Thumbnail for কেন ইরানের শাসন ব্যবস্থার পতন ঘটানো অসম্ভব | আদ্যোপান্ত | Why Iran’s Regime Won’t Fall by ADYOPANTO

কেন ইরানের শাসন ব্যবস্থার পতন ঘটানো অসম্ভব | আদ্যোপান্ত | Why Iran’s Regime Won’t Fall

ADYOPANTO

13m 7s1,905 words~10 min read
YouTube auto captions
Transcript source

YouTube auto captions

This transcript was extracted from YouTube's auto-generated caption track. The transcript below is server-rendered so it can be read, searched, cited, and shared without opening the original YouTube player.

Pull quotes
[0:01]আমেরিকার এই রেজিম চেঞ্জ বা সরকার পরিবর্তনের ছক কি সত্যিই সফল হবে নাকি এটি মধ্যপ্রাচ্যকে আরেকটি অন্তহীন এবং রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবে?
Use this transcript
Related transcript hubs

[0:01]সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় যখন ওমানের মধ্যস্থতায় আমেরিকা এবং ইরানের মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছিল তখন অনেকেই ভেবেছিলেন হয়তো একটি কূটনৈতিক সমাধান খুব কাছাকাছি। কিন্তু এ আশাবাদদের মাঝেই হঠাৎ দৃশ্যপট বদলে যায়। শনিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ইরানের রাজধানী তেহরানসহ একাধিক শহর কেপে ওঠে ভয়াবহ বিস্ফোরণের শব্দে। আমেরিকা এবং ইসরাইল যৌথভাবে শুরু করে এক নজিরবিহীন সামরিক অভিযান। পেন্টাগন এর নাম দিয়েছে অপারেশন এপিক ফিউরি। এই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন। প্রাণ গেছে আরো বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতার। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই হামলাকে মেজর কমব্যাট অপারেশন হিসেবে ঘোষণা করে সরাসরি ইরানের জনগণকে তাদের সরকার উৎখাতের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যখন আমাদের কাজ শেষ হবে তখন আপনারা আপনাদের সরকারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেবেন। এটি হয়তো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আপনাদের একমাত্র সুযোগ। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানীদের এই স্বৈরাচারের জোয়াল ভেঙে ফেলার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কেবল বিমান হামলা চালিয়ে কিংবা সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করে কি একটি দেশের দীর্ঘদিনের সুসংহত শাসন ব্যবস্থার পতন ঘটানো সম্ভব? আমেরিকার এই রেজিম চেঞ্জ বা সরকার পরিবর্তনের ছক কি সত্যিই সফল হবে নাকি এটি মধ্যপ্রাচ্যকে আরেকটি অন্তহীন এবং রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবে? এসব প্রশ্নেরই উত্তর জানার চেষ্টা করব আদ্যপান্ত আজকের পর্বে। শনিবারের এই অতর্কিত হামলার মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যা করে শাসন ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দেয়া। যাকে সামরিক পরিভাষায় বলা হয় ডিক্যাপিটেশন স্ট্রাটেজি বা শিরচ্ছেদ কৌশল। ইসরাইলের দাবি অনুযায়ী তারা ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিশেষ করে কেরমান শাহ অঞ্চলে অবস্থিত এসএস-৬৫ ধ্বংস করে দিয়েছে। এই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ প্রতিরক্ষামন্ত্রী আমির নাসির জাদে এবং রেভুলেশনারি গার্ডসের শীর্ষ কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুর নিহত হয়েছেন। ইসরাইলী সংবাদ মাধ্যমগুলো দাবি করেছে যে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেশকিয়ানও এই হামলার অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিলেন। আমেরিকা এবং ইসরাইল মনে করে শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দিতে পারলেই ইরানের ইসলামিক শাসন ব্যবস্থা হুরমুর করে ভেঙে পড়বে। ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে ভেনেজুয়েলায় ঠিক এই ধরনের একটি কৌশল প্রয়োগ করে সফল হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি হয়তো আশা করছেন ইরানের ক্ষেত্রেও একই রকম ফলাফল পাওয়া যাবে। ট্রাম্প ইরানের ইসলামিক রেভুলেশনারি গার্ড কোর আইআরজিসি এবং অন্যান্য সশস্ত্র বাহিনীকে অস্ত্র সমর্থন করার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন তা না হলে তাদের নিশ্চিত মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হবে। তবে ইরানের মতো একটি রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এই কৌশল কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে বিশেষজ্ঞদের মনে। আমেরিকা এবং ইরানের এই শত্রুতা একদিনের নয়। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখলের পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে এক চিরস্থায়ী বৈরিতার সূচনা হয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে ২০১৫ সালের জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অফ অ্যাকশন বা ইরান পারমাণবিক চুক্তি থেকে একতরফাভাবে আমেরিকাকে বের করে নিয়ে এসেছিলেন। ওবামা প্রশাসনের সেই চুক্তিটি ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণের একটি কার্যকর কূটনৈতিক মাধ্যম। কিন্তু ট্রাম্প একে দুর্বল আখ্যা দিয়ে বাতিল করার পর থেকেই মূলত সংকটের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। এর আগে ২০২৫ সালের জুন মাসে ইসরাইল এবং আমেরিকার সাথে ইরানের ১২ দিনের একটি তীব্র যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। সেই যুদ্ধে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে ব্যাপক হামলা চালানো হয়েছিল যার ফলে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে তিনি ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতাকে পুরোপুরি অবলিটারেট বা নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছেন। কিন্তু এক বছর পার না হতেই আবারো সেই পারমাণবিক হুমকির কথা বলে নতুন করে যুদ্ধ শুরু করা ট্রাম্পের বক্তব্যের সব বিরোধিতা কেই সামনে নিয়ে এসেছে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য এই যুদ্ধ রাজনৈতিকভাবে লাভজনক। বছরের শেষের দিকে ইসরাইলের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। গাজায় হামাসের সাথে দুই বছরের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে নেতানিয়াহু বিশ্বাস করেন যে ইসরাইল যখন যুদ্ধের মধ্যে থাকে তখন তার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অবস্থান আরো সুসংহত হয়। তাই অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার স্বার্থেও এই যুদ্ধ ইসরাইলের জন্য একটি তুরুপের তাস। ইতিহাস ঘাটতে দেখা যায় শুধুমাত্র বিমান হামলা চালিয়ে কোন দেশের সরকার পরিবর্তনের নজির পৃথিবীতে নেই। ২০০৩ সালে ইরাকের সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাত করতে আমেরিকাকে বিশাল স্থলবাহিনী নিয়ে দেশটিতে প্রবেশ করতে হয়েছিল। ২০১১ সালে লিবিয়ার মোহাম্মদ গাদ্দফীকে ক্ষমতাচ্যুত করার সময়ও নেটোর বিমান হামলার পাশাপাশি বিদ্রোহী স্থলবাহিনীর প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল। এবং উভয় ক্ষেত্রে ফলাফল ছিল রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ পতন, দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ এবং হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু। ইরানের ইসলামিক শাসন ব্যবস্থা কোন একক ব্যক্তির উপর নির্ভরশীল নয়। গত প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধরে তারা এমন একটি জটিল রাজনৈতিক এবং সামরিক কাঠামো তৈরি করেছে যা আদর্শ এবং কঠোর শাসনের এক সুসংহত নেটওয়ার্কের উপর ভিত্তি করে টিকে আছে। খামেনির অবর্তমানে ইসলামিক রেভুলেশনারি গার্ড কোরের সমর্থনে অন্য কোন শীর্ষ ধর্মীয় নেতা সেই জায়গা পূরণ করবেন। কারণ শাহাদাত বরণ বা আত্মোৎসর্গ করা শিয়া ইসলাম এবং ইরানের রাষ্ট্রীয় আদর্শের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই ট্রাম্পের সাধারণ ক্ষমার প্রস্তাবে আইআরজিসি খুব সহজে আত্মসমর্পণ করবে এমনটা ভাবা নেহাতই বোকামি ছাড়া আর কিছুই নয়। জার্মানির গ্লোবাল এন্ড রেডিয়ার স্টাডিজ ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক দিবা মিরজায়ের মতে পারমাণবিক হুমকির কথা বলে আমেরিকা আসলে এই যুদ্ধের একটি অজুহাত তৈরি করেছে। মূলত ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সামরিক অভিযানকে ব্যবহার করে ইরানের অভ্যন্তরীণ একটি গণঅভ্যুথানকে উসকে দিতে চাইছেন। কিন্তু ফ্রাইডরিক এবার্ট স্টিফ টুং এর বিশেষজ্ঞ মার্কার স্নাইডার মনে করেন শুধুমাত্র বিমান হামলার উপর ভরসা করে যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে সাধারণ মানুষ একটি সরকারের বিরুদ্ধে সফল বিদ্রোহ করবে এমনটা কল্পনা করাও কঠিন। ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ভাষণে এই অভিযানের চারটি মূল লক্ষ্যের কথা উল্লেখ করেছেন। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা ব্যালিস্টিক মিসাইল সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দেয়া নৌবাহিনীকে ধ্বংস করা এবং সর্বোপরি ইরানের শাসন ব্যবস্থার পতন ঘটানো। কিন্তু এই লক্ষ্যগুলো অর্জন কতটা বাস্তবসম্মত প্রথমত পারমাণবিক কর্মসূচির ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা বলছেন বিমান হামলা চালিয়ে পারমাণবিক স্থাপনাসহ হয়তো ক্ষতি করা সম্ভব। কিন্তু প্রযুক্তিগত জ্ঞান বা টেকনোলজিক্যাল নো-হাউ বোমা মেরে মুছে ফেলা যায় না। মার্কার্স স্নাইডারের মতে ইরানের নিজস্ব দক্ষতা রয়েছে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করার যা পুরোপুরি ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব। দ্বিতীয়ত ব্যালিস্টিক মিসাইল ধ্বংস করা। ইরানের মিসাইল প্রযুক্তি পুরোপুরি দেশীয় শিল্পের উপর নির্ভরশীল। তারা বাইরে থেকে এই মিসাইল আমদানি করে না। গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধে ইরান প্রমাণ করেছে যে তারা নিজেরাই শক্তিশালী মিসাইল তৈরি করতে সক্ষম। বিমান হামলা চালিয়ে কিছু গোদাম বা কারখানা ধ্বংস করা গেলেও তাদের সক্ষমতা পুরোপুরি নিঃশেষ করা অনেক সময়ের ব্যাপার। তৃতীয়ত নৌবাহিনী ধ্বংস করা। ইরানের নৌবাহিনীর একটি বড় অংশ ছোট ছোট স্পিড বোর্ডের সমন্বয়ে গঠিত যা পারস্য উপসাগর এবং হরমোচ প্রণালীতে গেরিলা কায়দায় হামলা চালাতে সক্ষম। এগুলো এক সপ্তাহের মধ্যে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়া সম্ভব নয় বলে মনে করেন সামরিক বিশ্লেষকরা। আর চতুর্থ লক্ষ্য অর্থাৎ সরকার পতন ঘটাতে হলে শেষ পর্যন্ত হয়তো আমেরিকাকে স্থলবাহিনী নামাতেই হবে। কারণ ইরানের মত সুসংগঠিত রাষ্ট্রে জনগণ বিক্ষোভ ঘটিয়ে সরকার ব্যবস্থার পতন ঘটাতে পারবে এটা অনেকটাই আকাশকুসুম কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়। আমেরিকা এবং ইসরাইলের এই হামলায় ইরানীদের মধ্যে একটি মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। একদিকে গত জানুয়ারিতে সরকার বিরোধী বিক্ষোভে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু এবং কঠোর দমন-পীড়নের স্মৃতি সাধারণ মানুষের মনে এখনো দগদগে। বিবিসির এক রিপোর্ট অনুযায়ী কিছু ইরানি নাগরিক যারা এই স্বৈরাচারী শাসনের অবসান চান তারা এই হামলায় এক ধরনের স্বস্তি বা উল্লাস প্রকাশ করেছেন।

[7:18]এমনকি কিছু কিশোরীকে ট্রাম্পের প্রতি ভালোবাসা জানাতেও দেখা গেছে। অনেক ইরানি নাগরিকের ফোনে সাহায্য এসে গেছে এমন টেক্সট মেসেজও পৌঁছেছে যেখানে তাদের ঘরে থাকতে এবং সরকারি বাহিনীকে অস্ত্র ফেলে দেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। কিন্তু অন্যদিকে সাধারণ মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ এবং আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ ইরানের মিনাপ কাউন্টিতে একটি মেয়েদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইসরাইলী হামলায় কমপক্ষে ১০৮ জনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর জনগণের মনোভাব দ্রুত বদলাতে শুরু করে। একজন প্রবাসী ইরানি সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন এ যুদ্ধের প্রথম শিকার মিনাবের মেয়েরা। আপনারা কি এই যুদ্ধের জন্য উল্লাস করছেন? ভয়াবহ এই হামলার পর তেহরানসহ বড় শহরগুলোতে ইন্টারনেট সংযোগ প্রায় পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। কিছু মানুষ স্টারলিং স্যাটেলাইট বা ভিপিএন ব্যবহার করে বাইরের বিশ্বের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন। অনেকেই পেট্রোল পাম্পে ভিড় জমাচ্ছেন এবং তুলনামূলক নিরাপদ এলাকা ভেবে কাস্পিয়ান সাগরের দিকে পালাতে শুরু করেছেন। এদিকে ইরান এই হামলার পর বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে পাল্টা আঘাত হানতে শুরু করেছে। ইসরাইল এবং উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাটিগুলো লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক মিসাইল ছুড়তে শুরু করেছে তারা। ইরানের ইসলামিক রেভুলেশনারি গার্ড কোর একে বলছে ট্রুথফুল প্রমিস ফোর অপারেশন। কাতারের আলু দেই দেয়ার বেস বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর ফিফথ ফ্লিটের সদর দপ্তর এবং কুয়েতের আলী আল সালেম বিমানঘাঁটিতে মিসাইল হামলা চালানো হয়েছে। জাওদান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে তারা তাদের আকাশসীমায় আসা একাধিক মিসাইল সফলভাবে ধ্বংস করেছে। তবে আমিরাতে মিসাইলের ধ্বংসাবশেষ পড়ে একজন বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। এই সংঘাতের সবচেয়ে বিপদজনক দিকটি হলো ইরানের বিস্তৃত প্রক্সি নেটওয়ার্ক। লেবাননে হিজবুল্লাহ ইয়েমেনে হুদি বিদ্রোহী এবং ইরাকে আল হাসদা শাবীর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো যেকোনো মুহূর্তে এই যুদ্ধে সর্বাত্মকভাবে জড়িয়ে পড়তে পারে। ওয়াশিংটনের আরব গাল্ফ স্টেটস ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক হোসেন ইবি সতর্ক করে বলেছেন যদিও গত এক বছরে ইসরাইলী হামলায় হিজবুল্লাহর কিছুটা ক্ষতি হয়েছে তবুও তারা এখনো অত্যন্ত সুসজ্জিত এবং যেকোনো সময় বড় ধরনের আঘাত হানতে সক্ষম। আর ইয়েমেনের হুদি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগর এবং এডেন উপসাগরে বৈশ্বিক বাণিজ্য চলাচলে যে ভয়াবহ বিঘ্ন ঘটাতে পারে তা তারা ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছে। ইরান যদি তাদের এই প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে আমেরিকার বিরুদ্ধে সর্বাত্মক হামলা নির্দেশ দেয় তবে পুরো মধ্যপ্রাচ্য একটি ভয়াবহ আঞ্চলিক যুদ্ধ ক্ষেত্রে পরিণত হবে। বিশ্ব অর্থনীতিতেও এর মারাত্মক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ব্রিজটার এনার্জির ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক জর্জ লিওন সতর্ক করে বলেছেন যদি এই সংঘাত দ্রুত প্রশমিত না হয় তবে বাজার খোলার সাথে সাথেই ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০ থেকে ২০ ডলার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। ইরান ওপেক এর তৃতীয় বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ এবং হরমুচ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের একটি বিশাল অংশ পরিবাহিত হয়। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পর হরমুচ প্রণালী দিয়ে কোন জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। লুফথানসা, এমিরেটস, কাতার এয়ারওয়েজ থেকে শুরু করে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের মতো বৈশ্বিক এয়ারলাইনগুলো মধ্যপ্রাচ্যের বেশিরভাগ রুটে তাদের ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত করেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন একটি সময় এই যুদ্ধে জড়িয়েছেন যখন আমেরিকার সাধারণ জনগণের মধ্যে আরেকটি বিদেশী যুদ্ধ নিয়ে কোন উৎসাহ নেই। সাম্প্রতিক একটি জরিপে দেখা গেছে মাত্র ২৭ শতাংশ আমেরিকান ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি ব্যবহারের পক্ষে রয়েছেন এবং অপর একটি জরিপে এই সমর্থন মাত্র ২১ শতাংশ। সামনেই আমেরিকার মধ্যবর্তী বা মিটম নির্বাচন। ট্রাম্প যদি দ্রুত এই যুদ্ধে কোন দৃশ্যমান বিজয় অর্জন করতে না পারেন তবে এটি তার এবং রিপাবলিকান পার্টির জন্য একটি বড় রাজনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। যদি এই যুদ্ধ প্রলম্বিত হয় এবং আমেরিকার সেনারা হতাহত হয় তবে ডেমোক্রেটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে এবং ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ইম্পিচমেন্টের চাপও বাড়তে পারে। ট্রাম্প এবং তার রানিং মেট জেডি ভেন্স এর আগে বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তারা আমেরিকাকে ফরএভার ওয়ারস বা অন্তহীন বিদেশী যুদ্ধ থেকে বের করে আনবেন। কিন্তু এখন তারাই আবার মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছেন যা তাদের কট্টর সমর্থকদেরও হতাশ করতে পারে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এই হামলার তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের প্রধান ভলকার তুর্ক এই সংঘাতকে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলে উল্লেখ করে দ্রুত আলোচনা টেবিলে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ কূটনীতিক কায়াকাল্লাস এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত বিপদজনক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রো জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রেডরিক মেজ এবং যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কেআর স্টারমার একটি যৌথ বিবৃতি দিয়ে ইরানকে পাল্টা আক্রমণ থেকে বিরত থাকতে এবং একটি কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজতে আহ্বান জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট জানিয়েছে যে তারা এই হামলায় সরাসরি অংশগ্রহণ করেনি। তবে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের স্বার্থ ও মিত্রদের রক্ষায় তারা প্রস্তুত রয়েছে এবং ব্রিটিশ যুদ্ধবিমান আকাশে টহল দিচ্ছে। রাশিয়া এই হামলাকে বেপরোয়া পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং একে আলোচনা প্রক্রিয়ার আড়ালে একটি ধ্বংসাত্মক কৌশল বলেও অভিহিত করেছে। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল বুসাইদি যিনি এই আলোচনার মধ্যস্থতা করছিলেন তিনি হতাশা ব্যক্ত করে বলেছেন যে আরো একবার একটি কার্যকর আলোচনাকে নস্যাৎ করে দেয়া হলো। আমেরিকা এবং ইসরাইলের এই প্রিএমটি বা আগাম হামলার যুক্তি আন্তর্জাতিক আইনের ধোপে টেকে না। কারণ এখানে কোন আসন্ন বা তাৎক্ষণিক হুমকির প্রমাণ ছিল না। এটি মূলত একটি পরিকল্পিত যুদ্ধ। তারা মনে করেছে অর্থনৈতিক সংকট এবং অভ্যন্তরীণ গণবিক্ষোভের কারণে ইরানের বর্তমান সরকার দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। আর তাই এটাই আঘাত হানার মোক্ষম সময়। কিন্তু বাস্তবতা হলো মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এবং সমাজ ব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল। শুধুমাত্র আকাশ থেকে বোমা ফেলে একটি আদর্শভিত্তিক এবং সামরিকভাবে সুসংগঠিত রাষ্ট্রকাঠামোকে ভেঙে ফেলা প্রায় অসম্ভব। ট্রাম্প হয়তো আশা করছেন ইরানি জনগণ নিজেরাই তাদের সরকারের পতন ঘটাবে। কিন্তু ক্রমাগত বিমান হামলা বেসামরিক মানুষের মৃত্যু এবং ধ্বংসযজ্ঞ উল্টো সাধারণ মানুষকে দেশের প্রতি আরো বেশি জাতীয়তাবাদী করে তুলতে পারে। যুদ্ধের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো একবার এটি শুরু হলে এর শেষ কোথায় হবে তা কেউ বলতে পারে না।

Need another transcript?

Paste any YouTube URL to get a clean transcript in seconds.

Get a Transcript