[0:00]তেল আর পেট্রোলিয়াম আবিষ্কারের আগে মানুষ খুব অল্প কিছু শক্তির উৎসের উপর নির্ভর করতো। দিনের সূর্যের আলোতেই কাজ সারতো, কিন্তু সূর্য ডুবে গেলেই যেন জীবন থেমে যেত চারপাশ ডুবে যেত অন্ধকারে। রাতে আলো পাওয়ার জন্য মানুষ জ্বালাতো কাঠ, কয়লার লাল আগুন কিংবা পশুর চর্বি থেকে তৈরি তেল। এই ছিল আলো পাওয়ার সাধারণ উপায়, কিন্তু এগুলো ছিল বেশ ব্যয়বহুল আর খুব তাড়াতাড়ি নিভে যেত। সপ্তদশ শতাব্দী থেকে উনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিক পর্যন্ত ইউরোপ আর আমেরিকায় হোয়েল অয়েল মানে তিমির শরীরের তেল ছিল সবচেয়ে দামি আর গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি। মানুষ বিশাল সমুদ্র পাড়ি দিত তিমিদের ধাওয়া করে তাদের হত্যা করত আর তাদের শরীর থেকে তেল বের করে এনেই সেই তেলেই জ্বালাতো নিজেদের ঘরের বাতি। শহরের রাস্তা পর্যন্ত সেই তেলের আলোয় ঝলমল করে উঠতো, কিন্তু এই আলো পাওয়ার মূল্য ছিল ভয়ানক। প্রতি বছর হাজার হাজার তিমি মারা যেত যাতে ধনীদের বাড়ি ঝলমল করে কিন্তু গরিব মানুষ তবুও কাটাত অন্ধকারে। ধীরে ধীরে তিমির সংখ্যা এতটাই কমে গেল যে মানুষ বুঝে ফেলল এভাবে আলো যোগানো কোন দীর্ঘস্থায়ী সমাধান হতে পারে না। উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি এসে আলো পাওয়ার চাহিদা আরো বেড়ে গেল, কিন্তু তখন হোয়েল অয়েল পাওয়া খুব কঠিন হয়ে গেল এবং এর দামও আকাশ ছোঁয়া। তখন মানুষ ভাবতে শুরু করল এমন একটা নতুন শক্তির উৎস খুঁজে বের করতে হবে যেটা হবে সস্তা, টেকসই এবং সর্বত্র পাওয়া যায়। আর সেই খোঁজই মানুষকে পৌঁছে দিল ক্রুড অয়েল কাঁচা তেলের কাছে এবং শুরু হল পেট্রোলিয়ামের যুগ। একটা যুগ যা পৃথিবীর চেহারাই পাল্টে দিল। মজার বিষয় হলো তেল কিন্তু মানুষের কাছে একদম নতুন কিছু ছিল না, শুধু এর আসল শক্তিটা মানুষ তখনো বুঝে উঠতে পারেনি। হাজার হাজার বছর আগে মানুষ প্রাকৃতিক ডামার ব্যবহার করত বাড়ি বানানোর কাজে, দেওয়াল মজবুত করতে আর নৌকাগুলোকে পানির খোঁজে থেকে বাঁচাতে। পূর্ব এশিয়ার মানুষ তখন এই কাঁচা তেল ব্যবহার করত ঔষধ তৈরিতে, মসলা হিসেবে আর আগুন জ্বালানোর জন্যেও। আজারবাইজানের মতো জায়গায় মানুষ শত শত বছর ধরে মাটির উপরের স্তর থেকে হাত দিয়েই তেল তুলত, কিন্তু এগুলো ছিল খুব ছোট পরিসরের প্রচেষ্টা। আসল গল্প তখনো শুরু হয়নি। 1846 সালে কানাডার বিজ্ঞানী আব্রাহাম গেসনার ইতিহাস সৃষ্টি করলেন। তিনি প্রথমবার কেরোসিন উদ্ভাবন করলেন। এই কেরোসিন তৈরি হয়েছিল কয়লা আর তেল থেকে আর অল্প সময়ের মধ্যেই এটি হয়ে উঠলো সবচেয়ে সস্তা আর সহজে পাওয়া যায় এমন আলোর উৎস। এই আবিষ্কার মানুষের জীবনে এনে দিল এক বিশাল পরিবর্তন, কারণ এখন মানুষ সম্পূর্ণভাবে মুক্তি পেল হোয়েল অয়েলের উপর নির্ভরতা থেকে। নির্ভরতার সেই যুগ থেকে মানুষকে মুক্তি দিলেও আসল বিপ্লব এলো 1859 সালে যখন আমেরিকার পেনসিলভেনিয়া রাজ্যে বিশ্বের প্রথম সফল অয়েল ওয়েল খনন করা হয়। এর আগে মানুষ শুধুই সেই তেল ব্যবহার করত যেটা প্রাকৃতিকভাবে মাটির উপর বেরিয়ে আসতো, কিন্তু প্রথমবার মেশিনের সাহায্যে পৃথিবীর গভীর থেকে তেল তোলা সম্ভব হলো। এই ছোট কূপটাই হয়ে উঠলো আজকের মডার্ন অয়েল ইন্ডাস্ট্রির ভিত্তি। শুরুর দিকে এই তেল দিয়ে মূলত কেরোসিন তৈরি করা হত যা লন্ঠনের আলো জ্বালানোর কাজে রাখত। কিন্তু যখন পৃথিবীতে এলো ইলেকট্রিক বাল্ব তখন আলো পাওয়ার জন্য কেরোসিনের প্রয়োজন ধীরে ধীরে কমে গেল। তবুও ইতিহাস তখন নিলো এক নতুন মোড়, কারণ এক বিশাল বিপ্লব আসতে চলেছিল যা পুরো পৃথিবীটাই বদলে দেবে। ইঞ্জিন আর মোটর গাড়ির আবিষ্কারের পর তেলের দাম আর চাহিদা দুটোই আকাশ ছুঁয়ে ফেলল। তখন তেল শুধু আলোই দিচ্ছিল না, এটা হয়ে উঠলো মেশিন, গাড়ি, জাহাজ এমনকি এয়ারপ্লেন পর্যন্ত চালানোর প্রাণশক্তি। ড্রিলিং টেকনোলজির উন্নতির পর আমেরিকায় শুরু হলো এক নতুন উন্মাদনা, অয়েল রাশ, যেখানে সবাই তেলের খোঁজে পাগল হয়ে উঠলো। অল্প সময়ে শত শত অয়েল খনন হলো, নতুন শহর গড়ে উঠলো আর তেল হয়ে গেল সম্পদ আর শক্তির প্রতীক। এই অয়েল ম্যাডনেস খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়লো রাশিয়া, ভেনিজুয়েলা আর মিডিল ইস্ট পর্যন্ত যেখানে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় তেলের ভান্ডার লুকিয়েছিল মাটির নিচে। 20 শতকের শুরুতে তেল আর শুধু শক্তির উৎস ছিল না, বরং পুরো আধুনিক সভ্যতার লাইফ লাইনে পরিণত হলো। কিন্তু এর সঙ্গে ছড়িয়ে পড়লো এক বিশাল ভুল ধারণা যেটা আজও অনেকে সত্যি বলে বিশ্বাস করে বসে আছে। আজও অনেক মানুষ মনে করেন পেট্রোলিয়াম তৈরি হয় ডাইনোসরের শরীর থেকে, কিন্তু আসল কথা হলো এই ধারণা একদমই ভুল। বাস্তবে তেল তৈরি হয় অত্যন্ত ক্ষুদ্র সমুদ্রের প্রাণী যেমন শৈবাল আর প্ল্যাঙ্কটন থেকে। যখন এই অতি ক্ষুদ্র প্রাণীগুলো মারা যায় তাদের দেহ সমুদ্রের গভীরে গিয়ে মাটি আর কাঁদার স্তরের নিচে লাখ লাখ বছর ধরে চাপা পড়ে থাকে। লক্ষ লক্ষ বছরের তাপ আর চাপের ফলে এই জৈব পদার্থগুলো ধীরে ধীরে পরিণত হয় পেট্রোলিয়ামে। আর আশ্চর্যের বিষয় হলো এই প্রক্রিয়া ঘটেছিল ডাইনোসরদের জন্মের অনেক আগেই প্রায় 25 থেকে 36 কোটি বছর আগে। তবু প্রশ্ন থাকে এই ডাইনোসর থেকে তেল ধারণাটা মানুষের মাথায় এলো কিভাবে? আসলে 1930 এর দশকে আমেরিকার সিনক্লেয়ার অয়েল নামে একটি কোম্পানি তাদের অয়েল ড্রাম আর বিজ্ঞাপনে ডাইনোসরের ছবি ব্যবহার করতে শুরু করে। এভাবেই মানুষের মনে ধীরে ধীরে গেথে গেল এই ভুল ধারণা যে তেল মানেই ডাইনোসরের অবশিষ্টাংশ।
[5:07]তাদের বিজ্ঞাপনে যখন ডাইনোসরের ছবি ব্যবহার করা শুরু হলো তখন সেই ডাইনোসরের ইমেজ আর থিম এতটাই জনপ্রিয় হয়ে গেল যে 1932 সালে কোম্পানিটা সেটাকে নিজের অফিশিয়াল লোগো বানিয়ে ফেলল। বিজ্ঞাপন, প্যাকেজিং এমনকি বাচ্চাদের খেলনাতেও যখন সর্বত্র ডাইনোসরের ছবি দেখা যেতে লাগলো তখন সাধারণ মানুষের মনে বসে গেল একটাই ধারণা। সম্ভবত তেলের সঙ্গে ডাইনোসরের কোন গভীর সম্পর্ক আছে। তেলের ড্রাম, কোম্পানির লোগো, বিজ্ঞাপন আর খেলনার মধ্যে এই ডাইনোসরের ছবিগুলো ধীরে ধীরে মানুষের মনে একটা ভুল ধারণা গেথে দিল। আজও অনেকেই সেই ভুলকেই সত্যি বলে বিশ্বাস করে বসে আছে। কালো তেল মানে ব্ল্যাক গোল্ড, যার যত বেশি মজুদ সেই দেশ তত বেশি ধনী আর শক্তিশালী। তেলের চাহিদা আর দাম এতটাই বেশি যে পৃথিবীর নানা দেশে প্রতি মাসেই শত শত নতুন অয়েলকূপ খনন করা হয়। কিছু বড় বড় এনার্জি কোম্পানি তো এক সপ্তাহের মধ্যেই নতুন কূপ খনন করতে সক্ষম, কিন্তু এই কূপ থেকে তেল তোলা কিন্তু একেবারেই সহজ কাজ নয়। এর জন্য লাগে উন্নত টেকনোলজি, লাগে অনেক সময় আর বিপুল পরিমাণ টাকা। কাঁচা তেল বা ক্রুড অয়েল থাকে পৃথিবীর গভীরে প্রায় দেড় থেকে চার কিলোমিটার নিচে কোটি কোটি বছর পুরনো শক্ত শিলা স্তরে ফাঁকে ফাঁকে বন্দি হয়ে। এই তেল পর্যন্ত পৌঁছাতে যে ড্রিলিং মেশিনগুলো কাজ করে তাদের শক্তি অবিশ্বাস্য রকমের বেশি। তারা মাটির গভীরে ছিদ্র করতে করতে নিচে নেমে যায়, পাথর ভেঙে নিজেদের পথ তৈরি করে নেয়। এই কাজ সত্যিই ভয়ংকর বিপদজনক, এত গভীরে তাপমাত্রা আর চাপ থাকে ভয়ানক মাত্রায় তাই সামান্য একটা ভুলও মারাত্মক বিস্ফোরণের কারণ হয়ে উঠতে পারে। তেল উত্তোলনে নিয়োজিত কর্মীরা প্রতিটা মুহূর্তে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন। একটা ছোট ভুলই পুরো টিমের জন্য হয়ে উঠতে পারে বিপদজনক, আর যখন অবশেষে তেল পাওয়া যায় তখন শুরু হয় আসল যুদ্ধ, পরিশ্রম আর নিয়ন্ত্রণের যুদ্ধ। শুরুতে যখন চাপ বেশি থাকে তখন কাঁচা তেল নিজের চাপেই ফেটে উঠে আসে মাটির উপরে। কিন্তু যখন সেই ন্যাচারাল প্রেসার কমে যায় তখন ব্যবহার করা হয় এক বিশাল পাম্পিং মেশিন। বাইরে থেকে দেখতে এটা হয়তো একটা দোল খাওয়া লোহার মেশিনের মতো লাগে, কিন্তু এর আসল শক্তি মাটির শত শত মিটার নিচে পৌঁছে যায়। এ মেশিন ধীরে ধীরে পৃথিবীর গভীর থেকে ক্রুড অয়েল টেনে উপরে তুলে আনে। যখন তেল উপরে উঠে আসে তখন সেটাকে পাইপলাইন আর বিশাল ট্যাঙ্কার দিয়ে পাঠানো হয় রিফাইনারিতে। মানে সেই জায়গায় যেখানে কাঁচা তেলকে প্রক্রিয়াজাত করা হয়, সে জায়গাটাই আসলে গল্পটাকে নিয়ে যায় একদম রোমাঞ্চকর মোড়ে। অনেকে মনে করেন বিশ্বের সবচেয়ে বড় রিফাইনারি নিশ্চয়ই কোন গাল্ফ দেশে হবে, কিন্তু আসল সত্য হলো একদম উল্টো। বিশ্বের সবচেয়ে বড় অয়েল রিফাইনারি আছে ভারতের গুজরাটের জামনগরে।
[8:15]এই অসাধারণ স্থানের নাম হলো রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রির জামনগর রিফাইনারি। এক কথায় বললে এখানে প্রতিদিন প্রায় 1.2 মিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি কাঁচা তেল প্রসেস করা হয়। 7500 একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত এই এলাকাটা এতটাই বিশাল এখানে থাকা বিল্ডিং, পাইপলাইন আর বিশাল ট্যাংগুলো দেখে মনে হয়, এ যেন একটা ছোট শহর দাঁড়িয়ে আছে। এই রিফাইনারি থেকে তৈরি পেট্রোল, ডিজেল, কেরোসিন আর ডামার বিশ্বের 100 রও বেশি দেশে রপ্তানি করা হয়। এখন চলুন দেখি কাঁচা তেলকে রিফাইন করার পর কিভাবে আমরা পাই আলাদা আলাদা পেট্রোলিয়াম প্রোডাক্ট। মাটির নিচ থেকে উঠে আসা কাঁচা তেল ঘন কালো আর তীব্র গন্ধযুক্ত হয়, এ অবস্থায় এটা সরাসরি ব্যবহার করা যায় না। রিফাইনিং প্রক্রিয়ায় তেলের ভেতরের আলাদা আলাদা উপাদানগুলোকে একটা আরেকটা থেকে পৃথক করা হয়। যেখান থেকে তৈরি হয় পেট্রোল, ডিজেল আর কেরোসিন, এগুলো আজকের জীবনে একেবারেই অপরিহার্য। এই দামি জ্বালানিগুলোর কারণেই কাঁচা তেলকে বলা হয় ব্ল্যাক গোল্ড। কাঁচা তেলের ভেতর থাকে নানা আকার ও ওজনের হাইড্রোকার্বন তাই এগুলোকে আলাদা করা খুব জরুরি। এই পার্থক্য অনুযায়ী তাদের আলাদা করার যে প্রক্রিয়া তাকে বলা হয় ফ্র্যাকশনাল ডিস্টিলেশন। অবশেষে কাঁচা তেল ঢোকানো হয় একটা উঁচু টাওয়ারের মত ট্যাংকে যেটাকে বলা হয় ফ্র্যাকশনাল ডিস্টিলেশন কলাম। এ টাওয়ারের ভেতর তেলকে গরম করা হয় প্রায় 350 থেকে 400 ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত। তখন তেলের বিভিন্ন উপাদান বিভিন্ন মাত্রায় বাষ্পে পরিণত হয়ে উপরে উঠতে থাকে এবং বিভিন্ন স্তরে গিয়ে ঠান্ডা হয়ে জমে যায়। যখন সেই বাষ্প টাওয়ারের ভেতর উপরে ওঠে তখন তা বিভিন্ন মাত্রায় ঠান্ডা হয়ে আলাদা আলাদা স্তরে ঘনিভূত হয়ে জমা হয়। এই মুহূর্তটা আসলে সবচেয়ে জাদুকরী যখন দেখতে সাধারণ একটা কালো তরল যেটা বাইরে থেকে তেমন মূল্যবান মনে হয় না। রূপ নেয় আমাদের জীবনের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় জ্বালানিতে। এখন একটু ভাবুন কনডেন্সেশন বা ঘনিভবনে আসলে কি ঘটে। চলুন একটা সহজ উদাহরণ দেওয়া যাক, ধরুন এক গ্লাস পানিতে লবণ মেশানো হয়েছে শুধু দেখে বোঝা প্রায় অসম্ভব। যখন লবণ আর পানি একসাথে মিশে থাকে তখন প্রথম দেখায় বোঝা যায় না, কিভাবে দুটোকে আলাদা করা যায়। কিন্তু যতক্ষণই পানিটা গরম করা হয় সবকিছু বদলে যায় আর পার্থক্যটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পানির বয়লিং পয়েন্ট হলো প্রায় 100 ডিগ্রি সেলসিয়াস কিন্তু লবণের জন্য এই তাপমাত্রা তার চেয়ে অনেক বেশি। তাই যখন পানি গরম হয় তখন সেটি ভাঁপ হয়ে উপরে উঠে যায় আর লবণ নিচে রয়ে যায়। যখন এই ভাঁপ কোন ঠান্ডা সারফেসের সাথে ধাক্কা খায় তখন সেটি ছোট ছোট পানির ফোঁটায় পরিণত হয়ে আলাদা পাত্রে জমা হয়। ফলাফল কি? একদিকে থেকে যায় লবণ আর অন্যদিকে আমরা পাই একদম বিশুদ্ধ পানি। এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় সংঘনন বা কনডেন্সেশন যেখানে ভাঁপ ঠান্ডা হয়ে আবার তরলে পরিণত হয়। ঠিক একইভাবে ক্রুড অয়েলকেও ভাগ করা হয়, ভারী উপাদানগুলো নিচে জমে হালকা উপাদানগুলো উপরে উঠে আসে। এভাবেই তৈরি হয় আমাদের দৈনন্দিন জীবনের চালিকাশক্তি ফুয়েল বা জ্বালানি। এই বিশাল টাওয়ারের ভেতরে যাত্রা শুরু হয় একদম উপরের দিক থেকে, সবচেয়ে উপরে জমে এলপিজি মানে সেই গ্যাস যা আমরা রান্নাঘরে ব্যবহার করি। তার নিচেই জমে পেট্রোল যেটা দিয়ে আমাদের গাড়ি আর বাইক চলে। এর পরের স্তরে থাকে নেফথা যা প্লাস্টিক, কেমিক্যাল আর মেডিসিন তৈরির মূল কাঁচামাল। এর নিচে থাকে কেরোসিন আর এটিএফ মানে এয়ারক্রাফট টারবাইন ফুয়েল, বিমান জ্বালানি। তারও নিচে থাকে ডিজেল যা ট্রাক, বাস আর ট্রেন চালাতে ব্যবহৃত হয়। আরো নিচে পাওয়া যায় লুব্রিকেটিং অয়েল যা ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশকে মসরিন রাখে। তারপর আসে ফুয়েল অয়েল যা বড় বড় ফ্যাক্টরি আর শিপে পুড়িয়ে ব্যবহার করা হয়। সবচেয়ে নিচে জমে অ্যাসফল্ট বা বিটুমিন যা দিয়ে তৈরি হয় সড়কের কালো স্তর, কিন্তু এখানে শেষ নয়। রিফাইনিং প্রক্রিয়ায় আরো কিছু বাই প্রোডাক্ট তৈরি হয় যেমন সালফার আর হাইড্রোজেন। আর হ্যাঁ, যে পেট্রোলিয়াম জেলি আমরা স্কিন কেয়ারে বা ল্যাম্পে দেখি সেটাও কিন্তু কাঁচা তেল থেকেই তৈরি। এক ব্যারেল প্রায় 159 লিটার ক্রুড অয়েল রিফাইন করলে তৈরি হয় নানা রকমের পেট্রোলিয়াম প্রোডাক্ট। আনুমানিকভাবে এক ব্যারেল তেল থেকে পাওয়া যায় প্রায় 72 লিটার পেট্রোল, 34 লিটার ডিজেল, 14 লিটার কেরোসিন আর বাকি অংশ রূপ নেয় লুব্রিকেন্ট, প্লাস্টিক আর বিভিন্ন কেমিক্যালে। রিফাইনিং শেষ হওয়ার পর পেট্রোল পৌঁছে যায় বিশাল আন্ডারগ্রাউন্ড পাইপলাইন দিয়ে টার্মিনালে। তারপর সেখানে তা ভরে ফেলা হয় ট্রাক বা ট্রঙ্কারে এবং সেখান থেকে শুরু হয় তার নতুন যাত্রা। এরপর সেই পেট্রোল পৌঁছে দেওয়া হয় আপনার কাছের পেট্রোল পাম্পে। রিফাইনারি থেকে বিশাল বিশাল ট্যাঙ্কারে ভরে সে পেট্রোল পাঠানো হয় বিভিন্ন দেশের পাম্পে। কিন্তু শুনে যেমন সহজ লাগে ট্যাঙ্কারে পেট্রোল ভরাটা কিন্তু মোটেই ততটা সহজ নয়। কারণ এখানে যদি সামান্য একটা স্পার্কিং পড়ে যায় তাহলে মুহূর্তের মধ্যেই ঘটতে পারে ভয়াবহ বিস্ফোরণ। এ কারণেই সেফটির জন্য প্রতিটি পেট্রোল ট্যাঙ্কারে প্রথমেই গ্রাউন্ডিং কেবল দিয়ে যুক্ত করা হয় যাতে গাড়ির মধ্যে জমে থাকা স্ট্যাটিক ইলেকট্রিসিটি পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে যায়। এরপর বিশেষ ধরনের সেন্সর আর পাইপ সিস্টেমের সাহায্যে পেট্রোলের ভেপার বা বাষ্পগুলোকে আবার সংগ্রহ করা হয়। যাতে সেগুলো বাতাসে মিশে কোনভাবে আগুন বা বিস্ফোরণের কারণ না হয়। এই সমস্ত নিরাপত্তা প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর প্রতিদিন লাখ লাখ লিটার পেট্রোল সম্পূর্ণ নিরাপদে পৌঁছে দেওয়া হয় দেশের বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে। এই ছিল বিশ্বের বিষয়ের আজকের এই ভিডিওতে আশা করছি ভিডিওটি আপনাদের সকলের কাছে অনেক ভালো লেগেছে। ভিডিওটি কেমন লেগেছে তা জানিয়ে কমেন্ট করুন, ভিডিওটি ভালো লাগলে লাইক এবং শেয়ার করুন, এরকম আরো ভিডিও পেতে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন। ধন্যবাদ।



