[0:00]সৎসঙ্গ জীবনধারা চ্যানেলের আজকেরের নিবেদন করুণাময় দয়াল ঠাকুর। কিভাবে একটা ভেসে যাওয়া পরিবার নতুন করে সবকিছু ফিরে পেলো তা শুনলে চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে যাবে। 1993 সালের এক ঘটনা কাহিনীকার অনদিনাথ ভট্টাচার্য আলোচনা পত্রিকা 4 ঠা এপ্রিল 2016। 1993 সালে শীতের সকালে বারেন্ডায় বসে পত্রিকা পড়ছি। হঠাৎ এক মহিলা তার এক পুত্র কন্যাকে নিয়ে সাহায্যপ্রার্থী হয়ে বাড়িতে ঢুকলেন। মহিলা রুক্ষ কেশ, জীর্ণ বেশ, মুখে আতঙ্ক ও হতাশার ছাপ স্পষ্ট। ছেলে মেয়েদের বয়স 10 12। দেখে খুব করুণা হল। মা ছেলে মেয়েদের চেহারা দেখলে সহজেই বোঝা যায় সম্ভ্রান্ত ঘরের সদস্য পেশাদার ভিখারী নয়। নেহাত নিরুপায় হয়ে জীবন রক্ষার তাগিদে ছেলেমেয়েদের নিয়ে ঘরে ঘরে ঘুরে বেড়াচ্ছে সাহায্যের আশায়। তিন দিন ধরে খাওয়া দাওয়া হয়নি তাদের। তার নাম সুজাতা চক্রবর্তী। স্বামীর নাম রাহুল চক্রবর্তী। বাড়ি বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। আমি বললাম পরে কথা হবে বাথরুমে গিয়ে ছেলেমেয়েদের নিয়ে ভালো করে স্নান করো। রান্নার সরঞ্জাম দিচ্ছি স্নান করে খাওয়া দাওয়া করো। আমার স্ত্রী বিয়োগ হয়েছে 1988 সালে। তিন ছেলেকে নিয়ে আমার সংসার তৃতীয় ছেলে খুব ছোট তাই ওর বাল্য ও শৈশব কেটেছে মামার বাড়িতে। প্রথম ও দ্বিতীয় ছেলে ও আমি যখন যার সুবিধা হতো সে তখন রান্না করতো। এই কাজে আমিও ওরা মোটামুটি অভ্যস্ত হয়ে গেছি। সুজাতার স্নানের পর ওদের টিফিন দেওয়া হলো। ছেলেমেয়েদের সহায়তায় সুজাতা রান্নাবান্না করে খাওয়া-দাওয়া করলো। সে প্রথমে খেতে চাইছিল না। কারণ ও স্বামী রাহুল অভুক্ত। আমি পীড়াপীড়ি করে রাজি করালাম আর বললাম তুমি খেয়ে নিয়ে ওকে পাঠিয়ে দেবে। তিন দিন অনাহারের পর অপ্রত্যাশিতভাবে আহার জুটবে এ তারা ভাবতেই পারেনি। খুব খুশি হয়েছে ওরা ওদের খুশিতে আমরাও আনন্দ ও খুশি পেলাম। সুজাতাকে বললাম তাড়াতাড়ি গিয়ে রাহুলকে পাঠিয়ে দিতে কিছু সময় পর রাহুল এল। রাহুলের চান খাওয়া দাওয়া হলো খাওয়া দাওয়ার পর বিস্তারিত বিবরণ জানতে পারলাম। ওদের বাড়ি বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে জন্ম লেখাপড়া বিয়ে শাদী রুজি রোজগার স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় প্রাণ বাঁচাতে রাতের অন্ধকারে বর্ডার পার হয়ে আগরতলায় এসে পৌঁছেছে। বাজারের কাছে একটা ছাড়া বাড়িতে আছে যাক আমি অভয় দিয়ে বললাম তুমি কাল আটটার সময় আবার এসো দেখা যাক কি করা যায়। জায়গাটা আগরতলা শহরের কেন্দ্রবিন্দু থেকে ছয় কিমি উত্তরে। জায়গাটার নাম হলো ইন্দ্রনগর। চারপাশে গুরু ভাই অনেক আছে ওই দিন সব গুরু ভাইদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে স্থির হলো। রাহুল যদি রাজি হয় জিবি বাজারে একটা চা পান বিড়ি সিগারেটের দোকান দেওয়া যায়। দোকান হবে ঠেলা বা টেবিলের উপর পরের দিন রাহুল এলো। আমাদের প্রস্তাব আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করলো। সব গুরু ভাইদের সহযোগিতায় বিনা ভাড়ায় একটা ঘরের ব্যবস্থা হয়ে গেল।
[3:28]আস্তে আস্তে তার যোগ্যতার প্রকাশ হতে লাগলো যেমন সাইনবোর্ড লেখার কাজ এবং ওই জাতীয় কাজ ধীরে ধীরে জুটতে লাগলো। সুজাতা প্রায়ই আমাদের বাড়িতে আসতো ছেলেরা যাজন করত একদিন বললাম সুজাতা আমাদের ক্ষমতা খুবই সীমিত। যা কিছু হয়েছে সব প্রভুর দয়াত হয়েছে ভগবানকে ভুলে থাকা যত দুঃখের কারণ। দয়াল ঠাকুর পরমেশ্বর দুঃখ যন্ত্রণাক্লিষ্ট মানুষের মুক্তির উপায় প্রভুর দীক্ষায় দীক্ষিত হওয়া। সুজাতা ও রাহুল গুরু ভাইদের আচরণে প্রথম থেকেই অভিভূত। চেনা জানা কিছু নেই কিন্তু সব গুরু ভাইরা ওদের জন্য এভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছে সে কল্পনার অতীত। ওরা রাজি হয়ে একদিন আগরতলা মন্দিরে গিয়ে দীক্ষা নিয়ে এলো। দেখতে দেখতে আস্তে আস্তে দুর্দশার কালো মেঘ সরে গেল রাহুল স্থানীয় মন্দিরে পূজার কাজ পেয়েছে। তাছাড়া হাতের কাজ তো আছেই সুজাতা একটা নার্সিং হোমে কাজ পেয়েছে। আসল ঘটনাটা শুনলে সবাই চমকে যাবেন মাঝে মধ্যে সুজাতা আমাদের বাড়িতে আসতো। একদিন সুজাতা এক অপূর্ব ঘটনার কথা বলল আগরতলা আসার পর অচেনা অজানা পরিবেশে এইভাবে অনাহারে অভাবে দিশেহারা হয়ে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়ে হাতে দড়ি নিয়ে অজানার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল সে। এইভাবে বাঁচা সম্ভব নয় চোখের সামনে স্বামী পুত্র কন্যা অভুক্ত নিজেও অভুক্ত বাঁচার সব রাস্তা বন্ধ। তার উপর অচেনা অজানা পরিবেশে প্রতি মুহূর্তে ভয় ও আতঙ্ক মৃত্যু ছাড়া আর কোন পথ নেই তার কাছে। তাই স্থির সিদ্ধান্ত আত্মহত্যা মনের মধ্য সিদ্ধান্তের পক্ষে বিপক্ষে অনেক যুক্তির তুফান উঠেছে তার। স্বামী ছেলেমেয়ের কথা মনে এলে ভীষণ কষ্ট হয়। তথাপি সিদ্ধান্তে অটল হয়ে নির্জন জায়গার খোঁজে চলল সে ধীরে ধীরে। কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পরে হঠাৎ দেখতে পেল বিপরীত দিক থেকে মাঝ বয়সী দিব্য কান্তি এক পুরুষ তার দিকে আসছেন। কাঁচা পাকা চুল উজ্জ্বল গৌর বর্ণ খালি গায়ে শ্বেত শুভ্র উপবিত শোভা পাচ্ছে। পরিধানে ধুতি হাঁটার মধ্য এক অপূর্ব ছন্দ উদাস দৃষ্টি সুজাতার সম্মুখে এসে দাঁড়ালেন। সুজাতা বলল বহু মানুষ দেখেছি কিন্তু এমন অপূর্ব সুন্দর মানুষ দেখি নাই। মানুষ এমন সুন্দর হতে পারে না ওনার দর্শনের সাথে সাথে আমার মনের ছন্দ হতাশা দুঃখ নিমিষে দূর হয়ে গেল। এক স্বর্গীয় আনন্দে মন প্রাণ ভরে গেল। আমার দিকে চেয়ে গম্ভীর কন্ঠে বললেন, মা আত্মহত্যা মহাপাপ। তোর দুই অবুঝ সন্তান তোকে না পেয়ে কান্নাকাটি করছে। তোর স্বামীর কথা চিন্তা কর এই বিপদের সময় তুই যদি আত্মহত্যা করিস তবে ওর অবস্থা কি হবে। ধৈর্য ধর মা সমস্যা সমাধানের চিন্তা কর আত্মহত্যা সমাধান নয় আমি হাউ হাউ করে কেঁদে উনাকে প্রণাম করলাম। কতক্ষণ এই অবস্থায় ছিলাম বলতে পারি না। প্রণাম করে উঠে দেখি উনি আর নেই। আমি বিস্ময়ে অবাক মুহূর্তের মধ্যে কি হয়ে গেল। কে এই অন্তর্যামী পুরুষ নিজের প্রতি নিজের ধিক্কার আসলো ছি অসহায় স্বামী ও সন্তানদের ছেড়ে আমি কেন এই হটকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। পাগলের মত দৌড়ে গিয়ে নিজের আস্তনায় ঢুকলাম গিয়ে দেখি ছেলে মেয়ে মা মা করে কাঁদছে। স্বামী আমার খুঁজে বেরিয়েছে কিছুদিন পর যখন দীক্ষার আসনে বসলাম তখন দীক্ষার আসনে যে দয়াল ঠাকুরের ছবি ছিল সে সেই দিনের দেখা ওই মহামানবের চেহারার সঙ্গে অবিকল মিলে গেল। বুঝতে আর বাকি রইলো না যার দীক্ষা নিতে যাচ্ছি তিনিই সেদিন এই হতভাগীকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। তিনি মানুষ নন তিনি পরমেশ্বর তিনি পুরুষোত্তম সবাই ভালো থাকুন সুস্থ থাকুন সবাইকে আমার রাম আনন্দিত জয়গুরু।



