[0:00]আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় ভঙ্গুর অর্থনীতি তার উপর চারপাশে ঘিরে আছে মার্কিন রণতরি। ইশারা পেলে যেকোনো সময় হামলা। এমন প্রেক্ষাপটেও তেহরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে নতি স্বীকার করেনি। বিষয়টা ভীষণভাবে ভাবিয়ে তুলেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে।
[0:23]জেনেভার বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের কৌতুহল চেপে রাখেনি তার বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। ইরানের এমন আত্মবিশ্বাসের কারণ জানতে চেয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির কাছে। আরাকচিও জবাব দিয়েছেন দারুণ। বলেন আমরা আত্মসমর্পণ করি না। কারণ আমরা ইরানি।
[0:45]এই বক্তব্যে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইরান নিজেকে কেবল একটি আঞ্চলিক দেশ হিসেবে দেখে না। তাদের নেতাদের মতে ইরান একটি প্রাচীন ও প্রভাবশালী রাষ্ট্র। যার রয়েছে নিজস্ব সম্মান ও মর্যাদা। মার্কিন চাপ উপেক্ষা করার ক্ষেত্রে তাদের এই আত্মবিশ্বাস শেষ পর্যন্ত সঠিক প্রমাণিত হবে কিনা তা এখনো স্পষ্ট নয়। ইরানি কর্মকর্তারা এবং মধ্যস্থতাকারী দেশ ওমান জানিয়েছে 26 ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ত্রপক্ষীয় পরোক্ষ আলোচনায় কিছু অগ্রগতি হয়েছে। তবে তেহরান এখনো ওয়াশিংটনের প্রধান দাবিগুলো মেনে নিতে রাজি হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বৈরতা মূলত ইউরেনিয়াম নিয়ে। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হয় এই ইউরেনিয়াম। তবে এটি যদি খুব বেশি মাত্রায় সমৃদ্ধ করা হয় তাহলে তা দিয়ে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা সম্ভব। ইরানের দাবি যেহেতু পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা এনটিপি স্বাক্ষরকারী তারা তাই শান্তিপূর্ণ কাজে পারমাণবিক শক্তি উন্নয়নের অধিকার আছে তাদের। এর মধ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার বিষয়টিও পড়ে। তাদের মতে এনটিপির অন্য সদস্যগুলো যে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে সে একই চুক্তি থেকে ইরানকে আলাদা করে বঞ্চিত করা উচিত নয়। ইরানের বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচির অধিকার রয়েছে বিষয়টি স্বীকার করে যুক্তরাষ্ট্র। তবে তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি কেবল শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে এই দাবি পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছে না ওয়াশিংটন।
[2:27]ঠ্যাঁপাটে ট্রাম্পের তীব্র চাপের মুখেও ইরানের নতি স্বীকার না করার পেছনে বেশ কিছু কারণ আছে বলে মনে করেন সামরিক বিশেষজ্ঞরা। এগুলোর মধ্যে অন্যতম ইরানের জাতীয়তাবাদ ও সার্বভৌমত্ব। ইরানের কাছে পারমাণবিক কর্মসূচি কেবল শক্তি নয়। এটি তাদের আধুনিক জাতি হিসেবে পরিচয়ও বটে। 9 কোটি 20 লাখ মানুষের এই দেশটির ইতিহাস আড়াই হাজার বছরের পুরনো। এক সময় প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সাম্রাজ্যের সমান শক্তিশালী ছিল দেশটি। সাইরাস দ্য গ্রেট থেকে সাফাবিদ সাম্রাজ্য পর্যন্ত সবসময় নিজেকে শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে দেখে আসছে ইরান। 1979 সালে ইসলামিক বিপ্লবের পর থেকে ধর্মীয় নেতারা ইরান শাসন করলেও দেশটি এখনো জাতীয়তাবাদী প্রতীক ব্যবহার করে। ইরান তার বিপ্লবী পরিচয়ের পাশাপাশি প্রাক ইসলামিক ইতিহাসকেও গুরুত্ব দেয়।
[3:24]ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি মূলত শুরু হয়েছিল মার্কিন সহায়তায়। এটি চলছেও দীর্ঘদিন। তবে এ নিয়ে অন্য দেশগুলোর অতটা মাথা ব্যথা নেই যতটা যুক্তরাষ্ট্রের। তেলআবিব ভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের সিনিয়র গবেষক ডেনিস সিট্রিনোভিচ বলেন, তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এখন ইসলামী প্রজাতন্ত্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। বিশেষ করে যখন দেশটি চাপের মধ্যে তার বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত ক্ষমতা প্রদর্শন করাতে চায়। লন্ডনের চ্যাথাম হাউস থিং ট্যাংকের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা প্রোগ্রামের পরিচালক সানাম ওয়াকিল বলেন, ইরান পুরোপুরি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ থেকে সরে এলে কট্টরপন্থীরা একে আত্মসমর্পণ হিসাব দেখাবে। ইরানের শাসকরা পারমাণবিক কর্মসূচিতে কিন্তু আপস করাতে পারে। কিন্তু সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ করবে না।
[4:45]চ্যাথাম হাউসের বিশেষজ্ঞ সানাম ওয়াকিল বলেন, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণকে একটি কৌশলগত লালরেখা মনে করে তেহরান। তারা মনে করছে শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন ঝুঁকি বাড়ানোর পরিবর্তে আগের মতো সীমাবদ্ধতা মেনে নেবে। তাদের মনে রাখা উচিত দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের চেয়ে কঠোর চুক্তি পছন্দ করেন ট্রাম্প।
[5:07]অনেকেই মনে করেন পারমাণবিক বোমা বানানোর পথ সহজ করে দিচ্ছে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি। তবে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন কখনো পারমাণবিক বোমা বানাবে না তেহরান। পারমাণবিক বোমা না বানানোর প্রতিশ্রুতিতে ইরান অটল থাকলেও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধির মাধ্যমে কৌশলগত শক্তি যোগাচ্ছে তারা। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে যে কোনো সময় সহজেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে। প্রয়োজনীয় ক্ষমতা ও অবকাঠামো তাদের কাছে আছে। তেহরান মনে করে এটি তাদের প্রতিপক্ষের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার একটি বড় হাতিয়ার। 2015 সালে পারমাণবিক চুক্তি থেকে ট্রাম্প সরে আসার পর ইরান দেখিয়েছে তারা কিভাবে ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারে। দেশটি ধীরে ধীরে বেসামরিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে। আসলে এটা ওয়াশিংটনের প্রতি তেহরানের একটি স্পষ্ট বার্তা তা হলো 2015 সালের চুক্তিতে ঠিক করা সীমা আর প্রযোজ্য নয়। তবে এই কৌশল খুব একটা কাজে আসেনি। ইরান চুক্তির মাধ্যমে ওয়াশিংটনকে ফিরে আনার চেষ্টা না করায় 2025 সালের জুনে ইসরাইলি হামলা এবং ইরানি ভূখণ্ডে প্রথম সরাসরি মার্কিন সামরিক আক্রমণ ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্র যখন তাদের স্থাপনায় বোমা হামলা চালায় তখন ইরানের কাছে কোন সক্রিয় পারমাণবিক অস্ত্র ছিল না।



