[0:06]বিজ্ঞানীদের কাছে অপার এক রহস্যের নাম আটলান্টিক বা অতলান্তিক মহাসাগর। 1912 সালে বিশ্বখ্যাত টাইটানিক জাহাজ ডুবির ঘটনাটি ঘটেছিল উত্তর আটলান্টিকে। এছাড়াও বিভিন্ন রহস্যময় ঘটনা ও বিমান দুর্ঘটনার কারণে এই মহাসাগরটি সবসময় রয়েছে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। এটি পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মহাসাগর। শুনতে অবাক লাগলেও এই মহাসাগরটি পৃথিবী পৃষ্ঠের প্রায় এক পঞ্চমাংশ এবং পৃথিবীর মোট জলভাগের প্রায় 29 ভাগ এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। সুপ্রিয় দর্শক, চলুন তবে আর কথা না বাড়িয়ে আদ্যপান্তের এই পর্বে আটলান্টিক মহাসাগরের খুঁটিনাটি জেনে আসি।
[0:56]আটলান্টিক মহাসাগরের আকৃতি ইংরেজি এস অক্ষরের মতো। ইউরোপিয়ান মতাদর্শ মতে, পুরাতন পৃথিবী থেকে নতুন পৃথিবীকে পৃথককারী মাধ্যম হলো এই মহাসাগর। এই মহাসাগরের পশ্চিমে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশ এবং পূর্বে ইউরোপ ও আফ্রিকা মহাদেশ অবস্থিত। মহাসাগরটি উত্তর-দক্ষিণে উত্তর মহাসাগর থেকে দক্ষিণ মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। আটলান্টিক মহাসাগর ডেনমার্ক প্রণালী, গ্রীনল্যান্ড সাগর, নরওয়েজেন সাগর ও বারেন্টস সাগরের মধ্য দিয়ে আর্কটিক মহাসাগরের সাথে সংযুক্ত হয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকার কেইপ হর্নের কাছে আটলান্টিক মহাসাগর প্রশান্ত মহাসাগরের সাথে মিলিত হয়েছে। এবং আফ্রিকার দক্ষিণে কেপ আগুলহাসের কাছে আটলান্টিক মহাসাগর মিশেছে ভারত মহাসাগরের সাথে। এই মহাসাগরটি আমেরিকাকে ইউরেশিয়া এবং আফ্রিকা থেকে বিভক্ত করেছে। পৃথিবীর প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এলাকা জুড়ে অবস্থিত আটলান্টিক মহাসাগরের আয়তন 10 কোটি 64 লাখ 60 হাজার বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে উত্তর আটলান্টিকে 4 কোটি 14 লাখ 90 হাজার বর্গকিলোমিটার আর দক্ষিণে 4 কোটি 2 লাখ 70 হাজার বর্গকিলোমিটার। প্রান্তিক সমুদ্র সহ এই মহাসাগরের উপকূলের দৈর্ঘ্য 1 লাখ 11 হাজার 866 কিলোমিটার। আটলান্টিকের গড় গভীরতা 3646 মিটার বা 11962 ফুট। পুয়ের্তো রিকো ট্রেঞ্চ হচ্ছে এই মহাসাগরের সবচেয়ে গভীরতম এলাকা। যা পরিচিত মিলাউয়াকি ডিপ নামে। এর গভীরতা 8376 মিটার বা 27480 ফুট। প্রতিধ্বনি প্রযুক্তির সাহায্যে এক ব্রিটিশ নাবিক সর্বপ্রথম এর গভীরতা নির্ণয় করেছিলেন। এই মহাসাগরে বিদ্যমান মোট পানির পরিমাণ 31 কোটি 4 লাখ 10 হাজার 900 ঘনকিলোমিটার। আটলান্টিক মহাসাগর পৃথিবীর পৃষ্ঠের মোট জলরাশির প্রায় 29 শতাংশ অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত। বিশ্বের সবচেয়ে বিপদজনক জলরাশির তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে আটলান্টিকের নাম। এই সমুদ্রের পানি উপকূলীয় বাতাস, পানির পৃষ্ঠের তাপমাত্রা এবং পানির স্রোত এসব দ্বারা অনেকখানি প্রভাবিত।
[3:20]পৃথিবীর আবর্তন গতি, বায়ুপ্রবাহ, সমুদ্রজলের লবণাক্ততার ঘনত্ব ও উষ্ণতার পার্থক্যের জন্য সমুদ্রের উপরের জলরাশি নিয়মিতভাবে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে প্রবাহিত হয়। সমুদ্রজলের এই গতিকে সমুদ্র স্রোত বলে। আটলান্টিক মহাসাগরের প্রধান স্রোতগুলি হচ্ছে কুরের স্রোত, বেঙ্গুয়েলা স্রোত, দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোত, ব্রাজিল স্রোত, উত্তর নিরক্ষীয় স্রোত, উপসাগরীয় স্রোত, উত্তর আটলান্টিক স্রোত, ক্যানারি স্রোত, ল্যাব্রাডোর স্রোত ইত্যাদি।
[3:55]আটলান্টিক মহাসাগরের অর্থ এটলাসের সমুদ্র। নেভিগেশন এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের গ্রিক দেবতা এটলাসের নামানুসারে আটলান্টিস নামের উৎপত্তি। এবং যুগ যুগ ধরে চলা এই নামই শেষ পর্যন্ত রূপ নেয় আটলান্টিক নামে। টাইটানমীর পর অনন্তকাল ধরে আকাশ ধরে রেখেছিল এটলাস। এমনটাই বিশ্বাস করেন পুরনো ধ্যান ধারণার মানুষরা। 19 শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত দক্ষিণ আটলান্টিককে বলা হতো ইথিওপিয়ান মহাসাগর আর এই শব্দটির জন্ম প্রাচীন ইথিওপিয়া থেকে। তবে তারও আগে ইংরেজদের কাছে এটি পরিচিত ছিল গ্রেট ওয়েস্টার্ন ওশান নামে। তবে আটলান্টিক পুরনো বিশ্ব থেকে নতুন বিশ্বকে আলাদা করেছে এমনটাই বিশ্বাস করেন ইউরোপিয়ানরা। এই মহাসাগরের উল্লেখযোগ্য সাগরগুলোর মধ্যে রয়েছে ভূমধ্যসাগর, বাল্টিক সাগর, কৃষ্ণসাগর, লিবিয়ান সাগর, উত্তর সাগর, নরওয়েজিয়ান সাগর, সেল্টিক সাগর, আইনিয়ান সাগর, ক্যারিবীয় সাগর ইত্যাদি। উপসাগরের মধ্যে আছে মেক্সিকো উপসাগর, ব্যাফিন উপসাগর, গিনি উপসাগর ইত্যাদি। পৃথিবীর অনেক প্রধান প্রধান নদীর জলধারা আটলান্টিকের সাথে মিশেছে। এগুলোর মধ্যে মিসিসিপি, নাইজার, অ্যামাজন, কঙ্গো, রাইন নদী ইত্যাদির পানি এই মহাসাগরে পতিত হয়। দুটি সাগর অথবা দুটি বিশাল জলরাশিকে সংযোগকারী সরু জলপথকে বলে প্রণালী। আটলান্টিক মহাসাগরের এরকম অনেকগুলো প্রণালী রয়েছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ডেনমার্ক, ম্যাজেলান, ফ্লোরিডা ও ডোভার প্রণালী। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যবর্তী জোভার প্রণালী বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ততম সমুদ্র প্রণালী। জার্মানির কেল খাল, ডেনমার্ক ও সুইডেনের মাঝে অবস্থিত ওরেসুন প্রণালী, তুরস্কের বসফরাস প্রণালী, স্পেন ও মরক্কোর জিব্রাল্টার প্রণালী, কানাডার সেন্ট লরেন্স সমুদ্রপথ জলপথে আটলান্টিক মহাসাগরের উল্লেখযোগ্য প্রবেশদার।
[5:57]গবেষকদের ধারণা, জুরাসিক আমল থেকেই এই মহাসাগরের গঠন শুরু হয়েছিল। 980 থেকে 982 সালের দিকে নরসুবিযাত্রী এরিক দ্যা রেড সর্বপ্রথম জাহাজে করে এই মহাসাগর পাড়ি দিয়েছিলেন বলে মনে করা হয়। তবে 1492 সালে ক্রিস্টোফার কলম্বাস আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে আমেরিকা মহাদেশ আবিষ্কার করেছিলেন এই তথ্য প্রায় সবারই জানা। 1919 সালে বিমান পথেও পাড়ি দেওয়া হয় আটলান্টিক মহাসাগর। জন আলকোক ও আর্থার ব্রাউন নামক দুজন বৈমানিক বিমান পথে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে কানাডা থেকে আয়ারল্যান্ডে পৌঁছেছিলেন। এছাড়া 1978 সালে তিন অভিযাত্রী বেলুনে চেপেও পাড়ি দিয়েছিলেন আটলান্টিক মহাসাগর।
[6:42]আটলান্টিক মহাসাগরের সবচেয়ে বড় দ্বীপ গ্রীনল্যান্ড যা আয়তনে বাংলাদেশের চেয়ে 15 গুণ বড়। জানেন হয়তো ভুবনজয়ী সম্রাট নেপোলিয়ান বোনাপার্টকে আটলান্টিক মহাসাগরের সেইন্ট হেলেনা দ্বীপে নির্বাসিত করা হয়েছিল। ক্যানারি দ্বীপ, ফারুদ্বীপ, আইসল্যান্ড, বার্বাডোজ, বাহামা, ত্রিনিদাদ এন্ড টোবাগো, ফকল্যান্ড দ্বীপুঞ্জ ছাড়াও আরো ছোট বড় অসংখ্য দ্বীপ রয়েছে এই মহাসাগরে। এই মহাসাগরের পানির চরিত্র কেমন? সাধারণত ধারণা করা হয় যে, আটলান্টিকের পানি অনেক বেশি শীতল। কিন্তু এটি পুরোপুরি ভুল। এই মহাসাগরের পানি বেশ উষ্ণ। সাধারণত পানির তাপমাত্রা নির্ভর করে বেশ কয়েকটি প্রভাবের উপর। প্রথমত অক্ষাংশ ভেদে এর উষ্ণতার হেরফের হয়। যেমন মার্কিন উপকূলে এর উষ্ণতা প্রশান্ত মহাসাগরের চেয়ে 16 ডিগ্রি ফারেনহাইট বেশি। অর্থাৎ এটি বেশ ভালোই গরম। এরপর রয়েছে মৌসুম ভেদে পরিবর্তন ও সৌরশক্তি এবং জলবায়ু পরিবর্তন জনিত পরিস্থিতি। এ সবকিছুই আটলান্টিকের পানির শীতলতা বা উষ্ণতার তারতম্য ঘটায়। তবে আটলান্টিক মহাসাগরের পানি সময় ও স্থানভেদে বরফেও পরিণত হয়। প্রতিবছর অক্টোবর থেকে জুন পর্যন্ত এই মহাসাগরের ল্যাব্রাডোর সাগর, বাল্টিক সাগর এবং জেনমার্ক প্রণালী বরফে ঢাকা থাকে। মজার ব্যাপার হলো উত্তর আটলান্টিকের পানির তাপমাত্রা যদি ঘড়ির কাটার দিকে ঘোরে তবে দক্ষিণ আটলান্টিকের জলের স্রোত ঘোরে বিপরীত দিকে। ফলে পানির তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে 4 ডিগ্রি থেকে 30 ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করে।
[8:27]আটলান্টিক মহাসাগর হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে লবণাক্ত মহাসাগর। এর উন্মুক্ত পৃষ্ঠের পানির লবণাক্ততা অক্ষাংশ ও ঋতুভেদে 3.3 থেকে 3.7 শতাংশ পর্যন্ত হয়ে থাকে। তাপমাত্রার মতো লবণাক্ততাও নির্ভর করে অক্ষাংশ ও মৌসুমের উপর। অর্থাৎ জায়গাভেদে এর লবণাক্ততার পরিমাণেও কম বেশি হয়। এছাড়াও পানি লবণাক্ততার মানকে বাষ্পীভবন, বৃষ্টিপাত, নদীর প্রবাহ এবং সমুদ্রের বরফ গলন ইত্যাদিও প্রভাবিত করে। ভারী ক্রান্তীয় বৃষ্টিপাতের কারণে নিরক্ষীয় অঞ্চলের ঠিক উত্তর দিকে সাধারণত পানির লবণাক্ততার মান কম হয়। আর উপকূল বরাবর নদীর অববাহিকায় লবণাক্ততার মান বেশি থাকে। আটলান্টিকের পানির রং অন্য মহাসাগরের চেয়ে একেবারেই ভিন্ন। অন্যান্য মহাসাগরের পানির রং নীলাভ হলেও আটলান্টিকের পানি দেখতে অনেকটাই সবুজ রঙ্গা। আমেরিকার পূর্ব উপকূলীয় এলাকার পানি দেখতে সবুজ রঙের আর এর কারণও আছে। এই পানিতে প্রচুর পরিমাণে শৈবাল এবং উদ্ভিদের উপস্থিতি রয়েছে। আটলান্টিক মহাসাগরের কিছু কিছু স্থানে সমুদ্রের মৃত উদ্ভিদ থেকে নিসৃত এক প্রকার রঞ্জক পদার্থের কারণে পানির রং সবুজ দেখা যায়। আবার সূর্যের সাতটি রঙের মধ্যে এই মহাসাগরের পানিতে সবুজ রঙের অধিক বিচ্ছুরণও পানির সবুজ বর্ণের কারণ। ভূমধ্য আটলান্টিক মহাসাগরের মিলনস্থলে পানির রং আলাদা আলাদা। তবে এর পানির রং সবুজ হলেও এটি অনেক বেশি অন্ধকার। কেননা পানির তাপমাত্রা অনেক বেশি শীতল হবার কারণে এটি অনেক নোংরা আর উদ্ভিদে পূর্ণ থাকে। পানিতে থাকা এসব নোংরা আর গাছপালা খুব দ্রুত সূর্যের আলো শোষণ করে। আর এ কারণেই একে এত বেশি অন্ধকার দেখায়। এছাড়া আটলান্টিক মহাসাগরের মোহনা থেকে যত গভীরে যাওয়া হয় ততই এর রং হালকা বাদামী থেকে সবুজ বাদামী রং ধারণ করে। আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশের কিছু কিছু জায়গার পরিবেশ বেশ বৈচিত্রময় এবং রয়েছে সমৃদ্ধ ইকোসিস্টেম। সেখানে আছে নানা রকমের কোরাল ও স্পঞ্জ সহ বিচিত্র সব প্রাণী। এটলাস নামক একটি প্রকল্পের অধীনে ব্রিটিশ বিজ্ঞানীদের নেতৃত্বে এই মহাসাগরের রহস্য উন্মোচনে চেষ্টা চলছে। তার সাথে কাজ করছে উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের আরো 24 টি প্রতিষ্ঠান। তবে আটলান্টিক মহাসাগরে বেশি পরিমাণের জাহাজ চলাচলের কারণে এর পানিতে বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক দ্রব্য মিশছে যা জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদগুলোর জন্য দিন দিন মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠছে। জীব বৈচিত্রের মতো মৎস সম্পদের বিশাল ভান্ডার রয়েছে এই মহাসাগরে। মৎস সম্পদের প্রাচুর্যতার দিক থেকে এই মহাসাগরের অবস্থান দ্বিতীয়। পৃথিবীর মোট মাছের প্রায় 25 শতাংশ আটলান্টিক মহাসাগর থেকে আসে। সবচেয়ে বেশি মাছ পাওয়া যায় গ্র্যান্ড ব্যাংকস, স্কটিশ শেল্ফ, জর্জেস ব্যাংক সহ আশপাশের জলরাশি, ফান্দি উপসাগর এবং উত্তর সাগরের ডগার ব্যাংক সহ বেশ কয়েকটি স্থানে। তবে জলবায়ু পরিবর্তন সহ নানা কারণে 1950 সালের পর থেকে এই মৎস ভান্ডারগুলোতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। সারা বিশ্বে তিন ভাগে বিভক্ত এই মৎস্য ভান্ডারের দুটির অবস্থানই আটলান্টিকে। বাকি একটি ভান্ডারের অবস্থান ভারত ও পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে। আটলান্টিক তীরবর্তী দেশগুলোর উন্নয়ন ও অর্থনীতিতে এই মহাসাগর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। ন্যাশনাল ওশানিক এন্ড অ্যাটমোস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের এক অভিযানে আটলান্টিক মহাসাগরের নিচে মাইল দুয়েক এলাকাজুড়ে প্রায় 2 লাখ টন সোনার সন্ধান পাওয়া গেছে। অভিযাত্রী দল ধারণা করেছিল প্রায় 3 লাখ টন সোনা থাকতে পারে অতলান্তিকের নিচে। তবে এ সোনা পানির নিচ থেকে উত্তোলন করে সঠিক ব্যবহারের কোন উপায় এখনো আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি। পাশাপাশি প্রাকৃতিক গ্যাস, অপরিশোধিত তেল, মূল্যবান পাথরের বিশাল ভান্ডার এই আটলান্টিক মহাসাগর। ফ্লোরিডা প্রণালীর উত্তর কিউবা অববাহিকায় প্রায় 87 কোটি ঘনমিটার পেট্রোলিয়াম, 9.8 ট্রিলিয়ন ঘনমিটার প্রাকৃতিক গ্যাস থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। পর্যটন শিল্পের বিকাশেও এই মহাসাগরের রয়েছে বিশেষ ভূমিকা। আটলান্টিকের সৌন্দর্যকে ভিত্তি করে ক্যারিবিয়ান উপকূল, ফ্লোরিডা বিচ এবং মিয়ামিতে লাভজনক পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটেছে। আটলান্টিক মহাসাগরের মধ্যে ক্যানেরি দ্বীপুঞ্জের অন্যতম লানজারুটের উপকূলের কাছে সাগরতলে প্রথম জাদুঘর স্থাপন করে স্পেন। সাগরের 15 মিটার নিচে এমন পদার্থ দিয়ে 300 টি ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে যাতে সাগরের জীব বৈচিত্র ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। ধারণা করা হচ্ছে এ ভাস্কর্যগুলো প্রায় 300 বছর টিকবে। এগুলো তৈরি করেছেন জেসন দ্যা কেয়ার্টস নামের একজন শিল্পী। অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় পর্যটকদের জন্য এই এক অনন্য সৃষ্টি। তবে এই জাদুঘরটি দেখতে হলে অক্সিজেনের টিউব সহ ডুবুরির পোশাক পড়ে সাগরের নিচে ডুব দিতে হবে। পৃথিবীর রহস্যপুরী হিসেবে খ্যাত বারমুজা ট্রায়াঙ্গলের নাম শোনেননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এটিও আটলান্টিক মহাসাগরের অন্তর্ভুক্ত একটি বিশেষ অঞ্চল। এখান থেকে বেশ কিছু জাহাজ ও উড়োজাহাজ রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হওয়ার কথা শোনা যায়। অনেকে মনে করেন ওই সকল অন্তর্ধানের কারণ নিছক দুর্ঘটনা যার কারণ হতে পারে প্রাকৃতিক দুর্যোগ অথবা চালকের অসাবধানতা। এর বিপরীতে অনেকেই বিশ্বাস করেন এসবের পেছনে দায়ী হলো অতি প্রাকৃতিক কোন শক্তি বা বহির্জাগতিক প্রাণীর উপস্থিতি। আটলান্টিক মহাসাগরে চলাচলরত জাহাজগুলোতে জলদস্যুদের আক্রমণের পরিমাণ অনেক বেশি। তাই বর্তমান সময়ে জাহাজগুলোর আন্তর্জাতিক রুটে চলাচল বেশ বিপদজনক হয়ে উঠেছে। 2014 সালে গিনি উপসাগরে মোট 41 টি বাণিজ্যিক জাহাজ জলদস্যুদের দ্বারা আক্রান্ত হয়। মূলত সোমালিয়ার জলদস্যুরাই এই মহাসাগরে ভাসমান জাহাজগুলোতে আক্রমণ করে থাকে। শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির অন্যতম উৎস হিসেবেও পরিচিত আটলান্টিক মহাসাগর। প্রত্যেক শীতকালে এখানে ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হয়। এদিকে গ্রীষ্ম ও শরৎকালে উত্তর আটলান্টিকের পশ্চিমাংশে হারিকেনের প্রবণতা অনেক বেশি থাকে। তবে শক্তিশালী বাতাস আর দুর্বল আন্ত ক্রান্তীয় অঞ্চলের কারণে দক্ষিণ আটলান্টিকে ঘূর্ণিঝড় হয় না বললেই চলে। 2019 সালের 2 সেপ্টেম্বর আটলান্টিকের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শক্তিশালী সামুদ্রিক ঝড় ডোরিয়ান আঘাত হানে ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র বাহামায়। এতে অন্তত 80 জনের মৃত্যু হয়। বহু ঘরবাড়িও লন্ডভন্ড হয়ে যায় আর এতে আর্থিক ক্ষতি হয় প্রায় 3.4 বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
[15:38]বিশ্ব বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আটলান্টিক মহাসাগর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। পৃথিবীর পরাশক্তি দেশগুলোর মধ্যখানে এই মহাসাগরটির অবস্থান হওয়ায় বিশ্ব বাণিজ্য সংক্রান্ত নানান কাজে আটলান্টিক মহাসাগরের গুরুত্ব কতটা তা বলার অপেক্ষা রাখে না। পৃথিবী খ্যাত বিভিন্ন নগরীর প্রাণ ভোমরা বলা যায় এই আটলান্টিক মহাসাগরকে। সমুদ্রপথে ইউরোপের সাথে আমেরিকার পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে আটলান্টিকের বিকল্প নেই। একইভাবে এশিয়া এবং আফ্রিকার সাথে আমেরিকার বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও আটলান্টিক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্ত মহাদেশীয় সমুদ্র বাণিজ্য চালু হওয়ার পর থেকেই পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে আটলান্টিক মহাসাগরের ব্যবহার দিন দিনই বাড়ছে। পৃথিবীর প্রায় 133 টি দেশ সরাসরি এই মহাসাগরের তীরে অবস্থিত। যে কারণে আটলান্টিক মহাসাগরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বহু বন্দর ও পোতাশ্রয়। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া, স্পেনের বার্সেলোনা, ডেনমার্কের কোপেনহেগেন, জার্মানির হাম্বুর্গ, গ্রেট ব্রিটেনের লন্ডন, ফ্রান্সের লে হারভে, পর্তুগালের লিসবন, নরওয়ের অসলো, নেদারল্যান্ডস এর রটার্ডাম, রাশিয়ার সেইন্ট পিটার্সবার্গ, কানাডার মনট্রেল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ও নিউ অরলিয়ান্স, ব্রাজিলের রিওডি জেনেইরো, আর্জেন্টিনার বুয়েন্স আয়ার্স ইত্যাদি। এছাড়াও আরো ছোট বড় বহু বন্দর গড়ে উঠেছে আটলান্টিক মহাসাগরের তীরে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পরিবেশবিদদের মাথা ব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে আটলান্টিকের দূষণ। নানান ভাবে দূষণের শিকার হওয়া এই মহাসাগরের পানিকে দূষণমুক্ত রাখতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বিভিন্ন ধরনের চুক্তি করলেও কমানো যাচ্ছে না এই দূষণ। অধিক পরিমাণে জাহাজ চলাচলের কারণে প্রতিদিন আটলান্টিকের পানিতে মিশছে বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য যা মহাসাগরের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া কৃষিকাজে ব্যবহৃত সার, পশু সম্পদ ও মানববর্জ্যও মিশছে এতে। তবে অন্যান্য দূষণের মধ্যে কৃষি ও পৌর বা নগরের বর্জ্য বেশি উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। নগর বর্জ্যগুলো মূলত আসে পূর্ব আমেরিকা, দক্ষিণ ব্রাজিল এবং পূর্ব আর্জেন্টিনা থেকে। ক্যারিবীয় সাগর, মেক্সিকো উপসাগর, মারাকাইবো লেইক, ভূমধ্যসাগর, দক্ষিণ সাগর থেকে আসে তেল জাতীয় দূষণ। আর শিল্পবর্জ্যের উৎস হলো বাল্টিক সাগর, দক্ষিণ সাগর ও ভূমধ্যসাগর। আটলান্টিক মহাসাগরের দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলে শুরু হয়েছিল আদিম মানুষের প্রথম আগমন। এক হাজারের ও কম মানুষ এখানে জীবিকার সন্ধানে এসেছিল। এ জায়গা ছিল খোলাওয়ালা মাছ, পশমযুক্ত সিল, অন্যান্য মাছ এবং সামুদ্রিক পাখির অন্যতম উৎস। এখানকার আদিবাসীরা এসব খেয়ে জীবন নির্বাহ করতো। 70 হাজার বছরের পুরনো আফ্রিকানদের এসব তথ্যের প্রমাণ মিলেছে দক্ষিণ আফ্রিকার ব্লম্বোস গুহায় খোদাই করা বিভিন্ন শিলাচিত্র থেকে। পৃথিবীর মানব জীবনে আটলান্টিকের কিছুটা বিরূপ প্রভাব থাকলেও এর অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, জীবন ধারণের বিশেষ উপকারিতা সহ সর্বোপরি এই মহাসাগরটির অস্তিত্ব যে মানুষের জন্য সৃষ্ট প্রদত্ত এক অমূল্য আশীর্বাদ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর তাই আটলান্টিকের নাম শুনেছেন, ইন্টারনেটের ছবি দেখেছেন কিন্তু মনে মনে বা কথার কথায় এই মহাসাগরের তীরে একবার যাওয়ার বাসনা ব্যক্ত করেননি এমন মানুষ পাওয়া বিরল।



