[0:06]বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে প্রথমবারের মতো বিশ্বযুদ্ধের সাক্ষী হয়েছিল মানবসভ্যতা। ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত স্থায়ী সেই যুদ্ধকে ওই সময়কার প্রভাবশালীরা সব সংঘাত বন্ধের যুদ্ধ আখ্যা দিয়েছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে এমন রক্তক্ষয়ী ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে লিগ অফ নেশনস নামে একটি আন্তর্জাতিক সংগঠনও গড়ে তোলা হয়েছিল। এই সংগঠনটিকে বর্তমান জাতিসংঘের পূর্বসূরী বলা যেতে পারে। তবে ইতিহাসবিদদের ভাষ্য অনুযায়ী ওই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি পর্বই পরবর্তী বিশ্বযুদ্ধের বীজ বপন করে গিয়েছিল। যার ধারাবাহিকতায় মাত্র দুই দশকের মধ্যেই পুরো পৃথিবীজুড়ে আবারও বিশ্বযুদ্ধের ডামাটল বেজে উঠেছিল। সঙ্গত কারণেই এই যুদ্ধটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নামে পরিচিত। এই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধটি ছিল মানব ইতিহাসের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত চলা এই যুদ্ধে পৃথিবীর কমপক্ষে ৩০টি দেশের প্রায় ১০ কোটি মানুষ সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন। আর যুদ্ধ শেষে সব মিলিয়ে প্রাণহানির সংখ্যা ছিল সাড়ে আট কোটির বেশি। এর মধ্যে সাড়ে পাঁচ কোটির বেশি ছিলেন বেসামরিক নাগরিক। আর এই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসিদের দ্বারা নির্বিচারে ইহুদি নিধনের কার্যক্রমটি মানব ইতিহাসের অন্যতম বিষাদপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। হলোকাস্ট শীর্ষক এই জেনোসাইডে কমপক্ষে ৬০ লাখ ইহুদি ধর্মাবলম্বী মানুষকে হত্যা করেছিল নাৎসি বাহিনী। আজ আপনাদের এই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কে বিস্তারিত জানাবো। তবে তার আগে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইলে আমাদের এই ভিডিওটিও দেখতে পারেন। প্রিয় দর্শক চলুন তবে আর কথা না বাড়িয়ে আদ্যপান্তরে এই পর্বে ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাত এই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কে জেনে আসি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে বিজয়ী মিত্রবাহিনীর নীতি নির্ধারকেরা পরাজিত সাম্রাজ্যগুলোর প্রতি বেশ কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। অস্ট্রো-হাঙ্গেরী সাম্রাজ্যটি ভেঙে গোটা দশেক নতুন রাষ্ট্র এবং রাজ্যের সৃষ্টি করেন তারা। আর অটোমান সাম্রাজ্যটি ভেঙে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় ব্রিটেন এবং ফ্রান্স। এই ভাগ বাটোয়ারা অস্বীকার করে তুরস্ক নিজেদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আত্মসমর্পণপত্র হিসেবে স্বাক্ষরিত ভার্সাই চুক্তি অনুযায়ী জার্মানিকেও বেশ চড়া মূল্য দিতে হয়েছিল। প্রথমত, রাজ্যটির পশ্চিম সীমান্তবর্তী একাধিক এলাকার নিয়ন্ত্রণ ফ্রান্স এবং বেলজিয়ামের কাছে হস্তান্তর করা হয়। অন্যদিকে পূর্ব সীমান্তে বিশাল এলাকা নিয়ে পোল্যান্ড নামক নতুন একটি রাষ্ট্র গঠন করেন বিজয়ী জোটের সদস্যরা। তবে কাজ করতে গিয়ে তারা বিপুল সংখ্যক জার্মান নাগরিককে মূল জার্মানি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিলেন। তাছাড়া জার্মান সামরিক বাহিনীর ওপরেও একাধিক বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়। সেনাবাহিনীর সদস্য সংখ্যা এক লাখের নিচে রাখা, ট্যাংক বা কামানের মতো কোনো ভারী অস্ত্র ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা উল্লেখযোগ্য। এমনকি জার্মানিকে কোনো বিমান বাহিনী রাখারও অনুমতি দেয়া হয়নি। সর্বোপরি জার্মানি ও তার মিত্রদের প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ক্ষতিপূরণ বাবদ বিপুল অংকের অর্থ পরিশোধের নির্দেশ দেয়া হয়। যৌক্তিক কারণেই বিজয়ী জোটের এই অবস্থান জার্মানির জনসাধারণকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল। মিত্রবাহিনীর এমন এক পেশে কর্মকাণ্ড জার্মানির মত ইতালির জনসাধারনের মাঝেও তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার করে। যুদ্ধের সময় মিত্রবাহিনী তাদের পক্ষে লড়াইয়ের বিনিময়ে ইতালিকে অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের পূর্ব উপকূলে উপনিবেশ স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধ শেষে সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হয়নি। অথচ প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ইতালির প্রায় ছয় লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। এ জনরোশের কারণে বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে জার্মানি এবং ইতালির রাজনৈতিক অঙ্গনে উগ্র ডানপন্থী দলগুলোর উত্থান শুরু হয়। এ সময় ইউরোপের যুদ্ধ বিধ্বস্ত অর্থনীতিও এই উগ্রপন্থীদের ক্ষমতায়নে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিল। বিশেষ করে জার্মানিতে মুদ্রাস্ফীতির তীব্রতা রীতিমতো আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছিল। ১৯১৮ সালের নভেম্বর মাসে এক ইউএস ডলারের বিনিময়ে ৪ ডশ মার্ক পাওয়া যেত। পাঁচ বছরের মাথায় ১৯২৩ সালের নভেম্বর মাসে এক মার্কিন ডলারের বিনিময় মূল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৪ হাজার ২শ কোটি ডয়েশ মার্ক। এমন অসহনীয় মুদ্রাস্ফীতির কারণে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ক্ষতিপূরণ পরিশোধ বন্ধ করে দেয় জার্মানি। তখন অবশ্য জার্মানি বিশ্বজুড়ে ওয়াইমার রিপাবলিক নামে পরিচিত ছিল। এর প্রতিবাদে ওয়াইমার প্রজাতন্ত্রের সীমান্তবর্তী রুর নামক শিল্প এলাকাটি দখল করে নেয় ফ্রান্স এবং বেলজিয়াম। ১৯২৮ সালের জনসাধারণের মাঝে বিদ্যমান অসন্তোষের সুযোগে ইতালির ক্ষমতায় আসেন মুসোলিনি। সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করে দেশটিতে ফ্যাসিবাদ আমলের সূচনা করেন তিনি। এর পরের বছর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ওয়াল স্ট্রিট শেয়ার বাজারে বিশাল এক ধস নামে। এর প্রভাবে পুরো বিশ্ব অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ মন্দার সৃষ্টি হয়। ইতিহাসে এই মন্দাটি গ্রেট ডিপ্রেশন নামে কুখ্যাত। এই মন্দার ফলে জার্মানির অর্থনীতিও সংকুচিত হয়ে পড়ে। ১৯৩২ সালে দেশটির তরুণ প্রজন্মের মাঝে বেকারত্বের হার শতকরা ৩০ ভাগ ছাড়িয়ে যায়। পরিস্থিতির জন্য সরকারকে দায়ী করে প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসেন জার্মানির অধিবাসীরা। এর ধারাবাহিকতায় ঐ বছর জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয় উগ্র ডানপন্থী দল এনএসডিএপি। জনৈক এডলফ হিটলার নেতৃত্বাধীন এই দলটি সংক্ষেপে নাৎসি পার্টি নামে পরিচিত ছিল। নির্বাচনে জয় লাভের পর দলটি তাদের সভাপতি এডলফ হিটলারকে দেশের সরকার প্রধান হিসেবে নিয়োগ করে।
[6:35]দেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের পরই মুসোলিনির অনুকরণে বাকি সব রাজনৈতিক দলকে অবৈধ ঘোষণা করেন হিটলার। ১৯৩৩ সালে তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করা বন্ধ করে দেন। এরপর ভার্সাই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে জার্মান সেনাবাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি শুরু করেন তিনি। শুধু তাই না, সক্ষম জার্মান তরুণদের জন্য সামরিক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়। হিটলারের এই কর্মকাণ্ড নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে কিছুটা সমালোচনা হলেও জাতীয় পর্যায়ে তার জনপ্রিয়তা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছিল। ১৯৩৫ সাল নাগাদ হিটলার প্যান-জার্মানিজম শীর্ষক একটি মতবাদ উদ্ভাবন করেন। সংক্ষেপে এই মতবাদ অনুযায়ী বিশুদ্ধ জার্মান বংশোদ্ভূতরা এরিয়ান জাতির সদস্য। এই মতবাদে সোনালী চুল এবং নীল চোখের অধিকারী জার্মানদের বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম জাতি হিসেবেও দাবি করা হয়। এর বিপরীতে হিটলারের ধারণা অনুযায়ী ইহুদি ধর্মাবলম্বীরা ছিলেন মানুষের মধ্যে নিকৃষ্টতম। এছাড়া কার্ল মার্কস প্রণীত সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের অনুসারীরাও হিটলারের নিকৃষ্ট মানুষের তালিকায় স্থান পেয়েছিল। সর্বোপরি বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় একটি চূড়ান্ত সমাধান বাস্তবায়নের প্রস্তাব রাখেন নাত্সিবাদে জনক হিসেবে কুখ্যাত অ্যাডলফ হিটলার। তার প্রস্তাবনা অনুযায়ী বিশ্বজুড়ে এরিয়ানদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করা হবে। এবং বৈশ্বিক ওই সাম্রাজ্যে ক্ষমতাসীনরা বিশ্বব্যাপী মার্কসপন্থী এবং ইহুদিদের নির্মূলে গণহত্যা চালাবে। নিজের এই ঘৃণ্য সমাধান জার্মানির ভেতর বাস্তবায়নও শুরু করেছিলেন হিটলার। তিনি কি ১৯৩৫ সালেই আফ্রিকা মহাদেশে নতুন উপনিবেশ স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয় ইতালি। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পূর্ব আফ্রিকার ইথিওপিয়া রাজ্যে সেনা অভিযান শুরু করা হয়। সেনা হামলার মুখে অ্যাবিসিনিয়া নামে পরিচিত এই রাজ্যের শাসক পালিয়ে যান। তবে রাজ্যটির জনসাধারণ সশস্ত্র বিপ্লব শুরু করে। একই সময়ে ইউরোপের স্পেনেও ক্ষমতাসীন রাজার বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান শুরু করেন স্প্যানিশ সেনাবাহিনীর জেনারেল ফ্রান্সিস ফ্রাঙ্কো। এই অভ্যুত্থানে জেনারেল ফ্রাঙ্কোকে সামরিক সহায়তা দেয় ইতালি এবং জার্মানি। এই সুযোগে ১৯৩৬ সালে নিজেদের মধ্যে একটি দ্বিপাক্ষিক সামরিক চুক্তি করে নেয় স্বৈরাচার শাসিত এই দেশ দুটো। এই চুক্তিটি রোম-বার্লিন এগ্রিমেন্ট নামে পরিচিত।
[9:11]একই বছর এশিয়ার অন্যতম পরাশক্তি জাপানের সাথেও একটি পৃথক সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করে জার্মানি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে এই দেশের অবস্থাও খুব একটা ভালো ছিল না। ১৯৩১ সালে প্রাক্তন রুশ সাম্রাজ্যের সীমানা সংলগ্ন চীনের মানচুরিয়া প্রদেশটি দখল করে নিয়েছিল জাপানের সেনাবাহিনী। ১৯৩৬ সালে চীনের রাজপন্থী এবং কমিউনিস্টদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হলে জাপান মানচুরিয়ার দক্ষিণেও বিশাল এলাকা জুড়ে সেনা মোতায়েন করে। ১৯৩৭ সালে চীনের নানজিং প্রদেশে জাপানি সেনাবাহিনী বর্বর গণহত্যা চালায়। ইতিহাসে এই ঘটনাটি নানজিং ম্যাসাকার নামে পরিচিত। এতে চীনের প্রায় তিন লাখ নাগরিক জাপানি সেনাদের হাতে প্রাণ হারায়। ১৯৩৮ সালে জার্মানির প্রতিবেশী অস্ট্রিয়াতেও নাৎসি পার্টি ক্ষমতা লাভ করে। এরপর তারা নিজেদের স্বাধীনতা বিসর্জন দিয়ে জার্মানির সাথে একীভূত হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। অস্ট্রিয়ার এই কাজেই হিটলার ইউরোপের আরও এলাকা দখলে উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠেন। বিশেষ করে প্রায় ৩৫ লাখ জার্মান উদ্বসিত চেকোস্লোভাকিয়া দখলে তিনি চেষ্টা শুরু করেন। শেষ পর্যন্ত ১৯৩৯ সালের শুরুতে চেকোস্লোভাকিয়ার বিশাল এলাকা দখল করে নেয় জার্মান সেনাবাহিনী। জার্মানির এই আগ্রাসনে সম্মতি ছিল ব্রিটেন এবং ফ্রান্সেরও। তবে ছয় মাসের মাথায় ব্রিটেন এবং ফ্রান্সের সাথে সম্পাদিত মিউনিখ চুক্তির শর্ত ভেঙে পুরো চেকোস্লোভাকিয়ায় দখল করে নিয়েছিল জার্মানি।
[10:52]নিজেদের দক্ষিণ পূর্ব সীমান্ত সুরক্ষিত করার পর এবার উত্তর পূর্বে পোল্যান্ডের দিকে নজর ফেরায় জার্মানি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বাজেয়াপ্ত করা স্থলভাগ ফিরিয়ে দিতে পূর্ব ইউরোপের দেশটিকে আজমেটাম দেন হিটলার। জবাবে ব্রিটেন এবং ফ্রান্স জানায় পোল্যান্ড আক্রান্ত হলে তারা জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবে। একই বছর অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের পূর্ব উপকূলে অবস্থিত আল্বেনিয়া দখল করে নেয় ইতালি। আর মঙ্গোলিয়ার সাথে সীমান্তে বিবাদের জেরে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে জাপান। ঐ যুদ্ধে পরাজিত হবার পর নিজেদের পশ্চিমমুখী সম্প্রসারণ বন্ধ করে দক্ষিণে নতুন উপনিবেশ সৃষ্টিতে মনোনিবেশ করে পূর্ব এশিয়ার এই দেশটি। অবশেষে ১৯৩৯ সালের পয়লা সেপ্টেম্বর কোন পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই পোল্যান্ড আক্রমণ করে বসে জার্মান সেনাবাহিনী। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এর প্রতিক্রিয়ায় জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে ব্রিটেন এবং ফ্রান্স। এই যুদ্ধে জার্মানি সম্পূর্ণ আনকড়া একটি সমর কৌশল প্রয়োগ করে। ব্লিটজক্রিগ শীর্ষক এই কৌশলে ট্যাংক এবং অন্যান্য সাজোয়াযান ব্যবহার করে শত্রুপক্ষের প্রতিরোধ রেখা খুব দ্রুত ভেঙে ফেলা হয়। তারপর দুপাশের শত্রুকে আলাদাভাবে ঘিরে ফেলা হয়। জার্মানির অভিনব এই সমর কৌশলের মুখে পোল্যান্ডের সামরিক বাহিনী তেমন শক্ত কোনো প্রতিরোধই গড়ে তুলতে পারেনি। জার্মানি যখন তার পুপ সীমান্তে দখল অভিযানে ব্যস্ত ছিল তখন ব্রিটেন এবং ফ্রান্সের যৌথবাহিনী পশ্চিম দিক থেকে জার্মানির ভেতর ঢুকে পড়ার বদলে দেশটির পশ্চিম সীমান্তে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। মিত্রবাহিনীর এই ভুলে পশ্চিম পোল্যান্ড জার্মানির দখলে চলে যায়। এই সুযোগে সোভিয়েত ইউনিয়নও সেনা পাঠিয়ে পোল্যান্ডের পূর্বাঞ্চল টুকু দখল করে নেয়। পোল্যান্ডের পাশাপাশি ফিনল্যান্ডের সীমান্তবর্তী একাধিক এলাকায় সেনা মোতায়েন করে সোভিয়েতরা। সোভিয়েত হানাদারদের বিরুদ্ধে ফিনল্যান্ডের সেনাদের যুদ্ধটি উইন্টার ওয়ার নামে পরিচিত। সামরিক শক্তির বিচারে সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের প্রতিপক্ষ ফিনল্যান্ডের তুলনায় অনেক এগিয়ে থাকলেও আক্রমণকারীরা এই যুদ্ধে খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত ১৯৪০ সালের মার্চ মাসে দুপক্ষের মধ্যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
[13:20]এই যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের দুর্বলতার বিষয়টি হিটলারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। এর ফলে তার মনে সোভিয়েত ইউনিয়ন দখলের তীব্র বাসনা জন্ম নেয়। একই সময় ব্রিটেন এবং ফ্রান্সের যৌথ নৌবাহিনী নর্থ সি'র সমুদ্রপথে অবরোধ আরোপ করে। এর ফলে সুইডেন থেকে জার্মানিতে জ্বালানি তেল আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়। জবাবে জ্বালানি আমদানীর সমুদ্র পথটি নিরাপদ রাখার বাহানায় ১৯৪০ সালের এপ্রিল মাসে ডেনমার্ক এবং নরওয়ে দখল করে নেয় জার্মান সেনাবাহিনী। ঐ বছর মে মাসে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অনুকরণে নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম এবং লুক্সেমবার্গ দেশ তিনটি দখল করে নেয় নাৎসি সেনারা। এ থেকে মিত্রবাহিনীর ব্রিটিশ এবং ফরাসি সেনা কর্তৃপক্ষ মনে করেছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতোই স্লিফেন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে জার্মানি। এই ধারণার কারণে বেলজিয়াম এবং নেদারল্যান্ডসের সেনাবাহিনীর সাথে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয় মিত্রবাহিনী। কিন্তু জার্মানি তাদের পশ্চিম দিকেও ব্লিটজক্রিগ রণ কৌশল ব্যবহার করে। মিত্রবাহিনীর প্রতিরক্ষা বুজ্যের দুর্বলতম স্থানে তারা বোমারু বিমান ব্যবহার করে প্রথমে উপর্যপুরি কয়েক ঘন্টা গোলাবর্ষণ করে। এরপর সেই ফাঁক দিয়ে প্যানজার ট্যাংক এবং সাজোয়াযানের বহর শত্রুপক্ষকে ঘিরে ফেলে। এভাবে ব্রিটেন, ফ্রান্স, বেলজিয়াম এবং নেদারল্যান্ডসের প্রায় ১৫ লাখ সেনা ডানকার্ক সৈকতে আটকা পড়েন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য সেখান থেকে প্রায় সাড়ে তিন লাখ ব্রিটিশ এবং ফরাসি সেনাকে ইনল্যান্ডে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ১৯৪০ সালের ৪ঠা জুন ডানকার্ক সৈকতটিও জার্মান সেনাদের দখলে চলে যায়। এরপর নাৎসি বাহিনী ফ্রান্স দখলে অভিযান শুরু করে। দেশটির রাজধানী প্যারিস অভিমুখে বিদ্যুৎ গতিতে এগিয়ে যায় জার্মান সেনারা। উত্তরে এই অস্থিরতার সুযোগে দক্ষিণ পূর্ব সীমানা দিয়ে ফ্রান্সের ভেতর ঢুকে পড়ে ইতালির সেনাবাহিনী। ফ্রান্সের নবনির্বাচিত সরকার প্রধান মার্শাল বেতা দ্বিমুখী এই সারাশি আক্রমণের মুখে যুদ্ধবিরতির চুক্তি সাক্ষরে বাধ্য হন। কিন্তু লন্ডনে নির্বাসিত ফরাসি সেনাপ্রধান জেনারেল শার্ল দু-গোল এক রেডিও বার্তায় ফ্রান্সের জনসাধারণের প্রতি নাৎসি বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন। মার্শাল বেতা তার অনুসারীদের মধ্য থেকে হিটলারপন্থী সরকার গঠন করে দক্ষিণ ফ্রান্সের ভিসিসি শহরে রাজধানী সরিয়ে নেন। আর ফ্রান্সের উত্তর এবং পশ্চিম প্রান্তে আটলান্টিক মহাসাগরের উপকূলবর্তী বিস্তৃত এলাকায় নাৎসি বাহিনী তাদের নিজস্ব সামরিক শাসন কায়েম করে। এর ফলে ফরাসি নৌবাহিনীর যুদ্ধ জাহাজগুলো জার্মানির দখলে চলে যায়।
[16:17]এদিকে উত্তর এবং পশ্চিমে এই অস্থিরতার সুযোগে পূর্ব ইউরোপের লাটভিয়া, এস্তোনিয়া এবং লিথুনিয়া দেশ তিনটি কোন যুদ্ধ ছাড়াই দখল করে নেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। স্পেন এবং পর্তুগাল ছাড়া ইউরোপের মূল ভূখণ্ডের পুরোটা নিজের দখলে নেবার পর ১৯৪০ সালের জুলাই মাসে ইংলিশ চ্যানেলের ওপারে ব্রিটেন দখলের যুদ্ধ শুরু করে নাৎসি বাহিনী। কিন্তু ব্রিটিশ নৌবাহিনীর শক্তি মোকাবিলায় সামর্থ্য না থাকায় ইংল্যান্ডের দক্ষিণ পূর্ব উপকূলে বিমান হামলা চালিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয় তাদের। রয়্যাল এয়ারফোর্স এবং জার্মান বিমান বাহিনীর মধ্যে এই যুদ্ধটি ইতিহাসের পাতায় ব্যাটেল অব ব্রিটেন নামে স্থান করে নিয়েছে। প্রথম দিকে এই যুদ্ধে জার্মান বিমানবাহিনী শুধু মিত্রবাহিনীর সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করেই বোমা হামলা চালাত। কিন্তু আগস্ট মাসে এমন একটি হামলায় ব্যবহৃত বোমাটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে লন্ডনের উপকণ্ঠে এক জনপদে আঘাত হানে। এর জবাবে খোদ বার্লিন শহর লক্ষ্য করে বোমা হামলা চালায় ব্রিটিশ বিমানবাহিনী। যা হিটলারকে ভীষণ ক্ষুব্ধ করে তোলে। এরপর থেকে সামরিক স্থাপনার বদলে ইংল্যান্ডের বিভিন্ন শহর লক্ষ্য করেই বোমাবর্ষণ শুরু করে জার্মানি। সব মিলিয়ে ১৯৪০ সালের ১০ই জুলাই থেকে শুরু হয়ে ৩১শে অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় চার মাস স্থায়ী এই আকাশ যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ বিমানবাহিনী জয় লাভ করে। কিন্তু উভয় পক্ষেই প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। ব্রিটিশ বিমান বাহিনীর দেড় হাজারের বেশি পাইলট এই যুদ্ধে প্রাণ হারান। আহত হন আরও প্রায় ৫০০ জন। আর শত্রুপক্ষের হামলায় বিধ্বস্ত বিমানের সংখ্যা ১৭৪৪টি। এর বিপরীতে জার্মান বিমানবাহিনীর আড়াই হাজারের বেশি পাইলট এই যুদ্ধে নিহত হন। আহত হয়েছিলেন আরও ৭০০'র বেশি বিমান সেনা। রয়েল এয়ার ফোর্সের হামলায় তাদের প্রায় ২০০০ বিমান বিধ্বস্ত হয়েছিল। তবে বিভিন্ন জনপদের উপর নির্বিচারে বোমাবর্ষণের ফলে দুই পক্ষ মিলিয়ে এর যুদ্ধে নিহত বেসামরিক নাগরিকের সংখ্যা প্রায় ১৫ হাজার। আর আহত হয়েছিলেন আরও ২০ হাজারের বেশি মানুষ।
[18:34]অবশেষে ১৯৪০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জার্মানি এবং ইতালির এই সামরিক জোটে হাত মেলায় এশিয়ার পরাশক্তি জাপান। এই ত্রিদেশীয় জোটকে অক্ষশক্তি নাম দিয়েছেন ইতিহাসবিদরা। বিষয়কর ব্যাপার হলো একই সামরিক জোটে থাকলেও জার্মানি এবং ইতালি সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল। একদিকে ইতালি ইউরোপ জুড়ে আধিপত্য বিস্তারের পরিবর্তে নিজেদের উপনিবেশের সংখ্যা বৃদ্ধির উপর গুরুত্ব দিচ্ছিল। যার ধারাবাহিকতায় ইতালির সেনাবাহিনী আল্বেনিয়া, গ্রিস, মিশর এবং ইথিওপিয়া দখলে অভিযান শুরু করে। কিন্তু এই অভিযানগুলো খুব একটা সাফল্যের দেখা পায়নি তারা। বরং বলকান অঞ্চলে গ্রিক এবং ব্রিটিশ যৌথ প্রতিরোধের মুখে ইতালি পিছু হঠতে বাধ্য হয়। মিশরেও একই পরিণতির শিকার হয় ইতালীয় সেনাবাহিনী। জোটের মিত্র দেশকে সামরিক বিপর্যয় হাত থেকে রক্ষার জন্য উত্তর আফ্রিকা এবং বলকান অঞ্চলে সেনা মোতায়েন করতে বাধ্য হয় জার্মানি। এতে পুরো বলকান অঞ্চল অক্ষশক্তির নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
[19:43]১৯৪১ সালে জার্মান স্বৈরাচার শাসক অ্যাডলফ হিটলার তার সেনাবাহিনীর জন্য নতুন একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন দখলে সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে অপারেশন বারবারোসা নামক একটি অভিযানের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। অপারেশন বারবারোসার মূল উদ্দেশ্য ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ স্থলভাগ দখল এবং সেখানে জার্মান বংশোদ্ভূতদের স্থায়ী বসবাসের ব্যবস্থা করা। এই লক্ষ্যে জার্মান সেনাবাহিনী ১৯৪১ সালের ২২শে জুন সোভিয়েত ইউনিয়ন দখলে অভিযান শুরু করে। জেনে অবাক হবেন ওই দিনটি ঠিক ১২৯ বছর আগে ১৮১২ সালের ২৪শে জুন ইউরোপের আরেক সেনাপতি রাশিয়া দখলের চেষ্টা করেছিলেন। অনেকেই হয়তো বুঝে ফেলেছেন এখানে ফরাসি সেনাপতি নেপোলিয়ন বোনাপার্টের কথা বলা হচ্ছে। ঐ অভিযানে নেপোলিয়নের সাথে থাকা প্রায় ৯ লাখ সেনার মধ্যে সাড়ে ৬ লাখের মতো নিহত হয়েছিল। উল্টো এই অভিযানের ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে না পারায় পরবর্তীতে এই ফরাসি সেনাপতির পতনের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ১২৯ বছর পর একই ভুল করা অ্যাডলফ হিটলারকেও সেই একই পরিণতির মুখোমুখি হতে হয়। এদিকে বিশ্বযুদ্ধের প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে জাপানের আধিপত্য খর্ব করার জন্য দেশটির উপর বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে জাপানের সামরিক বাহিনীর জন্য অপরিহার্য জ্বালানি তেল এবং ইস্পাত আমদানি বন্ধ হয়ে যায়। পরিস্থিতি মোকাবেলায় মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং সিঙ্গাপুরের মতো ইউরোপীয় উপনিবেশগুলো দখলের পরিকল্পনা করে জাপান। এই লক্ষ্য অর্জনে একমাত্র বাধা ছিল হাওয়াই দ্বীপের পার্ল হারবারে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী নৌবহর। প্যাসিফিক ফ্লিট শীর্ষক এই নৌবহর ধ্বংসের ১৯৪১ সালের ৭ই ডিসেম্বর ঐ বন্দর লক্ষ্য করে হামলা চালায় জাপানের বিমানবাহিনী। এর বদলা নিতে ব্রিটেন এবং ফ্রান্সের সাথে মিত্রবাহিনীতে যোগ দেয় যুক্তরাষ্ট্র। তবে ক্ষতিগ্রস্ত নৌবহর মেরামত করে যুদ্ধে সেনা প্রেরণের জন্য বাড়তি সময় প্রয়োজন ছিল তাদের। সেই সময়ে মিয়ানমার এবং সিঙ্গাপুর সহ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ দখল করে নেয় জাপান। পরের বছর আটলান্টিক মহাসাগরে ব্রিটেনের যাত্রী এবং পণ্যবাহী জাহাজগুলো লক্ষ্য করে সাবমেরিন হামলা শুরু করে জার্মান নৌবাহিনী। এই হামলায় তাদের ব্যবহৃত ইউ-বোটগুলো রীতিমত কিংবদন্তির পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। ১৯৪২ সালের এপ্রিল মাস থেকে শুরু হওয়া এই নৌযুদ্ধটি ব্যাটেল অফ আটলান্টিক নামে পরিচিত। এই মাসে যুক্তরাষ্ট্র গোপনে একটি শক্তিশালী সমরস্ত্র নির্মাণে গবেষণা শুরু করে। ম্যানহাটন প্রজেক্ট শীর্ষক এই গবেষণা প্রকল্পেই প্রথম পারমাণবিক অস্ত্র আবিষ্কার করা হয়েছিল। এই বছর জুন মাসের পর থেকে যুদ্ধের মোড় ঘুরে যাওয়া শুরু করে। ১৯৪২ এর সেপ্টেম্বর মাসে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দ্বীপপুঞ্জগুলো জাপানের দখলমুক্ত করার লক্ষ্যে সম্মিলিত সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। এই বছর আফ্রিকা মহাদেশেও ঐক্য বাহিনী উপর্যপুরি পরাজয়ের শিকার হয়। মিত্রবাহিনীর প্রতি হামলায় মিশর দখলের চেষ্টায় ইতি টানতে বাধ্য হয় তারা। উত্তর-পশ্চিমে মিত্রবাহিনীর হামলায় মরক্কো এবং আলজেরিয়াসহ ফরাসি উপনিবেশগুলো অক্ষশক্তির দখলমুক্ত হয়। এই মহাদেশে জার্মানির শেষ ঘাঁটি ছিল তিউনিশিয়ায়। ১৯৪৩ সালের মে মাস নাগাদ সেখানেও তারা আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়।
[23:36]১৯৪৩ সালের জুলাই মাস থেকে পুরো ইউরোপ নাৎসি বাহিনীর দখলমুক্ত করার লক্ষ্যে ত্রিমুখী আক্রমণ শুরু করে মিত্রবাহিনী। পূর্ব দিক থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নের রেড আর্মি ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে ঢুকে পড়ে। দক্ষিণে আফ্রিকা থেকে মিত্রবাহিনী ইতালির নিয়ন্ত্রণে থাকা সিসিলি দ্বীপপুঞ্জে অবতরণ করে। আর পশ্চিমে ফ্রান্সের কোন উপকূলে বিপুল পরিমাণ সেনা প্রেরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর জন্য ফ্রান্সের কোন উপকূল ব্যবহার করা হবে তা নিয়ে মতানৈক্যের কারণে এর বাস্তবায়ন প্রায় এক বছর পিছিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত ১৯৪৪ সালের জুন মাসে নরমিন্ডু উপকূলে প্রায় ২১ লাখ সেনা অবতরণ করে। অপারেশন ওভারলোড শীর্ষক এই অভিযানটি ইতিহাসের বৃহত্তম সেনা অভিযান হিসেবে বিবেচিত হয়। এতে অংশ নেওয়া সেনাদের অধিকাংশই ছিলেন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং কানাডার নাগরিক। মিত্রবাহিনীর ত্রিমুখী হামলায় পিছু হঠতে হঠতে নাৎসি বাহিনী ১৯৪৫ সালের জানুয়ারি মাসে জার্মানির ভেতরে ঢুকে যেতে বাধ্য হয়। এই বছর ফেব্রুয়ারি মাসে বর্তমান ইউক্রেনের ইয়াল্টা শহরে মিত্রবাহিনীর সরকার প্রধানদের মধ্যে এক ঐতিহাসিক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। যেখানে একত্রিত হয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট, ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বাধিনায়ক জোসেফ স্টালিন। এই সম্মেলনেই লীগ অফ নেশনস ভেঙে দিয়ে নতুন একটি বিশ্ব সংস্থা গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জাতিসংঘ তাদের কার্যক্রম শুরু করে। এ সময় মিত্রবাহিনীর জার্মানি অভিমুখে যাত্রাও বন্ধ ছিল না। এপ্রিল মাস নাগাদ খোদ বার্লিন শহরটিও সোভিয়েত সেনারা ঘিরে ফেলেছিল। মে মাসে জার্মানির চূড়ান্ত আত্মসমর্পণের দুদিন আগে আত্মহত্যা করেন এডলফ হিটলার। ১৯৪৫ সালের জুন মাস থেকে জাপানের বিরুদ্ধে সর্বশক্তি নিয়োগ করে মিত্রবাহিনী। জুলাই মাসে দেশটির সরকারকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের আলটিমেটাম দেওয়া হয়। এই আলটিমেটাম প্রত্যাখ্যান করায় আগস্ট মাসে জাপানের হিরোসিমা এবং নাগাসাকি শহরে দুটি পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় যুক্তরাষ্ট্র। এই বিস্ফোরণে জনবহল শহর দুটির প্রায় আড়াই লাখ মানুষ প্রাণ হারায়। বিধ্বংসী এই হামলার পর দিশেহারা হয়ে পড়ে জাপান। একদিকে ছিল ফের পারমাণবিক হামলার আশঙ্কা অন্যদিকে ছিল মিত্রবাহিনী যেকোনো সময় দেশটিতে ঢুকে পড়তে পারে। এমন অবস্থায় ১৯৪৫ সালের ১৫ই আগস্ট নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয় জাপান। এরপর দোসরা সেপ্টেম্বর আত্মসমর্পণ পত্রে স্বাক্ষর করে দেশটি। এর মধ্য দিয়েই আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্তি ঘটে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যে শুধু বিপুল সংখ্যক প্রাণহানি আর ধ্বংসযজ্ঞের সাক্ষী হয়েছে তাই না। এই যুদ্ধ গোটা বিশ্বের রাজনৈতিক এবং সামাজিক জীবনে আমূল পরিবর্তনের সূচনা করেছিল। ভবিষ্যৎ বিপর্যয় সামাল দেওয়ার জন্য যেমন জাতিসংঘের সৃষ্টি হয়েছিল তেমনি জন্ম নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র বা সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো সুপার পাওয়ারেরও। আর এই দুই সুপার পাওয়ারের মধ্যে প্রায় অর্ধ শতক ধরে চলা স্নায়ু যুদ্ধ তো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী আরেক রোমাঞ্চকর ইতিহাস।



