Thumbnail for বাজেট কী, সহজে কীভাবে বাজেট বুঝব | অর্থনীতি-অনর্থনীতি | What Is Budget? | Prothom Alo by Prothom Alo

বাজেট কী, সহজে কীভাবে বাজেট বুঝব | অর্থনীতি-অনর্থনীতি | What Is Budget? | Prothom Alo

Prothom Alo

17m 13s2,119 words~11 min read
AI audio transcription
Transcript source

AI audio transcription

This transcript was generated from the video's audio because no usable YouTube caption track was available. The transcript below is server-rendered so it can be read, searched, cited, and shared without opening the original YouTube player.

Timestamped outline
[0:00]Section 1

আমরা প্রতিমাসে আয় করি, খরচ করি, কখনো সঞ্চয় করি। আবার কখনো কখনো ধারও করতে হয়। সংসার চালাতে মাসের শুরুতে পরিকল্পনা করি, বাড়ি ভাড়া, বাজ...

[1:28]Section 2

বাজেট কথাটা এসেছে ফরাসি শব্দ বুজেট থেকে। এর অর্থ চামড়ার তৈরি টাকার থলে। এই বাজেটও আমাদের উপহার দিয়েছিল ব্রিটিশেরাই। ১৭৩৩ সালে দেশটির রা...

[3:22]Section 3

পরে রাজা বাধ্য হয়ে মেঘনাকাটা সই করেন। মেঘনাকাটার ১২ নম্বর ধারায় বলা আছে রাজা রাজ্যের প্রতিনিধিদের পরামর্শ ও সম্মতি ছাড়া কোনো কর আরোপ ক...

[5:17]Section 4

ধরুন আপনি একটি সাবান কিনলেন সেখানে ভ্যাট কাটা হলো। আপনি মোবাইলে রিচার্জ করলেন সেখানেও কর কাটা হলো। রেস্টুরেন্টে খেতে গেলেন তাতেও ভ্যাট দি...

[14:10]Section 5

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে আপনার খরের টাকায় যে সরকারি ব্যয় হচ্ছে তার বিনিময়ে আপনি কতটা সেবা পাচ্ছেন? বেতন ভাতার বরাদ্দ বাড়ল...

Pull quotes
[3:22]সরকারের তো নিজের আয় নেই। আসলে সরকারকে এই অর্থ আমরা দেই আমাদের পকেট থেকে। আমরা কেন দেই?
[5:17]প্রথমেই দেখতে হবে সরকার কোথায় অর্থ ব্যয় করছে। যদি বাজেটের বড় অংশ বেতন ভাতা ও ঋণের সুদ পরিশোধে চলে যায় তাহলে বুঝতে হবে পরিচালন ব্যয় অনেক বেশি উন্নয়ন ও জনসেবার জন্য সুযোগ কম।
[14:10]এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে আপনার খরের টাকায় যে সরকারি ব্যয় হচ্ছে তার বিনিময়ে আপনি কতটা সেবা পাচ্ছেন?
[14:10]বেতন ভাতার বরাদ্দ বাড়লে সেটি প্রশাসনিক দক্ষতা সেবার মান বা জবাবদিহি বাড়াতে কতটা ভূমিকা রাখবে?
Use this transcript
Related transcript hubs

[0:00]আমরা প্রতিমাসে আয় করি, খরচ করি, কখনো সঞ্চয় করি। আবার কখনো কখনো ধারও করতে হয়। সংসার চালাতে মাসের শুরুতে পরিকল্পনা করি, বাড়ি ভাড়া, বাজার, বিদ্যুৎ বিল, সন্তানের স্কুল, চিকিৎসা, একটু ঘুরতে যাওয়া আর কিছু টাকা ভবিষ্যতের জন্য রেখে দেওয়া। কিন্তু মাস শেষে এসে দেখা যায় হিসাব ঠিক মিলছে না। বাংলাদেশ সরকারও ঠিক একই কাজ করে। পার্থক্য শুধু একটাই আমার আপনার সংসারে চার-পাঁচজন মানুষ আর সরকারের সংসারে প্রায় ১৮ কোটি মানুষ। এই বিশাল সংসার চালানোর বার্ষিক পরিকল্পনার নামই জাতীয় বাজেট। বাজেট কথাটা শুনলেই অনেকে ভয় পান। মনে হয় এটি কেবল অর্থমন্ত্রী, আমলা আর অর্থনীতিবিদদের বিষয়। কিন্তু বাস্তবে বাজেট সকালের নাস্তা থেকে রাতের ওষুধ পর্যন্ত সবকিছুর সঙ্গেই জড়িত। আপনি যে মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন, ইন্টারনেট চালান, লুকিয়ে সিগারেট খান, গাড়ি চড়েন, চাল ডাল কিনেন সবকিছুর পেছনেই আছে বাজেট। বাজেট কেবল সংখ্যার খেলা নয়, এটি মানুষের জীবনযাত্রারই গল্প। প্রাইম ব্যাংক অর্থনীতি অনর্থনীতিকে আজকের বিষয় বাজেট কী সহজে কীভাবে বাজেট বুঝব।

[1:28]বাজেট কথাটা এসেছে ফরাসি শব্দ বুজেট থেকে। এর অর্থ চামড়ার তৈরি টাকার থলে। এই বাজেটও আমাদের উপহার দিয়েছিল ব্রিটিশেরাই। ১৭৩৩ সালে দেশটির রাজা ছিলেন দ্বিতীয় জর্জ। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী ছিলেন রবার্ট ওয়ালপুল। তখন আবগারী শুল্ক বস্তুকে কেবল মদ ও তামাকের উপরে। এ শুল্ক বাড়াতে বা কমাতে যত দাবি প্রস্তাব তিনি পেতেন সবকিছু একটা ব্যাগে রেখে দিতেন। পরে সেই ব্যাগ থেকে কাগজপত্র বের করে পার্লামেন্টের বার্ষিক প্রস্তাব উপস্থাপন করেছিলেন। এই হচ্ছে বাজেটের শুরু। স্বাধীনতার পরে দেশের প্রথম অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ প্রথম বাজেট বক্তৃতার শুরুতেই বলেছিলেন। বেতার ও টেলিভিশনের মাধ্যমে এই বাজেট প্রচার না করে নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের সামনে উপস্থাপন করতে পারলে আমি সুখী হতাম। তবে আমি আশা করি যে এরপর আর কোনদিন এইভাবে আমাদের বাজেট প্রচার করতে হবে না। প্রশ্ন হচ্ছে নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের সামনে বাজেট উপস্থাপন এতটা গুরুত্বপূর্ণ কেন? রাষ্ট্র জনগণের কাছ থেকে কর আদায় করবে সেটা ঠিক আছে। কিন্তু এই কর আরোপের ক্ষমতা কারো একক ইচ্ছার উপরে নির্ভর করবে না। তা হতে হবে জনগণের প্রতিনিধিদের সম্মতির ভিত্তিতে। আধুনিক গণতান্ত্রিক বাজেট ব্যবস্থার এই যে মৌলিক ধারণা তার শিকড় ১২১৫ সালের মেঘনাকারটাতে। ল্যাটিন ভাষায় মেঘনাকারটার অর্থ মহাসনদ বা গ্রেট চার্টার। এ মেঘনাকারটা ছিল ইংল্যান্ডের রাজা জনের ক্ষমতা সীমিত করার একটি ঐতিহাসিক চুক্তি। তখন রাজা জন কর বাড়িয়ে ব্যারন বা অভিজাত ভূস্বামীদের উপরে চাপ দিচ্ছিলেন ও নিজের ইচ্ছামতো শাসন করছিলেন। এতে ক্ষুব্ধ ব্যারনরা বিদ্রোহ করেন।

[3:22]পরে রাজা বাধ্য হয়ে মেঘনাকাটা সই করেন। মেঘনাকাটার ১২ নম্বর ধারায় বলা আছে রাজা রাজ্যের প্রতিনিধিদের পরামর্শ ও সম্মতি ছাড়া কোনো কর আরোপ করতে পারবেন না। এই ধারণাটাই পরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতিতে রূপ নেয়। অর্থাৎ নো ট্যাক্সেশন উইদাউট রিপ্রেজেন্টেশন এর বাংলা অর্থ হচ্ছে প্রতিনিধিত্ব ছাড়া কর নয়। অর্থাৎ যে জনগণ কর দেবে তাদের প্রতিনিধিদের সম্মতি ছাড়া সেই কর আরোপ করা যাবে না। আমরা এটা অনুসরণ করি। বাংলাদেশের সংবিধানের ৮৩ অনুচ্ছেদে বলা আছে সংসদের কোনো আইনের দ্বারা বা কর্তৃত্ব ব্যতীত কোনো কর আরোপ বা সংগ্রহ করা যাইবে না। আবার সংবিধানের ৮৭ অনুচ্ছেদে বলা আছে প্রতি অর্থবছরে সরকারকে সংসদের সামনে সম্ভাব্য আয় ও ব্যয়ের বিবরণী উপস্থাপন করতে হবে। একেই বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি বলা হয়। এরপর সংসদে আলোচনা, অনুদান দাবি, বরাদ্দ অনুমোদন এবং অর্থ বিল পাশের মাধ্যমে সরকার কর আদায় ও অর্থ ব্যয়ের অনুমতি পায়। এটাই বাজেট। আগামী ১১ জুন অর্থমন্ত্রী যে বাজেটটি দেবেন তার আকার হবে সোয়া ৯ লাখ কোটি টাকারও বেশি। এই টাকা আসবে কোথা থেকে? সরকারের তো নিজের আয় নেই। আসলে সরকারকে এই অর্থ আমরা দেই আমাদের পকেট থেকে। আমরা কেন দেই? কারণ আমরা চাই সরকার এই অর্থ দিয়ে এমন ব্যবস্থা করবে যাতে আমরা আরও ভালোভাবে জীবনযাপন করতে পারি। আমাদের ভালো বাসা থাকে, আমাদের সন্তানেরা ভালো শিক্ষা পায়, শিক্ষা শেষে ভালো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয় আর আমরা যেন ভালো চিকিৎসা পাই। অর্থাৎ অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসা এই মৌলিক চাহিদার কথা সংবিধানেই লেখা আছে। এই যে অর্থ দেই এর নাম ট্যাক্স বা কর।

[5:17]ধরুন আপনি একটি সাবান কিনলেন সেখানে ভ্যাট কাটা হলো। আপনি মোবাইলে রিচার্জ করলেন সেখানেও কর কাটা হলো। রেস্টুরেন্টে খেতে গেলেন তাতেও ভ্যাট দিলেন। চাকরি করলে আয়করও দিতে হয়। অর্থাৎ আপনি বুঝুন আর নাই বুঝুন প্রায় প্রতিদিনই সরকারকে টাকা দিচ্ছেন। এই কর মোটামুটি দুই ধরনের। প্রথমটি প্রত্যক্ষ কর বা ডাইরেক্ট ট্যাক্স যেমন আয়কর। এখানে যে বেশি আয় করে তার বেশি কর দেওয়ার কথা যদিও তা আসলে হয় না। দ্বিতীয়টি পরোক্ষ কর বা ইনডাইরেক্ট ট্যাক্স। এখানে আপনি সরাসরি সরকারকে টাকা দিচ্ছেন না কিন্তু কোন পণ্য বা সেবা কেনার সময় তার মধ্যেই কর যোগ করা থাকে যেমন ভ্যাট। সরকার এ টাকা দিয়ে কী করে? সরকার দুইভাবে এই অর্থ ব্যয় করে। একটি হচ্ছে রাজস্ব ব্যয় যা সরকার পরিচালনার খরচ। এখে অনুন্নয়ন বাজেটও বলা হয়। এই ব্যয়ে মোটাদাগে তিনটি যেমন দেশ রক্ষা, আইন শৃঙ্খলা রক্ষা ও প্রশাসন চালানোর খরচ। আবার ধরুন একটি পরিবার সিদ্ধান্ত নিল যে তাদের সন্তানকে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াবে। এতে খরচ বাড়বে ঠিকই কিন্তু ভবিষ্যতে সন্তানের আয় বাড়ার সম্ভাবনাও তৈরি হবে। সরকারও একইভাবে কিছু খরচ করে ভবিষ্যতের অর্থনীতি বড় করতে চায় বলে এটাই হচ্ছে উন্নয়ন বাজেট। এজন্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি নামে একটি প্রকল্প খাত রয়েছে। এই খাতে সাধারণত উন্নয়ন বাজেটের খরচ দেখানো হয়। রাস্তা বা সেতু নির্মাণ থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি, স্কুল কলেজ, হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা সহ নানা ধরনের উন্নয়নমূলক কাজ করে সরকার। সমস্যা হলো আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশে সরকারে আয় যত খরচ তার চেয়ে বেশি। একেই বলা হয় বাজেট ঘাটতি। এখানে সরকার আর আপনার মধ্যে একটা বড় পার্থক্য আছে। আপনি আগে আয় করেন তারপর খরচ করেন। সরকার আগে খরচ করে তারপর আয়ের ব্যবস্থা করে। ধরুন সরকার বছরে ১০০ টাকা আয় করলেও খরচ করতে চায় ১৩০ টাকা। বাকি ৩০ টাকা কোথা থেকে আসবে? সহজ উত্তর ঋণ। সরকার মূলত দুইভাবে ঋণ নেয়। এর মধ্যে বৈদেশিক উৎস হচ্ছে সরকার বিভিন্ন দাতা সংস্থা ও দেশ থেকে সহজ শর্তে ঋণ নেয়। এই উৎস থেকে বেশি ঋণ নিতে পারলে অত অর্থনীতির জন্য বেশি সহনীয়। কারণ এদের সুধার কম এবং পরিশোধ করতে অনেক সময় পাওয়া যায় তবে শর্ত থাকে বেশি। আর এখন পাওয়া যাচ্ছে কম। তাই দেশের ভিতর থেকেই বেশি ঋণ নিতে হয়। সরকার দুইভাবে দেশের ভেতর থেকে ঋণ নেয় যেমন ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও ব্যাংক বহির্ভূত ব্যবস্থা। ব্যাংক ব্যবস্থার উৎসগুলো হচ্ছে ট্রেজারি বিল, বন্ড বিক্রি ইত্যাদি। ব্যাংক বহির্ভূত ব্যবস্থার মধ্যে আছে সঞ্চয়পত্র বিক্রি। এভাবে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ঋণ নেয় সরকার। বাজেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ এটি। কারণ এখানেই অর্থনীতির অনেক বিপদ লুকিয়ে থাকে। ধরুন আপনার আয় কম হলে আপনিও ধার করে খরচ চলতে পারেন। প্রথম বছর সমস্যা হলো না দ্বিতীয় বছরও না। কিন্তু বছরের পর বছর ঋণ বাড়তে থাকলে একসময় ঋণের আসল ও সুদ দেওয়াটাই বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। বছরের পর বছর জমতে থাকা এই ঋণী জাতীয় ঋণ। ঋণ খারাপ কিছু নয় সব দেশই ঋণ নেয়। সমস্যা তখনই যখন ঋণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তখন শ্রীলঙ্কা বা আর্জেন্টিনার মতো সংকট তৈরি হয় দেশ দেউলিয়া হয়ে যায়। এ কারণেই বাজেটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো একটি হলো সরকার কত ঋণ নিচ্ছে কোথা থেকে নিচ্ছে আর সেই ঋণ কোথায় ব্যয় করছে? অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে বেশি ঋণ নেওয়ার দুটি বড় ঝুঁকি আছে। প্রথমত ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে সরকারি বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণযোগ্য অর্থ কমে যায় এতে বিনিয়োগ কমবে। আবার সরকার যদি সঞ্চয়পত্র থেকে বেশি ঋণ নেয় তাহলে বেশি সুদ দিতে হয়। এতে সুদ পরিশোধের চাপ বাড়ে। এ কারণেই প্রায়ই সঞ্চয়পত্রের সুদ কমানোর জন্য আইএমএফ চাপ দেয়। সরকারের ঋণ নেওয়ার আরেকটি উৎস আছে যেমন সরকার চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে নতুন টাকা সৃষ্টি করে বাজেট ঘাটতি মেটাতে পারে। সাধারণ ভাষায় একে বলা হয় টাকা ছাপানো। অর্থাৎ সবসময় যে প্রিন্টিং প্রেস থেকে টাকা ছাপতে হবে তা কিন্তু নয়। তাহলে বলতে পারেন এত ঝামেলার দরকার কি সরকার তো এভাবে টাকা ছাপিয়ে বাজেট তৈরি করতে পারে। সমস্যা হচ্ছে টাকা ছাপলেই তো সম্পদ তৈরি হয় না। সম্পদ আসে উৎপাদন, পণ্য, সেবা, কর্মসংস্থান ও আস্থার মাধ্যমে। তাই সরকার যদি কর আদায় বা ঋণ নেওয়ার বদলে শুধু টাকা ছাপিয়ে বাজেট করে তাহলে অর্থনীতিতে অর্থ সরবরাহ কেবল বাড়বে। কিন্তু চাল, তেল, বিদ্যুৎ, বাড়ি বা চাকরি একই হারে বাড়বে না। ফলে একই পণ্যের পিছনে বেশি টাকা ছুটবে এতে দাম বাড়বে অর্থনীতি সংকটও আরও বাড়বে। তাছাড়া বাজেটের আসল ভিত্তি টাকা ছাপানো নয় বরং উৎপাদনশীল অর্থনীতি ও মানুষের আস্থা। তাহলে প্রশ্ন করতে পারেন ঘাটতি বাজেট দেওয়ার দরকারটা কি? সুষম বাজেট দিলেই তো হয়। অর্থাৎ আয় ও ব্যয় সমান। আসলে অর্থনীতি খুব ভালো থাকলে সুষম বাজেট বা উদ্বৃত্ত বাজেট করা যায়। এতে সঞ্চয় ও বিনিয়োগ বাড়ে সুদের হার ও বাণিজ্য ঘাটতি কমে। একটা সময় ছিল যখন ঘাটতি বাজেটকে ক্ষতিকর ও সরকারের দুর্বলতা ভাবা হতো। তবে এখন বলা হয় বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশে সীমিত ঘাটতি বাজেট করা ভালো। এতে অব্যবহৃত সম্পদের ব্যবহার বাড়ে ঘাটতি পূরণের চাপ থাকে তাতে অর্থনীতিতে উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। তবে অতিরিক্ত ঘাটতি থাকা ভালো না। সাধারণভাবে জিডিপির প্রায় পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত ঘাটতি গ্রহণযোগ্য বলে ধরা হয়। গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে বাজেটের মাধ্যমে সরকার আসলে কি করতে চায়? কেবল আয় ব্যয়ের হিসাব করাই তো একমাত্র লক্ষ্য হতে পারে না। একটি ভালো সরকারের কাজ হচ্ছে অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়া। প্রবৃদ্ধি টেকসই করা কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা, দারিদ্র বিমোচন করা ইত্যাদি। আর এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজস্ব নীতি। আমরা দুটি নীতির কথা জানি যেমন ফিস্কাল বা রাজস্ব নীতি এবং মনিটরি বা মুদ্রার নীতি। রাজস্ব নীতি বাজেটের অংশ আর মুদ্রানীতির দায়িত্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার নগদ জমার বাধ্যবাধকতা এবং সরকারি সিকিউরিটিজ ও বৈদেশিক মুদ্রা কেনাবেচার মাধ্যমে অর্থ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে। আর তা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব ফেলে এটাই মুদ্রানীতি। অন্যদিকে সরকার করের পরিমাণ ও ধরন ব্যয়ের আকার ও গঠন এবং ঋণ নেয়ার ধরন ও পরিমাণ বদলে অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে যাকে আমরা বলি রাজস্ব নীতি। সরকার রাজস্ব নীতির মাধ্যমে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে সম্পদের ব্যবহারকে প্রভাবিত করে। জাতীয় আয় হিসাবের একটি মৌলিক সমীকরণ দিয়ে এটি বোঝানো যায়। যেমন জিডিপি হচ্ছে সি প্লাস আই প্লাস জি প্লাস এন এক্স। এখানে জিডিপি হচ্ছে মোট দেশজ উৎপাদন অর্থাৎ এক বছরে দেশে উৎপাদিত সব চূড়ান্ত পণ্য ও সেবার মোট বাজার মূল্য। সি হচ্ছে কনজাম্পশন বা মানুষের ভোগ ব্যয়। যেমন মানুষ খাবার ও পোশাক কেনে ভাড়া দেয় চিকিৎসা, শিক্ষা ও পরিবহনে ব্যয় করে। আই হলো ইনভেস্টমেন্ট বা বিনিয়োগ। যেমন কারখানা, যন্ত্রপাতি, ভবন, ব্যবসার মজুদ পণ্য ইত্যাদি। জি হচ্ছে সরকারি ব্যয় যেমন রাস্তা, সেতু, বেতন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রতিরক্ষা ইত্যাদি। এন এক্স হচ্ছে নিট রপ্তানি অর্থাৎ রপ্তানি আয় থেকে আমদানি ব্যয় বাদ দিলে যা থাকে। সহজভাবে বলা যায় একটি অর্থনীতিতে মোট উৎপাদিত জিনিস শেষ পর্যন্ত কে কিনল এই হিসাবে জিডিপি বা মোট আয়। এই সমীকরণে সরকার সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে জি অর্থাৎ সরকারি ব্যয়। যেমন সরকার রাস্তা, সেতু, স্কুল, হাসপাতাল বানালে বা বেতন ভাতা দিলে অর্থনীতিতে সরাসরি চাহিদা তৈরি হয়। তাই পরোক্ষ পদক্ষেপ নেয়। যেমন কর কমালে মানুষের হাতে বেশি টাকা থাকে ফলে সি বা ভোগ ব্যয় বাড়তে পারে। আবার কর ছাড়, ভর্তুকি বা সহজে ঋণ দিলে আই বা বিনিয়োগ বাড়তে পারে। এছাড়া রপ্তানি প্রণোদনা ও শুল্ক নীতির মাধ্যমে এন এক্স অর্থাৎ নিট রপ্তানিও প্রভাবিত হতে পারে। বাজেটে সরকার মূলত এটাই করে। সুতরাং বাজেট শুধু সরকারের আয় ব্যয়ের খাতা নয় এটি অর্থনীতির গতি বাড়ানো, কমানো বা দিক পরিবর্তনের একটি মাধ্যম। তাহলে আমরা বাজেট ভালো না খারাপ কিভাবে বুঝব? প্রথমেই দেখতে হবে সরকার কোথায় অর্থ ব্যয় করছে। যদি বাজেটের বড় অংশ বেতন ভাতা ও ঋণের সুদ পরিশোধে চলে যায় তাহলে বুঝতে হবে পরিচালন ব্যয় অনেক বেশি উন্নয়ন ও জনসেবার জন্য সুযোগ কম।

[14:10]এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে আপনার খরের টাকায় যে সরকারি ব্যয় হচ্ছে তার বিনিময়ে আপনি কতটা সেবা পাচ্ছেন? বেতন ভাতার বরাদ্দ বাড়লে সেটি প্রশাসনিক দক্ষতা সেবার মান বা জবাবদিহি বাড়াতে কতটা ভূমিকা রাখবে? সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। আবার উন্নয়ন ব্যয়ের ধরন ও গুরুত্বপূর্ণ। যদি রাস্তাঘাট, হাটবাজার বা দৃশ্যমান অবকাঠামো প্রকল্পে বেশি অর্থ বরাদ্দ হয় কিন্তু শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকে তাহলে সরকারের অগ্রাধিকার সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। অন্যদিকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবসম্পদ উন্নয়নে বেশি ব্যয় দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের প্রতি গুরুত্বের ইঙ্গিত দেয়। বাজেট তো দেশের মানুষের জন্য। তাহলে বাজেটের কোন কোন দিকে নজর রাখব আমরা? এক মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্য। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উপর নতুন কর শুল্ক বা ভ্যাট আরোপ হয়েছে কিনা তা দেখা জরুরি। কারণ এসব সিদ্ধান্ত সরাসরি বাজার দরে প্রভাব ফেলে। গত চার বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে থাকা মানুষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো এবারের বাজেট মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কতটা সহায়ক হবে? দুই করনীতি ও করের বোঝা। কারা বেশি কর দেবেন কারা কর সুবিধা পাবেন করমুক্ত আয়সীমা বাড়ছে না কমছে এসব বিষয় বেতনভোগী ও মধ্যবিত্তদের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তিন কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ। বাজেটে স্থানীয় শিল্প, কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, অবকাঠামো এবং রপ্তানি খাতে নতুন কি থাকছে? তাও দেখতে হবে। কারণ এসব খাতের বিনিয়োগী নতুন চাকরির সৃষ্টি করে। চার শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবার জন্য কত অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে এবং আগের বছরের তুলনায় তা বাড়ছে নাকি কমছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। পাঁচ সামাজিক নিরাপত্তা ও ভর্তুকি। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, খাদ্য সহায়তা বা অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বরাদ্দ বাড়ছে কিনা তা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য খুবই দরকারি। ছয় উন্নয়ন প্রকল্প ও অবকাঠামো। নিজ এলাকার রাস্তা, সেতু, বিদ্যুৎ, পানি বা অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন প্রকল্প ও বরাদ্দ আছে কিনা তাও দেখার বিষয়। তবে খেয়াল রাখতে হবে এসব প্রকল্প সাধারণ মানুষের প্রয়োজন মেটানোর জন্য নেওয়া হচ্ছে নাকি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী দেশের সুবিধার জন্য। সাত ঋণ ও বাজেট ঘাটতি। সরকার কি পরিমাণ ঋণ নিয়ে বাজেট ঘাটতি পূরণ করবে এবং সেই ঋণের উৎস কি তা জানাটা জরুরি। এ তথ্য ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক চাপ সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে। সুতরাং শেষ কথা হচ্ছে বাজেট আপনার জীবনের গল্প, বাজেট আপনার পকেটের গল্প, বাজেট আপনার ভবিষ্যতের গল্প। বাজেট শুধু অর্থমন্ত্রীর বক্তৃতার নয় এটি আমাদের সবার গল্প। প্রাইম ব্যাংক অর্থনীতি অনর্থনীতি থেকে আজ এ পর্যন্তই আবার দেখা হচ্ছে।

Need another transcript?

Paste any YouTube URL to get a clean transcript in seconds.

Get a Transcript