[0:05]মৃত্যু যখন কয়েক ইঞ্চি দূরত্বের বাতাসের মতো তপ্ত নিঃশ্বাস ছাড়ে, তখন মানুষের হিতাহিত জ্ঞান লোপ পাওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কিশোরগঞ্জের ভৈরব রেলওয়ে স্টেশনে গতকাল যা ঘটলো, তা যেন কোন থ্রিলার সিনেমার দৃশ্যকে হার মানিয়েছে। যান্ত্রিক দানব ট্রেনের নিচে পড়েও কেবল বাবার অকুতোভয় আলিঙ্গনে নতুন জীবন ফিরে পেলো দুই বছরের এক দুগ্ধপোষ্য শিশু। সময়টা দুপুর ১টা ৩০ মিনিট। তিতাস কমিউটার ট্রেনটি এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়াতেই যাত্রীদের হুড়োহুড়ি। ভিড়ের মধ্যে কোতিয়াদির সেই দম্পতিও চেষ্টা করছিলেন জটলা ঠেলে কামরায় উঠতে। কে জানতো এক মুহূর্তের অসতর্কতা তাদের জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেবে। ট্রেনে ওঠার সময় আচমকাই ভারসাম্য হারান ঐ নারী। কোল থেকে ছিটকে পড়ে যায় দুই বছরের শিশুটি। মা ও সন্তান দুজনেই তখন প্ল্যাটফর্ম আর ট্রেনের মাঝখানে সেই ম-র-ণ-ফাঁদে। চারদিকে আর্তনাদ, মানুষের চিৎকার। মা কোনমতে উপরে উঠে আসতে পারলেও শিশুটি রয়ে যায় ট্রেনের চাকার ঠিক পাশেই। আর সেই মুহূর্তেই বেজে ওঠে ট্রেনের বিদায়ী বাঁশি। চাকা ঘুরতে শুরু করেছে, যান্ত্রিক দানবটি সচল হতে যাচ্ছে। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানো শত শত মানুষের নিঃশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে গেল। শিশুটিকে তোলার আর কোন উপায় নেই। নিচে নামা মানেই অবধারিত মৃত্যু। কিন্তু বাবার কাছে নিজের প্রাণের চেয়ে সন্তানের ধুকপুকানি ছিল অনেক বেশি দামি। ট্রেন পুরোপরি গতি পাওয়ার আগেই ঝাঁপিয়ে পড়লেন নিচে। মুহূর্তের সিদ্ধান্তে নিজেকে বিছিয়ে দিলেন লাইনের সমান্তরালে। পরম মমতায় কোল বালিশের মতো জড়িয়ে ধরলেন নিজের কলিজার টুকরাটাকে। শুরু হলো এক দীর্ঘ প্রতীক্ষা। একে একে পার হচ্ছে ট্রেনের বগি, মাথার ঠিক উপর দিয়ে প্রচন্ড শব্দে চলে যাচ্ছে চাকা। একটু নড়াচড়া, একটু মাথা তোলা মানেই ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া। বাবা তখন পাথরের মতো নিশ্চল। তার শরীরের পুরো ভার দিয়ে ঢাল হয়ে আগলে রেখেছেন সন্তানকে। প্ল্যাটফর্মে উপস্থিত জনতা তখন স্তম্ভিত। কেউ চোখ বন্ধ করে প্রার্থনা করছেন, কেউ আল্লাহ আল্লাহ বলে চিৎকার করছেন। তিতাস ট্রেনের টিকেট বিক্রেতা ফালু মিয়া সেই মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে শিউরে উঠলেন। তার ভাষায় মনে হচ্ছিল, আকাশ ভেঙে পড়বে। কিন্তু ঐ বাবা নড়েননি। অবশেষে ট্রেনটি শেষ বগি নিয়ে প্ল্যাটফর্ম ছাড়লো। ধুলোর আস্তরণ সরিয়ে যখন দেখা গেল বাবা ও ছেলে অক্ষত অবস্থায় শুয়ে আছেন, তখন চারদিকে এক অলৌকিক স্তব্ধতা নেমে আসে। বাবা উঠে দাঁড়ালেন। পরম আবেগে মা তার সন্তানকে টেনে নিলেন কোলে। এ যেন এক নতুন জন্ম, এক নতুন পৃথিবী। ভৈরব রেলওয়ে থানার ওসি মোহাম্মদ সাঈদ আহমেদ জানান, এমন অবিশ্বাস্য ঘটনা আগে কখনও দেখেননি কেউ। বড় কোন চোট নেই, নেই রক্তপাত। শুধু আছে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার এক বুক আতঙ্ক আর বিস্ময়। ঢাকা যাওয়ার কথা থাকলেও এই দম্পতি শেষ পর্যন্ত বাড়ি ফিরে গেছেন। নাম পরিচয় ছাপিয়ে ভৈরবের আকাশে বাতাসে এখন শুধু একটাই কথা, বাবার বুক কি হিমালয়ের চেয়েও শক্ত? লোহাজুড়ির সেই বাবা বুঝিয়ে দিলেন, সন্তানের জন্য বাবার আলিঙ্গনই পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ বর্ম।

নিজেরা কেঁদে, কাঁদালেন পুরো দেশকেই | Train | Channel24
Channel 24
3m 29s414 words~3 min read
Auto-Generated
Watch on YouTube
Share
MORE TRANSCRIPTS


