[0:03]জীবনে অনেক সময় আমরা নিজেদের প্রতিভাকেনবা অর্জনকে অন্যের সাথে তুলনা করে দেখি। বাটখারার এক পাল্লায় তাকে রেখে আরেকপাল্লায় নিজেকে দাঁড় করিয়ে নিজেকেই প্রশ্নকরি, আমি কেন তার অবস্থায় পৌঁছাতে পারলাম না? আর বর্তমানের এই রিলস আর টিকটকের লাল নীলদুনিয়ার চপ্পলে পড়ে এই রোগ যেন বেড়েই যাচ্ছে। তাই আজকের গল্পটি তাদের জন্য যারা নিজেদের জীবননিয়ে অসন্তুষ্ট এবং সব সময় মনে করেন অন্যরাতাদের চেয়ে বেশি সুখী। তাই না টেনে গল্পটি শেষ পর্যন্ত শুনুন..
[0:38]এক বারের কথা একটি কাক উড়তে উড়তে একটি গাছেরডালের উপর এসে বসল।. কিছু দূরে এসে একটি রাজহাঁসকে দেখল যেটিকিনা একটি পুকুরে সাঁতার কাটছিল। রাজহাঁসের সাদা ঝকঝকে পালক দেখে গ্রামবাসী মুগ্ধহয়ে তাকিয়ে থাকল। কাকটিও বেশ আগ্রহী হয়ে রাজহাঁসটির কাছে যাওয়ারসিদ্ধান্ত নিল। কিন্তু গ্রামবাসীদের কাছে যেতেই কাক্তি কিছুটা অস্বস্তিকরপরিস্থিতির সম্মুখীন হলো। গ্রামবাসীরা হাত নেড়ে নেড়ে কাকটিকে তাড়িয়ে দিতে লাগলযেন তারা কাকটিকে আশেপাশে দেখতে চায় না। কাকটি ভাবল আমি হয়তো তাদের নোংরা করে দেব তাই তারামনে হয় ভয় পাচ্ছে। তাই সে আর একটি জায়গায় গিয়ে বসল। কিন্তু সেখানেও গ্রামবাসীরা তাকে তাড়িয়ে দিল। এই ব্যবহারে কাকটির মন খুবই খারাপ হয়ে হলো। সে দেখল রাজহাঁসকে সবাই তার সুন্দর পালকের জন্যপ্রশংসা করছে, খুব বাহবা করছ। কিন্তু তাকে কেউই ভালো চোখে দেখছে না, সবাই শুধু তাড়িয়ে দিচ্ছে। মনের গভীর হতাশা নিয়ে কাকটি গ্রাম ছেড়ে একটিজঙ্গলে চলে গেল। একটি গাছের ডালে বসে এসব ঐসব ভাবততার চোখ দিয়ে জল ঝরছিল। সে আফসোস করে বলল, আমার এই কালো পালকেরকারণে সবাই আমাকে অবহেলা করে। ইস, যদি আমার রাজহাঁসের মত সাদা পালক থাকতো,তবে আমিও নিশ্চয়ই সুখী হতাম, মানুষের বাহবা কুড়াতাম। এমন সময় এক বৃদ্ধ কাক ওই জঙ্গল দিয়ে যাচ্ছিল। তার কান্না ঐ বৃদ্ধ কাকটির নজরে পড়ল। বৃদ্ধ কাকটি উড়ে করে তার কাছে গেলেনএবং জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কাঁদছ কেন.. এত দুঃখ কিসের? কাকটি তার কান্না থামিয়ে উত্তর দিল, আমার এই কালোপালকের জন্য আমি খুব কষ্টে আছি। আমার পালকগুলো দেখতে খুবই বিশ্রী। কেউ আমাকে দেখতে পারে না।. বৃদ্ধ কাকটি মৃদু হাসি দিয়ে বললেন, তাহলে তুমিকেমন দেখতে হলে খুশি হতে.. বলো তো? কাকটি বলল, আমি যদি রাজহাঁস হতাম তবে কতই নাভালো হতো। বৃদ্ধ কাকটি শান্তভাবে উত্তর দিলেন, অবশ্যই ভালো হতো,আমি গভীর জঙ্গলে থাকা একটি বিশেষ ঝর্ণার পানির কথা জানি। সেই পানি রহস্য হলো যে কেউ তার শুদ্ধ হৃদয় নিয়েসেই পানিতে গোসল করে সে নিজের রূপ পরিবর্তন করতে পারে। তুমি চাইলে আমি তোমাকে সেখানে নিয়ে যেতে পারি। তবে তার আগে আমি চাই তুমি রাজহাঁসের কাছে গিয়েজিজ্ঞেস করো, সে কি সত্যিই তার জীবন নিয়ে সুখী? কাকটি একটু অবাক হল কিন্তু বৃদ্ধ কাকের কথায়রাজি হয়ে গেল। কাকটি আবার পুকুরের দিকে উড়ে গেল। সে দেখল রাজহাঁসটি পুকুরের তীরে শান্তভাবে সাঁতারকাটছে। আশেপাশে কেউ না থাকায় কাকটি সাহস করেকাছে গিয়ে বলল, "ও রাজহাঁস ভাই, তুমি নিশ্চয়ইএই গ্রামের সব চেয়ে সুখী পাখি" তোমার সাদা ঝকঝকে পালক দেখে সবাই মুগ্ধ। তুমি কি তোমার জীবন নিয়ে খুশি? রাজহাঁসটি মাথা নিচু করে এক অপ্রত্যাশিত উত্তর দিল। সে বলল, হ্যাঁ, আমার পালক সুন্দর। আর সবাই তা দেখেপ্রশংসা করে। কিন্তু আমি সুখী নই। মানুষ আমাদের পোষ মানিয়ে রাখে, আমরা স্বাধীনভাবেচলতে পারি না। আর বয়স হলে ওরা আমাদেরমাংসের জন্য আমাদের খেয়ে ফেলে। আর আমি এটাও বলতে পারব না কালকে আমি এইপুকুরে সাঁতার কাটতে পারব কি না। রাজহাঁসের কষ্টের কথা শুনে কাকটি হতবাক হলো। সে জিজ্ঞেস করল, তাহলে তোমার মতে কারা সব চেয়েসুখী? রাজহাঁস বলল, আমার মনে হয় টিয়া পাখি সবচেয়ে সুখী। তার রবিন পালক, আমার সাধারণ সাদা পালকের চেয়েওআকর্ষণীয় আর তার মাংসও খায় না। রাজহাঁসকে ধন্যবাদ দিয়ে কাকটি এবার টিয়াপাখির খোঁজে রওনা দিল।. অনেক খোঁজার পর সে একটি গাছের ডালে একটি টিয়াপাখিকে দেখতে পেল। কাকটি বলল. ও টিয়া পাখি, তুমি নিশ্চয়ই সবচেয়ে সুখী পাখি.. তোমার রঙিন পালক দেখে সবাই মুগ্ধ হয়। কিন্তু তুমি কি সুখী? টিয়া পাখি চিন্তিত চোখে চারপাশে তাকিয়ে বলল, হ্যাঁ,আমার পালক রঙিন, আর সবাই এটা দেখে প্রশংসা করে। কিন্তু এই রঙিন পালকের জন্যই মানুষ আমাদেরধরে নিয়ে যায়। আমাদের সারাদিন খাঁচায়বন্দি করে রাখে, তাই আমি সব সময়ে ভয়ই থাকি। টিয়া পাখির কথায় কাকটি আরও দুঃখ পেল। সে বলল, তাহলে তোমার মতে কারা সব চেয়ে সুখী? টিয়া পাখি বলল, আমার মনে হয় ময়ূর সবচেয়ে সুখী। মানুষ তাকে ধরে রাখলেও তার জন্য বড় খাঁচা বানায়এবং তার সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়। কাকটি দেরি না করে চিড়িয়াখানার দিকে উড়ে গেল যেখানেএকটি ময়ূর ছিল.. ময়ূরটির কাছে গিয়ে কাকটি বলল, তোমার পালক দেখতেখুবই সুন্দর। সত্যিই তোমার সৌন্দর্যের কোনো তুলনা নেই। তুমি নিশ্চয়ই বিশ্বের সবচেয়ে সুখী পাখি। ময়ূরটি শান্তভাবে বলল, না বন্ধু.. আমি সুখী নই। আমার সুন্দর পালকের জন্য মানুষ জোর করে সেগুলোছিড়ে নিয়ে যায়। এই যন্ত্রণাটি সহ্য করা খুব কঠিন।. পালকগুলো আবার গজালে তারা আবারও ছিনে নেয়.. আমার এই দুঃখের চক্র কখনও শেষ হয় না। ময়ূরের কথায় কাকটি খুবই মর্মাহত হলো.. ময়ূর বলল, সত্যি বলতে কি আমি যদি কাক হতেপারতাম তবেই ভালো হতো। তোমার মতো সাধারণ পাখি, যার প্রতি মানুষের কোনোআগ্রহই নেই। তোমরা কত স্বাধীনভাবে না জীবনযাপন করতে পারো? তোমাদের জীবনটা সত্যিই অসাধারণ। ময়ূরের কথা শুনে কাকটি ধন্যবাদ জানিয়ে চলে গেল। প্রথম বারের মতো সে নিজের কাক হওয়ার জন্য কৃতজ্ঞতাঅনুভব করল। কাকটি আবার বৃদ্ধ কাকটির কাছে ফিরে এলো। তারপর সব কথা বৃদ্ধ কাকটিকে বলল। সব শেষে বলল আমি আর অন্য কোনও পাখি হতে চাইনা,আমি কৃতজ্ঞ যে আমি একটি কাক। ইংরেজিতে একটা কথা আছে.. Why compare yourself with others? No one in the entire world can do a better job of being you than you. আমাদের জীবনে, যদি আমরা খেয়াল করি আমরা অনেকসময়ই একই রকম সমস্যার মুখোমুখি হই। আমরা অহেতুক নিজেদের অন্য দের সাথে তুলনা করিযা আমাদের অসুখী করে তোলে। এতে আমরা আমাদের যা আছে তার জন্য কৃতজ্ঞ হতে পারিনাএবং একটি হতাশার চক্রে আটকে পড়ি। তাই যা আছে তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকুন এবং অন্যকেঅনুসরণ করার চেষ্টায় সময় নষ্ট করবেন না। উপরওয়ালা একজনকে আলাদা আলাদা নেয়ামত দিয়েছেন। মনে রাখবেন, স্রষ্টার সব সৃষ্টিই সুন্দর। অন্যের তুলনায় নিজেকে সুখী করার থেকে আপনার যাআছে সেটা নিয়েই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন। যদি এই গল্পটি আপনাকে সাহায্য করে থাকে, তবেএকটি লাইক এবং কমেন্ট করতে ভুলবেন না। আজকের জন্য বিদায়, অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাদেরবিশাল সাপোর্টের জন্য, পরবর্তী গল্পে আবার দেখা হবে।



