অপারেটররা কান পেতে আছেন রেডিওর দিকে। তারা বুঝতে পারছিলেন লেফটেন্যান্ট চার্লস টেইলর একটি মারাত্মক ভুল করছেন। গ্রাউন্ড কন্ট্রোল থেকে বারবার টেইলরকে বলা হচ্ছিলো আপনার ইমার্জেন্সি সুইচ করুন, আমরা আপনাকে ট্র্যাক করতে পারছি না। কিন্তু অদ্ভুত কারণে টেইলর সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করছিলেন। কেন? বিশেষজ্ঞরা মনে করেন টেইলর ভয় পাচ্ছিলেন। তার একটি বিমান বাদে বাকি চারটি বিমানে রেডিও রিসিভার ঠিকমতো কাজ করছিলো না। টেইলর ভাবছিলেন তিনি যদি ফ্রিকুয়েন্সি পরিবর্তন করেন তবে তিনি হয়তো তার দলের বাকি চারটি বিমান বা উইংম্যানদের সাথে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলবেন। একজন দলনেতা হিসেবে তিনি তার ছাত্রদের একা ফেলে দিতে চাননি। কিন্তু এই দলবদ্ধ থাকার জেদি শেষ পর্যন্ত পুরো দলটিকে ডুবিয়ে দেয়। বিকেল ৫টার দিকে রেডিওতে ভেসে এলো ট্রেইনি পাইলটদের কণ্ঠস্বর। তারা ছিলেন স্থানীয়। তারা ফ্লোরিডার আকাশ এবং সমুদ্রকে হাতের তালুর মতো চিনতেন। তাদের কাছে বিষয়টি ছিলো দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। তারা দেখছিলেন সূর্য ডুবছে তাদের বাম দিকে। অর্থাৎ পশ্চিম দিক তাদের বামে। যদি তারা বাম দিকে ওড়েন তবে তারা ফ্লোরিডা পাবেন। আর যদি টেইলরের কথামতো তারা ডান দিকে অর্থাৎ পূর্ব দিকে ওড়েন তবে তারা চলে যাবেন খোলা সাগরে। রেডিও লগে শোনা যায় একজন ট্রেইনি পাইলট সম্ভবত ক্যাপ্টেন এডওয়ার্ড পাওয়ার্স বিরক্তিসহ বলছেন ধুচ্ছাই। আমরা যদি কেবল পশ্চিম দিকে উড়তাম তবে এতক্ষণে বাড়ি পৌঁছে যেতাম। অন্য একটি বিমানে দুই ছাত্রের মধ্যে কথা কাটাকাটি শোনা যায়। আমাদের পশ্চিম দিকে ওড়া উচিত। তাহলে আমরা কেন ঘুরছি না? কারণ বস রাজি হচ্ছেন না। এখানে মিলিটারি সবচেয়ে নির্মম সত্যটি লুকিয়ে আছে। সামরিক বাহিনীতে ইনস্ট্রাক্টর বা কমান্ডারের আদেশ অমান্য করাকে বলা হয় মিউটিনি বা বিদ্রোহ। এর শাস্তি কোর্ট মার্শাল। ১৪ জন মানুষের জীবন তখন ঝুলছিলো সুতোর উপর। তারা জানতো ইনস্ট্রাক্টর ভুল করছেন। তারা জানতো তিনি তাদের মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে তাদের মস্তিষ্কে যে শৃঙ্খলা বা ডিসিপ্লিন গেঁথে দেওয়া হয়েছিলো তা তাদের উর্ধ্বতরের আদেশের বিরুদ্ধে গিয়ে বিমানের মুখ ঘোরানোর সাহস দেয়নি। তারা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাদের নেতাকে অনুসরণ করেছিলেন। বিকেল ৫টা ১৫ মিনিট। টেইলর তখন পুরোপুরি বিভ্রান্ত বা ডিসওরিয়েন্টেড। কখনো তিনি বলছিলেন আমরা এখন পূবে উড়বো, ডাঙ্গা পেলেই নামবো। ১০ মিনিট পর তিনি বলছেন না, আমরা হয়তো মেক্সিকো উপসাগরে আছি। সবাই ঘোড়ো, আমরা এখন উত্তরে উড়বো। ভাবুন একবার। পাঁচটি ভারী যুদ্ধবিমান সমুদ্রের উপর দিয়ে একবার পূবে, একবার উত্তরে, আবার একবার পশ্চিমে এভাবে আঁকাবাঁকা জিগজ্যাগ করে উড়ছে। এর ফলে দুটি ভয়াবহ ঘটনা ঘটছিলো। প্রথমত জ্বালানি অপচয়। এলোমেলো ওড়ার কারণে তাদের মূল্যবান এভিয়েশন ফুয়েল দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছিলো। দ্বিতীয়ত, প্রতিবার যখন তারা পূবে বা উত্তরে উড়ছিলেন তারা ফ্লোরিডা উপকূল থেকে আরো দূরে আটলান্টিকের গভীর অংশে চলে যাচ্ছিলেন। বিকেল ৫টা ৩০ মিনিট। সূর্য ডুবে গেলো। আর সাথে সাথেই আটলান্টিক মহাসাগর তার ভয়াল রূপ ধারণ করলো। এতক্ষণ আকাশ মোটামুটি পরিষ্কার থাকলেও সন্ধ্যার পর সেখানে হানা দিলো মৌসুমী ঝড়। বাতাসের গতিবেগ বেড়ে দাঁড়ালো ঘন্টায় ৩০ থেকে ৪০ নট। সমুদ্রের ঢেউগুলো ২০ ফুট পর্যন্ত উঁচু হতে শুরু করলো। টিবিএম অ্যাভেঞ্জার বিমানগুলো নিচু উচ্চতায় ওড়ে। ফলে ঝড়ের ঝাপটা সরাসরি তাদের গায়ে লাগছিলো। অন্ধকার রাতে মেঘের ভেতর দিয়ে ওড়ার সময় পাইলটদের পক্ষে আকাশ আর সমুদ্রের পার্থক্য বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। একে বলা হয় ভার্টিগো। নিচে কালো সমুদ্র, উপরে কালো আকাশ। আর তার মাঝখানে পাঁচটি ছোট বিমান যেন অনন্ত শূন্যতায় ভাসছে। সন্ধ্যা ৫টা ৫০ মিনিটের দিকে ফ্লোরিডার বিভিন্ন রাডার স্টেশন ফ্লাইট ১৯ এর অবস্থান ট্রাইঅ্যাঙ্গুলেট করতে সক্ষম হয়। তারা নিশ্চিত হয় যে টেইলর মেক্সিকো উপসাগরে নন, বরং তিনি বাহামাসের উত্তরে এবং ফ্লোরিডার পূর্বে আটলান্টিকের উপরে আছেন। গ্রাউন্ড কন্ট্রোল থেকে মড়িয়া হয়ে টেইলরকে বার্তা পাঠানো হয়। আপনাদের অবস্থান শনাক্ত করা গেছে। আপনি এখন যেখানে আছেন সেখান থেকে সোজা পশ্চিমে উড়ুন, আপনি ডাঙ্গা পাবেন। কিন্তু বায়ুমণ্ডলের গোলযোগ বা অ্যাটমোস্ফিয়ারিক ইন্টারফিয়ারেন্স এর কারণে টেইলর এই বার্তাটি শুনতে পাননি। অথবা পেলেও তার বিভ্রান্ত মস্তিষ্ক তা বিশ্বাস করতে চায়নি। তিনি তখনো ভাবছিলেন তিনি মেক্সিকো উপসাগরে। আর মেক্সিকো উপসাগর থেকে পশ্চিমে ওড়া মানে টেক্সাসের দিকে যাওয়া, যা অনেকটাই দূর। তাই তিনি এই নির্দেশ মানলেন না। তিনি পূব দিকে উড়তে থাকলেন সোজা আফ্রিকান উপকূলের দিকে, যা হাজার মাইল দূরে। সন্ধ্যা ৬টা। ফুয়েল ট্যাংকের কাঁটা লাল দাগের কাছাকাছি। টেইলর বুঝতে পারলেন খেলা শেষ হয়ে এসেছে, ডাঙ্গা আর পাওয়া যাবে না। তার কণ্ঠে তখন আর কোন দ্বিধা নেই। আছে এক অদ্ভুত শান্তভাব যা মৃত্যুর আগে মানুষের মধ্যে আসে। তিনি তার উইংম্যানদের উদ্দেশ্যে শেষ এবং সবচেয়ে কঠিন আদেশটি দিলেন। ইতিহাসে এই আদেশটি এক করুণ সুইসাইডাল প্যাক্ট হিসেবে পরিচিত। তিনি বললেন সবাই ভালো করে শোনো। আমরা ততক্ষণ পর্যন্ত উড়বো যতক্ষণ না আমাদের জ্বালানি শেষ হয়। যখন প্রথম বিমানটির জ্বালানি ১০ গ্যালনের নিচে নামবে তখন আমরা সবাই একসাথে সাগরে নামবো। তিনি জানতেন একা সাগরে নামলে কেউ বাঁচবে না। তাই মরলে সবাই একসাথে মরবেন। রাত নামছে। নিচে উত্তাল সমুদ্র, রাক্ষসের মতো ফণা তুলে অপেক্ষা করছে। পাঁচটি বিমানের ১৪ জন তরুণ পাইলট যাদের সামনে পুরো জীবন পড়ে ছিলো তারা এখন প্রস্তুত হচ্ছেন তাদের জীবনের শেষ ল্যান্ডিং এর জন্য। সেই শেষ মুহূর্তগুলো কেমন ছিলো এবং তাদের উদ্ধার করতে যাওয়া বিমানটি নিজেই কিভাবে হারিয়ে গেলো? ৫ ডিসেম্বর, ১৯৪৫। সন্ধ্যা ৭টা। ফ্লোরিডার আকাশ তখন নিকষ কালো অন্ধকারে ঢাকা। আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে বইছে দমকা হাওয়া। বাতাসের গতিবেগ ঘন্টায় ৩০ নটেরও বেশি। ফোর্ট লডারডেলের কন্ট্রোল টাওয়ারে তখন আর কোন আশা অবশিষ্ট নেই। ফ্লাইট ১৯ এর রেডিও সিগন্যাল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। রাডারের স্ক্রিনে সেই পাঁচটি ছোট বিন্দুর আর কোন অস্তিত্ব নেই। কর্মকর্তারা জানেন অ্যাভেঞ্জার বিমানগুলোর জ্বালানি এতক্ষণে শেষ। বিমানগুলো এখন আটলান্টিকের কোথাও ভাসছে অথবা তলিয়ে গেছে। কিন্তু যতক্ষণ নিশ্চিত খবর না পাওয়া যাচ্ছে ততক্ষণ হাল ছাড়া যায় না। নৌবাহিনীর নীতি হলো উই লিভ নো ম্যান বিহাইন্ড। দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো উদ্ধারকারী বিমান পাঠাতে হবে। ফোর্ট লডারডেলের উত্তরে অবস্থিত বানানা রিভার নেভাল এয়ার স্টেশন থেকে জরুরি তলব করা হলো দুইটি বিশাল সি-প্লেন বা উভোচর বিমানকে। এগুলো সাধারণ কোন বিমান ছিলো না। এগুলো ছিলো মার্টিন পিবিএম মেরিভার। বিশাল ডানা বিশিষ্ট বিমানগুলোকে বলা হতো উড়ন্ত নৌকা বা ফ্লাইং বোট। এগুলো ঝড়ের মধ্যে দিয়ে দীর্ঘক্ষণ আকাশে ভেসে থাকতে পারতো এবং প্রয়োজনে উত্তাল সাগরের বুকেও নামতে পারতো। মিশনের লক্ষ্য ছিলো পরিষ্কার। ফ্লাইট ১৯ এর সর্বশেষ সম্ভাব্য অবস্থান খুঁজে বের করা এবং ১৪ জন পাইলটকে জীবিত অথবা মৃত উদ্ধার করা। সন্ধ্যা ৭টা ২৭ মিনিট। বানানা রিভার এয়ার স্টেশনের রানওয়ে থেকে গর্জন করে আকাশে ডানা মেললো প্রথম উদ্ধারকারী বিমানটি। এর কল সাইন ছিলো ট্রেনিং ৪৯। বিশাল এই বিমানটির ককপিটে ছিলেন লেফটেন্যান্ট হ্যারি কোন। সাথে ছিলেন আরো ১২ জন ক্রু। মোট ১৩ জন মানুষের একটি দল। তারা প্রত্যেকেই ছিলেন অভিজ্ঞ এবং সাহসী। তারা জানতেন বাইরের আবহাওয়া ফ্লাইং এর জন্য মোটেই অনুকূল নয়। তবু সহযোদ্ধাদের বাঁচানোর তাগিদে তারা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিতে দুবার ভাবেননি। বিমানটি টেকঅফ করার পর কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে তাদের শেষ নির্দেশনা দেওয়া হলো। আপনারা ফ্লোরিডা উপকূল ধরে উত্তরে যান এবং তারপর পূবে মোড় নিয়ে হারিয়ে যাওয়া বিমানগুলো খুঁজুন। লেফটেন্যান্ট কোন উত্তর দিলেন রজার আমরা যাচ্ছি। এটিই ছিলো তাদের শেষ রেডিও বার্তা। বিমানটি আকাশে ওড়ার মাত্র ২০ মিনিটের মাথায় ঠিক সন্ধ্যা ৭টা ৫০ মিনিটে রাডার থেকে ভোজ বাজির মতো গায়েব হয়ে গেলো। কোন মে ডে কল নেই, কোন যান্ত্রিক ত্রুটির রিপোর্ট নেই, কোন ঝড়ের কবলে পড়ার আর্তনাদ নেই। কেবল এক মুহূর্ত আগে রাডারে একটি উজ্জ্বল বিন্দু ছিলো আর পরের মুহূর্তে তা নেই। ফোর্ট লডারডেলের টাওয়ারে থাকা অফিসাররা নিজেদের চোখে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। প্রথমে পাঁচটি যুদ্ধবিমান এবং ১৪ জন পাইলট নিখোঁজ। আর এখন তাদের খুঁজতে যাওয়া ১৩ জন ক্রু বাহী একটি বিশাল উদ্ধারকারী বিমানও নিখোঁজ। এক রাতের মধ্যে ছয়টি বিমান এবং ২৭ জন মানুষ হাওয়া। টাওয়ারের এক অফিসার বিড়বিড় করে বলছিলেন এটি অসম্ভব। বিমানগুলো কি আকাশে মিলিয়ে যাচ্ছে? ফ্লাইট ১৯ এর ঘটনা যদি রহস্য হয় তবে পিবিএম মেরিনারের ঘটনাটি ছিলো একটি নিশ্চিত ট্রাজেডি। সন্ধ্যা ৭টা ৫০ মিনিট নাগাদ বিমানটি যখন রাডার থেকে হারিয়ে যায় তখন ফ্লোরিডা উপকূলের নিউ স্মারনা বিচের অদূরে আটলান্টিকের বুকে ভাসছিলো একটি তেলবাহী ট্যাংকার জাহাজ এসএস গেইনস মিলস। জাহাজের ক্যাপ্টেন শ্যাকলফোর্ড ব্রিজে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হঠাৎ অন্ধকারের বুক চিরে আকাশের গায়ে জ্বলে উঠলো এক বিশাল আগুনের গোলা। তিনি চমকে উঠলেন। এটি কোন উল্কাপাত নয়, কোন আতশবাজি নয়, এটি ছিলো একটি ভয়াবহ বিস্ফোরণ। ক্যাপ্টেন শ্যাকলফোর্ড পরবর্তীতে তদন্ত কমিটিকে লিখিত জবানবন্দীতে জানান আমি দেখলাম একটি বিমান জ্বলন্ত অবস্থায় আকাশ থেকে সর্পিল গতিতে সাগরে আছড়ে পড়লো। সাথে সাথেই সাগরের বুকে তৈরি হলো প্রায় ১০০ ফুট উচ্চতার এক বিশাল আগুনের কুন্ডলী। আগুনটি এতটাই তীব্র ছিলো যে রাতের আকাশ দিনের মতো আলোকিত হয়ে গিয়েছিলো। জাহাজটি দ্রুত দুর্ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। আগুন নিভতে সময় নিয়েছিলো প্রায় ১০ মিনিট। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর নাবিকরা যা দেখলেন তা ছিলো আরো হৃদয় বিদারক। সাগরের বুকে ভাসছে কেবল তেলের আস্তরণ এবং বিমানের কিছু ধ্বংসাবশেষ। কোন লাইফবোট নেই, কোন মানুষ নেই। ১৩ জন ক্রুর একজনও সেই নারকীয় আগুন থেকে বের হতে পারেননি। পিবিএম মেরিনার এর বিমানগুলো আকারে বিশাল এবং শক্তিশালী হলেও পাইলটদের কাছে এগুলোর একটি খুব বাজে বদনাম ছিলো। তারা এই বিমানগুলোকে ডাকতো দ্য ফ্লাইং গ্যাস ট্যাংক নামে। কেন এই ভয়ঙ্কর নাম? কারণ এই বিমানগুলোর ফুয়েল লোড করার ক্ষমতা ছিলো বিশাল। কিন্তু এর ফুয়েল লাইন বা জ্বালানি পাইপগুলোর জয়েন্ট বা সংযোগস্থলগুলো ছিলো ত্রুটিপূর্ণ। উইথড্রন এর সময় বা টেক অফ এর ঝাঁকুনিতে প্রায়ই এই পাইপগুলো থেকে অতি সামান্য পরিমাণে এভিয়েশন ফুয়েল লিক করতো। এই লিক হওয়া ফুয়েল থেকে তৈরি হতো উচ্চ দাজ্য বাষ্প বা ভেপার, যা বিমানের খোলের ভেতরে জমে থাকতো, যা অনেকটা কাজ করতো বোমার মতোই। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেন ৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় লেফটেন্যান্ট হ্যারি কোনের বিমানেও একই ঘটনা ঘটেছিলো। বিমানটি যখন আকাশে ওড়ে তখন হয়তো এর ভেতরে গ্যাস জমেছিলো। আর সেই সময়ে কোন ক্রু হয়তো অজান্তেই একটি ইলেকট্রিক সুইচ অন করেছিলেন। অথবা কেউ হয়তো উত্তেজনার বসে একটি সিগারেট ধরানোর চেষ্টা করেছিলেন। ব্যাস একটি ছোট স্ফুলিঙ্গ বা স্পার্ক। আর তাতেই পুরো বিমানটি মাঝ আকাশে বিস্ফোরিত হয়ে আগুনের গোলায় পরিণত হয়। যদিও নৌবাহিনী পরবর্তীতে নিশ্চিত হয়েছিলো যে পিবিএম মেরিনারটি বিস্ফোরিত হয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে এই ব্যাখ্যা পৌঁছায়নি বা পৌঁছালেও তারা তা বিশ্বাস করতে চায়নি। সংবাদপত্রের শিরোনামগুলো ছিলো বারমুডা ট্রাইঅ্যাঙ্গেলের ক্ষুধা উদ্ধারকারীও নিখোঁজ। মানুষের মনে বদ্ধমূল ধারণা জন্মালো যে ওই এলাকায় এমন কোন অশুভ শক্তি আছে যা কেবল বিমানগুলোকেই টেনে নিচ্ছে না। বরং যারা তাদের বাঁচাতে যাচ্ছে তাদেরও ছাড়ছে না।

[26:54]ফ্লাইট ১৯ এর রহস্যের সাথে মেরিনারের এই ট্রাজেডি যুক্ত হয়ে জন্ম দিলো এক অজেয় মিথের। ৫ ডিসেম্বর রাত ৯টার দিকে ফ্লোরিডার উপকূলে অনুসন্ধানকারী জাহাজগুলো যখন আলো ফেলে সাগরে কিছু খুঁজছিলো তখন তারা জানতো না তারা আসলে কিছুই পাবে না। সমুদ্র সেদিন খুব ক্ষুধার্ত ছিলো। সে ফ্লাইট ১৯ এর পাঁচটি বিমান এবং উদ্ধারকারী মেরিনারকে এমনভাবে গিলে খেয়েছিলো যে মনে হচ্ছিলো তাদের কোনদিন অস্তিত্বই ছিলো না। রাত গভীর হলো, ঝড় বাড়লো। আর সেই ঝড়ের গর্জনের সাথে মিশে রইলো ২৭ জন মানুষের নবল আর্তনাদ।

Need another transcript?

Paste any YouTube URL to get a clean transcript in seconds.

Get a Transcript